দিন দুই আগে এডাম রিস (Adam Riess) একটা সাক্ষাতকারে দাবি করেছেন যে যেই তত্ত্বের জন্যে তিনি ২০১১ সালে পদার্থ বিজ্ঞানে নোবেল প্রাইজ পাইছেন, তা ভুল হইতে পারে। এবং সুতরাং, বর্তমানে পদার্থ বিজ্ঞানীদের মধ্যে সবচাইতে সর্বসম্মত যেই স্ট্যান্ডার্ড কসমোলজিকাল মডেল, তাও ভুল হইতে পারে। তিনি এবং আরো দুইজন পদার্থ বিজ্ঞানী নোবেল প্রাইজ পাইছিলেন মূলত ক্রমপ্রসারমান মহাবিশ্ব প্রতিনিয়ত আরো দ্রুতগতিতে প্রসারিত হচ্ছে, এমন পর্যবেক্ষণের কারনে।
ঐ সময় এই তত্ত্ব ও অবজার্ভেশনকে এতো গুরুত্ব দেয়া হয়েছিল কারন তা পরোক্ষভাবে ডার্ক এনার্জির অস্তিত্ব প্রমাণ করে, যেই এনার্জির ধারণা ছাড়া বর্তমান স্ট্যান্ডার্ড কসমোলজিকাল মডেলটি ভেঙে পড়বে। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো যে তখন যারা পত্রপত্রিকা পড়েছেন, অনেকেরই মনে আছে যে বহু পত্রিকাতে সরাসরিই দাবি করা হয়েছিল যে তারা ডার্ক এনার্জি আবিষ্কারের জন্যে নোবেল পুরষ্কার পাইছেন। সাধারণ পাঠকদেরকে সহজে তাদের আবিষ্কারের গুরুত্ব বোঝাবার জন্যেই হয়তো এমন প্রচার করা হয়েছিল। কিন্তু এরফলে ডার্ক এনার্জিকে অনেকেই প্রমাণিত সত্য বলে ভ্রম করেছিল। এখনো আপনি এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকায় গেলে দেখবেন যে তাতে এই তিনজনকে ডার্ক এনার্জি আবিষ্কারের জন্যে নোবেল প্রাইজ দেয়া হয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে।
ভবিষ্যতে যখন এই নিওলিবারাল সময়টার ইতিহাস লেখা হবে, মানুষ হয়তো অবাক হয়ে দেখবে যে প্রযুক্তিখাতে বহু অনর্থক ও ধ্বংসাত্মক উৎপাদনকে এসময় মানুষ বিজ্ঞানের উন্নয়ন ভেবে নিয়েছিল। এবং আসলে আইনস্টাইন ও সত্যেন বোসদের পরবর্তি সময়ে পদার্থ বিজ্ঞানে তেমন কোন মেজর আবিষ্কারই নাই। বরং, এই সময়টা হলো পদার্থ বিজ্ঞানের অন্যতম বন্ধা সময়, যখন অবজার্ভেবল মহাবিশ্বের ৯৬ শতাংসই বিজ্ঞানীরা ব্যাখ্যা করতে পারেন না। এডাম রিস বর্তমান দুনিয়ায় ব্যাতিক্রমদের একজন। তার গানিতিক তত্ত্ব যে বর্তমান কসমোলজিকাল মডেলকে কেবলই সত্যায়ন করতেই ব্যবহৃত হতে পারে না, বরং এই মডেলের প্যারাডাইমগুলো ভেঙে পড়ার দিকেই নির্দেশ করতে পারে, সেই সত্য তিনি তুলে ধরেছেন। নোবেল প্রাইজের কারনে সত্য বিরোধী হন নাই তিনি।
ভবিষ্যতের মানুষ দেখবে, যখন স্ট্যান্ডার্ড কসমোলজিকাল মডেলকে টিকিয়ে রাখা প্যরাডিগমাটিক স্তম্ভগুলো ভেঙে পড়েছিল, তখনো দুনিয়ার পদার্থ বিজ্ঞানী সমাজ মোটাদাগে মোল্লাদের মতো আচরণ করে তা টিকিয়ে রাখতে চেয়েছে। আর তা করতে গিয়ে ডার্ক মেটার ও ডার্ক এনার্জির মতো কাল্পনিক ভুগিচুগিকে সত্য বলে খাইয়েছে সাধারণ জনগণকে। এবং বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার খরচ করা হয়েছে এই মডেল টেকাতে গিয়ে। তরুণ সব বিজ্ঞানীদেরকে এমন সব এবস্ট্রাক্ট কণা ও এনার্জির তত্ত্ব আবিষ্কারের কাজে লাগানো হয়েছে, যেগুলোর ৯৯ শতাংসেরই বাস্তবে অস্তিত্ব নাই।
আমরা বড় হয়েছি প্রবল সায়েন্টিফিক পজিটিভিজমের একটা যুগে। নব্বইয়ের দশকটা আদতেই ছিল একটা পজিটিভিজমের যুগ। স্নায়ুযুদ্ধে বিজয়ী নিওলিবারালিজমের হেজিমনি সুনিশ্চিত করতে এইধরণের পজিটিভিস্ট মতাদর্শের প্রয়োজন ছিল। পত্রিকা পড়ে আমরা যেই ২০২৫ সালের কথা কল্পনা করতাম, তাতে এখন আমাদের বাইভার্বাল নিয়ে আসমানে ওড়ার কথা ছিল, একটা টেবলেট খেয়ে সকল নিউট্রিশন পাওয়ার কথা ছিল (মানে, ক্ষুধা-দারিদ্র্য থাকার কথা ছিল না), এবং রাস্তাঘাটে রোবটদের থাকার কথা ছিল মানুষের সেবক হিসাবে। আমাদের এখন থাকার কথা ছিল ফুল্লি অটোমেটেড লাক্সারি কমিউনিজমে। কিন্তু আমরা বাস করছি প্রবল পরিবেশ বিপর্যয়ের দুনিয়ায়। ডিজিটাল প্রযুক্তির সহযোগিতা নিয়ে ও সোস্যাল মিডিয়া লাইভে গণহত্যা-শিশুহত্যা সংঘটনের দুনিয়ায়।
নিওলিবারাল বৈজ্ঞানিক পজিটিভিজম বর্তমান দুনিয়ার অধিকাংশ ট্যালেন্টেড পোলাপানকে টেনে নেয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি খাতে। অবশ্য, তাদের খুব ছোট একটা অংশই পারেন পদার্থ বিজ্ঞানী হইতে। যারা তা পারেন, তাদেরও বেশিরভাগই জীবন পার করে দেন নানান কাল্পনিক ও এবস্ট্রাক্ট কণা, এনার্জি, স্ট্রিং-এর মডেল, ইত্যাদি আবিষ্কার করে, যেগুলোর হয়তো বাস্তবে অস্তিত্বই নাই। এবং এসব আবিষ্কার কাজে লাগে মূলত একটা ইতোমধ্যেই ভেঙে পড়া মহাবিশ্বের মডেল টিকিয়ে রাখার কনজার্ভেটিভ প্রকল্পে। এ এমন এক মডেল, যা মধ্যযুগীয় নিওপ্লেটোনিক মডেলের মতোই নানান রকম মেটাফিজিকাল ও থিওলজিকাল পরিভাষা (বিগ ব্যাং, সিংগুলারিটি, ডার্ক মেটার, ডার্ক এনার্জি) ও পর্দা দ্বারা ঘেরা।
কিন্তু অধিকাংশের সেই ভাগ্যও হয় না। তারা বড়জোর হন প্রযুক্তি-শ্রমিক। তবে তারা অন্য শ্রমিকদের চাইতে নিজেদের বড় ভাবেন। এবং ভাবেন যে তাদের জ্ঞানের এলাকাটা সমাজ বিজ্ঞান অথবা মানবিকবিদ্যার চাইতে অনেক অবেজক্টিভ ও উচ্চতর স্তরের বিষয়। বাস্তবে, এই প্রযুক্তি শ্রমিকদের মধ্যে সবচাইতে শ্রেষ্ঠরাও ইলন মাস্ক, মার্ক জুকারদের মতো টেকনো ফিউডাল লর্ডদের কর্মচারী ও স্লেভ মাত্র। বিজ্ঞান-প্রযুক্তির ফ্যাটিশিজম আমাদেরকে এনেছে এমন এক দুনিয়ায়, যেখানে ফেসবুক-ইউটিউব ব্যবহার করে আলকায়েদার সমর্থকরা কালো পতাকা উড়িয়ে ইমাম মাহদির বাহিনীর আগমনের প্রোপাগান্ডা প্রচার করে (কিংডম অফ হ্যাভেন নামক হলিউডি সিনেমার দৃশ্য ব্যবহার করে)।
এই যে বাংলাদেশের ডিপস্টেটের একাংশ জুলকারনাইন সায়েরদের দিয়ে এবং আরেক অংশ পিনাকী-ইলিয়াসদের দিয়ে দেশের রাজনীতি নিয়ন্ত্রন করছে, জনগণকে নাচাচ্ছে, এটাই হলো বর্তমান বিজ্ঞান-প্রযুক্তিতে প্রতিনিয়ত উন্নয়নবাদী সভ্যতার সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ সত্যগুলির একটি। এই সত্য ডার্ক মেটার অথবা ডার্ক এনার্জির চাইতে অনেক বেশি কংক্রিট। এক হিসাবে, কিছু ডার্ক মেটার ও ডার্ক এনার্জি আমাদের বর্তমান দুনিয়ায় কর্তৃত্ব করে চলেছে বটে। যেমন, যেই ডার্ক মেটারের কারনে মানুষ সারা দুনিয়ার সকলের ক্ষুধা নিবারণের সক্ষমতা অর্জন করা সত্ত্বেও মারণাস্ত্র উৎপাদন এবং ফসিল ফুয়েল পোড়াতে সর্বোচ্চ শক্তি ব্যয় করছে, তা তার মস্তিস্কের অন্তর্গত ডার্ক মেটার। তথা – ইম্যাচিউরিটি ও ইর্যাশনালিটি।
যেই ডার্ক এনার্জির কারনে প্রযুক্তির সহযোগিতা নিয়ে মানুষ এখন গণহত্যা ও পরিবেশ হত্যায় মেতেছে, তা মানুষের নিজের ভেতরের ডার্ক এনার্জি, একধরণের নেতিবাচক রুহানিয়াত। যেই এনার্জির বলে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে সর্বোচ্চ বুৎপত্তির যুগেও কেবল মিথ্যা, শূন্যতা, আর ধ্বংসের রাজত্বই সে কায়েম করছে। এডাম রিসের তত্ত্ব যেই সেকুলার আখেরিতত্ত্বের প্রচারকে জনপ্রিয় করেছে (মহাবিশ্বের এক্সিলারেশনিস্ট এক্সপানশনের কারনে এক পর্যায়ে সকলই সমাপ্ত ও শূন্য হবে), তাকে এমন একটা দুনিয়ারই এলেগরি হিসাবে পাঠ করা যায়।
