রমজানের আগেই অস্থিতিশীল হয়ে উঠেছে বাজার। বাজারে ভোজ্য তেলসহ কয়েকটি নিত্যপণ্যের সরবরাহ সংকট তৈরি হওয়ায় নড়েচড়ে বসেন সরকারের দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা। ভোগ্যপণ্যের বাজার স্থিতিশীল রাখতে নানামুখী পদক্ষেপ নিচ্ছে সরকার। একই সঙ্গে বাজার সিন্ডিকেট ভাঙতে সরকারপ্রধানের নির্দেশে মাঠে নেমেছেন বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
আগামী ২০ মার্চ থেকে রাষ্ট্রায়ত্ত বিপণন প্রতিষ্ঠান ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) মাধ্যমে ভোজ্য তেলসহ ছয়টি নিত্যপণ্য ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে দেওয়া শুরু হবে। আন্ত মন্ত্রণালয় বৈঠকের পর ভোজ্য তেলের ভ্যাট কমানোর পরিপত্র জারি করা হয়েছে। এ ছাড়া নিত্যপণ্যের বাজারে সিন্ডিকেট ভাঙতে নিয়মিত অভিযান চালাচ্ছে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর।
এদিকে ভোজ্য তেলের সরবরাহ বাধা ভাঙতে এসও (সাপ্লাই অর্ডার) ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনা হবে বলে জানিয়েছেন বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি। বিশ্ব ভোক্তা অধিকার দিবস উপলক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, ডিওর মালিকরা একটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে পণ্য ডেলিভারি নিতে বাধ্য হবেন এবং পরে ডেলিভারি করতে বাধ্য হবেন। এ ছাড়া ভোজ্য তেলের উচ্চ মূল্যের লাগাম টানতে সরকার আরো বেশি শুল্কছাড়ের সিদ্ধান্ত নিয়েছে উল্লেখ করে বাণিজ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, আমদানি পর্যায়ে ভ্যাট কমানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, ‘আমাদের যথেষ্ট পরিমাণ দ্রব্য মজুদ আছে। সেটা দিয়ে রমজান মাস পার হয়ে যাবে। চেষ্টা করছি রমজান পর্যন্ত আগের দামটা রাখার জন্য। তবে কেউ অবৈধভাবে পণ্য মজুদ করলে তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ’ তিনি আরো বলেন, ‘পণ্যের দাম বাড়বে না, সেই নিশ্চয়তা দিয়ে বলতে পারি, ভ্যাট কমালে পণ্যের দাম কমতেও পারে। আমরা যে দামটা ঠিক করেছি, সেটা নিশ্চিত করতে চাই। ’
ভোজ্য তেলে দুই পর্যায়ে ভ্যাট প্রত্যাহার
ভোজ্য তেলের বাজার গরম হয়ে ওঠায় রোজার আগে পরিস্থিতি সামলাতে দুই পর্যায়ে ভ্যাট প্রত্যাহার করেছে সরকার। সয়াবিন তেল ও পাম তেলে স্থানীয় উৎপাদন পর্যায় এবং ব্যবসায়ী পর্যায়ে আরোপিত ২০ শতাংশ ভ্যাট প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত গতকাল জানিয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড। এক প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, এই আদেশ অবিলম্বে কার্যকর হবে এবং আগামী ৩০ জুন পর্যন্ত কার্যকর থাকবে।
মন্ত্রিসভার বৈঠক
এদিকে গতকাল মন্ত্রিসভার বৈঠকে ভোজ্য তেলসহ বিভিন্ন নিত্যপণ্যে খুচরা পর্যায়ে ভ্যাট কমানোর সঙ্গে সঙ্গে আমদানি পর্যায়েও ‘সর্বোচ্চ’ কমানোর নির্দেশনা দিয়েছে মন্ত্রিসভা। গতকাল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভা বৈঠকে এই নির্দেশনা দেওয়া হয়। প্রধানমন্ত্রী তাঁর সরকারি বাসভবন গণভবন থেকে এবং মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীরা সচিবালয় থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে বৈঠকে অংশ নেন। বৈঠক শেষে সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদসচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম ব্রিফিং করে বৈঠকের বিষয়ে সাংবাদিকদের জানান।
প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রিপরিষদসচিব জানান, রবিবার নিত্যপণ্যের দাম সহনীয় রাখতে বৈঠক হয়েছে। তিনি বলেন, ‘গতকালের (রবিবার) বিষয়গুলোতে প্রধানমন্ত্রী একমত হয়েছেন এবং খুব শক্তভাবে নির্দেশনা দিয়েছেন। ’ তিনি বলেন, এরই মধ্যে তেলসহ বিভিন্ন নিত্যপণ্যের ভোক্তা পর্যায়ে ভ্যাট কমানোর বিষয়ে অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
মন্ত্রিপরিষদসচিব বলেন, ‘আমদানি পর্যায়ে শুল্ক সর্বোচ্চ কমানোর বিষয়টি বিবেচনার জন্য বলেছে মন্ত্রিসভা। ভোজ্য তেল আমদানি পর্যায়ে ১৫ শতাংশ ভ্যাট রয়েছে। এটা কিভাবে, কতটুকু কমানো যায়, সে বিষয়ে এনবিআরকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। ভোজ্য তেল, চিনিসহ অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যে আমদানি পর্যায়ে ভ্যাট কমাতে বলা হয়েছে। ’
কী কী পণ্যে আমদানি পর্যায়ে ভ্যাট কমানোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, জানতে চাইলে মন্ত্রিপরিষদসচিব বলেন, ‘যেসব পণ্য ক্রাইসিসে থাকবে, সেসবে ভ্যাট কম পর্যায়ে নেওয়ার নির্দেশনা দিয়েছে। ভ্যাট একেবারে তুলে দেওয়া যাবে না। কারণ তখন এনবিআরের কাছে হিসাব থাকবে না। সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেওয়ার নির্দেশনা দিয়েছে মন্ত্রিসভা। ’
একচেটিয়াভাবে বাজার দাম বাড়ার কারণ: হাইকোর্ট
প্রতিযোগিতামূলক না হয়ে বাজার একচেটিয়াভাবে জোটবদ্ধ ব্যক্তি-গোষ্ঠীর কাছে চলে যাওয়ায় নিত্যপণ্যের দাম বাড়ার কারণ বলে মনে করছেন হাইকোর্ট। আদালত বলেছেন, প্রতিযোগিতামূলক বাজার নিয়ন্ত্রণে সরকার আইন করলেও এখন পর্যন্ত সেই আইনের বিধি না করায় আইনের প্রয়োগ বা বাস্তবায়ন সম্ভব হচ্ছে না। এটি দুর্ভাগ্যজনক। আর এর সুযোগ নিচ্ছে জোটবদ্ধ ব্যক্তি-গোষ্ঠী।
সয়াবিন তেলের দাম বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে করা রিট আবেদনের শুনানিতে এমন পর্যবেক্ষণ এসেছে বিচারপতি ফারাহ মাহবুব ও বিচারপতি মো. মনিরুজ্জামানের হাইকোর্ট বেঞ্চ থেকে।
গতকাল সোমবার দ্বিতীয় দিনের শুনানিতে প্রথমেই এ রিটের বিরোধিতা করে ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল প্রতিকার চাকমা বলেন, ‘বাজার নিয়ন্ত্রণে সরকার ব্যবস্থা নিচ্ছে, এরই মধ্যে সয়াবিন তেলসহ অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারদর নিয়ন্ত্রণে এসেছে। সরকার বাজার তদারকিতে টাস্কফোর্স গঠনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ফলে এই রিটে রুল জারি করা ঠিক হবে না। ’
তখন রাষ্ট্রপক্ষকে উদ্দেশ করে আদালত বলেন, প্রতিযোগিতাবিরোধী জোটকে কিভাবে নিরূপণ করছেন? ২০১২ সালে প্রতিযোগিতা আইন হয়েছে। এখন পর্যন্ত এর বাস্তবায়ন নেই। প্রতিযোগিতাবিরোধী চুক্তি, কর্তৃত্ব বন্ধ করতে এখন পর্যন্ত কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল প্রতিকার চাকমা জবাবে বলেন, উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
টাস্কফোর্সে কারা থাকছেন
দেশব্যাপী দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখতে সরকার একটি টাস্কফোর্স গঠন করার সিদ্ধান্ত নেয়। গত রবিবার আন্ত মন্ত্রণালয়ের বৈঠকে এই সিদ্ধান্তের কথা জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। এদিকে গতকাল বাণিজ্যমন্ত্রী জানান, আগামী দু-এক দিনের মধ্যে এই টাস্কফোর্স গঠন করা হবে। সেই টাস্কফোর্সের অধীনে পুলিশ, র্যাব, বিভিন্ন জেলার ডিসি, ভোক্তা অধিকার ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে দ্রব্যমূল্য মনিটরিং সেল থাকবে।
অভিযান চলছে
ঢাকা মহানগরের মোহাম্মদপুর টাউনহল বাজার, শেওড়াপাড়া বাজার, কাজীপাড়া বাজার, রামপুরা কাঁচাবাজারসহ দেশব্যাপী মোট ২৩টি বাজার ও বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে পরিচালিত তদারকি কার্যক্রমের মাধ্যমে ভোক্তাস্বার্থবিরোধী বিভিন্ন অপরাধে ৪৯টি প্রতিষ্ঠানকে দুই লাখ ৭১ হাজার টাকা জরিমানা আরোপ এবং আদায় করা হয়। গতকাল ভোক্তা অধিকার সূত্রে এ তথ্য জানা যায়।
এ ছাড়া কালের কণ্ঠের নোয়াখালী প্রতিনিধি জানান, গতকাল নোয়াখালীতে ১৮ হাজার লিটার ভোজ্য তেল জব্দ করেছে নোয়াখালী ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর। একই সঙ্গে ওই ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে তেল মজুদ করায় ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড করা হয়।
জামালপুর প্রতিনিধি জানান, অবৈধভাবে সয়াবিন তেল মজুদকারী জামালপুরের মেলান্দহ বাজারের দুই ব্যবসায়ীকে ৩০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। এ ছাড়া ৪০১টি ড্রাম ও বোতলে মজুদ ৮১ হাজার লিটার সয়াবিন তেল দ্রুত ন্যায্য মূল্যে বিক্রির আদেশ দিয়েছেন ভ্রাম্যমাণ আদালত।
নড়াইল প্রতিনিধি জানান, বাজারে সয়াবিন তেলসহ নিত্যপণ্যের মূল্য নিয়ন্ত্রণে টাস্কফোর্স অভিযান পরিচালিত হয়েছে। তালিকা না টাঙানোর দায়ে নড়াইলের কালিয়া উপজেলার চাচুড়ি বাজারের তিন ব্যাবসায়ীকে ছয় হাজার টাকা জরিমানা করেছেন ভ্রাম্যমাণ আদালত।
ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে পণ্য : পবিত্র রমজান ঘিরে এবার পণ্য বিক্রিতে পরিবর্তন আনছে টিসিবি। শহর ও গ্রামে ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে বিপণন করা হবে পণ্য। এ জন্য শহর ও গ্রামে অসহায় মানুষের তালিকা তৈরি করছে জেলা প্রশাসন। টিসিবির ঊর্ধ্বতন কার্যনির্বাহী ও তথ্য প্রদানকারী কর্মকর্তা মো. হুমায়ুন কবির কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে ১৫ মার্চ দেওয়ার কথা থাকলেও পিছিয়ে ২০ মার্চ করা হয়েছে। ঢাকার বাইরে অন্যান্য জেলা, উপজেলা, মহানগর ও ইউনিয়ন পরিষদেও টিসিবির পণ্য বিক্রি করা হবে ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে। ’
