Sunday, April 26, 2026
No menu items!

আমাদের মুসলিমউম্মাহ ডট নিউজে পরিবেশিত সংবাদ মূলত বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদের সমাহার। পরিবেশিত সংবাদের সত্যায়ন এই স্বল্প সময়ে পরিসরে সম্ভব নয় বিধায় আমরা সৌজন্যতার সাথে আহরিত সংবাদ সহ পত্রিকার নাম লিপিবদ্ধ করেছি। পরবর্তীতে যদি উক্ত সংবাদ সংশ্লিষ্ট কোন সংশোধন আমরা পাই তবে সত্যতার নিরিখে সংশোধনটা প্রকাশ করবো। সম্পাদক

Homeদৈনন্দিন খবরবৃত্তাকার নৌপথ প্রকল্প : পাঁচ নদী এক পথে আনতে শত বাধা

বৃত্তাকার নৌপথ প্রকল্প : পাঁচ নদী এক পথে আনতে শত বাধা

নদীমাতৃক দেশে শুধু রাজধানী ঢাকাকে কেন্দ্র করেই রয়েছে পাঁচটি বড় নদী। বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, ধলেশ্বরী, শীতলক্ষ্যা ও বালু—এই পাঁচটি নদীর সঙ্গে ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ ও টঙ্গী নদীবন্দরকে যুক্ত করতে চায় সরকার। এর জন্য ২০১৫ সালে তিন পর্যায়ের একটি প্রকল্প নেওয়া হয়। কিন্তু পাঁচ নদী ও তিন নদীবন্দরকে এক নৌপথে এখনো আনা যায়নি।

মূলত স্থানীয় রাজনৈতিক বাধা, মামলা জটিলতা, বিভিন্ন জায়গায় নিচু সেতু ও অর্থায়ন সংকটে প্রকল্পের কাজ গতি পাচ্ছে না। এ অবস্থায় আজ পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক নৌ দিবস। দিনটির এবারের প্রতিপাদ্য—‘নদীর পরিবেশ দূষণমুক্ত রাখা’। বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডাব্লিউটিএ) সূত্র বলেছে, নদীর জায়গায় যাঁদের স্থাপনা আছে, স্থানীয় পর্যায়ে রাজনৈতিকভাবে তাঁরা সবাই প্রভাবশালী।

এতে করে প্রকল্পে কাজের গতি কমে গেছে। যেমন, উত্তরখান এলাকায় মাউসাউদ মৌজায় তুরাগ নদের টঙ্গী খালের আড়াই কিলোমিটার নদীপথ উদ্ধার করা কঠিন হয়ে পড়েছে।

টঙ্গী এলাকায় একটি বড় প্রতিষ্ঠানের মামলার কারণে তুরাগ নদের প্রায় এক কিলোমিটার পথ এখনো বুঝে পাওয়া যাচ্ছে না। তবে বেশির ভাগ বাধা দূর করা গেছে।

বাকিগুলোও রাজনৈতিকভাবেই মীমাংসা করার চেষ্টা চলছে।
এ অবস্থায় ঢাকাকে ঘিরে থাকা নদীগুলোয় নৌযান চলাচলের উপযোগিতা কমছে। ব্যাপক হারে কমেছে পণ্যবাহী নৌযান। কাছাকাছি দূরত্বে যাত্রীবাহী নৌযান চলাচল হয় না বললেই চলে।

পাঁচ নদীর মিলিত দৈর্ঘ্য ১১০ কিলোমিটার

ঢাকার পাশের এই পাঁচ নদীর মিলিত দৈর্ঘ্য ১১০ কিলোমিটার।

দুই তীর ধরে আসা-যাওয়া বিবেচনা করলে এই পথের দৈর্ঘ্য হবে ২২০ কিলোমিটার। এই পুরো পথ নিরবচ্ছিন্নভাবে সচল করা গেলে নৌযান চলাচল বাড়বে। পণ্যবাহী নৌযানের পাশাপাশি বাড়বে যাত্রীবাহী নৌ চলাচলও। সড়কের ওপর চাপ কমে আসবে। নদীগুলোর দুই তীরও থাকবে দখলমুক্ত। দুই পারে তৈরি হবে হাঁটা পথ।
পাঁচ নদীর মধ্যে আমিনবাজার সেতু থেকে ত্রিমুখ সেতু পর্যন্ত তুরাগ নদের দৈর্ঘ্য ৩৮ কিলোমিটার, ত্রিমুখ সেতু থেকে সুলতানা কামাল সেতু পর্যন্ত বালু নদের দৈর্ঘ্য ২১ কিলোমিটার, সুলতানা কামাল সেতু থেকে মুক্তারপুর সেতু পর্যন্ত শীতলক্ষ্যার দৈর্ঘ্য ২২ কিলোমিটার, মুক্তারপুর থেকে বক্তাবলী পর্যন্ত ধলেশ্বরীর দৈর্ঘ্য ১২ কিলোমিটার এবং বক্তাবলী থেকে আমিনবাজার পর্যন্ত বুড়িগঙ্গা নদীর দৈর্ঘ্য ১৭ কিলোমিটার। এই পাঁচ নদী একটার সঙ্গে আরেকটা ঢাকাকে ঘিরে রাখায় রাজধানীর চারপাশে বৃত্তাকার নদীপথ তৈরি হয়েছে। কিন্তু প্রাকৃতিক এই ঐশ্বর্যকে কাজে লাগানো যাচ্ছে না।

প্রকল্পের উপপরিচালক মতিউল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, অনেক মামলা আদালতে বিচারাধীন। তবে ধীরে ধীরে শংকট কাটছে। অনেক জায়গা বুঝে নেওয়ার আশ্বাস পাওয়া গেছে। আগামী শুষ্ক মৌসুম থেকে আটকে থাকা জায়গায় পুরোদমে কাজ শুরু করা যাবে।

তবে রাজনৈতিক বাধার কথা মেনে নিতে রাজি হননি নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘রাজনৈতিক বাধার কোনো অভিযোগ আমার কাছে আসেনি। আমার জানাও নেই। কোনো ঠিকাদারও বলেননি তাঁরা কাজ করতে পারছেন না। করোনাসহ অন্য কিছু কারণে কাজের গতি কিছুটা কমেছে, এটা ঠিক। হয়তো প্রকল্পের সময়ও বাড়বে। কিন্তু কাজ চলমান আছে এবং এটা শেষ হবে।’

কোন নদীর কত পথ

২০১৫ সালে ‘ঢাকা শহরের চারপাশের বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, ধলেশ্বরী, শীতলক্ষ্যা ও বালু নদের তীর ভূমিতে তীর রক্ষা, হাঁটার পথ তৈরি ও জেটিসহ আনুষঙ্গিক অবকাঠামো নির্মাণ (প্রথম পর্যায়)’ প্রকল্পটি হাতে নেয় সরকার। এই প্রকল্পটিই বৃত্তাকার নৌপথ নামে পরিচিত। প্রথম পর্যায়ের কাজ শেষ হয়েছে। এখন দ্বিতীয় পর্যায়ের কাজ চলছে। প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে বিআইডাব্লিউটিএ।

প্রকল্প পরিচালক আবু জাফর মোহাম্মদ শাহনেওয়াজ কবির কালের কণ্ঠকে বলেন, পুরো পথটিকে তিনটি ভাগে বিভক্ত করে তিন প্রকল্পে কাজ করা হচ্ছে। নদীর এলাকা দখলমুক্ত, হাঁটা পথ তৈরির পাশাপাশি নদীর গভীরতা ও প্রশস্ততা বাড়ানোর কাজও করা হচ্ছে। এতে করে পণ্য ও যাত্রীবাহী নৌযান চলাচলের সংখ্যা বাড়বে। যাত্রীবাহী নৌযান চলাচলকে উৎসাহিত করতে নদীর পরিবেশ পরিচ্ছন্ন থাকা খুবই জরুরি। তার ওপরও জোর দেওয়া হচ্ছে।

প্রকল্পের শুরুতে রাজধানীর বছিলা, টঙ্গী ও শ্যামপুরে ১৫ কিলোমিটার ও নারায়ণগঞ্জ সদর এবং সিদ্ধিরগঞ্জের কাঞ্চনপুর ও টানবাজার এলাকায় পাঁচ কিলোমিটার হাঁটা পথ তৈরি করা হয়েছে। ওই অংশে যেসব জায়গায় দখল ছিল সেগুলো উচ্ছেদ করা হয়েছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী হাঁটা পথ নির্মাণকাজও শেষ করা হয়েছে।

পরিবহন বিশেষজ্ঞ বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক শামছুল হক কালের কণ্ঠকে বলেন, নদীর খারাপ অবস্থার জন্য নদীপথগুলো মরে যাচ্ছে। নৌপথ সচল থাকলে সড়কের ওপর চাপ কমে আসবে। নৌপথে পণ্য পরিবহনের খরচও কম। নৌপথ সচল ও পরিবেশ ভালো থাকলে যাত্রী চলাচলও বাড়বে।

নদী

দ্বিতীয় পর্যায়ের কাজে প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ছে

২০১৮ সালের জুলাইয়ে শুরু হওয়া দ্বিতীয় পর্যায়ের কাজ চলতি বছরের জুনে শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু এই সময়ের মধ্যে কাজ শেষ হয়নি। আরো এক বছর প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে। এই অংশের মধ্যে ফতুল্লা, গাবতলী, আমিনবাজার, রায়েরবাজার, কামরাঙ্গীর চর, আশুলিয়া, টঙ্গী ও পাগার মৌজায় ৩৫ কিলোমিটার এলাকায় এবং নারায়ণগঞ্জের বন্দর, মদনগঞ্জ ও সাইদপুর এলাকায় ১৭ কিলোমিটারজুড়ে প্রকল্পের কাজ হচ্ছে।

প্রকল্পের নথির তথ্যানুযায়ী, দ্বিতীয় পর্যায়ে এক হাজার ১৮১ কোটি ১০ লাখ ৩১ হাজার টাকা খরচ করে বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, শীতলক্ষ্যা ও বালু নদের তীরভূমি দখলমুক্ত করে সৌন্দর্য বাড়ানো; নদীর দুই তীরের পরিবেশ উন্নয়ন; নদীর দখলমুক্ত তীরভূমিতে অবকাঠামো নির্মাণ করে ব্যবহার; নদীর নাব্যতা, গভীরতা ও প্রশস্ততা বৃদ্ধি করা এবং নদীর পানির দূষণ কমানো হবে।

এই প্রকল্পের অধীনে বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, শীতলক্ষ্যা ও বালু নদের তীরভূমিতে ৫২ কিলোমিটার হাঁটার রাস্তা নির্মাণ করা হবে। এই ৫২ কিলোমিটারের মধ্যে ঢাকা নদীবন্দরের অন্তর্ভুক্ত অঞ্চল ২১ কিলোমিটার, টঙ্গী নদীবন্দরের অন্তর্ভুক্ত অঞ্চল ১৪ কিলোমিটার এবং নারায়ণগঞ্জ নদীবন্দরের অন্তর্ভুক্ত ১৭ কিলোমিটার।

প্রকল্পের অগ্রগতি প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, গত ২০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সার্বিক কাজের অগ্রগতি হয়েছে ৭০ শতাংশ। আর টাকা খরচ হয়েছে প্রায় ৪০০ কোটি।

তৃতীয় পর্যায়ের কাজ এখনই শুরু হচ্ছে না

বিআইডাব্লিউটিএ সূত্র বলেছে, তৃতীয় পর্যায়ের কাজ দ্রুত শুরু করার কথা থাকলেও প্রকল্পটি এখনই জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটিতে (একনেক) তোলা হয়নি। বৃত্তাকার নৌপথ ঘিরে সরকারের বহু বিভাগ একসঙ্গে কাজ করছে। কাজের সমন্বয়, অগ্রাধিকার এবং অর্থায়নের জন্য সরকার বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে আলোচনা করেছে। এখন বিশ্বব্যাংক পুরো বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করছে।

বিশ্বব্যাংকের মতামত না আসা পর্যন্ত এই নৌপথ ঘিরে নতুন কোনো প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হবে না। তবে তৃতীয় প্রকল্প প্রস্তাব করা রয়েছে। প্রস্তাবে বাকি ১৪৮ কিলোমিটার এলাকায় কাজ শেষ করার জন্য তিন বছর লাগবে বলে জানানো হয়েছে। এই অংশের জন্য খরচ ধরা হয়েছে দুই হাজার ২২৭ কোটি টাকা।

প্রকল্পের পুরো এলাকায় জমি অধিগ্রহণ, ভূমি উন্নয়ন, বিদ্যমান তীর রক্ষা এলাকায় কংক্রিটের হাঁটা পথ, নিচু তীরভূমিতে কলামের ওপর হাঁটা পথ, সীমানাপ্রাচীর, বসার বেঞ্চ, কংক্রিট ও স্টিলের জেটি, পার্কিং ইয়ার্ড নির্মাণ করা হবে। এ ছাড়া ড্রেনেজ ব্যবস্থাপনা, ইকো পার্ক, সবুজ বনায়ন ও জলজ উদ্ভিদ বেষ্টনী গড়ে তোলা হবে।

প্রকল্পসংশ্লিষ্ট সূত্র বলেছে, উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) প্রস্তুত করে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। ২০২০ সালের আগস্টে যাচাই সভা হয়। পরে মহাপরিকল্পনা প্রণয়নসংক্রান্ত কারিগরি কমিটির ২০২১ সালের ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত সভায় প্রকল্পের কাজ আপাতত স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

টঙ্গীর পথে বাধা ১৩ নিচু সেতু

টঙ্গী নদীবন্দরের অন্তর্ভুক্ত ধউর সেতু থেকে ত্রিমুখ সেতু পর্যন্ত মোট ১৩টি নিচু সেতু রয়েছে। ফলে উঁচু নৌযান এই ৩৮ কিলোমিটার নৌপথ পাড়ি দিতে পারে না। তাই এই ১৩টি সেতু ভেঙে ফেলার প্রস্তাব দিয়েছে বিআইডাব্লিউটিএ। এর মধ্যে আশুলিয়া সেতু, ধউর সেতু, টঙ্গী সেতু, ত্রিমুখ সেতু, বালু সেতু, ইছাপুর সেতু ও টঙ্গী রেল সেতু অন্যতম।

প্রকল্প পরিচালক আবু জাফর মোহাম্মদ শাহনেওয়াজ কবির বলেন, ‘সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সঙ্গে এ বিষয়ে আমরা কথা বলেছি। এখন পর্যন্ত কিছু সেতু সরিয়ে নেওয়ার আশ্বাস পাওয়া গেছে। সব সেতু সরানো না হলে এই অংশ সচল হবে না। আর একটি অংশ বাধাপ্রাপ্ত হলে পুরো বৃত্তাকার নৌপথই বাধাপ্রাপ্ত হবে।’

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

7 − five =

সবচেয়ে জনপ্রিয়

সাম্প্রতিক মন্তব্য