মধ্যযুগে ইলমি মজলিস বা জ্ঞানের আসর চিহ্নিত করার জন্য যে পরিভাষা সর্বাধিক ব্যবহৃত হতো, তা হলো ‘মজলিস’। যে ব্যক্তিকে কেন্দ্র করে একটি মজলিস অনুষ্ঠিত হতো, হয়তো তার নামেই মজলিসের নামকরণ হতো। উদাহরণস্বরূপ ‘মজলিসে মাহামিলির’ কথা বলা যায়। এটি মাহামিলির বাসগৃহে অনুষ্ঠিত হতো এবং এখানে মূলত ফিকহ ও ধর্মতত্ত্ব নিয়ে আলোচনা হতো। মজলিসে শাফেঈ বাগদাদের জামে মানসুরে অনুষ্ঠিত হতো। (তারিখে বাগদাদ : ৯/৩৯৪)
ইলমি মজলিস বা জ্ঞানের আসর বোঝানোর জন্য চিহ্নিত করার জন্য দ্বিতীয় যে পরিভাষাটি ব্যবহৃত হতো, সেটি হলো ‘হালাকা’ (পাঠচক্র)।
দরসে সুবিন্যস্তভাবে বসার ধারণা থেকে সম্ভবত শব্দটির উৎপত্তি হয়েছে। ছাত্ররা চারদিকে গোল হয়ে বসত, তবে শিক্ষকের সম্মুখভাগে বসা পছন্দনীয় ছিল। ইমাম শাফেঈ যখন বাগদাদ সফর করেন, তখন জামে মানসুরে ৪০ থেকে ৫০টির মতো হালাকা ছিল বলে উল্লেখিত হয়েছে। ৩২৬ হিজরিতে কায়রোর জামে আমরে মালেকি মাজহাবের ১৫টি, শাফেঈ মাজহাবের ১৪টি এবং হানাফি মাজহাবের তিনটি করে হালাকা ছিল। (আল-মুগরিব ফি হুলাল মাগরিব, পৃষ্ঠা ২৪)
কায়রো ও দামেস্কে নিয়মিত বৈঠকগুলোকে ‘আজ-জাবিয়া’ বলা হতো। জাবিয়াতে শাফেঈ, যেখানে তিনি সশরীরে দরস দিয়েছেন, প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে ওই নামে পরিচিত ছিল। কায়রোর মসজিদে আজহার এবং জামে মামুর, যেটিকে দামেস্কের গ্র্যান্ড মসজিদও বলা হয়, উভয়টিতে আটটি করে ‘জাবিয়া’ ছিল।
হাম্বলি মাজহাবের বিখ্যাত ফকিহ ও মুহাদ্দিস আবু বকর নাজ্জাদ জামে মানসুরে দুটি হালাকার আয়োজন করতেন। শুক্রবার জুমার সালাতের আগে ফিকহি মাসআলার জন্য একটি, আর অন্যটি জুমার পর হাদিস বর্ণনার জন্য। (তারিখে বাগদাদ : ৪/১৯০)
একই শহরের জামে রুসাফাতে হাদিসের ছাত্রদের আরেকটি হালাকা বসত। বিখ্যাত ধর্মতাত্ত্বিক আবুল হাসান আলী বিন ইসমাঈল আশআরি এখানে প্রতি শুক্রবার দরস দিতেন।
আসলে একটি হালাকায় কয়েকজন ওস্তাদ দরস দিতেন, আবার এটিও সম্ভব যে কয়েকজন ওস্তাদ কয়েকটি আলাদা হালাকায় অংশগ্রহণ করতেন। মজলিস ও হালাকার মধ্যে পার্থক্য ছিল বটে, তবে উভয়েরই মৃত শিক্ষকের নামে চেয়ার ছিল।
ছাত্রদের জন্য সাধারণত সব দরস উন্মুক্ত ছিল। তবে ব্যতিক্রম হতো সেসব বিষয়ে, যেগুলো শিখতে দীর্ঘ সময় লাগত। এসব ক্ষেত্রে শিক্ষক নিজে কিছু ছাত্রকে বাছাই করতেন এবং তাদের দরসে বসার অনুমতি দিতেন। আর যে বিষয় শেখানো হচ্ছে, সে অনুযায়ী ক্লাসের আকার ছোট-বড় হতো। ফলে ফিকহ বা ব্যাকরণের ক্লাসে ছাত্রসংখ্যা ছিল খুব সীমিত। কিন্তু হাদিসের ক্লাসগুলোতে উপস্থিতির সংখ্যা মাঝেমধ্যে এত বেশি হতো যে হাদিস বর্ণনার জন্য শিক্ষককে বর্ণনা সহকারী (মুসতামলি) নিয়োগ করতে হতো, যিনি শিক্ষকের বলা কথা একদম পেছনের সারিগুলোর উদ্দেশে আবার বলতেন, যেখান থেকে হয়তো শিক্ষকের কথা ঠিকমতো শোনা যায়নি। কায়রোর জামে আমরে আবুবকর নিআলির হালাকা এত বড় ছিল যে মসজিদের ১৭টি স্তম্ভজুড়ে ছাত্ররা বসত। (সুয়ুতি, হুসনুল মুহাযারা : ২/৯১)
হাদিসের পাঠ সম্পন্ন করার নির্ধারিত কোনো বয়স ছিল না। ছাত্ররা দীর্ঘ সময় ধরে সংকলনকার্য চালিয়ে যাবে, নাকি আগেভাগে বন্ধ করে দেবে, তা নির্ভর করত তাদের পারিপার্শ্বিক অবস্থা ও ব্যক্তিগত দক্ষতার ওপর। তবে কতিপয় শাস্ত্রের ক্ষেত্রে ভিন্নতর চিত্র দেখা যেত। ভাষাবিজ্ঞান ও ফিকহের ছাত্ররা একজন নির্দিষ্ট শিক্ষকের অধীনে বেশ লম্বা সময় ধরে পাঠ গ্রহণ করত। কথিত আছে, আহমাদ বিন ইয়াহইয়া সালাবের অন্যতম শিষ্য আবু মুসা আল-হামেজ তাঁর কাছে ৪০ বছর ধরে ইলম অর্জন করেছিলেন।
তাফসিরের একজন শিক্ষক ছয় বছর ধরে তাঁর কিতাবের দরস দিতেন।
প্রখ্যাত হানাফি ফকিহ আবু ইউসুফ ১৭ বছর ধরে তাঁর ওস্তাদ আবু হানিফার দরসে বসেছেন। আবু হানিফা নিজেও ১০ বছর ধরে তাঁর ওস্তাদ হাম্মাদ বিন আবু সুলায়মানের কাছে থেকে শিক্ষা গ্রহণ করেছেন। অবশেষে যে সময় বাগদাদ ও অন্যান্য জায়গায় মাদরাসা প্রতিষ্ঠিত হলো, তত দিনে ফিকহশাস্ত্র চার বছরের একটি মানসম্মত কোর্সের রূপ পরিগ্রহ করেছে।
মাদরাসা-পূর্ব যুগের শিক্ষাব্যবস্থা এমন ছিল যে সেখানে ছাত্র-শিক্ষক কারো জন্য কোনো বয়সসীমা ছিল না। একজন যত দিন চাইত পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারত। আবার যখন সে নিজেকে যোগ্য বলে মনে করত এবং ছাত্ররা তাকে ওস্তাদ হিসেবে গ্রহণ করত, তখন সে দরস দেওয়া শুরু করত। ১৭ বছরের এক তরুণ হাদিস বর্ণনার জন্য মজলিসের আয়োজন করেছিল।
আরেকজনের বয়স ছিল ১৮, যখন হাদিসের ছাত্ররা তাকে দরস প্রদানের জন্য অনুরোধ করেছিল।
তবে এটি সাধারণ চিত্র ছিল না। ওয়াকি ইবনুল জাররাহ ৩৩ বছর বয়সে হাদিস বর্ণনা করা শুরু করেন। এমনিভাবে ইবনে মাহদি যখন প্রথমবার পাঠদান করেন, তখন তাঁর বয়স ৩৫-ও হয়নি। (তারিখে বাগদাদ, ১৩/৪৬৮)
