অসলোর সিটি হলের ঘড়িতে যখন সকালের আলো এসে পড়েছে, সেই মুহূর্তটা ছিল অদ্ভুত রকমের স্থির এবং ভারী। ২০২৫ সালের নোবেল শান্তি পুরস্কার পাচ্ছেন মারিয়া কোরিনা মাচাদো (María Corina Machado)।
খবরটা যেন বিদ্যুতের গতিতে ছড়িয়ে পড়লো। আর তার সাথে সাথে পৃথিবীর দুই প্রান্তে তৈরি হলো দুটি সম্পূর্ণ বিপরীতধর্মী দৃশ্য। ভেনেজুয়েলার কারাকাসের রাস্তায় যে মানুষগুলো বছরের পর বছর ধরে একনায়কতন্ত্রের যাঁতাকলে পিষ্ট, ক্ষুধা আর হতাশায় যাদের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে, তাদের মধ্যে বয়ে গেল আনন্দের এক উদ্দাম স্রোত। বহু দিন পর তাদের বিবর্ণ মুখে ফুটে উঠল এক চিলতে হাসি। তরুণরা পতাকা হাতে রাস্তায় নেমে এলো, বৃদ্ধদের চোখে দেখা গেল আশার জল। কারাকাসের অভিজাত এলাকা চাকাও বা লাস মার্সিডিজ এ গাড়ির হর্ন বাজিয়ে উল্লাস শুরু হলো, যা ছিল এক দীর্ঘ প্রতীক্ষিত বিজয়ের স্বতঃস্ফূর্ত প্রকাশ। অন্যদিকে, ওয়াশিংটন, ব্রাসেলস আর মাদ্রিদের ক্ষমতার অলিন্দে এই ঘোষণাকে দেখা হলো গণতন্ত্রের এক অমোঘ বিজয় হিসেবে। পশ্চিমা গণমাধ্যমগুলো, যেমন সিএনএন, বিবিসি এবং দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস, তাকে চিত্রিত করতে শুরু করলো লাতিন আমেরিকার নতুন ‘লৌহমানবী’ (Iron Lady) হিসেবে, যিনি একাই এক দানবের বিরুদ্ধে লড়ে যাচ্ছেন; একবিংশ শতাব্দীর এক জোয়ান অফ আর্ক, যিনি তার জাতিকে মুক্তির পথে নেতৃত্ব দিচ্ছেন।
কিন্তু গল্পের আরেকটা পিঠও ছিল, যা ছিল আরও জটিল এবং কোলাহলপূর্ণ। কারাকাসের সরকারি টেলিভিশন চ্যানেলগুলোতে তখন ভিন্ন সুর। সেখানে তাকে দেখানো হচ্ছিল ‘সাম্রাজ্যবাদের দালাল’ এবং ‘আপাত্রিদা’ বা দেশহীন হিসেবে, যিনি দেশের ওপর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা চাপিয়ে সাধারণ মানুষের রুটি কেড়ে নিয়েছেন। ভেনেজুয়েলার পশ্চিমের বারিওগুলোতে , অর্থাৎ কারাকাসের পেতারে বা ২৩শে জানুয়ারির মতো এলাকাগুলোতে, যেখানে হুগো শ্যাভেজের স্মৃতি এখনো অমলিন এবং তার সামাজিক কর্মসূচিগুলো লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবন বদলে দিয়েছিল, সেখানকার মানুষগুলোর চোখে ছিল অবিশ্বাস, সন্দেহ আর চাপা ক্রোধ। তাদের কাছে এই নোবেল পুরস্কার ছিল পশ্চিমা ষড়যন্ত্রের একটি নতুন, আরও পরিশীলিত অধ্যায় মাত্র। তাদের কাছে মারিয়া কোরিনা মাচাদো সেই পুরোনো অভিজাততন্ত্রের প্রতীক, যে তন্ত্রকে তারা একবার ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছিল। এই পুরস্কার তাদের কাছে ছিল এক তিক্ত পরিহাস – যেন তাদের দারিদ্র্য আর সংগ্রামকে উপহাস করে সেই শ্রেণীকেই সম্মানিত করা হচ্ছে, যারা ঐতিহাসিকভাবে তাদের শোষণের জন্য দায়ী।
তার রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে বিতর্কিত অধ্যায়টি হলো ২০০২ সালের এপ্রিলে ঘটে যাওয়া স্বল্পস্থায়ী সামরিক অভ্যুত্থান । অভ্যুত্থানের পর ব্যবসায়ী নেতা পেদ্রো কারমোনা এস্তাংগা নিজেকে অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট ঘোষণা করেন এবং কুখ্যাত “কারমোনা ডিক্রি” জারি করে এক কলমের খোঁচায় দেশের সংবিধান, জাতীয় পরিষদ এবং সুপ্রিম কোর্টকে বিলুপ্ত করে দেন। মারিয়া কোরিনা মাচাদো সেই ডিক্রিতে স্বাক্ষরকারী শত শত বিরোধী নেতার মধ্যে অন্যতম ছিলেন ।
‘সুমাতে’ এবং বিদেশি হস্তক্ষেপের বিতর্ক সুমাতে ২০০৪ সালে শ্যাভেজের বিরুদ্ধে একটি গণভোট আয়োজনে নির্ণায়ক ভূমিকা রাখে। এই সংগঠনটির অর্থায়ন নিয়ে শুরু থেকেই তীব্র বিতর্ক ছিল। ভেনেজুয়েলা সরকার এবং বিশ্বের বিভিন্ন বামপন্থী গবেষকরা উইকিলিকসের ফাঁস করা তারবার্তা এবং অন্যান্য নথিপত্র উদ্ধৃত করে অভিযোগ করেন যে, সুমাতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কুখ্যাত ‘ন্যাশনাল এনডাওমেন্ট ফর ডেমোক্রেসি’ থেকে লক্ষ লক্ষ ডলার অর্থ সাহায্য পেয়েছে। NED এমন একটি সংস্থা, যা আনুষ্ঠানিকভাবে গণতন্ত্র প্রসারের জন্য কাজ করলেও, এর বিরুদ্ধে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে, বিশেষ করে লাতিন আমেরিকায়, মার্কিন স্বার্থবিরোধী নির্বাচিত সরকারকে অস্থিতিশীল করার অভিযোগ রয়েছে । এই অর্থ সাহায্যকে শ্যাভেজ সরকার ভেনেজুয়েলার অভ্যন্তরীণ বিষয়ে মার্কিন হস্তক্ষেপের প্রমাণ হিসেবে তুলে ধরে।
২০০৫ সালে মাচাদো হোয়াইট হাউসে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ. বুশের (George W. Bush) সাথে দেখা করেন। এই বৈঠকের ছবিটি শ্যাভেজ সরকারের জন্য একটি বিশাল প্রচারণাগত সুযোগ তৈরি করে দেয়। সেই সময়ে ইরাক যুদ্ধের কারণে বুশ সারা বিশ্বে, বিশেষ করে লাতিন আমেরিকায়, অত্যন্ত অজনপ্রিয় ছিলেন। তার সাথে মাচাদোর হাস্যোজ্জ্বল ছবি ভেনেজুয়েলার রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে বারবার দেখানো হতে থাকে। তারা এই ছবিটিকে প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করে প্রচার করতে থাকে যে, মাচাদো ভেনেজুয়েলার সার্বভৌমত্বকে ওয়াশিংটনের কাছে বিক্রি করে দিয়েছেন এবং তিনি একজন ‘pitiyanqui’ (ইয়াঙ্কিদের পোষা কুকুর)।
শ্যাভেজের উত্থান কোনো আকস্মিক ঘটনা ছিল না; এটি ছিল ভেনেজুয়েলার আপাত-স্থিতিশীল গণতন্ত্রের ভেতরের গভীর ফাটল এবং পুঞ্জীভূত ক্ষোভের এক অনিবার্য বিস্ফোরণ।
তিনি সরাসরি হুগো শ্যাভেজ এবং পরে নিকোলাস মাদুরোর নীতির কঠোর সমালোচনা করতেন।
মারিয়া কোরিনা মাচাদোকে পুরস্কৃত করার মাধ্যমে নোবেল কমিটি কি মাদুরো সরকারের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ আরও তীব্র করতে চাইছে? এটি কি ভেনেজুয়েলার অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে একটি সরাসরি হস্তক্ষেপ নয়, যা মাদুরো সরকারকে আরও একগুঁয়ে করে তুলতে পারে
সবচেয়ে উদ্বেগজনক তুলনাটি টানা যায় মিয়ানমারের নেত্রী অং সান সু চি -র সাথে। সু চি-ও গণতন্ত্রের জন্য অহিংস সংগ্রামের কারণে ১৯৯১ সালে নোবেল শান্তি পুরস্কার পেয়েছিলেন এবং বিশ্বজুড়ে গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের এক জীবন্ত প্রতীক হিসেবে প্রশংসিত হয়েছিলেন। কিন্তু ক্ষমতায় আসার পর তিনি রোহিঙ্গা মুসলিমদের ওপর হওয়া গণহত্যাকে উপেক্ষা বা সমর্থন করে তার আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি ধ্বংস করেন । এই ঘটনাটি একটি কঠোর সতর্কবার্তা দেয় যে, বিরোধী অবস্থানে থাকা একজন গণতন্ত্রের প্রতীক ক্ষমতায় গিয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন রূপ ধারণ করতে পারেন, বিশেষ করে যখন তাকে একটি জটিল এবং বিভক্ত সমাজ পরিচালনা করতে হয়।
অনেকেই মারিয়া কোরিনা মাচাদোর মধ্যে এই একই বিপদের ছায়া দেখতে পান। তার কট্টরপন্থী এবং অভিজাতবাদী পটভূমি, তার প্রতিশোধমূলক বাগাড়ম্বর এবং শ্যাভিজমকে সম্পূর্ণভাবে নির্মূল করার আকাঙ্ক্ষা এই আশঙ্কাকে আরও বাড়িয়ে তোলে। যদি তিনি ক্ষমতায় আসেন, তাহলে ভেনেজুয়েলার লক্ষ লক্ষ শ্যাভেজ-সমর্থক এবং বলিভারিয়ান বিপ্লবের সুবিধাভোগীদের কী হবে? তিনি কি তাদের অন্তর্ভুক্ত করার চেষ্টা করবেন, নাকি তাদের দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিকে পরিণত করবেন? অং সান সু চি-র উদাহরণ দেখায় যে, নোবেল শান্তি পুরস্কার ভবিষ্যতের নৈতিক আচরণের কোনো গ্যারান্টি দেয় না।
এক অনিশ্চিত পথের যাত্রী, এক ধূসর দিগন্ত মারিয়া কোরিনা মাচাদোর নোবেল শান্তি পুরস্কার প্রাপ্তি কোনো গল্পের শেষ নয়, বরং এক নতুন এবং সম্ভবত আরও জটিল অধ্যায়ের শুরু।
