ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিকের (ইউএপি) বেসিক সাইন্স বিভাগের শিক্ষিকা লায়েকা বশিরের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা ধর্মঅবমাননা, মুসলিম শিক্ষার্থী নির্যাতন এবং ধর্মীয় স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপের গুরুতর অভিযোগ উঠে এসেছে। বিভিন্ন বিভাগের বর্তমান ও প্রাক্তন শিক্ষার্থীরা তার বিরুদ্ধে ক্লাসে ইসলামী বিধান নিয়ে কটূক্তি, হিজাব-নিকাব পরিধানকারী শিক্ষার্থীদের অপমান এবং মানসিক নির্যাতনের অসংখ্য অভিযোগ এনেছেন।
১১ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখে লায়েকা বশির তার ফেসবুক পোস্টে ইসলামের ফরজ বিধান পর্দা করাকে “অপরাধের মাত্রা বাড়ানোর” সাথে যুক্ত করেন এবং লেখেন, “সারা মুখ মমি বানিয়ে রাখতে বলা হয়নি।” সম্প্রতি মোহাম্মাদপুরে গৃহকর্মী কর্তৃক মা ও মেয়ে হত্যার ঘটনায় অপরাধী বোরকা পরিহিত অবস্থায় পালিয়ে যাওয়ার ঘটনা উল্লেখ করে তিনি মুখ ঢেকে পর্দা করার বিরুদ্ধে মন্তব্য করেন।

এই পোস্ট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে এবং তার দীর্ঘদিনের ধর্মবিদ্বেষী আচরণের অভিযোগ সামনে আসতে শুরু করে।
ইউএপির ফার্মাসি বিভাগের প্রাক্তন ছাত্র মুহাম্মাদ মারূফ হোসাইন (ব্যাচ-৫০) বিস্তারিত লিখিত বিবৃতি দিয়েছেন। তিনি জানান, ২০২১ সালের স্প্রিং সেমিস্টারে লায়েকা বশিরের সমাজবিজ্ঞান (Sociology) ক্লাসে তিনি ছিলেন। মারূফ হোসাইন জানান:
- লায়েকা বশির ক্লাসে মুসলিম আইন অনুযায়ী সম্পত্তি বণ্টন নিয়ে আপত্তিকর মন্তব্য করতেন
- সমান অধিকারের নামে ইসলামের বিধানকে প্রতিনিয়ত খাটো করে উপস্থাপন করতেন
- শিক্ষার্থীদের মনে ধর্ম সম্পর্কে সন্দেহ-সংশয় তৈরি করতেন
- ঈদুল আযহার কুরবানিকে “উল্লাসে পশু হত্যা” বলে সম্বোধন করতেন
- কেউ আপত্তি তুললে সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থীদের “মার্কড” করা হতো এবং পরীক্ষার খাতায় ঝাল মেটাতেন
- পর্দা করলে নারী শিক্ষার্থীদের বিবিধ হেনস্থা করতেন
মারূফ হোসাইন একটি অত্যন্ত গুরুতর অভিযোগ এনেছেন যার প্রত্যক্ষ সাক্ষী তিনি নিজে এবং তার সেকশনের অন্যান্য শিক্ষার্থীরা। তিনি জানান, অনলাইন ক্লাসে অ্যাসেসমেন্ট ভাইভা চলাকালীন শিক্ষিকা লায়েকা বশির ক্লাস রেকর্ডিং চালু থাকা অবস্থায় মিটিংয়ে সকলের সামনে তিনজন মুসলিম নারী শিক্ষার্থীকে মুখ দেখানোর জন্য জোর করেন। শিক্ষার্থীরা রেকর্ডিং বন্ধ করার অনুরোধ জানালেও তা গ্রহণ করা হয়নি। বরং তাদের “বেয়াদব” ও “অভদ্র” আখ্যা দিয়ে মুসলিম নারী শিক্ষার্থীদের প্রতি চরম ঘৃণা, বিদ্বেষী মনোভাব এবং ধর্মীয় স্বাধীনতায় আঘাতের মাধ্যমে ফ্যাসিবাদী মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ ঘটান লায়েকা বশির।
দি ‘আসরের হাতে এই অভিযোগটির স্বপক্ষে ভিডিয়ো প্রমাণ পৌঁছেছে, এবং তাতে দি ‘আসর নিশ্চিত হয়েছে যে অভিযোগটি সত্য।
বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষার্থীদের অভিযোগ
লায়েকা বশিরের বিরুদ্ধে অসংখ্য শিক্ষার্থীর অভিযোগ উঠে এসেছে:
১. নিকাব খোলার জোরজবরদস্তিঃ
সিএসই বিভাগের এক শিক্ষার্থী জানিয়েছেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম দিনই ক্লাসে তার নিকাব খুলতে বাধ্য করা হয়েছিল।
২. প্রকাশ্যে অপমান
ইংরেজি বিভাগের স্প্রিং-১৭ সেশনের ফাহমিদা আখতার জানিয়েছেন: “প্রকাশ্যে পুরো ক্লাসের সামনে উনি আমাকে অপমান করেছিলেন, যদিও আমার মুখ ঢাকা ছিল না। উনার কথা এমন ছিল, আমার মত পোশাক পরা এক মহিলাকে রাস্তায় এক বাচ্চা দেখে ভূত বলে ভয় পেয়েছে।”
৩. পর্দানশীন নারীদের প্রতি বৈষম্য
একই বিভাগের ফল-১৮ ব্যাচের ছাত্রী জিন্নাত আরা ফেরদৌস লিখেছেন: “ক্লাস চলাকালীন তার আচরণ আমার প্রতি অনেক খারাপ ছিল। তিনি প্রায়ই আমার নিকাব পরা নিয়ে বিদ্রুপ করতেন। ক্লাসে কোনো প্রশ্ন করলে অনেক সময় শুনেও না শোনার ভান করতেন।”
জিন্নাত আরও লিখেছেন: “উনার এই ধারাবাহিক আচরণের কারণে আমি এতটাই মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিলাম যে, আল্লাহ না করুন, সুইসাইডাল এটেম্পট নিলে তখন কি এর দায় কে নিতো!”
সিএসই বিভাগের একজন নারী শিক্ষার্থী পরিচয় গোপন রাখার শর্তে জানিয়েছেন, নিকাব পরিহিতা নারীদের তিনি ইচ্ছাকৃতভাবে প্রেজেন্টেশনে মার্ক কম দিতেন।
৪. নামাজে বাধা
সাবরিনা সুলতানা নুহা জানিয়েছেন: “কেউ ক্লাসের সময় নামাজে যেতে চাইলে উনি খুব রাগ হতেন এবং উনার ক্লাসে আর না যাওয়ার জন্য বলতেন।”
৫. ধর্মীয় সংস্কৃতিতে বাধা
ইলেক্ট্রিক্যাল বিভাগের মাইমুনা আক্তার লিখেছেন: “কেমন আছি এর উত্তর ‘আলহামদুলিল্লাহ’ বলার কারণে কটু কথা শুনতে হয়েছে।”
৬. পর্দা নিয়ে বৈরি মন্তব্য
ফার্মাসি বিভাগের স্প্রিং ২০২৫ ব্যাচের এক শিক্ষার্থী জানিয়েছেন: “তার কথাবার্তায় মুসলিম নারীদের পর্দা নিয়ে পরোক্ষভাবে কিছু কথা বলতে শুনেছি। একজন মুসলিম মেয়ে হিসেবে আমি আমার ধর্মের বিরুদ্ধে কোনো অপ্রাসঙ্গিক মতামত মেনে নিব না।”
৭. প্রতিবাদ করলেই অ্যাকাডেমিকভাবে বৈষম্যকরণ, অন্যদিকে স্বজনপ্রীতি
সিএসই ২১ ব্যাচের একজন নারী শিক্ষার্থী জানিয়েছেন যে লায়েকা বশির তাদেরকে হুমকি দিয়েছিলেন যে, “আমি দেখে নিবো তোমরা কীভাবে ভালো সিজি নিয়ে ইউনিভার্সিটি থেকে বের হও”, পরবর্তীতে পুরো ব্যাচকে তিনি B, C, D গ্রেড প্রদান করেন তার কোর্সে। এদিকে একই ব্যাচে লায়েকা বশিরের এক পরিচিতের ছেলেকে একই কোর্সে A+ দেন, যদিও সে ভালো ছাত্র নয়। আবার এক শিক্ষার্থীর সিজিপিএ 3.99 হওয়া সত্ত্বেও, তাকে B দেওয়া হয়। এসব কারণে লায়েকার বিরুদ্ধে পার্শিয়ালিটির অভিযোগ করেছেন শিক্ষার্থীরা।
ফার্মেসির এক প্রাক্তন ছাত্র জানিয়েছেন যে, ইসলাম নিয়ে লায়েকা বশিরের বাজে ভাষায় আক্রমণগুলোর প্রতিবাদ করায় তাকে কোর্সে C+ দিয়েছেন লায়েকা, অথচ তিনি সিজিপিএ 3.7 নিয়ে ফার্মেসিতে বিএসসি সম্পূর্ণ করেছেন।
৮. বিবিধ অভিযোগ
ফার্মেসি বিভাগের এক নারী শিক্ষার্থী জানিয়েছেন যে লায়েকা বশির ক্লাসে ট্রান্সজেন্ডারদের সমর্থন করে কথা বলতেন।
সিএসই বিভাগের একজন ছাত্র জানিয়েছেন, “উনি ক্লাসে ইসলাম নিয়ে উলটাপালটা কথা বলতো”।
শিক্ষার্থীদের সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রচণ্ড প্রতিবাদের মুখে ইউএপি কর্তৃপক্ষ কেবল বর্তমান শিক্ষার্থীদের একটি গুগল ফর্ম পাঠায়, যেখানে লায়েকা বশিরের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে তা পূরণ করতে বলা হয়। ফর্মের সময়সীমা ছিল ৩১ ডিসেম্বর। কিন্তু সময়সীমা পার হয়ে গেলেও কর্তৃপক্ষ এখন পর্যন্ত কোনো কার্যকরী পদক্ষেপ নেয়নি। বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে, ইউএপি কর্তৃপক্ষ কেবল কয়েক মাসের জন্য লায়েকা বশিরকে সাময়িক সাসপেন্ড করে পুনরায় স্বপদে বহাল করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
শিক্ষার্থীদের আরো লিখিত অভিযোগ
শিক্ষার্থীদের এসব প্রতিবাদের বিপরীতে শিক্ষার্থী-অ্যালামনাইগণকে অজ্ঞাত ইমেইল থেকে ইমেইলে ‘উগ্রবাদী গোষ্ঠী ও মব অ্যাটাকার’ আখ্যা দেওয়া হচ্ছে।
গত ২১শে ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখে শিক্ষার্থীরা লায়েকা বশিরের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ সংবিধানের মৌলিক অধিকার ধর্মীয় স্বাধীনতা (অনুচ্ছেদ-৪১) ভঙ্গ, ধারা-২৬, সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ, ২০২৫ এবং ধারা-২৯৫এ, ২৯৮, ৪৯৯, পেনাল কোড-১৯৬০ এর লঙ্ঘনের অভিযোগ করেছেন। তা সত্ত্বেও প্রশাসন নিরব অবস্থানে রয়েছে।
বিবিধঃ
লায়েকা বশিরের কানেকশন খুঁজলে দেখা যায় তিনি তার সিভিতে রেফারেন্স হিসাব করেছেন আরেক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষিকা ‘সামিনা লুৎফা’কে, যিনি টিভিতে ওড়না পড়ার ব্যাপারে অপমানজনক মন্তব্য করে ফোকাসে এসেছিলেন, ২০১৩ সালে হেফাজতে ইসলামের উপর বর্বর গণহত্যাকে সমর্থন দেখিয়ে পোস্ট করেছিলেন, পাঠ্যপুস্তকে এলজিবিটি টপিক পুশ করার পেছনে কাজ করছেন।

উল্লেখযোগ্য যে, একই বিশ্ববিদ্যালয়ে ২৬ বছর ধরে শিক্ষকতা করা প্রফেসর শমসাদ আহমেদকে শায়েখ আহমাদুল্লাহর সাথে শুধুমাত্র ছবি তোলার কারণে শোকজ করা হয়েছিল। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে ধর্মঅবমাননা ও শিক্ষার্থী নির্যাতনের অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও লায়েকা বশিরের বিরুদ্ধে কোনো শক্ত পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে না।
Source: The Aasr
