মেজর (অব.) জাহিদুল ইসলামকে সম্প্রতি মরণোত্তর ব্রিগেডিয়ার জেনারেল পদবি দেওয়া হয়েছে। তাকে কীভাবে হত্যা করা হয়েছিল, সেই নৃশংসতার বিবরণ কমবেশি আজ সবারই জানা, তাই সেই আলোচনায় আর যাচ্ছি না। শুধু একটাই প্রশ্ন রাখছি, এই হত্যা কান্ডের জাস্টফিকেশনের বয়ানটা কে লিখেছিল?
২০১৬ সালের ২ সেপ্টেম্বর, রূপনগরে এক অভিযানে কথিত “জ’ঙ্গি” হিসেবে, গুলিতে নিহত দেখানো হয় সাবেক এই সেনা কর্মকর্তাকে। বাস্তবে – নির্মমভাবে হত্যা করা হয়! তার স্ত্রী জেবুন্নাহার ইসলাম ও দুই শিশুকন্যাকেও ছাড় দেয়া হয়নি, চোখ বেঁধে তুলে নিয়ে যাওয়া হয় ডিবির আয়নাঘরে, রাখা হয় চার মাস সাত দিন। পরে জেবুন্নাহার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর কার্যালয়ে অভিযোগ করেন, তার স্বামীকে জ’ঙ্গি নাটক সাজিয়ে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে, আসামির তালিকায় সাবেক আইজিপি একেএম শহিদুল হক, হাসিনা রেজিমের ডিবিপ্রধান মনিরুল ইসলাম, সিটিটিসির তৎকালীন প্রধান আসাদুজ্জামানসহ আরও কয়েকজন।
মেজর জাহিদকে হত্যার ঠিক পরেই – “আড়াই বছর আগে উগ্রবাদে জড়ান মেজর জাহিদ” – এই শিরোনামে প্রথম আলো লিখেছিল, “পরিবার ও নিকটাত্মীয়দের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে তিনি জ_ঙ্গিবাদের পথে পা বাড়িয়েছিলেন।”[১] খেয়াল করুন সময়টা, রাষ্ট্রীয় বাহিনীর গুলিতে একজন অবসর প্রাপ্ত আর্মি অফিসার হত্যা করার সাথে সাথেই তার “জ-ঙ্গি হয়ে ওঠার” গল্পটাও রেডি। তদন্ত নেই, বিচার নেই – হত্যাকাণ্ড হয়ে গেছে, এবার সেটা জায়েজ করার পালা!
এই দুটো ঘটনা পাশাপাশি রাখলে একটা মেকানিজম স্পষ্ট হয়। কেউ একজন খুন করে। আর কেউ একজন, খুনটাকে বৈধতা দেওয়ার ভাষা তৈরি করে রাখে। যাকে মারা হবে, তাকে ডিহিউম্যানাইজ করতে হয় – “জ-ঙ্গি” নামের একটা তকমা লাগিয়ে তাকে মানুষের ক্যাটাগরি থেকে বের করে দিতে হয়। তারপর তাকে মারা আর অপরাধ থাকে না, হয়ে যায় “অপারেশন”।
কে মেরেছে, সেটা আমরা মোটামুটি জানি – ডিবি, তৎকালীন পুলিশ প্রশাসন। কিন্তু যারা সেই খুনের ভাষাটা তৈরি করে দিয়েছিল, তাদের নাম বিচারের কাঠগড়ায় ওঠে না। অথচ প্রকৃত অর্থে তারাই বেশি ভয়ংকর, কারণ তারা খুনটা প্রতিটা মানুষের চোখের সামনে ঘটিয়েও দিনের পর দিন প্রশ্নাতীত থেকে যায়।
এখানেই আসল বিভ্রম শুরু হয়। যে প্রতিষ্ঠান একটা হত্যার বৈধতা তৈরি করে দিল, ঠিক সেই প্রতিষ্ঠানই আবার নতুন বাস্তবতায়, নতুন সরকারের অধীনে, ফিরে এসে লেখে – “মেজর জাহিদুল হত্যা মামলায় সাবেক আইজিপি শহিদুলকে হাজিরের নির্দেশ”।[২] একই কলম, একই প্রতিষ্ঠান, দুই বিপরীত ভূমিকায় – একবার খুনের পরে বৈধতা বানানো, একবার খুনের পরে বিচারের প্রতিবেদন লেখা। এই দুটোর মাঝখানে কোনো জবাবদিহিতা নেই, কোনো ক্ষমা চাওয়া নেই, শুধু বয়ান বদলে গেছে, কারণ ক্ষমতা বদলেছে।
এই প্যাটার্নটা মেজর জাহিদে থেমে থাকে না। “জ-ঙ্গি” তকমাটা বাংলাদেশে বহু নিরীহ মুসলিমের জীবন শেষ করে দিয়েছে, একই মিডিয়া হেজেমনির ভাষায়। যতদিন এই হেজেমনি টিকে থাকবে, ততদিন তকমাটা শুধু নাম বদলে ফিরে আসবে।
কিন্তু এই হেজেমনি একা টেকে না। এটা টিকে থাকে দেশের একটা সুশীল শ্রেণির কাঁধে ভর দিয়ে, যারা প্রথম আলোর মতো প্রতিষ্ঠানের এই ভূমিকাটা ভালোভাবেই চেনে, তবু প্রশ্ন তোলে না। এই তোষণের পেছনে কারণ একটাই – ইসলাম-বিদ্বেষ। যতদিন প্রথম আলোর মতো হেজেমন টিকে থাকবে, ততদিন জ-ঙ্গিবাদের নামে হোক বা অন্য যেকোনো নামেই হোক, এই দেশের ইসলামোফোবিক হেজেমনি ধরে রাখা যাবে, ইসলামি জাগরণকে চেক অ্যান্ড ব্যালেন্সে রাখা যাবে।
লক্ষ করুন, প্রথম আলোর মতো হেজেমনদের যদি সত্যিই জবাবদিহিতার আওতায় আনা হয়, তাহলে টাখনুর ওপরে প্যান্ট পরা, শুদ্ধভাবে সালাম দেওয়া, জন্মদিন উদযাপন না করা, গান-বাজনা না শোনা… এই সাধারণ ধর্মীয় চর্চাগুলোকে “জ-ঙ্গিবাদের লক্ষণ” হিসেবে কে ফ্রেমিং করবে? কে এই ন্যারেটিভ তৈরি করবে? কে এই কনসেন্ট ম্যানুফ্যাকচার করবে?
তাই এটা কোনো বিচ্ছিন্ন দুঃসংবাদ নয় যে পড়ে ভুলে যাওয়া যায়। এটা একটা ডেলিবারেট ইকোসিস্টেম, যেখানে প্রতিটা অংশ একে অন্যের থেকে লাভবান হয় – আর এই ইকোসিস্টেমের কেন্দ্রে বসে আছে ইসলামোফোবিয়া।
মেজর জাহিদের দোষ কি ছিল? পিলখানা ম্যাসাকারে ভারতের সংশ্লিষ্টতার ব্যাপারে তিনি একটু বেশিই জানতেন, ভারতের দালাল প্রথম আলো – তাকে সাজিয়ে দিল জ-ঙ্গি! এটি প্রথম আলোর কোন দুর্ঘটনা বা ভুল নয়, বরং এটিই তার ডি এন এ!
প্রশ্নটা তাই সহজ কিন্তু অস্বস্তিকর। যে প্রতিষ্ঠান খুনের বৈধতা তৈরি করে, খুনের পরে সেই একই প্রতিষ্ঠানের কলমে বিচারের খবর পড়ে আমরা কি সন্তুষ্ট হয়ে যাব? নাকি জিজ্ঞেস করব, প্রথম বয়ানটা লেখার সময় তাদের অবস্থান কী ছিল, আর কার স্বার্থে ছিল?
মেজর জাহিদুল ইসলামের নামের পাশে এখন মরণোত্তর “ব্রিগেডিয়ার জেনারেল” বসেছে বটে, কিন্তু যে কলম তাকে প্রথম “জ-ঙ্গি” বানিয়েছিল, সেই কলমটা এখনো একই হাতে, একই ছাপাখানায়, প্রতিদিন নতুন কারো নাম লেখার অপেক্ষায়!
– এরপরে কে?

