কওমী মাদরাসার ভাবমূর্তি রক্ষা, শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং কিছু প্রতিষ্ঠানে সংঘটিত অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার প্রতিকার চেয়ে আলেম-ওলামা ও মাদরাসার দায়িত্বশীলদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন আস-সুন্নাহ ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান শায়খ আহমাদুল্লাহ।
সম্প্রতি ফেসবুক পোস্টে দেওয়া এক খোলা চিঠিতে তিনি বলেন, কওমী মাদরাসা বাংলাদেশের ধর্মীয় শিক্ষা, নৈতিক মূল্যবোধ এবং সামাজিক কল্যাণে দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। রাষ্ট্রীয় সহায়তা ছাড়াই জনগণের অনুদানে পরিচালিত এসব প্রতিষ্ঠান লিল্লাহ বোর্ডিং ও এতিমখানার মাধ্যমে অসংখ্য এতিম, দরিদ্র ও সুবিধাবঞ্চিত শিশুর দায়িত্ব পালন করছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
তবে মাদরাসা শিক্ষাব্যবস্থার এই অবদানের পাশাপাশি কিছু গুরুতর সমস্যার কথাও স্বীকার করেন তিনি। চিঠিতে তিনি বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন আবাসিক মাদরাসায় শিশুদের ওপর শারীরিক নির্যাতন ও যৌন নিপীড়নের অভিযোগ সামনে এসেছে, যা ইসলামী নীতি ও মানবিক মূল্যবোধের সম্পূর্ণ পরিপন্থী। এ ধরনের অপরাধে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
শায়খ আহমাদুল্লাহ বলেন, কিছু গণমাধ্যম ও স্বার্থান্বেষী মহল মাদরাসার নেতিবাচক ঘটনাগুলোকে অতিরঞ্জিত করে পুরো শিক্ষাব্যবস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা করে থাকে। তবে একই সঙ্গে তিনি বলেন, মিডিয়ার সমালোচনা বা অপপ্রচারের অজুহাতে মাদরাসার ভেতরের বাস্তব সমস্যাগুলো অস্বীকার করার সুযোগ নেই।
চিঠিতে তিনি কওমী মাদরাসার সর্বোচ্চ কর্তৃপক্ষের অধীনে একটি স্বাধীন তদন্ত কমিটি গঠনের প্রস্তাব দেন। তার প্রস্তাব অনুযায়ী, শারীরিক বা যৌন নির্যাতনের অভিযোগ উঠলে বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে গঠিত কমিটি দ্রুত তদন্ত করবে এবং অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে অভিযুক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে প্রাতিষ্ঠানিক ও আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করবে।
তিনি আরও একটি কেন্দ্রীয় অভিযোগ গ্রহণ সেল গঠনের আহ্বান জানান, যেখানে ভুক্তভোগী বা তাদের পরিবার গোপনীয়তা বজায় রেখে অভিযোগ জানাতে পারবেন। পাশাপাশি অভিযুক্তদের তথ্য সংরক্ষণ করে ভবিষ্যতে অন্য কোনো মাদরাসায় নিয়োগ বন্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও বলেন তিনি।
প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের অংশ হিসেবে তিনি মাদরাসায় সিসিটিভি নজরদারি বাড়ানো, আবাসিক ব্যবস্থার উন্নয়ন, ছোট শিশুদের আবাসিক শিক্ষা ব্যবস্থায় সতর্কতা, শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে শিক্ষকদের ব্যক্তিগত সেবা গ্রহণ নিষিদ্ধ করা এবং শিশু সুরক্ষা নীতিমালা চালুর প্রস্তাব দেন।
শিক্ষকদের বিষয়ে তিনি বলেন, শিক্ষক নিয়োগে শুধু ধর্মীয় ও একাডেমিক যোগ্যতা নয়, নৈতিকতা, পরিপক্বতা এবং শিশুদের সঙ্গে আচরণগত দক্ষতাকেও গুরুত্ব দিতে হবে। শিক্ষকদের নিয়মিত প্রশিক্ষণের মাধ্যমে শিশু মনস্তত্ত্ব, নিরাপদ শিক্ষার পরিবেশ এবং দায়িত্বশীল আচরণ সম্পর্কে সচেতন করার আহ্বান জানান তিনি।
এ ছাড়া নারী মাদরাসাগুলোতে প্রশাসনিক ও একাডেমিক কার্যক্রমে নারীদের নেতৃত্ব নিশ্চিত করা এবং অনিয়ন্ত্রিত ও মানহীন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে নিয়মতান্ত্রিক কাঠামোর আওতায় আনার প্রস্তাবও দেন তিনি।
চিঠির শেষাংশে তিনি বলেন, নীতি, নৈতিকতা ও মানবিক আদর্শের অন্যতম নিরাপদ ঠিকানা এদেশের মাদরাসাগুলো। এই পবিত্র অঙ্গন থেকে মানুষের ভরসা হারিয়ে গেলে এদেশের মুসলিমদের আত্মিক আশ্রয়ের শেষ জায়গাটুকুও বিলীন হয়ে যাবে। অতএব, আত্মপক্ষ সমর্থনের ঊর্ধ্বে উঠে, কঠোর আত্মসংশোধনের মাধ্যমে এই সামাজিক ব্যাধি দূর করতে আমাদের ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে। তবেই কওমী মাদরাসার ঐতিহ্য ও গৌরব অক্ষুণ্ন থাকবে।
