নানা প্রতিবন্ধকতা উপেক্ষা করে ফিলিস্তিনের অবরুদ্ধ গাজা নগরী থেকে খুব কম মানুষই হজে যেতে পারে। তাই হজ নিয়ে তাদের অনুভূতিই আলাদা। এবার সব মিলিয়ে সুযোগ পেয়েছে ছয় হাজার ৬০০ জন। এ ভাগ্যবানদের মধ্য থেকে চারজনের কাছে তাদের অনুভূতি জানতে চেয়েছে আলজাজিরা। এ সময় সাক্ষাতকারে তারা উচ্ছ্বসিত অভিব্যক্তি ব্যক্ত করেন।
আল জাজিরা নিজের আনন্দের কথা জানিয়েছেন গাজা উপত্যকার দক্ষিণে খান ইউনিসের ফাতিয়া আল-হাসানাত (৫৮)। দীর্ঘ অপেক্ষার পর এবার তিনি হজ পালনের জন্য সুযোগ পেয়েছেন।
এ বিষয়ে নিজের অনুভূতি ব্যক্ত করে বলেন, ‘আমি আমার আনন্দের কথা বলে বুঝাতে পারব না। অনেক বছর ধরে হজ করার আশায় ছিলাম। আলহামদুলিল্লাহ, এ বছর লটারিতে আমার নাম এসেছে।’
এ সময় তিনি রাফাহ ক্রসিং দিয়ে সফরের অসুবিধা ও কায়রো বিমানবন্দরে পৌঁছনো পর্যন্ত দীর্ঘ সময় অপেক্ষার বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
তিনি বলেন, ‘হজযাত্রায় আমাদের সবচেয়ে বড় দুর্ভোগ হলো, গাজা থেকে কায়রো পর্যন্ত পৌঁছতে আমাদের ২০ ঘণ্টার বেশি সময় ব্যয় করতে হয়। দ্বিতীয় রেজিমেন্টের আমাদের সহকর্মীদের তো পুরো ২৪ ঘণ্টা সময় লেগেছে।’
তিনি আরো বলেন, ‘গাজা থেকে হজের যাত্রা খুবই কষ্টদায়ক। বিশেষ করে হজযাত্রীদের যারা বয়স্ক বা দীর্ঘস্থায়ী কোনো রোগে ভুগছেন, তাদের কষ্টটা সবচেয়ে বেশি। তবুও দিনশেষে এটাই তৃপ্তি দেয় যে আমরা তো বাইতুল্লাহ পৌঁছতে পারছি।’
আরেকজন ভাগ্যবান হলেন আহমেদ আবু আল-কাস (৪১)। তিনি দীর্ঘ পাঁচ বছর থেকে হজের জন্য নিবন্ধনের চেষ্টা করেছিলেন। অবশেষে এ বছর তালিকায় তার নাম আসে।
আবু আল-কাস বলেন, ‘যখন হজের জন্য আমার নাম গৃহীত হয়েছে বলে ফোন দেয়া হয়, তখন আমি আনন্দে কেঁদেছিলাম। এটি একটি দারুণ মুহূর্ত ছিল। আমি হজের আধ্যাত্মিক পরিবেশ নিয়ে আপ্লুত। আমি আল্লাহ তায়ালার কাছে আশা করি যে তিনি আমার হজ কবুল করবেন।’
আবু আল-কাস হাড়ের একটি দীর্ঘস্থায়ী রোগে ভুগছেন। তিনি এর আগে রাফাহ ক্রসিং দিয়ে যাত্রা করার চেষ্টা করেননি। তিনি বলেন, রাফাহ ক্রসিং দিয়ে যাতায়াতের প্রতিবন্ধকতা ও রাস্তায় দীর্ঘ সময় থাকার কথা শুনে আমি চিন্তিত, যা আমার স্বাস্থ্যের জন্য ভালো নাও হতে পারে। তবুও আমি আশাবাদী। কারণ, আমরা মিশরীয় কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে হজযাত্রীদের সুবিধা দেয়ার কথা শুনেছি। আমরা আশা করি, আমরা বিমানবন্দরে না পৌঁছা পর্যন্ত এটিই থাকবে।’
আবু আল-কাস হজের উচ্চ ব্যয়ের কথাও উল্লেখ করেছেন, যা গাজা উপত্যকার কঠিন ও অবনতিশীল অর্থনৈতিক অবস্থার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
তিন আরো বলেন, ‘হজ পালনের স্বপ্ন পূরণ না হওয়া পর্যন্ত আমি টাকা পয়সা সংগ্রহ করছিলাম। এটা কখনই সহজ ছিল না, বিশেষ করে সন্তান ও একটি পরিবারের দায়িত্ব যখন কাঁধে থাকে। কিন্তু তারা স্বেচ্ছায় আমার এ সফরের জন্য সহযোগিতা করেছে। তারা সবাই আমার জন্য খুশি।’
সামাহ আল-শুরাফা (৪৮) এই বছর হজে যাওয়ার আশা হারিয়ে ফেলেন। কারণ, তার নাম দুবার লটারিতে আসেনি। কিন্তু সৌভাগ্যবশত ক্যান্সার রোগী হওয়ায় অসুস্থদের তালিকায় তার নাম এসেছে।
তিনি বলেন, ‘এক বছর আগে আমার ক্যান্সার ধরা পড়ে। আমি অনেক কষ্ট পেয়েছি। তাই আমি নিজেকে উপশম করতে নিবন্ধন করতে চেয়েছিলাম। আমি সাধারণ তালিকায় ও রোগীর তালিকায় নিবন্ধন করেছি। আলহামদুলিল্লাহ, আমার নাম শেষ পর্যন্ত আমার বড় ছেলের সাথে দেখা গেছে। তার বয়স ৩০ বছর।’
তিনি বলেন, ‘আমি এই বছর হজ সম্পর্কে আবেগাপ্লুত। আমি আল্লাহ তায়ালার কাছে আশা করি যে এটি একটি কল্যাণের বছর হবে। গাজা উপত্যকার অবস্থার উন্নতি হবে। অবরোধের জটিলতা ও অন্যান্য ঝামেলার অবসান ঘটবে।’
সৌদি আরব প্রবর্তিত লটারি পদ্ধতির আওতায় হজযাত্রীদের হজ করতে চাইলে অনলাইনে আবেদন করতে বলা হয়। ইলেকট্রনিক ড্র সিস্টেমের ভিত্তিতে লোক নির্বাচন করা হয়।
২০২২ সালে সৌদি আরব সারা বিশ্ব থেকে এক মিলিয়ন হজযাত্রীকে অনুমতি দিয়েছে। এর মধ্যে আট লাখ ৫০ হাজার বিদেশী রয়েছে।
উল্লেখ্য, গত সপ্তাহে হজ পালনের জন্য অবরুদ্ধ গাজার চারটি হজযাত্রী দল সৌদি আরবের উদ্দেশে রওনা হয়েছে। সব মিলিয়ে মোট ছয় হাজার ৬০০ লোক এবার হজ পালন করবে।
ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, চার দিনের ব্যবধানে হজযাত্রীরা গাজা থেকে যাত্রা করেছেন। প্রথম দলে ৯০০, দ্বিতীয়টিতে ৯০০, তৃতীয়টিতে ৬০০ ও চতুর্থটিতে ৫০০ হজযাত্রী।
পশ্চিম তীর থেকে যারা সফরে বের হয়েছেন, তারা জর্ডান হয়ে সৌদি আরবে যাবেন। আর গাজা স্ট্রিপের বাসিন্দারা মিশর হয়ে যাবেন।
গাজা স্ট্রিপ থেকে মক্কা পর্যন্ত যাত্রা শুরু হয় রাফাহ ল্যান্ড ক্রসিং থেকে। কায়রো বিমানবন্দরের মধ্য দিয়ে যায়। সেখান থেকে জেদ্দার কিং আব্দুল আজিজ বিন সৌদ বিমানবন্দর ও তারপরে মক্কায়।
সূত্র : আলজাজিরা
