পিতামাতা, স্ত্রী-সন্তান, ভাই-বোন কিংবা নিকটাত্মীয়ের মায়া ছেড়ে দূরদেশে একলা থাকাটা খুবই কষ্টকর। এইযে এতো মায়া, এতো মোহাব্বত, এতো ভালবাসা সবই একসময় শেষ হয়ে যাবে। দিনশেষে আমাদেরকে নিজ কবরে একাই যেতে হবে, একাই হিসাব দিবসের দিন আল্লাহর সামনে দাঁড়াতে হবে, একাই পুলসিরাত পার হতে হবে, আর একাই জাহান্নামের আগুনে জ্বলতে হবে। না কোনো বন্ধু-বান্ধব সাহায্যে এগিয়ে আসবে, না পিতামাতা, আর না স্ত্রী-সন্তানরা আসবে। জেনে রাখুন, দুনিয়াবী লেনদেনের ক্ষেত্রে আমরা একে অপরের সাহায্যে হাত বাড়িয়ে দেই, চরম বিপদের মুহূর্তে অর্থনৈতিক সহযোগীতা করি, উপকারের কৃতজ্ঞতা স্বরূপ প্রতিদান দেয়ার চেষ্টা করি, দূর প্রবাসে হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রম করে স্ত্রী-সন্তানদের মুখে আহার তুলে দেই। পরিচিত কাউকে যেখানেই দেখি আগ বাড়িয়ে কথা বলতে ছুটে যাই! কিন্তু এমন একদিন আসবে, যেদিন কেউ কাউকে চিনবে না বরং উল্টো সবাই পরিচিতদের থেকে পালাতে থাকবে! আপনি চিৎকার করে ডাকবেন কিন্তু তারা একটিবারের জন্যেও পিছনে ফিরে তাকাবেনা। এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ্ বলেন —
فَاِذَا جَآءَتِ الصَّآخَّۃُ ﴿۫۳۳﴾
یَوۡمَ یَفِرُّ الۡمَرۡءُ مِنۡ اَخِیۡہِ ﴿ۙ۳۴﴾
وَ اُمِّہٖ وَ اَبِیۡہِ ﴿ۙ۳۵﴾
وَ صَاحِبَتِہٖ وَ بَنِیۡہِ ﴿ؕ۳۶﴾
لِکُلِّ امۡرِئٍ مِّنۡہُمۡ یَوۡمَئِذٍ شَاۡنٌ یُّغۡنِیۡہِ ﴿ؕ۳۷﴾
“অতঃপর যখন তীক্ষ্ণ আওয়াজ আসবে, সেদিন মানুষ পালিয়ে যাবে তার ভাইয়ের কাছ থেকে, এবং তার মাতা, তার পিতা, তার পত্নী ও তার সন্তান থেকে, সেদিন তাদের প্রত্যেকের এমন গুরুতর অবস্থা হবে যা তাকে সম্পূর্ণরূপে ব্যতিব্যস্ত রাখবে”। — [১]।
.
তিনি আরো বলেন —
یٰۤاَیُّہَا النَّاسُ اتَّقُوۡا رَبَّکُمۡ وَ اخۡشَوۡا یَوۡمًا لَّا یَجۡزِیۡ وَالِدٌ عَنۡ وَّلَدِہٖ ۫ وَ لَا مَوۡلُوۡدٌ ہُوَ جَازٍ عَنۡ وَّالِدِہٖ شَیۡئًا ؕ اِنَّ وَعۡدَ اللّٰہِ حَقٌّ فَلَا تَغُرَّنَّکُمُ الۡحَیٰوۃُ الدُّنۡیَا ٝ وَ لَا یَغُرَّنَّکُمۡ بِاللّٰہِ الۡغَرُوۡرُ ﴿۳۳﴾
“হে মানুষ, তোমরা তোমাদের রবকে ভয় কর এবং সেই দিনকে ভয় কর যেদিন পিতা তার সন্তানের কোনো উপকার করতে পারবে না এবং সন্তানও তার পিতার কোনো উপকারে আসবে না। নিশ্চয়ই আল্লাহর ওয়াদা সত্য। সুতরাং দুনিয়ার জীবন যেন কিছুতেই তোমাদেরকে ধোঁকা দিতে না পারে এবং মহাপ্রতারক (শয়তান) যেন তোমাদেরকে আল্লাহ সম্পর্কে ধোঁকায় ফেলতে না পারে।” —– [২]।
.
আহা! সে-কি ভয়াবহ পরিস্থিতি! চিন্তা করুন, নিজের মা-বাবা, স্ত্রী-সন্তানদের থেকেও সেদিন সবাই পালাতে থাকবে। এই ক্বিয়ামতের ভয়াবহতা সম্পর্কে প্রিয়নবী মুহাম্মদূর রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, “ক্বিয়ামতের দিন সমস্ত মানুষ একেবারেই উলংগ হয়ে উঠবে। একথা শুনে উম্মুল মুমিনীনদের মধ্য থেকে কোনো একজন ঘাবড়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমাদের লজ্জাস্থানও কি সেদিন সবার সামনে খোলা থাকবে? জবাবে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) সুরাহ আবাছার উপরিউক্ত আয়াতটি তেলাওয়াত করে বলেন, সেদিন (এত ভয়াবহ পরিস্থিতি বিরাজ করবে যে) একে অপরের দিকে তাকানোর মতো হুঁশ ও চেতনা থাকবে না।” —- [৩]।
.
উম্মুল মু’মিনীন আইশাহ্ (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহা) একদা জাহান্নামের আগুনের ভয়াবহতার কথা স্মরণ করে হুঁ হুঁ করে কেঁদে উঠেন। তখন প্রানাধিক প্রিয়নবী মুহাম্মদূর রাসূলুল্লাহ্ (ﷺ) জিজ্ঞেস করেন, “হে আইশাহ্! তুমি কাঁদছ কেন?’ জবাবে আম্মাজান আইশাহ্ (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহা) বলেন,” জাহান্নামের কথা স্মরণ করে কাঁদছি।” ইয়া রাসূলুল্লাহ্ (ﷺ), আপনি কি ক্বিয়ামতের দিন আপনার পরিবার-পরিজনের কথা (অর্থাৎ আমাদের কথা) স্মরণ রাখবেন?'” উত্তরে রাসূলুল্লাহ্ (ﷺ) বলেন, হে আইশাহ্, তিনটি স্থানে কেউ কাউকে স্মরণ রাখবে না। আর তা হলো:
১. মীযানের স্থানে। সেখানে প্রত্যেকেই নিজের নেকীর ওজন ভারী না হালকা হয়, সেই দিকেই খেয়াল রাখবে।
২. যখন আমলনামা দিয়ে বলা হবে,’ওহে! নাও তোমার আমলনামা, পড়ে দেখো।’ তখন প্রত্যেকেই এ চিন্তায় বিভোর থাকবে যে, তার আমলনামা ডান-হাতে দেওয়া হয়, না পিছনে থেকে বাম-হাতে দেওয়া হয়।
৩. পুলসিরাতের স্থানে। যখন তা জাহান্নামের দুই পার্শ্বের ওপর স্থাপন করা হবে।’ — [৪]।
.
প্রিয় সর্তীর্থগন, একথা ধ্রুব সত্য যে, আমাদের জীবনের প্রতিটি মুহূর্তের হিসাব আল্লাহর কাছে দিতে হবে, ছোট/বড় কোন কর্মই লুকানোর সুযোগ নেই! যেহেতু এখনও আপনার, আমার শ্বাস-প্রশ্বাস চলমান রয়েছে, অতএব, আসুন চিন্তাশীল হই। ঐ শুনুন মহান আল্লাহর বানী, “অতঃপর কেউ অণু পরিমাণ সৎকর্ম করলে তা দেখতে পাবে এবং কেউ অণু পরিমাণ অসৎকর্ম করলে তাও দেখতে পাবে।” —- [৫]।
হে আল্লাহ্ আপনি আমাদের ঈমানকে দৃঢ় করে দিন,
আমাদেরকে উপরিউক্ত বিষয়াদি অনুধাবনের তাওফীক্ব দিন, ফিতনাকে ফিতনা হিসেবে গন্য করার তাক্বওয়াটুকু দান করুন , আমাদের অন্তরসমূহকে শয়তানের জিম্মায় ছেড়ে না দিয়ে, দ্বীনের সাথে বেঁধে রাখার শক্তি ও ঈমান দান করে জাহান্নামের ইন্দন হওয়া থেকে রক্ষা করুন —- আ-মীন।
.
তথ্যসূত্র:
.
১. — [সূরাহ আবাছা , আয়াত : ৩৩-৩৭ ]।
২. — [সুরাহ লুক্বমান, আয়াত :৩৩]।
৩. — [নাসাঈ : ২০৮৩, তিরমিয়ী: ৩৩৩২]।
৪. — [আবু দাউদ: ৪৩৭৩]।
৫. — [সূরাহ যিলযাল, আয়াত : ৭-৮]।
