Friday, April 24, 2026
No menu items!

আমাদের মুসলিমউম্মাহ ডট নিউজে পরিবেশিত সংবাদ মূলত বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদের সমাহার। পরিবেশিত সংবাদের সত্যায়ন এই স্বল্প সময়ে পরিসরে সম্ভব নয় বিধায় আমরা সৌজন্যতার সাথে আহরিত সংবাদ সহ পত্রিকার নাম লিপিবদ্ধ করেছি। পরবর্তীতে যদি উক্ত সংবাদ সংশ্লিষ্ট কোন সংশোধন আমরা পাই তবে সত্যতার নিরিখে সংশোধনটা প্রকাশ করবো। সম্পাদক

Homeদাওয়াসমাজে অরাজকতা: কোরআন-হাদিসের সতর্কবার্তা

সমাজে অরাজকতা: কোরআন-হাদিসের সতর্কবার্তা

মানুষ সামাজিক জীব। মানুষের বেঁচে থাকার জন্য সমাজ প্রয়োজন। আর একটি সুস্থ, শান্তিপূর্ণ ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠনের জন্য প্রয়োজন সুশাসন, নৈতিকতা, আইন ও পারস্পরিক সহানুভূতি। কিন্তু যখন সমাজে শৃঙ্খলার পরিবর্তে বিশৃঙ্খলা, শান্তির পরিবর্তে হানাহানি এবং ন্যায়ের পরিবর্তে জুলুমের সয়লাব হয়, তখনই সৃষ্টি হয় অরাজকতা। ইসলামে অরাজকতা, অস্থিরতা, হানাহানি, ফিতনা ও অশান্তি সৃষ্টিকে ঘৃণ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। এসবের ভয়াবহতা সম্পর্কে কোরআন ও হাদিসে মানুষকে বারবার সতর্কও করা হয়েছে।

আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘ফিতনা হত্যা অপেক্ষাও গুরুতর।’ (সুরা বাকারা: ১৯১)। এই আয়াতে ‘ফিতনা’ শব্দটি এমন একটি সামাজিক অবস্থা বোঝায়, যেখানে অন্যায়, জুলুম, বিশৃঙ্খলা এবং নিরাপত্তাহীনতা ছড়িয়ে পড়ে। এ ধরনের অরাজক পরিস্থিতি একটি জাতিকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেয়। পবিত্র কোরআনে এসেছে, ‘যারা পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করে বেড়ায়, আল্লাহ তাদের পছন্দ করেন না।’ (সুরা মায়েদা: ৬৪)। এই আয়াত থেকে বোঝা যায়, যারা শান্ত সমাজে অশান্তি সৃষ্টি করে, তারা আল্লাহর দৃষ্টিতে অপছন্দের। তারা অভিশপ্ত।

অরাজকতার প্রকারভেদ

ইসলামি দৃষ্টিকোণ থেকে অরাজকতা কেবল রাজনৈতিক বা শারীরিক সংঘর্ষ নয়, বরং মনের মধ্যে ফিতনা, মতবিরোধ, মিথ্যা প্রচার, পরচর্চা, ঘৃণা ছড়ানো, সামাজিক বিভাজন ইত্যাদিও অরাজকতার অন্তর্ভুক্ত। যেমন, এক. রাজনৈতিক অরাজকতা: যা নেতৃত্ব নিয়ে দ্বন্দ্ব, বিদ্রোহ, রাষ্ট্রদ্রোহ ইত্যাদি রাজনৈতিক অরাজকতা সমাজকে বিভক্ত করে ফেলে। দুই. ধর্মীয় অরাজকতা: যা সঠিক ইসলামি শিক্ষা না জানার কারণে অনেক সময় ভ্রান্ত মতবাদ সমাজে ছড়ায়, যা বিভ্রান্তি ও হিংসার জন্ম দেয়। তিন. সামাজিক ও নৈতিক অরাজকতা: যা নৈতিক অবক্ষয়, মাদকাসক্ত, ব্যভিচার, চুরি, দুর্নীতি, চাঁদাবাজি ইত্যাদি সমাজে ফিতনা সৃষ্টি করে এবং আল্লাহর গজবকে আমন্ত্রণ জানায়।

নবীজি (সা.)-এর সতর্কবার্তা

রাসুলুল্লাহ (সা.) ফিতনার সময় মুসলমানদের সতর্কতা ও ধৈর্য ধারণের নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘ফিতনার সময় যে বসে থাকবে, সে দাঁড়িয়ে থাকা ব্যক্তির চেয়ে উত্তম। যে দাঁড়িয়ে থাকবে, সে চলমান ব্যক্তির চেয়ে উত্তম। যে চলবে, সে দৌড়ানো ব্যক্তির চেয়ে উত্তম।’ (সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিম)। এই হাদিসে ফিতনার সময় তৎপর না হওয়ার প্রতি উৎসাহ দেওয়া হয়েছে; কারণ, এতে নিজের ও অন্যের ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

আরেকটি হাদিসে এসেছে, ‘একটি সময় আসবে, যখন ফিতনা তোমাদের ঘরের দরজায় এমনভাবে উপস্থিত হবে, যেমন বৃষ্টির ফোঁটা পড়ে।’ (সহিহ বুখারি)। এই ভবিষ্যদ্বাণী আজ আমাদের সমাজে বাস্তবে পরিণত হয়েছে। ঘরে বসেই সোশ্যাল মিডিয়া, ভ্রান্ত মতবাদ ও গুজবের মাধ্যমে মানুষ বিভ্রান্ত হচ্ছে।

সমাজে অরাজকতার পরিণতি

এক. নৈতিক পতন: সমাজে যখন অরাজকতা সৃষ্টি হয়, তখন সত্য-মিথ্যার পার্থক্য ঘুচে যায়। মানুষ নিজ স্বার্থে মিথ্যা প্রচারে লিপ্ত হয়। দুই. আল্লাহর গজব: ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, যেসব জাতি সমাজে জুলুম, অন্যায় ও অরাজকতা সৃষ্টি করেছিল, আল্লাহ তাদের ধ্বংস করে দিয়েছেন। যেমন, কওমে লুত, কওমে সামুদ, কওমে আদ। তিন. বিশ্বাসের অবক্ষয়: অরাজকতার সময় মানুষ পরস্পরের প্রতি বিশ্বাস হারিয়ে ফেলে। ফলে সামাজিক বন্ধন দুর্বল হয়। চার. নিরাপত্তাহীনতা: মানুষ জানমাল নিয়ে আতঙ্কে থাকে। শিশু, নারী, বৃদ্ধ—কেউই নিরাপদ থাকে না।

প্রতিকারে করণীয়

এক. সত্যিকারের তাওহিদ ও তাকওয়া অর্জন: আল্লাহভীতি মানুষকে অন্যায় ও ফিতনা থেকে বিরত রাখে। তাকওয়াবান ব্যক্তি নিজের স্বার্থের জন্য সমাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে না।

দুই. ইসলামি জ্ঞানের চর্চা: সঠিক ইসলামি জ্ঞান মানুষকে বিভ্রান্তি ও ভ্রান্ত মতবাদ থেকে রক্ষা করে। কোরআন-হাদিসের আলোকে সঠিক পথ অন্বেষণ করা জরুরি।

তিন. সামাজিক দায়িত্ব পালন: প্রত্যেক মুসলমানের দায়িত্ব হলো সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠা করা। রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের মধ্যে যে অন্যায় কাজ দেখবে, সে যেন তা হাত দিয়ে প্রতিহত করে; যদি তা না পারে, তবে মুখ দিয়ে; তাও যদি না পারে, তবে অন্তরে ঘৃণা করুক—এটাই ইমানের সর্বনিম্ন স্তর।’ (সহিহ মুসলিম)

চার. নেতার প্রতি আনুগত্য ও সংযম: ইসলাম সরকার বা নেতার প্রতি আনুগত্যের নির্দেশ দিয়েছে, যদি না তারা প্রকাশ্যে কুফর করে। আল্লাহর নবী (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি আমার (নিয়োগকৃত) নেতার অবাধ্য হলো, সে যেন আমার অবাধ্য হলো।’ (সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিম)

পাঁচ. দোয়া ও ধৈর্য: ফিতনার সময় মুসলমানদের উচিত আল্লাহর কাছে সাহায্য চাওয়া এবং ধৈর্য ধারণ করা।

সমাজে অরাজকতা সৃষ্টি করা শুধু ব্যক্তি নয়, পুরো জাতির জন্য ভয়াবহ পরিণতি বয়ে আনে। ইসলামে এমন ফিতনার বিরুদ্ধে কঠোর হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে এবং সমাজে শান্তি, ইনসাফ, সহানুভূতি ও সংহতির প্রতি উৎসাহিত করা হয়েছে। আমাদের কর্তব্য হলো সত্যিকারের ইসলামি জীবনচর্চার মাধ্যমে সমাজকে ফিতনা ও অরাজকতা থেকে রক্ষা করা এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের পথ অনুসরণ করা।

লেখক: মুহতামিম, জহিরুল উলুম মহিলা মাদরাসা, গাজীপুর

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

one × three =

সবচেয়ে জনপ্রিয়

সাম্প্রতিক মন্তব্য