নতুন দিনের গণমাধ্যম আলাপে একজন সিনিয়ার সাংবাদিকের ইন্টারভিউ দেখতেসিলাম। উনি উত্তেজিত হয়ে উপস্থাপককে বলতেসেন- ‘আপনিই বলেন ফারজানা রুপা, মোজাম্মেল বাবু এনারা কি মানুষ খুন করতে পারে? দেখলে মনে হয়? হ্যাঁ কিছু সুযোগ তারা হয়তো নিয়েছেন…’।
আচ্ছা ‘খুন করা’ বলতে কি বোঝায় এইটাকে একটু আন্তর্জাতিক অপরাধের বিচারের যেই প্রক্রিয়া তার আলোকে বোঝা যাক।
ধরেন আমেরিকা হিরোশিমায় যেই বোমাটা ফেলল, লিটল বয়, যেই এক আনবিক বোমার আঘাতে মুহূর্তে নিরীহ নারী-শিশু-বৃদ্ধসহ লক্ষ মানুষের জীবন চলে গেলো, চলেন আমরা একটু খুঁজে দেখি এই লক্ষ মানুষের খুনের জন্য কে দায়ী?
ইতিহাস আমাদের বলে বিমান থেকে সুইচ টিপে যিনি বোমাটা মাটিতে ফেলেছিলেন তার নাম মেজর থমাস ফেরেবি।
তো কেবল ফেরেবিই কি এই এক লাখ বিশ হাজার মানুষের মৃত্যুর জন্য দায়ী? না তেমনটাও না। উনি কেবল সুইচটা টিপেছেন। এই অপারেশনের দায়িত্বে ছিলেন কর্নেল টিবেটস, পুরো নাম কর্নেল পল ওয়ারফিল্ড টিবেটস জুনিয়র। এই কর্মকাণ্ডে নেতৃত্ব দেয়ায় ওনার সম্মানে ওনার নামে একটা বিমানের নামকরণ করা হইসিল
আচ্ছা তাহলে কেবল এই কর্নেল দায়ী? না তেমনটাও না।
এই বোমা- লিটল বয় নির্মাণ করা হয় জেনারেল লেসলি গ্রোভের নেতৃত্বে ম্যানহাটান প্রকল্পে। সেই প্রকল্পের ছিলেন আমেরিকান এয়ারফোর্সের কমান্ডার মেজর জেনারেল উজাল ইন্ট। এই প্রকল্পে বিভিন্ন সময়ে কাজ করে ১,৩০,০০০ হাজার মানুষ। এর মধ্যে বিজ্ঞানী, ইঞ্জিনিয়ার, কনস্ট্রাকশন ওয়ার্কার, সাপোর্ট স্টাফ (শেফ, ফটোগ্রাফার, সুইপার ইত্যাদি) সবাই ছিলো।
প্রকল্পের শেষ ধাপে এই প্রকল্পে যুক্ত ছিলো ১৮০০ জনবল এবং ১৫টি বি-২৯ বোমারু বিমান। এইসব মানুষের বাইরেও এই প্রকল্পে যুক্ত ছিলেন আমেরিকান থিংক ট্যাংক, বুদ্ধিজীবী আর বিজ্ঞানিরা। যারা কখন কোন পয়েন্ট থেকে বোমাটি ফেললে সর্বোচ্চ ক্ষতি হবে, বোমা ফেলাটা এই যুদ্ধের এই পর্যায়ে কেন যৌক্তিক- এসব মতামত উৎপাদন করেছেন।
এই প্রকল্পের বৈজ্ঞানিক নেতৃত্বে ছিলেন রবার্ট ওপেনহাইমার এবং এনরিকো ফের্মির মতো বিশ্বখ্যাত বিজ্ঞানীরা, যারা নিউক্লীয় ফিশন প্রক্রিয়াকে মারণাস্ত্রে রূপান্তর করার প্রযুক্তিগত ভিত্তি তৈরি করেছিলেন।
এই বিজ্ঞানীরা জীবনে কখনো নিজ হাতে বন্দুক ধরেননি।
‘ইন্টারিম কমিটি’ নামের একটি বেসামরিক সংস্থা প্রেসিডেন্ট ট্রুম্যানকে এই বোমার ব্যবহারের ধরণ সম্পর্কে ইন্টালেকচুয়াল পরামর্শ দিয়েছিল। এই কমিটির থিংক ট্যাংকরা আলোচনা করেছিলেন কীভাবে বোমার বিস্ফোরণ ঘটালে সর্বোচ্চ ‘সাইকোলজিক্যাল ইফেক্ট’ বা মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব তৈরি করা যাবে ।
ম্যানহাটান প্রজেক্টের বিজ্ঞানীরা জানতেন যে তাদের কাজের ফল হবে অগণিত মানুষের মৃত্যু। ১৯৪৫ সালের জুনে সায়েন্টিফিক প্যানেলের একটি রিপোর্টে বিজ্ঞানীরা সরাসরি সামরিক ব্যবহারের পক্ষে মত দেন এবং কোনো ধরনের অ-প্রাণঘাতী প্রদর্শনের বিকল্পকে নাকচ করে দেন। বুদ্ধিজীবীরা নীতিনির্ধারণী বৈঠকে বোমার কার্যকারিতা বাড়ানোর উপায়ও খুঁজছিলেন।
এটি হচ্ছে ‘স্ট্রাকচারাল ভায়োলেন্স’ বা কাঠামোগত সহিংসতা। যেখানে খুনি এবং নিহতের মধ্যে সরাসরি কোনো শারীরিক সম্পর্ক থাকে না, কিন্তু খুনের পুরো প্রক্রিয়াটি বুদ্ধিজীবীদের কলম এবং বিজ্ঞানীদের মস্তিষ্ক দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয় ।
যেই বুদ্ধিজীবীরা আনবিক বোমাটি নিক্ষেপের স্থান-কাল-পাত্র নির্বাচন করছিলেন, বোমা ফেলার পক্ষে রেশনাল নির্মাণ করছিলেন- তারা কেউ সুইচটা টিপে দেন নাই, কাউকে গুলি করেন নাই।
হয়তো বাড়ি গিয়ে গান শুনেছেন, কাব্য করেছেন, রাতে শিশু কন্যাকে আদরে জড়িয়ে ধরে ঘুমিয়েছেন। তাদের শান্তিতে ঘুমে থাকার সময়েই হিরোশিমায় বাবা-মা’র সাথে শুয়ে থাকা শিশুরা মরে গেছে।
তারা কেউ সুইচ টেপেননি, কোন ট্রিগার চাপেননি কিন্তু তাদের সিদ্ধান্তে, তাদের মোরাল পজিশনে কারবালা হয়ে গেছে।
রুয়ান্ডা গণহত্যার বিচার করে জাতিসংঘের একটি বিশেষ আদালত। এই আদালত প্রথম পর্যায়ে মাত্র সাতজন মানুষের বিচার করে।
খোঁজ নিলে জানতে পারবেন সেই বিচারে একজন স্কুল শিক্ষকের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয়। সেই স্কুল শিক্ষকের নাম জেন পল আকায়াশু।
না এই লোকটি নিজের হাতে কাউকে হত্যা করেন নাই। তিনি ছিলেন রুয়ান্ডার টাবা শহরের একজন কমিউনিটি লিডার।
রুয়ান্ডা গণহত্যায় হুতু কমিউনিটির তুতসিদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ার পেছনে একটা মৌলিক বিষয় ছিল ঘৃণা। জেন পল আকায়াশু তার এলাকার কমিউনিটি রেডিও থেকে বিভিন্ন সময় ঘৃণামূলক বক্তব্য দিতেন। এইসব বক্তব্য দুই কমিউনিটির মধ্যে বিভেদ উশকে দেয়।
আদালতে পেশ করা একটা বক্তব্যে দেখা যায় আকায়াশুর মতো লোকেরা, সেখানকার লেখক, সাংবাদিক ও বুদ্ধিজীবীরা কমিউনিটি রেডিও থেকে তুতসিদের তেলাপোকার সাথে তুলনা করে বক্তব্য দিয়েছেন, ঘৃণা ছড়িয়েছেন।
আদালত এসব কাজকে বিমানবীকরণের রেফারেন্স হিসেবে শনাক্ত করেছে।
যখন মানুষকে তেলাপোকার সাথে তুলনা করা হয় তখন তাকে হত্যা করলে মানুষ হত্যা করেছেন মনে হবে না, মনে হবে তেলাপোকা হত্যা করেছেন। মানুষ হত্যা সহজ হয়ে যায়।
রুয়ান্ডায় আরটিএলএম রেডিও’র সাংবাদিকেরা গান এবং বিনোদনের ফাঁকে ফাঁকে ঘোষণা করতেন “তুতসিদের নির্মূল করো।”
আইসিটিআর-এর বিচারকরা তাদের রায়ে বলেছিলেন, “তাদেরর হাতে কোনো বন্দুক বা মাচেতে (দেশীয় অস্ত্র) ছিল না, কিন্তু তাদের কলম এবং কণ্ঠস্বর হাজার হাজার নিরীহ মানুষের মৃত্যুর কারণ হয়েছে।”
জুলাই-আগস্টে বাংলাদেশের রুপা আপা কিংবা মুন্নি সাহার মতো সাংবাদিকেরা কিছুই করেননি।
তারা শুধু কোন পত্রিকা কেন “চাল ডাল মাংসের স্বাধীনতা” চাইসে এজন্য সেই সাংবাদিককে জেল খাটাইতে, সেই পত্রিকার সম্পাদককে কাঠগড়ায় তুলতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হইসেন। করোনার সময় যেই ভবঘুরে ছেলেটি মাননীয় স্পিকারের দিকে আঙুল তুলে কথা বলেছে তাকে ডাণ্ডিখোর প্রমাণ করাকে সাংবাদিকতা জ্ঞান করেছেন। স্বাস্থ্যমন্ত্রীকে নিয়ে একটা কার্টুন আঁকসে দেখে কিশোর, মুশতাক বছর ধরে জেল খাটসে, কারাগারে মুশতাক ভাইয়ের মৃত্যু হইসে। আমাদের সিনিয়ার সাংবাদিকেরা সিরিজ টক-শো করে প্রমাণ করে গেসেন যে এরা রাষ্ট্রদ্রোহী।
জগন্নাথের ছাত্রী খাদিজাতুল কোবরা সরকার বিরোধী একটা টক-শো কেন হোস্ট করসে- আমাদের সিনিয়ারেরা অজ্ঞান হয়ে গেছেন আক্রোশে। মেয়েটা বছরের উপর জেল খাটসে। জীবন নষ্ট হয়ে গেস।
কেউ যদি সার্চ করে দেখেন- জেন পল আকায়াশুকে দেখলেও মনে হবে না সে কাউকে খুন করতে পারে। বেচারা একটা প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষক, ছোট ছোট বাচ্চাদের পড়াতেন।
অথচ জাতিসংঘের তৈরি করা আন্তর্জাতিক আদালত তাকে একটা গণহত্যার বিচারের প্রথম কনভিক্টেড ব্যক্তিদের একজন হিসেবে সাব্যস্ত করেছে!
আন্তর্জাতিক আইন বলে— হত্যাকান্ডে planning, instigation, aiding, abetting এবং incitement এই সবই গুরুতর অপরাধ।
শুধু ট্রিগার টানলেই দায়ী হতে হয় না। যারা পরিবেশ তৈরি করেন, ঘৃণা ছড়ান, মিথ্যা বয়ান তৈরি করেন, তারাও দায়ী হন, হতে হয়।
“সিনিয়র সাংবাদিকেরা কাউকে খুন করেননি” – এই আলাপ একটি মস্ত বড় ধোঁকাবাজি।
ইতিহাসের পাতায় পাতায় লেখা আছে কীভাবে বুদ্ধিদীপ্ত কলম এবং সুমিষ্ট কণ্ঠস্বর কামানের গোলার চেয়েও বেশি প্রাণ কেড়ে নিয়েছে।
হিরোশিমায় মেজর ফেরেবি হয়তো সুইচ টিপেছিলেন, কিন্তু সেই সুইচের পেছনে ছিল হাজার হাজার বিজ্ঞানীর মস্তিষ্ক আর শত শত বুদ্ধিজীবীর যৌক্তিকতা।
জেন পল আকায়াশু হয়তো নিজে তুতসিদের ওপর মাচেতে চালাননি, কিন্তু তার ভাষণে টাবা শহরের মাটি রক্তে রঞ্জিত হয়েছিল।
বাংলাদেশের সিনিয়র সাংবাদিকরা জুলাই মাসে সরাসরি ছাত্রদের বুকে গুলি চালাননি ঠিকই, কিন্তু তারা সেই গুলিবর্ষণকে ‘শান্তি রক্ষা’ হিসেবে চিত্রায়িত করেছেন। তারা নিহত শিশুদের ‘জঙ্গি’ বানিয়েছেন এবং খুনিদের ‘দেশের ত্রাতা’ হিসেবে উপস্থাপন করেছেন।
যখন কোনো সাংবাদিক সত্যের অপলাপ করেন এবং ক্ষমতাশালীকে তুষ্ট করতে গণহত্যার প্রেক্ষাপট তৈরি করেন, তখন তিনি আর সাংবাদিক থাকেন না; তিনি পরিণত হন একজন ‘বুদ্ধিবৃত্তিক খুনি’তে।
আন্তর্জাতিক আইনের কঠোর প্রয়োগ এবং নৈতিক বিচারের মাধ্যমেই কেবল ভবিষ্যতে এই ধরনের মিডিয়া-ফ্যাসিবাদ বন্ধ করা সম্ভব।
সাংবাদিকতা মানে কেবল তথ্য প্রচার না, এটা সাধারণের জীবনের প্রতি এক বিশাল দায়বদ্ধতা। যারা সেই দায়বদ্ধতা ভুলে ক্ষমতার দালালিকে সাংবাদিকতা জ্ঞান করেছেন, ইতিহাসের কাঠগড়ায় তাদের বিচার অনিবার্য।
হিরোশিমার বোমার কারিগরদের যদি দায় থাকে, রুয়ান্ডার রেডিওর মালিকদের যদি দণ্ড হয়, তবে জুলাইয়ের রক্তের দাগ যাদের কলমে লেগে আছে, তাদেরও ছাড় পাওয়ার কোনো অবকাশ নেই, থাকা উচিত না।
লেখা- আরিফ রহমান
