Thursday, May 7, 2026
No menu items!

আমাদের মুসলিমউম্মাহ ডট নিউজে পরিবেশিত সংবাদ মূলত বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদের সমাহার। পরিবেশিত সংবাদের সত্যায়ন এই স্বল্প সময়ে পরিসরে সম্ভব নয় বিধায় আমরা সৌজন্যতার সাথে আহরিত সংবাদ সহ পত্রিকার নাম লিপিবদ্ধ করেছি। পরবর্তীতে যদি উক্ত সংবাদ সংশ্লিষ্ট কোন সংশোধন আমরা পাই তবে সত্যতার নিরিখে সংশোধনটা প্রকাশ করবো। সম্পাদক

Homeদৈনন্দিন খবরআন্তর্জাতিকসৌদির অর্থনীতি ঘায়েল করতেই ওপেক ছাড়ছে আমিরাত?

সৌদির অর্থনীতি ঘায়েল করতেই ওপেক ছাড়ছে আমিরাত?

বিশ্বের জ্বালানি তেল উৎপাদনকারী ১২ দেশের প্রায় ছয় দশকের পুরোনো সংগঠন ওপেক থেকে সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) যখন বেরিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেয় মঙ্গলবার, তখন কিছু বিশ্লেষক উপসাগরীয় দেশটির এই পদক্ষেপকে নিছক অর্থনৈতিক কারণ বলেই মনে করেন। তাদের প্রাথমিক এই ব্যাখ্যা আপাতদৃষ্টিতে অযৌক্তিক নয়।

কারণ, আরব আমিরাত দীর্ঘদিন ধরেই ওপেকের তেল উৎপাদনের কোটা বা সীমাবদ্ধতা থেকে মুক্ত হয়ে তার বিশাল উৎপাদনক্ষমতা কাজে লাগাতে চেয়েছে। এতদিন তা সম্ভব না হলেও এখন তা কার্যকর করার সুযোগ দেখছে দেশটি। ইরানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের হামলা উপসাগরীয় অঞ্চলে অর্থনৈতিক অস্থিরতা তৈরির পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের অবাধ প্রবাহকে বাধাগ্রস্ত করেছে। এছাড়া একসময়ের ঘনিষ্ঠ মিত্র সৌদি আরবের সঙ্গে ক্রমবর্ধমান দ্বন্দ্বের প্রেক্ষাপটে ওপেক ত্যাগ করা একদিকে আরব আমিরাতের জন্য দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সুবিধা বয়ে আনতে পারে, অন্যদিকে তাদের এই পদক্ষেপ সৌদি আরবের তেলনির্ভর অর্থনীতিকেও ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।

সৌদি আরব তাদের বাজেট ভারসাম্য বজায় রাখতে তেলের উচ্চমূল্যের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। অন্যদিকে, আরব আমিরাত তার তেলের উৎপাদনক্ষমতা ও রপ্তানি বাড়াতে বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করেছে। এতে যদি ব্যারেল তেলের দাম কমেও যায়, তাতেও আমিরাতের কোনো সমস্যা নেই। কিন্তু দেশটির এই কৌশলের প্রেক্ষাপট এবং সময় ইঙ্গিত দেয় যে, এটি অর্থনৈতিক হওয়ার পাশাপাশি রাজনৈতিকভাবেও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। আমিরাতের এই পদক্ষেপকে ওপেকের বৃহত্তম ও গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড় সৌদি আরবের সবচেয়ে দুর্বল জায়গায় আঘাত করার একটি পরিকল্পনা হিসেবে দেখা হচ্ছে।

এমনকি তেলের রাজস্ব বৃদ্ধি বাস্তবে না ঘটলেও ওপেক ত্যাগ করা আমিরাতের জন্য লাভজনক হতে পারে, যদি তা রিয়াদের সঙ্গে তার ক্রমবর্ধমান প্রতিদ্বন্দ্বিতায় তাকে বাড়তি সুবিধা এনে দেয়। আরব আমিরাতের এই জোট ছাড়া সংগঠনের আরো দেশের জোট ছাড়ায় ভূমিকা রাখতে পারে, যা এই জোটকে ভাঙনের মুখে ঠেলে দিতে পারে।

ওপেকের উৎপাদন কোটা বা সীমিত তেল উৎপাদন নীতি পরিত্যাগের মাধ্যমে আরব আমিরাত আসলে সৌদির তেলের মূল্য ব্যবস্থাপনার পদ্ধতিকে দুর্বল করতে চাইছে। এই জোটের অঘোষিত নেতা হিসেবে সৌদি আরব দীর্ঘদিন ধরে তেলের দাম বেশি রাখার জন্য উৎপাদন সীমিত রাখার নীতিনির্ধারণ করে আসছে।

কিন্তু ওপেক থেকে আমিরাতের চলে যাওয়া ওপেককে দুর্বল করার পাশাপাশি তেল উৎপাদনের ওপর সংস্থার নিয়ন্ত্রণ কমে যাবে এবং সরবরাহ ব্যবস্থাপনা ও বৈশ্বিক তেলের দামকে প্রভাবিত করার ক্ষমতাও হ্রাস পাবে। যদি আমিরাত সময়ের সঙ্গে সঙ্গে উৎপাদন বাড়িয়ে দেয়, তবে তা তেলের দাম কমিয়ে দিতে পারে, যা সরাসরি সৌদি অর্থনীতিকে দুর্বল করবে।

অর্থনীতির বাইরে

আরব আমিরাত ২০২০ সালে ইসরাইলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার পর থেকে তেল আবিব এবং ওয়াশিংটন উভয়েরই ঘনিষ্ঠ হয়েছে। আমিরাতের ওপেক ত্যাগ করার সিদ্ধান্তে ইসরাইল এবং প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প খুশিই হবেন। ট্রাম্প দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছেন, ওপেক ‘সারা বিশ্বকে ঠকাচ্ছে’ এবং তিনি আমিরাতের ওপেক ত্যাগের ঘটনাকে একটি রাজনৈতিক বিজয় হিসেবে দেখবেন। কারণ এতে তেলের দাম কমার পাশাপাশি মার্কিন জ্বালানি বাজার লাভবান হবে। ইসরাইল আরব অঞ্চলকে বিভক্ত ও দুর্বল করতে চায়। আমিরাতের এই সিদ্ধান্ত দেশটির লক্ষ্য অর্জনে সহায়তা করবে।

আরব বসন্ত-পরবর্তী সময়ে আমিরাত ও সৌদির মধ্যে সমন্বয় ও সহযোগিতা বাড়তে থাকে। কিন্তু ইয়েমেন, সুদান, সোমালিয়া এবং ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন-ইসরাইল যুদ্ধসহ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক ইস্যুতে দুই দেশের মধ্যে বিভেদ বাড়ছে। রিয়াদ ইসরাইলের সঙ্গে আবুধাবির ঘনিষ্ঠতার বিরোধিতা করে আসছে এবং সৌদি প্রভাবশালী ব্যক্তিরা এই অঞ্চলে আমিরাতকে ‘ইসরাইলের ট্রোজান হর্স’ হিসেবে কাজ করার অভিযোগে তীব্র সমালোচনা করেছেন।

ইয়েমেন, সুদান ও সোমালিয়ায় বিচ্ছিন্নতাবাদী মিলিশিয়াদের সমর্থন দিয়ে আঞ্চলিক রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে নতুন রূপ দেওয়ার আমিরাতের চেষ্টারও বিরোধী সৌদি আরব। তারা এ অঞ্চলের অরাষ্ট্রীয় শক্তিগুলোর বিরুদ্ধে সরকারকে সমর্থন করে এসেছে। ২০২৫ সালের শেষের দিকে এবং এ বছরের শুরুতে সৌদি আরব ইয়েমেনে আমিরাত-সমর্থিত সাউদার্ন ট্রানজিশনাল কাউন্সিলের (এসটিসি) অবস্থানে হামলা চালায়, যা দীর্ঘদিনের দুই মিত্রের মধ্যে সংঘাত বাড়িয়ে দেয়। সোমালিল্যান্ড কর্তৃপক্ষ এবং সুদানের র‍্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেসকে (আরএসএফ) আরব আমিরাতের সমর্থন দেওয়ারও বিরোধিতা করেছে সৌদি আরব।

ইরানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের এবারের হামলার সময় আরব আমিরাত ইসরাইলি সামরিক সহায়তা পেয়েছে বলে জানা গেছে। একই সঙ্গে ইরানে ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রকে অভিযান চালিয়ে যেতে চাপও দিয়েছে দেশটি। অন্যদিকে, সৌদি আরব যুদ্ধ শেষ করার জন্য কূটনৈতিক পথ বেছে নিয়েছে।

আরব আমিরাতের ওপেক ত্যাগের ঘোষণার সময়টিও উল্লেখযোগ্য। এই সিদ্ধান্তটি এমন একসময়ে প্রকাশ করা হয়, যখন উপসাগরীয় নেতারা ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল যুদ্ধের বিষয়ে একটি ‘ঐক্যবদ্ধ উপসাগরীয় অবস্থান’ নেওয়ার জন্য জেদ্দায় একটি শীর্ষ সম্মেলনে সমবেত হচ্ছিলেন। কাতার, সৌদি আরব এবং বাহরাইনের রাষ্ট্রপ্রধানদের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত এই বৈঠকে আরব আমিরাতের প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ বিন জায়েদ না এসে তার পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে পাঠান।

ভবিষ্যৎ প্রভাব

ওপেক থেকে আমিরাতের বেরিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্তের পরিণতি হবে সুদূরপ্রসারী। এতে ওপেক দুর্বল হবে এবং আমিরাত ও সৌদি অর্থনীতির ওপরও এর প্রভাব পড়বে। তাছাড়া আরব আমিরাত রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে ইসরাইলের আরো কাছাকাছি হবে। দেশটি ইতোমধ্যেই ইসরাইলের সঙ্গে শক্তিশালী ব্যবসায়িক, সামরিক এবং পর্যটন সম্পর্ক স্থাপন করেছে। ইসরাইল-আমিরাত অক্ষ শুধু সৌদি স্বার্থের জন্যই নয়, ফিলিস্তিন, সুদান এবং আঞ্চলিক মানবাধিকারের ক্ষেত্রেও গুরুতর চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে।

অন্যদিকে, সৌদি আরব ইসরাইল থেকে আরো দূরে সরে যাবে। ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান ইসরাইলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিকী করার চুক্তির খুব কাছাকাছি ছিলেন। কিন্তু, গাজা গণহত্যা সৌদির হিসাব বদলে দিয়েছে। যার ফলে এখন এ ধরনের একটি চুক্তির সম্ভাবনা কমে গেছে।

আরব আমিরাত এবং সৌদির মধ্যে ক্রমবর্ধমান বিভেদ এই অঞ্চলের দেশগুলোকে পক্ষ নিতে বাধ্য করবে। মিসর এবং জর্ডান উভয়ই উপসাগরীয় বিত্তশালী দেশগুলোর আর্থিক সহায়তার ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। কিন্তু সৌদি-আমিরাতের দ্বন্দ্বে এসব দেশ কঠিন পরিস্থিতিতে পড়তে পারে। ২০১৩ সাল থেকে মিসর আবুধাবি ও রিয়াদ উভয়ের কাছ থেকেই ব্যাপক সমর্থন পেয়েছে। আরব আমিরাত অবকাঠামো ও উন্নয়ন প্রকল্পে বিপুল বিনিয়োগ করেছে, অন্যদিকে সৌদি আরব গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক সহায়তা ও জ্বালানি সহায়তা দিয়েছে। কিন্তু সৌদি-আমিরাতের বিভেদের কারণে এই সম্পর্কগুলোর মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়বে।

উপসাগরীয় দেশগুলোর সাহায্যের ওপর নির্ভরশীল জর্ডানও উভয় সংকটে পড়বে। মিসর ও জর্ডান ছাড়াও অন্যান্য আঞ্চলিক শক্তিগুলোও এই চাপ অনুভব করবে। তুরস্ক এই দুই উপসাগরীয় শক্তির সঙ্গেই সতর্কতার সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষা করেছে এবং এখন তারা দুই দেশের এই বিভেদকে কাজে লাগানোর চেষ্টা করতে পারে। অন্যদিকে সৌদি আরবের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সম্পর্ক গভীর করা পাকিস্তান সৌদি বলয়ে আরো বেশি ঝুঁকে পড়তে পারে।

এমন জল্পনাও বাড়ছে, আরব আমিরাত আরব লীগ, উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদ (জিসিসি) এবং ইসলামি সহযোগিতা সংস্থাসহ (ওআইসি) অন্য বহুপক্ষীয় সংস্থা থেকেও বেরিয়ে যাওয়ার কথা বিবেচনা করতে পারে। এই সম্ভাবনা অবিলম্বে বাস্তবায়িত না হলেও শুধু এই হুমকিই আরব, উপসাগরীয় এবং ইসলামি দেশগুলোর মধ্যে সম্পর্ককে আরো ঘোলাটে করে তুলতে পারে। একসময় যা তুলনামূলক ঐক্যবদ্ধ সৌদি-আমিরাতি অক্ষ বলে মনে হতো, তা এখন প্রকাশ্য প্রতিযোগিতা এবং শত্রুতায় পরিণত হয়েছে। যুদ্ধ এবং অস্থিরতায় জর্জরিত একটি অঞ্চলে নতুন এই পরিস্থিতি তেল উৎপাদনের কোনো পরিবর্তন আনার চেয়েও আঞ্চলিক ভূরাজনীতির জন্য অনেক বেশি তাৎপর্যপূর্ণ প্রমাণিত হতে পারে।

মিডল ইস্ট অবলম্বনে মোতালেব জামালী

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

three × 3 =

সবচেয়ে জনপ্রিয়

সাম্প্রতিক মন্তব্য