আমার পরিবারের একজন আমাকে স্বপ্নের ব্যাখ্যা নিয়ে জিজ্ঞেস করলে আমি দেখলাম islamqa(https://islamqa.info/) এর নিচের এই ফাতওয়াটি বাংলা করা হয়নি এখনো। তাই দ্বীনি ভাইবোনদের জন্য অনুবাদ করলাম। আশা করি আল্লাহ ভুলত্রুটির জন্য ক্ষমা করবেন এবং এর মাধ্যমে সবাইকে উপকৃত করবেন।
প্রশ্ন
আমার কাছে ইবনে সিরিন এর “ড্রিম ইন্টারপ্রিটেশন ইন ইসলাম” নামে একটি বই আছে। ইসলামিক স্বপ্নের ব্যাখ্যা সম্পর্কে আরো বিস্তারিত জানতে চাই।
সকল প্রশংসা আল্লাহর জন্য।
উত্তর
ইসলামে স্বপ্নের তাৎপর্য
১- সত্য স্বপ্ন নবুওয়াতের একটি অংশ, যেমনটি বর্ণিত হয়েছে হাদীসে – নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “সত্য স্বপ্ন নবুওয়াতের ছেচল্লিশ ভাগের এক ভাগ।” (আল-বুখারী, 6472; মুসলিম, 4201)
২-স্বপ্ন ছিল ওয়াহী আগমনের সূত্রপাতের চিহ্ন. (আল-বুখারী, 3; মুসলিম, 231)
৩- স্বপ্নের সত্যতা স্বপ্নদ্রষ্টার ইখলাসের সাথে সম্পর্কিত। তাদের স্বপ্নই সবচেয়ে বেশি সত্য হয়, যারা কথাবার্তায় সবচেয়ে সত্যবাদী। (মুসলিম, 4200)
৪- দুনিয়ার শেষের দিকে (কিয়ামতের পূর্বে), স্বপ্ন খুব কমই মিথ্যা হবে। নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেনঃ “নবুয়তের সময়কাল থেকে অনেক দূরে থাকার কারণে মুমিনদেরকে স্বপ্নের আকারে সুসংবাদ দেওয়া হবে বা এমন কোন খবর দেয়া হবে যা তাদের ঈমানের উপর ধৈর্য্যশীল ও অবিচল থাকতে সাহায্য করবে।” (আল-বুখারি, 6499; মুসলিম, 4200)
একই কথা বলা যেতে পারে সাহাবায়ে কেরামের পরে ঘটে যাওয়া কেরামতের (অলৌকিক ঘটনাগুলোর) ব্যাপারে। তাদের (সাহাবীদের) সময়ে এগুলোর প্রয়োজন হয়নি কারণ তাদের ঈমান ছিল দৃঢ়, তবে তাদের পরে যারা এসেছিলেন তাদের জন্য কেরামত (অলৌকিক ঘটনা) প্রয়োজন ছিল – কারণ তাদের ঈমান ছিল সাহাবীদের চাইতে দুর্বল।
ইসলামে স্বপ্নের প্রকারভেদ
৫-স্বপ্ন তিন প্রকার : রহমানি (যা আল্লাহর পক্ষ থেকে আসে), নাফসানি (মানসিক, এগুলো একজন ব্যক্তির চিন্তা থেকে আসে) এবং শয়তানি (যা শয়তানের কাছ থেকে আসে)। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ “স্বপ্ন তিন প্রকারঃ আল্লাহর পক্ষ থেকে স্বপ্ন, শয়তানের পক্ষ থেকে স্বপ্ন যা মানুষকে কষ্ট দেয় এবং মানুষের চিন্তা ভাবনা থেকে উদ্ভূত স্বপ্ন যা সে জেগে থাকা অবস্থায় ভাবে এবং ঘুমালে তাই দেখে ” (আল-বুখারী, 6499; মুসলিম, 4200)
নবীদের স্বপ্ন
৬- নবীদের স্বপ্ন ওয়াহী কারণ তারা শয়তান থেকে সুরক্ষিত। এ বিষয়ে উম্মাহর ইজমা আছে। এই কারণেই ইব্রাহিম আলাইহিস সালাম স্বপ্ন দেখেই আল্লাহর আদেশ বাস্তবায়নের জন্য তার পুত্র ইসমাইল আলাইহিস সালামকে কোরবানি করার জন্য রওনা হন ।
৭- নবী ব্যতীত অন্য লোকদের স্বপ্নকে সুস্পষ্ট ওয়াহীর [অর্থাৎ কুরআন ও সুন্নাহ] আলোকে পরীক্ষা করতে হবে। যদি তা কুরআন ও সুন্নাহ অনুযায়ী হয়, তাহলে ভাল; অন্যথায় এগুলোর উপরে আমল করা উচিত নয়। এটি অত্যন্ত গুরুতর বিষয়, কারণ সূফী এবং অন্য বিদআতী দলসমূহের অনেকেই এর কারণে পথভ্রষ্ট হয়েছে।
সত্য স্বপ্ন দেখতে করণীয়
৮- যে সত্য স্বপ্ন দেখতে চায় তার উচিত সত্যের উপর দৃঢ় থাকা, হালাল খাবার খাওয়া, শরীয়তের আদেশ-নিষেধ মেনে চলা, আল্লাহ ও তাঁর রাসুল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যা নিষেধ করেছেন তা পরিহার করা। তাকে ঘুমাতে হবে সম্পূর্ণ পবিত্র অবস্থায় কিবলার দিকে মুখ করে এবং আল্লাহকে যিকর করতে থাকতে হবে যতক্ষণ না তার চোখের পাতা ঘুমে নেমে আসছে। যে ব্যক্তি এই আমলগুলো করবে, তার খুব কম স্বপ্নই মিথ্যা হবে।
৯- সত্য স্বপ্ন বেশির ভাগই দেখা যায় সেহরীর সময় [সকালের ঠিক আগে], কারণ এটি এমন সময় যখন আল্লাহ নিচের আকাশে অবতরণ করেন এবং রহমত ও ক্ষমা নিকটবর্তী হয়; এটি এমন সময় যখন শয়তানরা শান্ত থাকে- এই সময় সূর্যাস্তের ঠিক পরে অন্ধকারের সময় থেকে ভিন্ন, যখন শয়তান এবং শয়তানের সঙ্গীরা ছড়িয়ে পড়ে। (দেখুনঃ মাদারিজ আল–সালিকেন, 1/50-52)
ইবনে হাজারের মতে স্বপ্নের প্রকারভেদ
আল হাফিজ ইবনে হাজার বলেছেন:
১০- সব স্বপ্নই দুই ধরনের হয়:
১- সত্য স্বপ্ন: এগুলি নবীদের এবং তাদের অনুসরণকারী নেককার লোকদের স্বপ্ন। এগুলি অন্য লোকেদের সাথেও ঘটতে পারে, তবে এটি খুব বিরল, যেমন কাফির রাজার স্বপ্ন যা ইউসুফ (আঃ) তাঁর জন্য ব্যাখ্যা করেছিলেন। সত্য স্বপ্ন হল সেই স্বপ্ন যা বাস্তব জীবনে ঘটতে দেখা যায় যেমন স্বপ্নে দেখা হয়েছিল।
২- মিথ্যা মিশ্রিত স্বপ্ন, যা কিছু সম্পর্কে সতর্ক করে। এগুলি বিভিন্ন ধরণের:
মিথ্যা মিশ্রিত স্বপ্নের প্রকারভেদ
১- শয়তানের খেলা কোনো ব্যক্তিকে কষ্ট দেওয়া, যেমন সে যখন দেখে তার মাথা কেটে ফেলা এবং সে তার (মাথাটিকে) অনুসরণ করছে, অথবা সে নিজেকে সংকটের মধ্যে পড়তে দেখে এবং তাকে তা থেকে বাঁচানোর জন্য কাউকে খুঁজে পায় না, ইত্যাদি।
২- যখন মানুষ দেখে যে কিছু ফেরেশতা তাকে নিষিদ্ধ কিছু করতে বলছে, বা অন্য কিছু করতে বলছে যার কোন অর্থ হয় না।
৩- যখন মানুষ বাস্তব জীবনে তার সাথে ঘটে যাওয়া কিছু দেখে, বা চায় যে এই ঘটনা তার জীবনে ঘটুক – এবং সে এমনভাবে স্বপ্ন দেখে যেন তা বাস্তবে হচ্ছে। এছাড়া এই ধরণের স্বপ্ন জেগে থাকা অবস্থায় তার সাথে প্রতিদিন যা ঘটে তা বা তার মনে যা চলছে তা প্রতিফলিত করে। এই স্বপ্নগুলি সাধারণত ভবিষ্যত বা বর্তমানের কথা বলে, খুব কমই তা অতীতের ব্যাপারে হয়। (ফাতহুল বারী, 12/352-354 দেখুন)
১১- আবূ সাঈদ আল-খুদরী (রাঃ) বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ “তোমাদের কেউ যদি এমন স্বপ্ন দেখে যা তার পছন্দ হয় তবে তা আল্লাহর পক্ষ থেকে। তাই সে এর জন্য আল্লাহর প্রশংসা করুক এবং অন্যদের এই সম্পর্কে বলুক। যদি সে তা ব্যতীত অন্য কোন স্বপ্ন দেখে যা সে অপছন্দ করে, এটি শয়তানের পক্ষ থেকে, তাই সে যেন এর অনিষ্ট থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চায় এবং কারো কাছে তা উল্লেখ না করে, কারণ তাহলে এটি তার ক্ষতি করবে না।
(আল-বুখারী, 6584, এবং মুসলিম, 5862)।
আবূ কাতাদাহ (রাঃ) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেনঃ “ভাল স্বপ্ন আল্লাহর পক্ষ থেকে আসে এবং (খারাপ) স্বপ্ন শয়তানের পক্ষ থেকে আসে। যে ব্যক্তি এমন কিছু দেখবে যা সে অপছন্দ করে, সে যেন তার বাম দিকে তিনবার থুতু দেয় এবং শয়তান থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চায়, এতে তা তার ক্ষতি করতে পারবে না। (আল-বুখারী, 6594, এবং মুসলিম, 5862 দ্বারা বর্ণিত)। এখানে উল্লেখিত “থুথু ফেলা” হল একটি নরম, শুকনো থুথু যাতে লালা বের হয় না।
জাবির রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত যে, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ “তোমাদের কেউ যদি অপছন্দনীয় স্বপ্ন দেখে, তবে সে যেন তার বাম দিকে তিনবার থুথু দেয়। আর তিনবার শয়তান থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা কর এবং পাশ ফিরে সে ঘুমাচ্ছিল সেখান থেকে ঘুরে অন্য পাশে শোয়। (মুসলিম দ্বারা বর্ণিত, 5864)
ভাল স্বপ্ন দেখলে যা করা উচিত
ইবনে হাজার বলেন: ভালো স্বপ্ন সম্পর্কে যা বলা হয়েছে তা সংক্ষেপে বলতে গেলে আমরা তিনটি কথা বলতে পারি:
- একজন ব্যক্তির উচিত ভালো স্বপ্নের জন্য আল্লাহর প্রশংসা করা
- এতে তার খুশি হওয়া উচিত
- তিনি যাদের ভালবাসেন তাদেরকে স্বপ্নটির ব্যাপারে বলা উচিত কিন্তু যাদের তিনি অপছন্দ করেন, তাদের সাথে নয়।
খারাপ স্বপ্ন দেখলে যা করা উচিত
খারাপ স্বপ্ন সম্বন্ধে যা বলা হয়েছে তার ব্যাপারে সংক্ষেপে আমরা চারটি বিষয় বলতে পারি:
- স্বপ্নের অনিষ্ট থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাওয়া উচিত
- শয়তানের অনিষ্ট থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাওয়া উচিত
- ঘুম থেকে উঠলে তার বাম দিকে তিনবার থুথু ফেলতে হবে
- এটা কারো কাছে উল্লেখ করা উচিত নয়।
- আল-বুখারী, বাব আল-কায়েদ ফি’ল-মানাম এ আবু হুরায়রা থেকে একটি পঞ্চম জিনিস বর্ণিত হয়েছে, তা হল সালাত পড়া। বর্ণনাকারী বলেছেন : যে ব্যক্তি অপছন্দনীয় কিছু দেখে (স্বপ্নে) সে যেন তা কাউকে না বলে; বরং তার উচিত ঘুম থেকে উঠে সালাত পড়া। এটিকে ইমাম মুসলিম তার সহীহ গ্রন্থে মওসুল হিসাবে বর্ণনা করেছেন।
- ঈমাম মুসলিম একটি ষষ্ঠ জিনিস যোগ করেছেন, তা হল সে যেদিকে শুয়েছিল সেখান থেকে উল্টো পাশে ফিরে শোয়া।
উপসংহারে, ছয়টি জিনিস করতে হবে, উপরে উল্লিখিত চারটি, পাশাপাশি দুই রাকাত সালাত আদায় করা এবং যেদিকে শুয়েছিল সেখান থেকে উল্টো পাশে ফিরে শোয়া। (ফাতহুল বারী, 12/370)
12- আল-তিরমিযী দ্বারা আবু রাজিন থেকে বর্ণিত একটি হাদিস অনুসারে, তার খুব ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছাড়া কাউকে খারাপ স্বপ্নের কথা বলা উচিত নয়; কেবল সেই লোক ব্যাতিত যে তার ভালোবাসার পাত্র বা খুব জ্ঞানী কেউ। অন্য একটি বর্ণনায় এসেছে, জ্ঞানী বা তার প্রিয় ব্যক্তি ছাড়া তার এ বিষয়ে কথা বলা উচিত নয়। অন্য আরেকটি বর্ণনায় এসেছে, তার স্বপ্নের কথা কোনো আলেম বা আন্তরিক উপদেশ দিবে এমন কেউ ছাড়া কাওকে বলা উচিত নয়। আল-কাদি আবু বকর ইবনে আল-আরাবী বলেন: আলেমরা তার জন্য যথাসম্ভব উত্তম উপায়ে ব্যাখ্যা করবেন এবং যে তাকে আন্তরিক পরামর্শ দেবে সে তাকে এমন কিছু শিখিয়ে দেবে যাতে তার উপকার হবে এবং তাকে সেই ভালো অর্জন করতে সাহায্য করবে। জ্ঞানী তিনিই যিনি এর ব্যাখ্যা করতে জানেন এবং তাকে কেবল তাই বলবেন যা তাকে সাহায্য করবে, অন্যথায় সে চুপ থাকবে। যে প্রিয়, সে ভালো কিছু জানলে বলবে, আর না জানলে বা সন্দেহ হলে চুপ করে থাকবে। (দেখুন ফাতহুল বারী, 12/369)
স্বপ্নের ব্যাখ্যা
13- ইমাম আল-বাগাভী বলেন:
“জেনে রাখুন স্বপ্নের ব্যাখ্যা বিভিন্ন বিভাগে পড়ে। স্বপ্নের ব্যাখ্যা হতে পারে কুরআনের আলোকে বা সুন্নাহর আলোকে, অথবা মানুষের মধ্যে প্রচলিত প্রবাদের মাধ্যমে, বা নাম ও রূপক দ্বারা বা এর বিপরীত অর্থ দিয়ে।” (শারহুস সুন্নাহ, ১২/২২০)
তিনি এর উদাহরণ দিয়েছেন, যেমন:
১- কুরআনের আলোকে ব্যাখ্যা: যেমন দড়ির অর্থ হল চুক্তি, কারণ আল্লাহ বলেন:
“আর তোমরা সবাই মিলে আল্লাহর রজ্জুকে দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধর…” [আলে ইমরান ৩:১০৩]
২- সুন্নাহর আলোকে ব্যাখ্যা: যেমন স্বপ্নে কাক দেখার অর্থ হল যেন একজন অনৈতিক লোক(ফাসিক) দেখা , কারণ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কাকের ব্যাপারে এমন বলেছেন।
৩- প্রবাদের মাধ্যমে ব্যাখ্যা: যেমন গর্ত খনন মানে একটি কুটপরিকল্পনা বা ষড়যন্ত্র , কারণ লোকেরা বলে “যে গর্ত খনন করবে সে তাতে পড়বে।”
4- নামের মাধ্যমে ব্যাখ্যাঃ যেমন রশিদ নামক একজনকে দেখা মানে প্রজ্ঞা।
5- বিপরীত মাধ্যমে ব্যাখ্যা : যেমন ভয় মানে নিরাপত্তা, কারণ আল্লাহ বলেন (অর্থের ব্যাখ্যা):
“এবং তিনি অবশ্যই তাদের ভয়ের পরে তাদের বিনিময়ে নিরাপদ নিরাপত্তা দেবেন” [আন-নূর 24:55]
14- ইবনে সিরীনের লিখা “স্বপ্নের ব্যাখ্যা” বইটির বিষয়ে, অনেক গবেষকই সন্দেহ করেন যে এটি আদৌ তার লিখা কিনা। তাই আমরা নিশ্চিতভাবে বলতে পারি না যে এই বইটি এই আলেমেরই লেখা।
আর আল্লাহই ভালো জানেন।
—–
مَعَ السَّلاَمَة
