গত বছরের অক্টোবরে চার মাসের অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রীকে রেখে পাঁচ মাসের চুক্তিতে তৃতীয় ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে চীনা জাহাজ ‘এমভি হ্যাপি ফরএভার’-এ যোগ দেন বাংলাদেশি নাবিক মোহাম্মদ জায়েদ রনি। পরিকল্পনা ছিল মার্চে সমুদ্রযাত্রা শেষে দেশে ফিরে পরিবারের সঙ্গে ঈদ উদযাপন করবেন এবং সন্তানসম্ভবা স্ত্রীর পাশে থাকবেন। কিন্তু আমেরিকা-ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধ পরিস্থিতিতে তার পরিকল্পনা ভেস্তে যায়। হরমুজ প্রণালির ভেতরে আটকে থেকে চুক্তির মেয়াদ শেষ হলেও ফ্লাইট বন্ধ ও ভিসা জটিলতার কারণে তিনি এখনো সমুদ্রে অবস্থান করছেন; দেশে ফেরার নির্দিষ্ট কোনো পথ নেই।
শুধু তিনিই নন, পারস্য ও ওমান উপসাগরের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় সাতটি দেশি-বিদেশি জাহাজে অন্তত ৭৫ জন বাংলাদেশি নাবিক আটকা পড়েছেন। মিসাইল বা ড্রোন হামলার আশঙ্কায় তারা অনিশ্চয়তার মধ্যে সময় কাটাচ্ছেন। তাদের পরিবারের সদস্যরাও উদ্বেগে রয়েছেন। বাংলাদেশ মার্চেন্ট মেরিন অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিএমএমওএ)-এর তথ্য অনুযায়ী, সবচেয়ে বেশি ৩১ জন নাবিক আটকে আছেন বাংলাদেশ শিপিং কর্পোরেশনের ‘বাংলার জয়যাত্রা’ জাহাজে। জাহাজটি তিনবার চেষ্টা করেও কূটনৈতিক জটিলতায় হরমুজ প্রণালি পার হতে পারেনি এবং বর্তমানে মিনা সাকার নোঙরস্থলে রয়েছে।
এ ছাড়া ২৫ জন নাবিক নিয়ে ‘বসুন্ধরা এলপিজি চ্যালেঞ্জার’ জাহাজটি ওমান উপসাগরে অবস্থান করছে। বিদেশি জাহাজগুলোর মধ্যে ‘এমভি ফরএভার হ্যাপি’-তে ১৫ জন এবং ‘এমভি বাহরি ট্রেডার’, ‘এমভি বাহরি ওয়াফি’ ও ‘এমটি লাকি কেম’-এ একজন করে বাংলাদেশি নাবিক আটকে আছেন। এর মধ্যে ‘এমটি লাকি কেম’ সোহার বন্দরের কাছে রয়েছে এবং অন্য তিনটি জাহাজ দাম্মাম বন্দরে অবস্থান করছে।
যুদ্ধ পরিস্থিতিতে কয়েকটি জাহাজ হামলার শিকার হয়েছে। গত ১ মার্চ ‘এমকেডি ভিয়ম’ জাহাজে হামলায় ইঞ্জিন কক্ষে বিস্ফোরণ ও অগ্নিকাণ্ড ঘটে এবং এক ভারতীয় নাবিক নিহত হন। ২১ জন নাবিককে উদ্ধার করা হয়, যাদের মধ্যে চারজন বাংলাদেশি ছিলেন। তারা ৪ মার্চ দেশে ফেরেন। এর কয়েক সপ্তাহ পর ‘এমভি গোল্ড অটাম’ জাহাজে মিসাইল হামলা হয়। পাকিস্তান নৌবাহিনী ১৮ জন নাবিককে উদ্ধার করে, যাদের মধ্যে ছয়জন বাংলাদেশি। পাঁচজন ইতোমধ্যে দেশে ফিরেছেন, একজন চিকিৎসাজনিত কারণে জাহাজেই আছেন।
গত ২৯ এপ্রিল হোয়াটসঅ্যাপে একটি জাতীয় দৈনিককে জায়েদ রনি বলেন, ‘২০২৫ সালের ১৭ অক্টোবর ওমানের সোহার বন্দর থেকে এমভি ফরএভার হ্যাপি জাহাজে থার্ড ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে যোগ দিই। তখন জানতাম না সামনে কী ভয়াবহ সময় অপেক্ষা করছে। সমুদ্রের নীল জলরাশি আর ইঞ্জিনের পরিচিত শব্দের মাঝে জীবনটা ছিল রোমাঞ্চের। কিন্তু সেই রোমাঞ্চ যে জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে গিয়ে দাঁড়াবে, তা কল্পনাও করিনি।’
তিনি বলেন, ‘ওমান থেকে যাত্রা শুরু করে আমাদের জাহাজটি পারস্য উপসাগরের বিভিন্ন বন্দর—কুয়েত, ইরান ও সৌদি আরব—থেকে কার্গো নিয়ে পাকিস্তানের করাচিতে যাতায়াত করছিল। সবকিছু স্বাভাবিক ছিল। কিন্তু হরমুজ প্রণালির ভেতরে থাকা অবস্থায় হঠাৎ ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধ শুরু হয়। মুহূর্তেই শান্ত সমুদ্র রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। আমরা আটকা পড়ে যাই সেই সংকীর্ণ পথে, যেখান থেকে বের হওয়ার প্রতিটি পথ এখন মৃত্যুফাঁদ।’ রনি জানান, তাদের জাহাজে মোট ২৫ জন নাবিক রয়েছেন, যার মধ্যে ১৫ জন বাংলাদেশি, ৮ জন ফিলিপিনো এবং ২ জন ভারতীয়।
তিনি আরও বলেন, ‘আমার চুক্তির মেয়াদ ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে। দেশের টানে কোম্পানিকে কয়েকবার সাইন-অফের জন্য আবেদন করেছি। কিন্তু যুদ্ধ পরিস্থিতিতে ফ্লাইট বন্ধ, তার ওপর ভিসা জটিলতা—সব মিলিয়ে কোম্পানি চাইলেও আমাদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে পারছে না। ফলে অবরুদ্ধ অবস্থায় চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে সময় কাটছে।’
নিজের মানসিক অবস্থা সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘দেশে আমার স্ত্রী অসুস্থ। এই কঠিন সময়ে তার পাশে থাকতে না পারার যন্ত্রণা আমাকে কুরে কুরে খাচ্ছে। এর মধ্যেই খবর পেয়েছি, আমাদের ঘরে একটি পুত্র সন্তান এসেছে। সন্তানের মুখ দেখার আকুলতা আর স্ত্রীর অসুস্থতা—সব মিলিয়ে চরম মানসিক চাপে দিন কাটছে।’
‘এমটি লাকি’ জাহাজে থাকা বাংলাদেশি নাবিক নাজমুল হাসান বলেন, ‘যুদ্ধবিরতি চললেও আমাদের জাহাজটি এখনো ওমান উপসাগরে আটকে আছে। আমরা যে এলাকায় আছি, সেখানে সরাসরি যুদ্ধ না চললেও এটি ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলের মধ্যে পড়ে। জাহাজটি বর্তমানে ইরানের ইমাম হোসাইন বন্দরে যাওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে। গত মাসে আমরা খাবার নিতে পেরেছিলাম, কিন্তু এই মাসে এখনো নিতে পারিনি। তাই দুই দিন ধরে খাবার রেশনিং করছি। পানীয় পানি এখনো পর্যাপ্ত থাকলেও কয়েক দিনের মধ্যে সংকট দেখা দিতে পারে।’ তিনি আরও বলেন, ‘ওমানের সোহার বন্দরে থাকার সময় খুব কাছ দিয়ে মিসাইল ও ড্রোন উড়ে যেতে দেখেছি। সেই আতঙ্ক এখনো তাড়া করে ফিরছে। জাহাজে আমার চুক্তির মেয়াদ আরও তিন মাস আছে। জানি না সামনে কী আছে।’
বাংলাদেশ মার্চেন্ট মেরিন অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ক্যাপ্টেন আনাম চৌধুরী বলেন, ‘যুদ্ধের কারণে আটকে পড়া নাবিকদের সঙ্গে আমাদের এবং তাদের পরিবারের সদস্যদের সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রয়েছে। তারা সবাই সুস্থ আছেন, তবে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় দিন কাটছে। নাবিকদের জীবন এমনই। যুদ্ধ পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে হরমুজ প্রণালি না খোলা পর্যন্ত তাদের ফিরিয়ে আনার তেমন সুযোগ নেই।’
বাংলার জয়যাত্রা জাহাজের বিষয়ে বাংলাদেশ শিপিং কর্পোরেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক কমোডর মাহমুদুল মালেক বলেন, জাহাজটি যুদ্ধ শুরুর আগে সংযুক্ত আরব আমিরাতের একটি বন্দরে ছিল এবং পরে নিরাপদ স্থানে সরানো হয়েছে। তিনি বলেন, ‘নাবিকরা মাসের পর মাস সমুদ্রে থাকেন। এ ধরনের পরিস্থিতির জন্য তাদের সবসময় প্রস্তুত থাকতে হয়। আমরা তাদের মনোবল চাঙা রাখতে সার্বক্ষণিক পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য জাহাজে স্টারলিংক স্যাটেলাইট ইন্টারনেটের ব্যবস্থা করেছি। পর্যাপ্ত খাবার ও পানির সরবরাহ রয়েছে। সবাইকে বেসিকের সমান যুদ্ধকালীন ভাতা দেওয়া হচ্ছে।’ তিনি আরও জানান, জাহাজটিকে নিরাপদে হরমুজ প্রণালি থেকে সরাতে কূটনৈতিক চেষ্টা চলছে এবং প্রয়োজনীয় ফরম পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে পাঠানো হয়েছে।
এ প্রসঙ্গে নৌপরিবহন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক কমোডর শফিউল বারী বলেন, ‘নাবিকরা নির্দিষ্ট সময়ের চুক্তিতে জাহাজে কাজ করেন। চুক্তির মেয়াদ শেষ হলে সবসময় তাদের ফেরার সুযোগ থাকে না। তবে কোনো জাহাজ দুর্ঘটনার কবলে পড়লে আমরা দায়িত্ব নিয়ে তাদের ফিরিয়ে আনতে পারি।’ ভিসা জটিলতার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘সংযুক্ত আরব আমিরাতে বর্তমানে বাংলাদেশিদের ভিসা দেওয়া হয় না। কূটনৈতিকভাবে অনেক চেষ্টা করেও এটি চালু করা সম্ভব হয়নি। তবে চুক্তির মেয়াদ শেষ হলে অন্য কোনো দেশে নেমে নাবিকরা দেশে ফিরতে পারেন।’
