Tuesday, April 21, 2026
No menu items!

আমাদের মুসলিমউম্মাহ ডট নিউজে পরিবেশিত সংবাদ মূলত বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদের সমাহার। পরিবেশিত সংবাদের সত্যায়ন এই স্বল্প সময়ে পরিসরে সম্ভব নয় বিধায় আমরা সৌজন্যতার সাথে আহরিত সংবাদ সহ পত্রিকার নাম লিপিবদ্ধ করেছি। পরবর্তীতে যদি উক্ত সংবাদ সংশ্লিষ্ট কোন সংশোধন আমরা পাই তবে সত্যতার নিরিখে সংশোধনটা প্রকাশ করবো। সম্পাদক

Homeদাওয়াহে পথিক : আমিও একদিন তোমার মত ছিলাম!

হে পথিক : আমিও একদিন তোমার মত ছিলাম!

যোহরের নামযটা শেষ করলাম, সাথে সাথেই ফোনটা বেঁজে উঠল, একটি বিশেষ কাজে এখনই বের হতে হবে। উতপ্ত রোঁদে ধূ ধূ মরুভূমি, কপাল বেয়ে নামে ঘামের ফোঁটা, কিন্তু তারপরও রিজিকের অন্বেষণে বিশ্রামহীন ছুটে চলা – এই নিয়েই আমার প্রবাস জীবন।
ছয়’শ কিলোমিটার পাড়ি দিয়ে যখন ফিরছি, রাত তখন দশটা। চারদিক নিরব নিস্তব্দ। কোথাও কোন সাড়া শব্দ নেই। রাতের অনেক অংশ এখনো বাকী তবুও আশেপাশে কাউকে দেখছিনা। রাস্তার লাইটগুলো বন্ধ, ঠান্ডা বাতাসের সাথে ধূলোবালিও উড়ছে। এদিকে এশার নামাযটাও পড়া হয়নি। চতুর্দিকের কোথাও মসজিদের মিনার নজরে আসছে না। খানিকটা সামনে যেতেই বাউন্ডারী ওয়াল সম্বলিত একটি মসজিদের সন্ধান পেলাম।
.
অত:পর গেইটের ভিতরে প্রবেশ করেই অন্তরটা কাঁপুনি দিয়ে উঠলো। হায়, হায় এ তো দেখি গণ-কবরস্থান! দু’পাশে শত শত কবরের মধ্যখানে সরু রাস্তাটা চলে গেছে মসজিদের দরজার দিকে। তড়িৎ গতিতে গিয়ে অযু করে এশার ছালাত আদায় করলাম। তারপর বাহিরে এসে মিনিট পাঁচেক দুপাশের কবরগুলোর দিকে তাকিয়ে রইলাম, হৃদয়টা কেমন যেন কোমল হতে শুরু করল। অত:পর সামনের দিকে হাঁটা শুরু করলাম…
দক্ষিণদিকে কয়েকটা নতুন কবর দেখা যাচ্ছে, সম্ববত দু’একদিন আগেই দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়েছেন। হয়ত অল্প কিছুদিনই দুনিয়ার বুকে বিচরণ করেছিলেন। পরিতাপের বিষয় হচ্ছে, মৃত্যুর পরেও এই কবরস্থানে তাঁরা ছয়মাসের বেশী থাকতে পারবেন না, নতুনদের আগমনে পুরোনোদের বিদায় ঘন্টা বেজে যাবে। মাথার খুলি, দেহের অবশিষ্ট হাড়গুলি উঠিয়ে ফেলা দেয়া হবে কোনো এক অজ্ঞাত স্থানে! এখানে ভি আই পি থেকে শুরু করে বে-ওয়ারিশ সবার কবর রয়েছে। ইয়েমেনী, সুদানী, মিশরী, কেরালা, পাকিস্তানী ও বাংলাদেশীদের কবরগুলো দেখে চোখের পানি আপনা-আপনি গড়িয়ে পড়লো।
.
ইতোমধ্যে দু’জন খাদেম প্রবেশ করলেন। তাঁরা বলাবলি করছে যে, কবর খুঁড়তে হবে, সকালে নাকি দু’জন নতুন মেহমান আসছেন। হতভম্ব হয়ে গেলাম, হায় আল্লাহ্! এ কোথায় দাঁড়িয়ে আছি আমি ? কিছুক্ষণ আকাশ পানে তাকিয়ে রইলাম। মুহুর্তেই দুনিয়াবী সকল দু:খ-দূর্দশা, দুঃচিন্তা-পেরেশানী দূর হয়ে গেল। এই কবরস্থান এমন এক জায়গা — যা ব্যক্তির সমস্ত অহংকারকে নিঃশেষ করে দেয়। আমাদের সালাফগন যখন কোনো কবরের পাশ দিয়ে যেতেন তখন নিরব-নিথর হয়ে যেতেন, আল্লাহর ভয়ে সেজদায় লুটিয়ে পড়তেন, খুব কাঁদতেন আর নিজেকে ধিক্কার দিতেন, তিরস্কৃত করতেন। উসমান (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু) যখন কোন কবরের নিকট দাঁড়াতেন তখন তিনি অঝরে কাঁদতেন। তিনি এতটাই কাঁদতেন যে, চোখের পানিতে তাঁর দাড়িগুলো ভিজে যেত। তাঁকে প্রশ্ন করা হল, জান্নাত-জাহান্নামের বর্ণনায় আপনি কাঁদেন না, অথচ কবর দেখলেই আপনি এত কাঁদেন কেন? জবাবে তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন,‘কবর হ’ল পরকালের যাত্রাপথের প্রথম মনযিল। যদি এখানে কেউ মুক্তি পায় তাহ’লে পরের মনযিলগুলি তার জন্য সহজ হয়ে যায়। আর যদি এখানে কেউ আটকে যায় তাহ’লে পরেরগুলি আরও কঠিন হয়ে যায়’। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) আরো বলেছেন, ‘আমি কবরের চাইতে ভয়ংকর কোনো দৃশ্য আর দেখিনি’। — [১]
.
একদা সাহাবীদের নিয়ে আল্লাহর রাসূল (ﷺ) কোথাও যাচ্ছিলেন। হঠাৎ তিনি একদল লোককে দেখতে পেয়ে বললেন, ওরা কি উদ্দেশ্যে এখানে একত্রিত হয়েছে? একজন বললেন, এরা একটি কবর খুঁড়ছে। একথা শুনেই রাসূলুল্লাহ (ﷺ) আতংকিত হয়ে পড়লেন এবং সঙ্গী-সাথীদের আগেই দ্রুতবেগে কবরের নিকটে পৌঁছে হাঁটু গেড়ে বসলেন। তিনি কি করছেন তা দেখার জন্য
সঙ্গী-সাথীরা তাঁর মুখোমুখি বসলেন। তিনি কেঁদে ফেললেন, এমনকি অশ্রুতে মাটি পর্যন্ত ভিজে গেল। অতঃপর তিনি সাহাবীদের দিকে ফিরে বসে বললেন, হে ভাইয়েরা! এ রকম দিবসের জন্য রসদ প্রস্তুত করে রেখো’। — [২]
.
উমার ইবনুল খাত্তাব (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু) বলতেন,“যার হাতে আমার প্রাণ, সেই আল্লাহর কসম, যদি আমার কাছে দুনিয়ার সকল স্বর্ণ এবং রৌপ্য থাকতো, আমি সেগুলোর বিনিময়ে হলেও মৃত্যুর পরে যে ভয়াবহতা রয়েছে তা থেকে বাঁচার চেষ্টা করতাম।”— [৩]।
.
প্রিয় সর্তীর্থবৃন্দ! মৃত্যুর একটা ঝাপটা দুনিয়ার সকল ব্যস্ততার অবসান ঘটিয়ে দিবে। স্থায়ী বাসিন্দা হবার আগে মাঝেমধ্যে কবরস্থানে ঘুরে আসুন। আপনার প্রিয় মানুষের কবরের পাশে দাঁড়ান। সেই সময়গুলোর কথা স্মরণ করুন যখন তারা ছিলেন সুস্থ-সবল, শক্তিশালী এবং অবস্থান করছিলেন আপনার-ই মাঝে। অত:পর সেই কবরবাসীদের জায়গায় নিজেকে কল্পনা করুন। উন্মুক্ত মন ও উন্মুক্ত অন্তর নিয়ে যান, ভাবুন মৃত্যুকে নিয়ে, মৃত্যু পরবর্তী জীবন নিয়ে; এই ভাবনা-ই যেন মৃত্যু এবং আখিরাতের জন্য আপনাকে প্রস্তুতি নিতে প্রেরণা জোগায়। নিশ্চয় মৃত্যুচিন্তা মৃত অন্তরকেও জীবিত করতে পারে।
যাইহোক, আসার সময় শেষবারের মত পিছনের দিকে তাকিয়ে দেখলাম কবরে শানিত মানুষগুলো যেন চিৎকার দিয়ে বলছে — “হে পথিক, আমিও একদিন তোমার মত ছিলাম।” হে আমাদের রব! আপনার কাছে উত্তম ও বরকতপূর্ণ মৃত্যু এবং কবরের যাবতীয় ফিতনা থেকে মুক্তি চাই! আ-মীন ইয়া রাব্বাল আলামীন।
.
❏ তথ্যসূত্র :
.
১. — [ ইবনু মা-জাহ : ৪২৬৭, তিরমিযী : ২৩০৮ ]।
২. — [আহমাদ, সিলসিলা ছহীহাহ : ১৭৫১ ]।
৩. — [সাহীহ আত-তাওতিক ফি সীরাত ওয়া
হায়াত আল-ফারুক : পৃ ৩৮৩ ]।
▬▬▬▬▬▬▬▬▬▬▬▬▬▬▬▬▬▬▬▬

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

7 + 17 =

সবচেয়ে জনপ্রিয়

সাম্প্রতিক মন্তব্য