আরবি শুধু একটি ভাষা নয়, এটি ইসলামী সভ্যতা-সংস্কৃতি ও জ্ঞান-বিজ্ঞানের অন্যতম বাহক। কালের বিবর্তনে বর্তমান পৃথিবীতে প্রচলিত অনেক ভাষা হারিয়ে যেতে পারে। কোরআনের বাহক হিসেবে আরবি ভাষা কিয়ামত পর্যন্ত টিকে থাকবে। কেননা মহান আল্লাহ কোরআন সংরক্ষণের দায়িত্ব নিয়েছেন। ইরশাদ হয়েছে, ‘নিশ্চয়ই আমিই কোরআন অবতীর্ণ করেছি, আমিই এটি সংরক্ষণ করব।’ (সুরা : হিজর, আয়াত : ৯)
বাংলাদেশের মতো অনারব দেশগুলোর জন্য আরবি ভাষা শিক্ষা ইসলামী শিক্ষারই নামান্তর। মানুষ যত বেশি এ ভাষার কাছাকাছি আসবে ততই ইসলামকে জানবে ও বুঝবে। ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) বলেন, ‘তোমরা আরবি ভাষা শেখো, কেননা এটি তোমাদের দ্বিনেরই অংশ।’
সিরাতে আরবি ভাষা শেখার অনুপ্রেরণা : রাসুল (সা.)-এর পবিত্র সিরাত অধ্যয়ন করলে আরবি ভাষা শিক্ষা ও এর প্রচার-প্রসারের কিছু পদ্ধতি ও দিকনির্দেশনা পাওয়া যায়। তা হলো—
ক. আরবি ভাষার প্রতি ভালোবাসা : স্বভাবগতভাবে মানুষ যা ভালোবাসে তা সহজে গ্রহণ করে এবং চর্চা করে। রাসুল (সা.) বলেন, ‘তোমরা আরবদের ভালোবাসো। কেননা আমার ভাষা আরবি, কোরআনের ভাষা আরবি এবং জান্নাতবাসীদের ভাষা আরবি।’ (মুসতাদরাকে হাকিম)
খ. আরবি ভাষা শিক্ষার পরিবেশ সৃষ্টি করা : শিশুরা সাধারণত দুই বছর বয়স থেকে ছয় বছর বয়সের মধ্যে মাতৃভাষা রপ্ত করে ফেলে। যদি এ সময় তাকে বিশুদ্ধ ভাষার পরিবেশ দেওয়া হয় তবে সে সহজেই বিশুদ্ধ ভাষা শেখে। রাসুল (সা.)-এর শৈশবের এই গুরুত্বপূর্ণ সময়টি কেটেছিল তায়েফের বনু সাদ গোত্রের হালিমার ঘরে। একাদশ শতাব্দীর বিশিষ্ট আরবি ভাষাতাত্ত্বিক সালবি বলেন, ‘আরবের মধ্যে বনু সাদ গোত্রের ভাষা ছিল সবচেয়ে বিশুদ্ধ ও প্রাঞ্জল।’ পাশাপাশি সহজ-সরল, প্রকৃতিঘনিষ্ঠ ও মূল্যবোধসম্পন্ন উন্নত গ্রামীণ জীবনশৈলীর জন্যও এই গোত্রটি প্রসিদ্ধ ছিল। (আবুল হাসান আলী নদভী, আস সিরাতুন নববীয়্যাহ)
বিশুদ্ধ ভাষা শিক্ষার ক্ষেত্রে বনু সাদ গোত্রের পরিবেশের প্রভাব স্বীকার করে রাসুল (সা.) বলেন, ‘আমি আরবদের মধ্যে সবচেয়ে বিশুদ্ধভাষী। কেননা আমি জন্মেছি কুরাইশ বংশে আর আমার শৈশব কেটেছে বনু সাদ বিন বকর গোত্রে।’ (ইমাম বাগাভি, শরহুস সুন্নাহ)
সুতরাং আরবি ভাষা শিক্ষার জন্য উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টির কোনো বিকল্প নেই।
গ. আরবি কবিতাচর্চা : যেকোনো ভাষা শিক্ষার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ভাষার বিখ্যাত লেখকদের সাহিত্য পড়া, চর্চা করা ও মুখস্থ করার গুরুত্ব অপরিসীম। রাসুল (সা.)-এর পবিত্র সিরাতে এ বিষয়ে চমৎকার নির্দেশনা পাওয়া যায়। সে সময় আরবি সাহিত্য বলতে শুধু কবিতাকেই বোঝানো হতো। কোরআনের ভাষা বোঝার জন্য আরবি কবিতা শেখার প্রতি গুরুত্বারোপ করে রাসুল (সা.) বলেন, ‘যদি তোমাদের কাছে কোরআনের কিছু (শব্দের অর্থ) অস্পষ্ট মনে হয়ে তবে তা কবিতায় অনুসন্ধান কোরো। কেননা কবিতা আরবদের (ইতিহাস-ঐতিহ্য ও ভাষা সংস্কৃতির) দিওয়ান বা আকরগ্রন্থ।’ (মুসতাদরাক হাকিম)
একবার এক বেদুইনের অলংকারপূর্ণ কথায় মুগ্ধ হয়ে রাসুল (সা.) বলেন, ‘কিছু কথায় জাদু আছে, কিছু কবিতায় আছে প্রজ্ঞা।’
ঘ. বিশুদ্ধ আরবিচর্চায় মনোযোগী হওয়া : রাসুল (সা.) বলেন, ‘আমি আরবদের মধ্যে সবচেয়ে বিশুদ্ধভাষী, কুরাইশ আমাকে জন্ম দিয়েছে, আমি শৈশব কাটিয়েছি বনু সাদ বিন বকর গোত্রে, আমার ভাষায় ভুল হবে কিভাবে!’ (তাবরানি, আল মুজামুল কাবির)
এ হাদিস থেকে প্রতীয়মান হয় রাসুল (সা.) ভাষার বিশুদ্ধতার প্রতি কতটা যত্নশীল ছিলেন। এ ছাড়া ‘মুসনাদুশ শিহাব’ গ্রন্থে বর্ণিত আছে, রাসুল (সা.) তাঁর চাচা আব্বাস বিন আবদুল মুত্তালিবের বিশুদ্ধ ভাষার প্রশংসা করে বলেছিলেন, ‘পুরুষের সৌন্দর্য হচ্ছে তার ভাষার বিশুদ্ধতা।’ বিশুদ্ধ আরবি ভাষা শিক্ষার জন্যই আরবি ব্যাকরণশাস্ত্র তথা নাহু ও সরফের উৎপত্তি হয়েছিল। আরবি ভাষার সৌন্দর্যচর্চার জন্যই সৃষ্টি হয়েছিল আরবি অলংকারশাস্ত্র বা ইলমুল বালাগাহ। সুতরাং আরবি ভাষা শিক্ষার ক্ষেত্রে বিশুদ্ধতার চর্চাও রাসুল (সা.)-এর অন্যতম শিক্ষা।
