এমভি অভিযান-১০ লঞ্চে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় নিখোঁজ যাত্রীদের লাশ ভেসে ওঠার আশায় ঝালকাঠির সুগন্ধাসহ কয়েকটি নদীতে টহল দিচ্ছেন উদ্ধারকারীরা। ডুবুরিদলের তল্লাশি বন্ধ করে কোস্ট গার্ড ও ফায়ার সার্ভিস সদস্যরা ট্রলার ও বোট নিয়ে গতকাল মঙ্গলবার সুগন্ধা, বিষখালী, ধানসিঁড়ি ও গাবখান নদীর মোহনায় দিনভর সন্ধান চালান। এ সময় সকালে এক যুবক ও দুপুরে এক কিশোরের লাশ ভেসে ওঠে। উদ্ধার করা ওই দুই লাশের পরিচয় শনাক্ত করা যায়নি। দুজনের শরীরেই পোড়া জখম আছে বলে জানান উদ্ধারকারীরা।
লাশ পাওয়ায় সন্ধান অব্যাহত রাখা হবে বলে জানিয়েছে সংস্থা দুটি। গত সোমবার উদ্ধার করা লাশটি গতকাল শনাক্ত হওয়ায় পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। মৃতদেহটি অভিযান-১০ লঞ্চের সহকারী বাবুর্চি শাকিল মোল্লার (৩৩)। তিনি নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার ইসদাইর এলাকার মৃত শফি উদ্দিন মোল্লার ছেলে।
এদিকে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় ঝালকাঠি থানায় সোমবার রাতে আরেকটি মামলা করেছেন ঢাকার ডেমরার বক্সনগর এলাকার বাসিন্দা ও ইট-বালু ব্যবসায়ী মনির হোসেন। তাঁর বোন তাসলিমা আক্তার, ভাগ্নি সুমাইয়া আক্তার মিম, সুমনা আক্তার তানিসা ও ভাইয়ের ছেলে জুনায়েদ ইসলাম নিখোঁজ রয়েছে। মনির তাঁর মামলায় লঞ্চটির মালিক হামজালাল শেখ, লঞ্চের স্টাফসহ আটজনের নাম উল্লেখ করেছেন। এ ছাড়া লঞ্চের ২০ থেকে ২৫ জন কর্মচারীকে অজ্ঞাতপরিচয় হিসেবে আসামি করা হয়েছে। বরগুনার আদালত ও ঢাকার নৌ আদালতে আগে দুটি মামলা হলেও ক্ষতিগ্রস্ত স্বজন হিসেবে তিনিই প্রথম মামলা করলেন।
অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় চারটি আলাদা তদন্ত কমিটি মাঠ পর্যায়ের তদন্তকাজ শেষ পর্যায়ে নিয়ে এসেছে। তারা প্রত্যক্ষদর্শী, আহত-দগ্ধ ব্যক্তিসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলেছে। এসব তদন্তে প্রতিটি ক্ষেত্রে মালিক কর্তৃপক্ষের চরম অবহেলা ও গাফিলতি পাওয়া গেছে বলে জানায় সূত্র। আলামত ও তথ্য যাচাই এবং বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণ শেষে প্রতিবেদন দেওয়া হবে বলে জানান সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
ঝালকাঠি জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে গঠিত তদন্ত কমিটির কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে বলে জানান জেলা প্রশাসক জোহর আলী। তিনি বলেন, ‘এক সপ্তাহের মধ্যে প্রতিবেদন দেওয়া হবে।’
ফায়ার সার্ভিসের বরিশালের উপপরিচালক ও তদন্ত কমিটির সদস্যসচিব কামালউদ্দিন ভুইয়া কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা প্রত্যক্ষদর্শীদের সঙ্গে কথা বলার পাশাপাশি নমুনা সংগ্রহ করেছি। দুই সপ্তাহে রিপোর্ট দেওয়া হবে।’
এ ছাড়া নৌ মন্ত্রণালয় ও বিআইডাব্লিউটিএ আলাদা দুটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। তাদের মাঠ পর্যায়ের তথ্য বিশ্লেষণ চলছে বলে জানা গেছে।
পঞ্চম দিনে দুই লাশ
ঝালকাঠি ফায়ার সার্ভিসের স্টেশন কর্মকর্তা শফিকুল ইসলাম বলেন, তাঁরা একটি স্পিডবোট ও একটি ট্রলারে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত সুগন্ধা, বিষখালীর মোহনা ও আশপাশের নদীতে সন্ধান চালান। পাশাপাশি কোস্ট গার্ডের দুটি স্পিডবোট অভিযান চালায়। সকালে সুগন্ধায় এক যুবক এবং দুপুরে বিষখালী নদী থেকে এক কিশোরের মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। যুবকের বয়স ৩৫ এবং কিশোরের বয়স ১২-১৩ বছর হতে পারে। মরদেহের শরীরে আগুনে পোড়ার দাগ রয়েছে। মৃতদেহ ময়নাতদন্তের জন্য ঝালকাঠি সদর হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হয়েছে।
ঝালকাঠি সদর থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মো. সাইফুল ইসলাম সোহাগ জানান, লাশ ভাসতে দেখে স্থানীয়রা ৯৯৯-এ ফোন দেয়। ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা লাশ উদ্ধার করে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করেন। বিষখালী নদীতে মাছ ধরার সময় কিশোরের মৃতদেহ দেখেছেন বলে জানান জালাল খান নামের একজন স্থানীয় ব্যক্তি। তিনি বলেন, ‘মৃতদেহ আমরা নদীতে ভাসতে দেখে নৌকার সঙ্গে আটকে তীরে নিয়ে যাই। পরে ৯৯৯-এ ফোন দিই।’
আংটি-পোশাকে চেনা যায় লাশটি শাকিলের
ঝালকাঠি থানার ওসির দায়িত্বে থাকা পরিদর্শক আব্দুল মালেক জানান, সোমবার উদ্ধারের পর রাত ২টার দিকে নিখোঁজ শাকিল মোল্লার মামা লুত্ফর রহমান নারায়ণগঞ্জ থেকে এসে মৃতদেহ শনাক্ত করেন। গতকাল সকাল ১০টার দিকে তাঁরা মৃতদেহ নিয়ে নারায়ণগঞ্জের উদ্দেশে রওনা দেন। শাকিল মোল্লার ছোট বোন শাহিদা আক্তার নিশা বলেন, ‘আমার বড় ভাই আগে সুন্দরবন-১০ লঞ্চে সহকারী বাবুর্চি হিসেবে কাজ করত। এক মাস আগে সে অভিযান-১০ লঞ্চে যোগ দেয়। আমরা দুই ভাই-বোন। আমার ভাই এখনো বিয়ে করেনি। ফেসবুকে মৃতদেহ উদ্ধারের খবর দেখে ফায়ার সার্ভিসের সঙ্গে যোগাযোগ করে নিশ্চিত হই, এটা আমার ভাইয়ের লাশ।’
শাকিল মোল্লার মামা মো. লুত্ফর রহমান বলেন, ‘আমার বোনের ছেলে শাকিলের মৃতদেহ আরেকজনের ভাই বলে দাবি করেছিল নিখোঁজদের সন্ধানে আসা এক ব্যক্তি। এ নিয়ে জটিলতা সৃষ্টি হয়। পরে দাড়ি ও পোশাক এবং আংটি দেখে লাশ শনাক্ত করি।’
স্বজনহারার মামলায়ও লঞ্চের ত্রুটি
সোমবার রাতের মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে, বৃহস্পতিবার রাতে মনির হোসেনকে ফোনে তাঁর বোন জানান, ‘লঞ্চে বিকট শব্দে ইঞ্জিনকক্ষ থেকে আগুন লেগেছে। আগুন পুরো লঞ্চে ছড়িয়ে পড়েছে। আমরা মনে হয় আর বাঁচব না।’ এর পর থেকে মনিরের বোনের ফোন বন্ধ হয়ে যায়। অভিযোগে বলা হয়, আগুন লাগার পরে যাত্রীরা লঞ্চ তীরে ভেড়ানোর জন্য অনুরোধ করলেও চালক তা করেননি। তখনো লঞ্চ কর্তৃপক্ষ যাত্রীদের কাছ থেকে ভাড়া আদায় করছিল। লঞ্চ কর্তৃপক্ষ ত্রুটিপূর্ণ ইঞ্জিন ব্যবহার করে, লঞ্চে পর্যাপ্ত অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা না রেখে, যাত্রীদের প্রয়োজনীয় লাইফ জ্যাকেট না রেখে, নিরাপদহীনভাবে লঞ্চ চালিয়ে যাচ্ছিল।
ঝালকাঠি থানার পরিদর্শক আব্দুল মালেক বলেন, দণ্ডবিধির ২৮০, ২৮৫, ২৮৭, ৩০৪(ক), ও ১০৯ ধারায় মামলাটি লিপিবদ্ধ করা হয়েছে। আসামিরা হলেন, লঞ্চের অন্যতম মালিক হামজালাল শেখ, দুই মাস্টার রিয়াজ সিকদার ও খলিল, দুই চালক মাসুম ও কালাম, সুপারভাইজার আনোয়ার, সুকানি আহসান ও কেরানি কামরুল। ঢাকায় যাঁরা গ্রেপ্তার হয়েছেন, তাঁদেরও এই মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হবে। অন্য আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান চালানো হবে।
লঞ্চে গ্যাস সিলিন্ডার সরানোর নির্দেশ
অগ্নিকাণ্ডের পর ঢাকা থেকে চলাচলকারী সব যাত্রীবাহী লঞ্চ থেকে গ্যাস সিলিন্ডার ও চুলা অপসারণের জন্য মালিক, মাস্টার ও চালকদের নির্দেশ দিয়েছে বিআইডাব্লিউটিএ কর্তৃপক্ষ। গত সোমবার বিআইডাব্লিউটিএর প্রকৌশলী ও জাহাজ জরিপকারক এবং অভ্যন্তরীণ নৌযান রেজিস্ট্রার মো. মাহবুবুর রশিদ স্বাক্ষরিত এক সার্কুলারের মাধ্যমে এ নির্দেশ দেওয়া হয়। নৌযানে গ্যাসের সিলিন্ডার ও চুলা পাওয়া গেলে বিধিমোতাবেক ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে নির্দেশনায় বলা হয়েছে।
