রাত্রি জাগরণ
মদিনার রাত সমাগত তার চারি দিকে অন্ধকারাচ্ছন্ন। কিন্তু রাসূল [সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম] তার চারি পার্শ্বে সালাত, যিকির ও অন্যান্য ইবাদতের মাধ্যমে আলোকিত করেছেন, রাত্রি জাগরণ করছেন..। তিনি ভূমণ্ডল ও নভোমণ্ডলের মালিক, যার হাতে সকল কিছুর চাবি-কাঠি স্বীয় স্রষ্টা মহান প্রভুর নির্দেশ পালনার্থে তাঁর সমীপে মুনাজাত করছেন। নির্দেশ হচ্ছে:
﴿ يَٰٓأَيُّهَا ٱلۡمُزَّمِّلُ ١ قُمِ ٱلَّيۡلَ إِلَّا قَلِيلٗا ٢ نِّصۡفَهُۥٓ أَوِ ٱنقُصۡ مِنۡهُ قَلِيلًا ٣ أَوۡ زِدۡ عَلَيۡهِ وَرَتِّلِ ٱلۡقُرۡءَانَ تَرۡتِيلًا ٤ ﴾ [المزمل: ١، ٤]
অর্থাৎ: হে বস্ত্রাবৃত! রাত্রি জাগরণ করুন, কিছু অংশ ব্যতীত, অর্ধরাত্রি বা তা অপেক্ষা অল্প, অথবা তা অপেক্ষা বেশী। আর কুরআন আবৃত্তি করুন ধীরে ধীরে ও স্পষ্টভাবে।[1] আবু হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন:
كان رسول الله – صلى الله عليه وسلم – يقوم يصلي حتى تنتفخ قدماه، فيقال له: يا رسول الله تفعل هذا وقد غفر الله لك ما تقدم من ذنبك وما تأخر؟ قال: «أفلا أكون عبدًا شكورًا؟».
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রাতে এত নামাজ আদায় করতেন যে, তার দুই পা ফুলে যেত। তাকে বলা হল: হে আল্লাহর রাসূল আপনার আগের ও পরের সকল গোনাহ ক্ষমা করে দেয়া হয়েছে তবুও কেন আপনি এত ইবাদাত করেন? তিনি উত্তরে বলেন: আমি কি আল্লাহর কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপনকারী বান্দা হবো না?।[2]
আসওয়াদ বিন ইয়াযিদ বলেন:
سألت عائشة رضي الله عنها عن صلاة رسول الله – صلى الله عليه وسلم – بالليل فقالت: «كان ينام أول الليل ثم يقوم فإذا كان له حاجة ألم بأهله، فإذا سمع الأذان وثب، فإن كان جنبًا أفاض عليه من الماء وإلا توضأ وخرج إلى الصلاة».
আমি আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহাকে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের রাত্রি কালীন সালাত সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলাম, তিনি উত্তরে বললেন: তিনি প্রথম রাত্রিতে ঘুমিয়ে যেতেন। অত:পর তিনি জাগ্রত হয়ে নামাজ আদায় করতেন, তারপর স্ত্রীর সাথে কোন প্রকার প্রয়োজন মনে করলে তা পূরণ করতেন। আর আযান শুনার সাথে সাথেই লাফিয়ে উঠে পড়তেন, গোসলের প্রয়োজন হলে তা সেরে নিতেন অথবা অজু করে নামাযের জন্য বেরিয়ে যেতেন।[3]
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সালাত ছিল অনেক সুন্দর ও দীর্ঘ, আমরা একটু ভাল করে অনুধাবন করে স্বীয় জীবনে নমুনা হিসেবে বাস্তবায়ন করব!
আবু আব্দুল্লাহ হুযাইফা বিন আলইয়ামান রাদিয়াল্লাহু আনহুমা হতে বর্ণিত, তিনি বলেন:
«صليت مع النبي – صلى الله عليه وسلم – ليلة فافتتح البقرة، فقلت: يركع عند المائة، ثم مضى فقلت: يصلي بها في ركعة، فمضى، ثم افتتح آل عمران فقرأها، فقلت: يركع بها، ثم افتتح النساء فقرأها، يقرأ مترسلاً، إذا مر بآية فيها تسبيح سبح، وإذا مر بسؤال سأل، وإذا مر بتعوذ تعوذ، ثم ركع فجعل يقول: سبحان ربي العظيم، فكان ركوعه نحوًا من قيامه، ثم قال: سمع الله لمن حمده، ربنا لك الحمد، ثم قام طويلاً قريبًا مما ركع، ثم سجد فقال: سبحان ربي الأعلى، فكان سجوده قريبًا من قيامه».
আমি এক রাত্রিতে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে সালাত আদায় করি, তিনি সূরা বাকারা পড়া শুরু করলেন, আমি ভাবলাম তিনি হয়তো একশ আয়াত শেষে রুকুতে যাবেন, তিনি পড়তেই থাকলেন, আমি মনে করলাম তিনি হয়তো সম্পূর্ণ সূরা শেষ করে রুকুতে যাবেন, তিনি সূরা বাকারা শেষ করে সূরা আলে ইমরান পড়া আরম্ভ করলেন, আমি মনে করলাম তিনি হয়তো এ সূরা শেষ করে রুকুতে যাবেন, তারপর তিনি সূরা নিসা পড়া আরম্ভ করে শেষ পর্যন্ত পড়লেন। তিনি ধীর-স্থির ভাবে তাজভীদের সাথে পড়েন। যদি এমন কোন আয়াত অতিবাহিত হত যাতে তাসবীহ রয়েছে, সেখানে তিনি তাসবীহ [সুবহানাল্লাহ] পড়তেন। আর প্রার্থনা বিষয়ক কোন আয়াত পাঠ করলে, তিনি আল্লাহর সমীপে প্রার্থনা করেন, আর আযাব বিষয়ক কোন আয়াত পাঠ করলে তিনি তা থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করেন। তারপর তিনি রুকু করেন। আর তাতে তিনি “সুবহানা রাব্বিয়ালা আযীম” পাঠ করেন। তার রুকুর পরিমাণও ছিল, প্রায় দাঁড়িয়ে থাকার সমপরিমাণ। রুকু থেকে উঠে “সামিয়াল্লাহু লিমান হামিদাহ, রাব্বানা লাকাল হামদ” পাঠ করেন, তারপর প্রায় রুকু করার সমপরিমাণ সময় ধরে দাঁড়িয়ে থাকেন। তারপর সিজদা করে “সুবাহানা রাব্বিয়ালা আলা” পাঠ করেন, তার সিজদাও প্রায় তাঁর দাঁড়ানোর সময়ের সমপরিমাণই ছিল।[4]
>
[1] সূরা মুযাম্মিল, আয়াত: ১-৪
[2] বুখারি, হাদিস: ১১৩০; ইবনে মাজাহ, হাদিস: ১৪১৯
[3] বুখারী
[4] মুসলিম, হাদিস: ৭৭২; আহমদ, হাদিস: ২৩৩৬৭
ফজরের পর
মদিনায় রাত্রি অবসানের পর, পূর্বাকাশে ফজরের আভা উঁকি দেয়ার পর, মসজিদে ফজরের সালাত জামাতের সাথে আদায়ান্তে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সূর্যোদয় হওয়া পর্যন্ত আল্লাহর যিকিরে মশগুল থাকতেন, তারপর তিনি দুই রাকাত সালাত আদায় করতেন।
জাবের বিন সামুরা রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন,
«أن النبي – صلى الله عليه وسلم – كان إذا صلى الفجر جلس في مصلاه حتى تطلع الشمس حسنًا».
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ফজর নামাযান্তে উত্তমরূপে সূর্যোদয় পর্যন্ত নামাযের স্থানেই বসে থাকতেন।[1]
আর তিনি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই দুই রাকাত সুন্নাত সালাত পড়ার জন্য তার উম্মতকে উৎসাহ প্রদান করেন, এবং এতে যে সওয়াব রয়েছে তাও স্মরণ করিয়ে দেন।
আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন,
«من صلى الفجر في جماعة،ثم قعد يذكر الله حتى تطلع الشمس ثم صلى ركعتين، كانت له كأجر حجة وعمرة، تامة، تامة، تامة».
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেন: যে ব্যক্তি জামাতের সাথে ফজরের সালাত আদায়ান্তে বসে আল্লাহর যিকিরে মশগুল থেকে সূর্য উদয় হওয়ার পর দুই রাকাত নফল সালাত আদায় করবে, সে পরিপূর্ণ এক হজ্জ ও ওমরার সওয়াব পাবে। পরিপূর্ণ এ কথাটি তিনি তিনবার বলেন।[2]
চাশতের সালাত
দ্বিপ্রহর হবে হবে ভাব, সূর্যের তাপের প্রখরতা বেড়ে চলছে, তাপে মুখ পুড়ে যাবার উপক্রম এ সময়টা হল চাশতের সময়, কাজের চাপ অনেক, জীবন যাপনের চাহিদা পূরণের কত ব্যস্ততা, রিসালাতের প্রচুর দায়িত্ব, প্রতিনিধিদের সাথে সাক্ষাত, সাহাবীদের শিক্ষা প্রদান ও পরিবারের সবার অধিকার আদায়ের পরও নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহ তা‘আলার ইবাদাত করতে থাকেন।
মুয়াজা রাদিয়াল্লাহু আনহা বলেন:
قلت لعائشة رضي الله عنها: أكان النبي – صلى الله عليه وسلم – يصلي الضحى؟ قالت: «نعم أربع ركعات ويزيد ما شاء الله عز وجل».
“আমি আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহাকে বললাম: রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কি চাশতের সালাত পড়তেন? তিনি উত্তরে বলেন: হাঁ, তিনি চার রাকাত পড়তেন অনেক সময় মা-শাআল্লাহ বেশীও পড়তেন।[3]
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ সালাত সম্পর্কে অসিয়তও করে গেছেন। আবু হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন:
«أوصاني خليلي – صلى الله عليه وسلم – بصيام ثلاثة أيام من كل شهر، وركعتي الضحى، وأن أوتر قبل أن أرقد».
আমার বন্ধু নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে প্রতি মাসে তিনটি রোজা রাখা, দুই রাকাত চাশতের সালাত পড়া ও ঘুমানোর পূর্বেই বিতর সালাত আদায় করার অসিয়ত করেছেন।[4]
[1] মুসলিম, হাদিস: ৬৭০
[2] তিরমিযী, হাদিস: ৫৮৬
[3] মুসলিম, হাদিস: ৭১৯
[4] বুখারী, হাদিস: ১৯৮১; মুসলিম, হাদিস: ৭২১
