FIFA 2022 এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানটি না দেখলেও, তার একটি অংশ হয়তোবা অনেকেই দেখেছেন। আবার অনেকে এটা দেখে বেশ খুশিও হয়েছেন যে কুরআনের একটি আয়াত দিয়ে অনুষ্ঠানটি শুরু করা হয়েছে। সেই অংশটুকু ভাইরাল হওয়ার ফলে আমিও দেখেছি। কিন্তু বিষয়টি আমার একটুও ভালো লাগেনি। ঐ অংশে যা হয় তা নিম্নরূপ:
মর্গান ফ্রিম্যান মঞ্চে প্রবেশ করেন। মঞ্চে গানিম আল মুফতাহ মর্গানকে স্বাগত জানায় এবং তার দিকে ডাকে। তারা একে অপরের পাশ দিয়ে হেঁটে যায়। মর্গান ফ্রিম্যান গানিমের কাছে এসে ধীরে ধীরে মাটিতে বসে। বসে জিজ্ঞাসা করে: কিভাবে এই পৃথিবীর সমস্ত দেশ, ভাষা এবং সংস্কৃতি একত্রিত হতে পারে যদি শুধুমাত্র একটি উপায় গ্রহণ করা হয়? উত্তরে গানিম আল মুফতাহ কুরআনের সূরা হুজুরাতের ১৩ নাম্বার আয়াতটি পড়েন।
আমরা যারা যাকিরি মাযহাবের ফারেগ, আমাদের মধ্যে হয়তোবা এমন কেউ নেই যে এই আয়াতটি আগে শোনেনি। আমারতো এই আয়াতটা আজও মুখস্ত। সূরা আল হুজুরাত, চ্যাপটার নাম্বার ৪৯, ভার্স ১৩। আল্লাহ্ বলেন … আরবি ও ইংলিশ অনুবাদ আজও মুখস্ত আছে। এই আয়াতটি সেসব স্বল্প আয়াতের একটি যেটার আরবি যাকির ভাইও পড়েন।
কিন্তু বিরক্তিকর লাগে তখন যখন দেখি গানিম এই আয়াতটি সম্পূর্ণ ভাবে পড়েনি। মাথা খারাপ হয় তখন, যখন দেখি; যেই অংশটুকু পড়েছে সেই অংশটুকুর ভুল ভাল অনুবাদ করেছে। আমার কাছে অনুবাদটি সম্পূর্ণ রূপে আয়াতটির অর্থগত বিকৃতি মনে হয়েছে, সুপরিকল্পিত ভাবে, এক ধরনের মতবাদ প্রচারের উদ্দেশ্যে। এইগুলোকে Subliminal ম্যাসেজ বলা হয়, কিন্তু এটা এতো স্পষ্ট বিকৃতি ছিল যে Subliminal বলা যাবে কিনা সন্দেহ। আচ্ছা সমস্যাটা কোথায়? সম্পূর্ণ আয়াতটি হচ্ছে:
O mankind, indeed We have created you from a single ˹pair of˺ male and female and made you peoples and tribes that you may know one another. Indeed, the most noble of you in the sight of Allah is the person who has Taqwa. Indeed, Allah is All Knowing and All Aware.
হে মানুষ! আমরা তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছি এক পুরুষ ও এক নারী হতে, আর তোমাদেরকে বিভক্ত করেছি বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে, যাতে তোমরা একে অন্যের সাথে পরিচিত হতে পার। তোমাদের মধ্যে আল্লাহর কাছে সে ব্যক্তিই বেশী মর্যাদাসম্পন্ন যে তোমাদের মধ্যে বেশী তাকওয়াসম্পন্ন। নিশ্চয় আল্লাহ্ সর্বজ্ঞ, সম্যক অবহিত।
তাকওয়া মানে হচ্ছে ধার্মিকতা, পরহেজগার, আল্লাহ্কে ভয় করা, সকল ধরনের হারাম কাজ থেকে বেঁচে থাকা ইত্যাদি।
কিন্তু গানিম এর অনুবাদ করেছে:
We were raised to believe that we were scattered on this earth as nations, as tribes, so we could learn from each other and find beauty in the differences.
আমাদেরকে এই বিশ্বাসের সাথে সৃষ্টি করা হয়েছে যে, আমরাদেরকে এই পৃথিবীতে বিভিন্ন জাতি, উপজাতিতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে দিয়েছেন, যাতে আমরা একে অপরের কাছ থেকে শিখতে পারি এবং আমাদের ভিন্নতার মধ্যে সৌন্দর্য্য খুঁজে পেতে পারি।
ঘাপলা কোথায় ধরতে পেরেছেন? আচ্ছা আমার যা মনে হয়েছে তা আপনাদের সাথে একটু শেয়ার করি। প্রথমে জেনে রাখুন যে― ইসলাম Salvific Exclusivity তে বিশ্বাস করে, মানে ইসলামই একমাত্র মনোনীত ধর্ম। একমাত্র জীবন ব্যবস্থা। ইসলাম ব্যতীত অন্য কোনো মতবাদই গ্রহণীয় হবে না। দেখুন সূরা আল ইমরান, চ্যাপটার ৩, ভার্স ১৯; সূরা আল ইমরান চ্যাপটার ৩, ভার্স ৮৫।
মর্গান ফ্রিম্যান কি তাহলে ইসলামের এই salvific exclusivity নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে? আর যেভাবে এই আয়াতটা এখানে ফিট করানো হল যা প্রকৃত পক্ষে এই বিষয়ের সাথে যায় না। আয়াতটাতে বলা হয়েছে যে, আল্লাহ্ আমাদেরকে এক পুরুষ ও এক নারী হতে সৃষ্টি করেছেন। বিভিন্ন দেশ, বর্ণ, ভাষায় সৃষ্টি করেছেন যাতে আমরা একে অপরকে চিনতে পারি, পরিচিত হতে পারি। আমরা যেন এসবের ভিত্তিতে কাউকে হেয় তুচ্ছ না করি। আমাদের সকলের উৎস এক।
কই…এই আয়াতেতো একে অপর থেকে শিখার কিছু বলা হয়নি। আর এই আয়াতের মেইন অংশটুকু যেখানে আল্লাহ্ পার্থক্য করছেন যে সকল মানবজাতি এক, কিন্তু তার মধ্যে সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ হচ্ছে সেই ব্যক্তি যার মধ্যে তাকওয়া রয়েছে। এই গুরুত্বপূর্ণ অংশটুকুই গানিম অনুবাদ করেনি যা হচ্ছে: “তোমাদের মধ্যে আল্লাহর কাছে সে ব্যক্তিই শ্রেষ্ঠ যে তোমাদের মধ্যে বেশি তাকওয়াসম্পন্ন, যে বেশি আল্লাহকে ভয় করে, যে বেশি পরহেজগার, যে বেশি ধার্মিক।”
আমার কাছে মনে হয়েছে তারা পরিকল্পিত ভাবে এখানে Pluralism প্রচার করার চেষ্টা করেছে। Pluralism হচ্ছে যে, যে যেই ধর্ম অনুসরণ করুক না কেন, যে যেই মতাদর্শ লালন করুক না কেন, সবগুলোই ঠিক। কিন্তু ইসলাম বলে শুধু ইসলামই ঠিক, আর কোনো মত নয়। তারপরে মর্গান ফ্রিম্যান বলে:
I can see it, for what unites us here in this moment is so much greater than what divides us.
হ্যাঁ, আমি দেখতে পাচ্ছি। এই মুহুর্তে যা আমাদেরকে এখানে একত্রিত করেছে তা আমাদেরকে যা যা বিভক্ত করে তার চেয়ে অনেক মহান। ফুটবলের জন্য একত্রিত হওয়া সবচেয়ে মহান কাজ? এর চাইতে হাস্যকর আর কি হতে পারে। আমাদেরকে একত্রিত করে “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ্”। ধুর! এই বিষয়ে আমার আর কিছু বলতেই ইচ্ছে করছে না।
তারপরে দেখলাম তারা দুইজনে একে অপরের হাত ধরার চেষ্টা করছে। প্রথমে ভাবলাম সবাই যেভাবে হাত ধরে, উপরের দিকে তুলে একতা দেখায় তা করবে। কিন্তু তা করেনি। পরে ভাবলাম Racism এর বিরুদ্ধে একটি আয়াত পড়েও হাত ধরলনা। কাহিনী কি এই ব্যাটা racist নাকি আবার!
পরে ভাবলাম না, মনে হয় Corona-র কারণে Social Distancing করছে। কিন্তু এখন তো কোন Corona নাই, তাহলে আবার কিসের Social Distancing? পরে হঠাৎ বুঝতে পারলাম, তারা মনে হয় Michelangelo এর Creation of Adam ছবিটি recreate করেছে। তখন তো আরও বিরক্ত হলাম।
ফাইনাল ওপিনিয়ন: পুরো বিষয়টাই আমার কাছে ফালতু লেগেছে।
আমার যা মনে হয়েছে আমি তাই তুলে ধরেছি। পোস্ট করার টাইম পাচ্ছিলাম না, আর অপেক্ষা করছিলাম যে, আমার মত এমন অন্য কারো মনে হয়েছে কিনা। নিজের দল ভারি করার বা নিজে sure হওয়ার চেষ্টা করছিলাম। তার মধ্যে দেখলাম পাকিস্তানের এক ভাই হুবহু কম বেশী আমার মতোই বিষয়টাকে দেখেছেন। তার পোস্ট দেখেই এই পোস্টটি করলাম।
আসল রহস্য আল্লাহ্ই ভালো জানেন। তবে এই বুঝে আমি একা নই। আপনাদের কারো কি আমাদের মত এমন কিছু মনে হয়েছে? নাকি আমি এই বিষয়টি নিয়ে একটু বেশিই ভেবে ফেলেছি?
নভেম্বের ২৫, ২০২২
মুহাম্মাদ ওমার ফারুক মিল্কি
