বাঙালীর হাজার বছরের ইতিহাসে তারা না শাসক হয়েছে, না কোথাও গিয়ে রাজ্য বিস্তার করতে পেরেছে ৷ যে নবাব সিরাজউদ্দৌলাকে নিয়ে বাংলার ইতিহাসের বিষাদ সিন্ধু রচিত হয়েছে, সেই সিরাজউদ্দৌলাও বাঙালী নয় ৷ যে বঙ্গবন্ধুকে হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালী বলা হয়, তাঁর পূর্ব পুরুষও ইরাক থেকে এসেছে ৷
বাঙালীর ইতিহাস হলো, অন্যরা এদের শাসন করেছে ৷ শোষিতদের এক অংশ অধিকার আদায়ের সংগ্রাম করেছে, আরেক অংশ গোলামী করেছে ৷ যেহেতু বাঙালীর শাসনের তেমন ইতিহাস নেই, তাই পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী মনে করতো বাঙালী শাসক হওয়ার অনুপযুক্ত ৷ ৭০ এর নির্বাচনে পরাজিত হওয়ার পর যদি পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠী ক্ষমতা হস্তান্তর করতো, অথবা ২৫ মার্চ কাল রাতে গণহত্যা না করতো তাহলে মুক্তিযুদ্ধ সংঘটিত হতো কি না, বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটির জন্ম হতো কি না, বিষয়টি গবেষণার দাবী রাখে ৷
এক বাপের যদি একাধিক সন্তান থাকে, অধিকার আদাযের জন্য প্রথমে তারা চাচা-জ্যাঠা, প্রতিবেশীদের সাথে লড়াই করে ৷ অধিকার আদায় হলে তারা নিজেরা নিজেরা মারামারিতে লিপ্ত হয় ৷ এটি মানুষের সহজাত স্বভাব ৷ যার কারণে আমরা দেখি, পৃথিবীর প্রতিটি জনপদে জনগণ ঐক্যবদ্ধভাবে অধিকার আদায়ের সংগ্রামে অবতীর্ণ হয়, তারপর নিজেরা নিজেরাই মারামারিতে লিপ্ত হয় ৷
পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠীর সাথে যেমন রাজনৈতিক দলগুলোর ক্ষমতার বিরোধ ছিলো, দেশ স্বাধীন হওয়ার পরে বাংলাদেশী শাসকগোষ্ঠীর সাথে ক্ষমতার দ্বন্ধ তৈরি হলো ৷ পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠী যেভাবে দমন-পীড়নের মাধ্যমে রাজনৈতিক দলগুলোর নেতা কর্মীদের হয়রানি করেছিলো, বাংলাদেশী শাসকগোষ্ঠীও একই পথে হাঁটা শুরু করলো ৷ স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু যদি রাজনীতি থেকে দূরে থাকতেন তাহলে তিনি নেলসন ম্যান্ডেলা, মোহনদাস গান্ধী, মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ’র মতই রাজনৈতিক সমালোচনার উর্ধ্বে থাকতেন ৷
মেজর জিয়াউর রহমান কোন রাজনীতিবিদ ছিলেন না, কিন্তু ভাগ্যগুণে তিনি শাসক হয়েছিলেন এবং মানুষের ভালোবাসা ও সম্মান অর্জন করেছেন ৷ সাবেক নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার সাখাওয়াত হোসেন পিএসসি’র মতে, “যে ধরনের দাফন স্বাধীনতার স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রাপ্য ছিল তা পাননি কিন্তু জিয়া মরে গিয়েও সে সম্মান পেলেন (তথ্যসূত্রঃ বাংলাদেশ রক্তাক্ত অধ্যায় ১৯৭৫ — ৮১) ৷”
একজন সাধারণ আর্মি অফিসার কেনো, কী কারণে, কী যোগ্যতায়, এমন বিরল সম্মানের অধিকারী হলেন? মেজর জলিল, কর্ণেল তাহেরের মত অন্যান্য মুক্তিযোদ্ধা সেনা অফিসার, আ সম রব, ইনুর মতো ছাত্রনেতারা রাজনৈতিক দল গঠন করেও যেখানে গণমানুষের আস্থা অর্জন করতে পারেনি, সেখানে জিয়াউর রহমান কীভাবে সফল হলেন? বিষয়গুলো নিয়ে গবেষণা বাংলাদেশের রাজনীতি ও রাজনীতিবিদদের জন্য শিক্ষনীয় হতে পারতো ৷ কিন্তু তা না করে তারা রাজনৈতিক প্রতিহিংসায় লিপ্ত হলো ৷ কেউ কেউতো বর্তমানে তাঁর মুক্তিযুদ্ধে অবদান নিয়েও বিকৃত ইতিহাস উপস্থাপন করতে শুরু করেছে ৷
বিশিষ্ট পরমাণু বিজ্ঞানী ডঃ এম এ ওয়াজেদ মিয়া বলেন— ২৭ শে মার্চ সন্ধ্যায় চট্রগ্রাম বেতার কেন্দ্র থেকে প্রচারিত ঘোষণায় বারবার বলা হচ্ছিলো যে, মেজর জিয়া ভাষণ দিবেন ৷ এর কিছুক্ষণ পর শোনা গেলো, “স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে মেজর জিয়া বলছি ৷ বাংলাদেশ স্বাধীনতা ঘোষণা করেছে ৷ দেশের সর্বত্র আমরা পাকিস্তানী হানাদারদের পর্যুদস্ত করে চলেছি ৷ ইনশাআল্লাহ আগামী ৪৮ ঘন্টার মধ্যে দেশকে আমরা শত্রুমুক্ত করতে সক্ষম হবো ৷ জয় বাংলা ” (তথ্যসূত্রঃ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে ঘিরে কিছু ঘটনা ও বাংলাদেশ) ৷
মুক্তিযুদ্ধের উপ অধিনায়ক আওয়ামী সরকারের সাবেক পরিকল্পনামন্ত্রী সেক্টর কমান্ডার এয়ার ভাইস মার্শাল (অবঃ) একে খন্দকার বলেন, “…… যুদ্ধের সময় সামরিক বাহিনীর একজন বাঙালি মেজরের কথা শোনা সম্পূর্ণ অন্য ব্যাপার ৷ আমি নিজে জানি, যুদ্ধের সময় জানি, যুদ্ধের পরবর্তী সময়ও জানি যে মেজর জিয়ার ঘোষণাটি পড়ার ফলে সারা দেশের ভেতরে এবং সীমান্তে যত মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন, তাঁদের মধ্যে এবং সাধারণ মানুষের মনে সাংঘাতিক একটা ইতিবাচক প্রভাব পড়ে (তথ্যসূত্রঃ মুক্তিযুদ্ধের পূর্বাপর কথোপকথন) ৷”
১০ এপ্রিল আগরতলায় প্রবাসী বাংলাদেশ সরকার গঠনের পর জেনারেল ওসমানীকে মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক নিযুক্ত করে রণাঙ্গনকে প্রথমে চারটি সেক্টরে বিভক্ত করা হয় ৷ উক্ত চার সেক্টরে চারজন অধিনায়কও নিয়োগ করা হয় ৷ এই চারজন হচ্ছেন মেজর সফিউল্লাহ, মেজর খালেদ মোশারফ, মেজর জিয়া ও আবু ওসমান চৌধুরী (তথ্যসূত্রঃ যুদ্ধে যুদ্ধে স্বাধীনতা, মেজর নাসির উদ্দিন) ৷ মুক্তিযুদ্ধের সময় সোনাগাছির পতিতা পল্লীতে দিন কাটানো আর খাটের তলায় লুকিয়ে থাকা চেতনাজীবিরা ব্যতীত, রণাঙ্গনের প্রতিটি মুক্তিযোদ্ধাই জানেন মুক্তিযুদ্ধের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত জিয়াউর রহমান সম্পৃক্ত ছিলেন ৷
তাহলে কেনো এমন ইতিহাস বিকৃতি?
ইংরেজরা বুঝেছিলো, ইতিহাস দিয়েই ভারতবাসীকে অন্ধকারে রাখা সম্ভব ৷ ইতিহাসের মাধ্যমেই হিন্দু-মুসলিম বিভেদ সৃষ্টি করে নিজেদের জমিদারি ও ব্রিটিশ প্রভুদের স্বার্থ রক্ষা করা যাবে ৷ গৌরিদান প্রথা বন্ধ, সতিদাহ প্রথা রহিতকরণ, বিধবা বিবাহ প্রচলন, সাগর পাড়ি দেওয়া, ব্রাক্ষ্ম সমাজ প্রতিষ্ঠা করে বিভিন্ন দেব-দেবীকে ঠাট্টা করার সুযোগ প্রদান সহ হিন্দু ধর্মের বিভিন্ন প্রথাকে ছিন্ন-ভিন্ন করে দেওয়ার পরেও ইংরেজ প্রভু ও তাদের দোসর জমিদারগণ হিন্দুদের কাছে পরম পূজনীয় ব্যক্তি ৷ অন্যদিকে মুসলমানরা গরুর গোশত খাওয়ার অপরাধে নিন্দনীয় ৷
গরুখোর খ্রীষ্টানরা শাসকরা উপমহাদেশ থেকে ধন-রত্ন লুট করে ভারতবাসীকে ভিক্ষুকের জাতিতে পরিণত করার পরেও সভ্য, অন্যদিকে মুসলমান শাসকেরা লেংটি পরা ভারতবাসীর গায়ে জামা তুলে দিয়ে ভারতকে সমৃদ্ধ করেও তারা অসভ্য! ভারত এখন পর্যন্ত বিশ্বের দরবারে সে বিষয়গুলো নিয়ে গর্ব করে তার অধিকাংশই মুসলিম শাসকদের অবদান ৷
দুইশত বছর ধরে ব্রিটিশ এবং তাদের দোসররা বিকৃত ইতিহাসের মাধ্যমে যে ঘৃণার বীজ বপন করেছিলো, সেটি বিশাল বট বৃক্ষে পরিণত হয়েছে ৷ যে শিক্ষিত হিন্দু সাংবাদিক আসামের নিরক্ষর মুসলিম কৃষকের লাশের উপর লাফালাফি করেছিলো এটি শুধু তার একা ক্ষোভের বর্হিঃপ্রকাশ নয়, ভারতের কোটি কোটি শিক্ষিত হিন্দু এভাবে মুসলমানদের লাশের উপর নৃত্য করার স্বপ্ন দেখে ৷ ভারতের উগ্রবাদী হিন্দুরা মুসলমানদের যে পরিমাণ ঘৃণা করে বাংলাদেশের মুসলমানরা একে অপরকে এর চেয়ে বেশি ঘৃণা করে ৷ এখানে ঘৃণা একটি লাভজনক ব্যবসা ৷ ধূর্ত লোকেরা এটি উৎপাদন করে, গোলামেরা এটি বিক্রি করে, বেকুবেরা এটি ক্রয় করে ৷
ইংল্যান্ডের সাথে যুদ্ধ করে আমেরিকা স্বাধীন হয়েছে ।
আজকে ইংল্যান্ড-আমেরিকা সব চাইতে কাছের মিত্র ৷ আমেরিকার বোমার আঘাতে জাপানের দুইটি শহর আগ্নিকুন্ডতে পরিণত হয়েছিলো । মারা গিয়ে ছিলো লাখো মানুষ । আজও সেই দুই শহরে জন্ম নেয়া নতুন বাচ্চাদের অনেকেই পারমাণবিক বোমার রয়ে যাওয়া রিয়েকশানের কারনে শারারীক অপূর্ণতা নিয়ে জন্ম নিতে হচ্ছে । তারপরেও আজকে আমেরিকা-জাপান একে অপরের উন্নয়নের সব চাইতে কাছের মিত্র ।
জার্মান-ফ্রান্স রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ ইতিহাস বিখ্যাত । প্রথম বিশ্বযুদ্ধ ১৯১৪ সালে শুরু হয়ে শেষ হয় ১৯১৮ সালে ৷ চার বছর ধরে চলা এই যুদ্ধে নিহত হন ১৪ লক্ষ ফরাসি ও ২০ লক্ষ জার্মান সৈনিক ৷ আজকে এককালের শত্রু দুই দেশের মিত্রতার কারণে টিকে আছে গোটা ইউরোপীয় ইউনিয়ন । দুনিয়ার প্রায় দেশ তাদের সাবেক শত্রুকে আজকে বন্ধুতে পরিণত হয়েছে । কারণ ঐসব দেশ গুলোতে যুদ্ধকে ধান্ধা করে খাওয়ার জন্য লেখক বা বুদ্ধিজীবী নেই ।
অন্যান্য দেশ যখন অতীত ভুলে সামনে এগিয়ে যাওয়ার চিন্তা করছে, আমাদের ধান্ধাবাজরা তখন মু্ক্তিযোদ্ধা-রাজাকার ইস্যু নিয়ে ঘৃণার বীজ বপন করে ৷ মুক্তিযুদ্ধের সময় যে পনেরো বছর বয়সী কিশোর যুদ্ধ করেছিলো তাঁর বর্তমান বয়স পঁয়ষট্টি, যে কিশোর বিরোধীতা করেছিলো তার বয়সও সমান ৷ এরা না হয় আরো পনেরো বছর বেঁচে থাকবেন, তারপর দেশে কোনো মুক্তিযোদ্ধা বা রাজাকার থাকবে না ৷
কে পারস্য থেকে এসেছে, কে ইরাক থেকে এসেছে, কে আফগান থেকে এসেছে অতীত ভুলে এক সময় যেমন সবাই পরিচিত হয়েছে বাঙালী হিসেবে; পনেরো বা বিশ বছর পরে মুক্তিযোদ্ধা বা রাজাকার থাকবে না সবাই তখন বাংলাদেশী ৷ এই বাংলাদেশীদের প্রধান শত্রু হবে ইংরেজদের মতো যারা দেশের সম্পদ লুট করে বিদেশে পাচার করে তারা, যারা কালোবাজারি তারা, যারা দেশের আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল নয় তারা ৷ এসব দূর্নীতিবাজদের কাছ থেকে তরুণ প্রজন্মকে ভুলিয়ে রাখার জন্যই ইংরেজদের মতো এসব ইতিহাস বিকৃতি ৷
আপনি আওয়ামীলীগ করেন বা বিএনপি করেন সমস্যা নেই ৷ কিন্তু আপনি যদি দূর্নীতিবীজকে দূর্নীতিবাজ না বলেন, ঘুষখোরকে ঘুষখোর না বলেন, ভূমিদস্যুকে ভূমিদস্যু না বলেন, ভোট চোরকে ভোট চোর না বলেন, অন্যায়কে অন্যায় বলার সৎ সাহস না রেখে আপনার চেতনার দৌড় শুধু মুক্তিযোদ্ধা-রাজাকারেই সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে আপনি স্রেফ গোলামী করছেন মাত্র ৷
ঈশপ, বিলাল (রাঃ), বাইবার্স (রাহিঃ), শেখ সাদী, আলাওলের মত অনেক প্রতিভাবান ব্যক্তিই জীবনের একটা সময় গোলামীর শৃঙ্খলে বন্দি ছিলেন ৷ স্বাধীন চিন্তার কারণেই তারা সে শৃঙ্খল ছিঁড়তে পেরেছেন ৷ আগে চিন্তার স্বাধীনতা অর্জন করুন, পরে না হয় বিজয়ের ইতিহাস শুনবো ৷
