বাংলাদেশের জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্র সাজেক হঠাৎ বন্ধ হয়ে গেল কেন? পাহাড়ে গিয়ে পর্যটকেরা আটকে পড়লেন কেন? এই প্রশ্ন শুধু পর্যটন নিয়ে নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব, পার্বত্য অঞ্চলের নিরাপত্তা এবং রাষ্ট্রের দায়িত্ব পালনের প্রশ্ন।
মেঘ-পাহাড়ের সৌন্দর্যে ঢাকা সাজেক স্থানীয় মানুষের জীবিকার অন্যতম মাধ্যম। পর্যটন বন্ধ হলে পর্যটকেরা ভোগান্তিতে পড়েন, ক্ষতিগ্রস্ত হন হোটেল-রিসোর্টের কর্মী, গাড়িচালক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীসহ অসংখ্য মানুষ। তাই নিরাপত্তাহীনতার সবচেয়ে বড় মূল্য দিতে হয় সাধারণ জনগণকেই।
সাজেকে অবরোধ, সশস্ত্র তৎপরতা এবং সংঘর্ষের যে সব অভিযোগ ও খবর আমাদের সামনে এসেছে, সেগুলো গুরুত্বের সাথেই পর্যবেক্ষণ করছি।
কে প্রথম গুলি চালিয়েছে, কারা অবরোধ সৃষ্টি করেছে এবং সংঘর্ষের জন্য কারা দায়ী, এসব প্রশ্নের উত্তর নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে বের করতে হবে। কোনো পক্ষের বক্তব্যকে যাচাই ছাড়াই চূড়ান্ত সত্য ধরে নেওয়া যেমন ঠিক হবে না, তেমনি কোনো অপরাধের অভিযোগ উপেক্ষা করাও ঠিক হবে না।
পার্বত্য চট্টগ্রামের সমস্যা বহুস্তরীয়। এখানে ভূমিবিরোধ, রাজনৈতিক টানাপোড়েন ও বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মধ্যে অবিশ্বাসের মতো জটিলতা রয়েছে। তাই পাহাড়ের সব মানুষকে সশস্ত্র সংগঠনের সাথে মিলিয়ে দেখা অতি সরল দৃষ্টিভঙ্গি। পাহাড়ি-বাঙালি সব নাগরিকের নিরাপত্তা, মর্যাদা ও অধিকার রাষ্ট্রকে নিশ্চিত করতে হবে।
একই সাথে কোনো সশস্ত্র গোষ্ঠী যদি ভয়ভীতি দেখিয়ে চাঁদাবাজি, অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার কিংবা মানুষের চলাচলে বাধা দেয়, তাহলে তার বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। পর্যটন কেন্দ্র বন্ধ করে দেওয়াটাই সমাধান নয়।
সার্বভৌমত্ব রক্ষার অর্থ শুধু সামরিক উপস্থিতি নয়। দেশের প্রতিটি অঞ্চলে মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করাও সার্বভৌমত্বের অংশ। সেনাবাহিনী ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের নিরাপত্তা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি তাদের কার্যক্রম নিয়ে অভিযোগ উঠলে সেটারও নিরপেক্ষ তদন্ত ও জবাবদিহি করতে হবে।
সাধারণ আলেম সমাজ মনে করে, সরকারের এখন তিনটি বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
প্রথমত, চলমান সংঘর্ষের নিরপেক্ষ তদন্ত করে প্রকৃত ঘটনা ও দায়ীদের শনাক্ত করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, সাজেকের সড়ক, পর্যটনকেন্দ্র এবং স্থানীয় জনপদে এমন নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে মানুষ নির্ভয়ে স্বাভাবিক চলাচল ও জীবিকা নির্বাহ করতে পারেন।
তৃতীয়ত, স্থানীয় জনগণের অভিযোগ আমলে নিয়ে সেগুলোর সমাধান এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গে কার্যকর সংলাপের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি শান্তির পথ তৈরি করতে হবে।
আমাদের উচিত বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতার পক্ষে থাকা, সংঘর্ষের নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করা এবং পার্বত্য অঞ্চলের সব নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কথা বলা।
দেশপ্রেম শুধু আবেগের নাম নয়, সত্যের পক্ষে থাকাও দেশপ্রেমের অংশ। এমনকি ন্যায়বিচার দাবি করা এবং রাষ্ট্রকে তার দায়িত্ব পালনে জবাবদিহির আওতায় রাখাও দেশপ্রেমের অংশ।
আমরা চাই না, কোনো সশস্ত্র গোষ্ঠী সাধারণ মানুষের জীবন ও জীবিকাকে জিম্মি করুক। অপরাধে জড়িত যে-ই হোক, পরিচয় ও প্রভাব নির্বিশেষে তাকে আইনের আওতায় আনতে হবে।
সাজেকের ঘটনা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তি শুধু সামরিক সক্ষমতায় নয়। নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা এবং মানুষের আস্থা অর্জনের মধ্যেও রাষ্ট্রের শক্তি নিহিত।
আমাদের দাবি হচ্ছে, নিরপেক্ষ তদন্ত, দায়ীদের জবাবদিহি, পর্যটক ও স্থানীয় মানুষের নিরাপত্তা এবং পার্বত্য অঞ্চলে দীর্ঘমেয়াদি শান্তি প্রতিষ্ঠা।
~ সাধারণ আলেম সমাজ
২৩ অক্টোবর ২০২৬
