মসজিদুল হারামের আঙিনায় প্রবেশ করতেই ঝাঁকে ঝাঁকে কবুতরের দেখা মেলে। ধূসর পালক, নীল বা সবুজ রঙের দীর্ঘ ঘাড় ও টানা চোখ এদের কিছুটা ভিন্নতা এনে দিয়েছে। আশপাশের খোলা জায়গায় রয়েছে এদের অবাধ বিচরণ। মসজিদুল হারামগামী মুসল্লিদের সঙ্গেও রয়েছে এদের বেশ সখ্যতা।
কেউ তাদের নির্বিঘ্ন উড়াউড়িতে বাদ সাধে না; বরং গমের দানা ছিটিয়ে দিয়ে মুসল্লি ও কবুতরের মধ্যে তৈরি হয় ভালোবাসা। এসব কবুতরের কিছু অনন্য বৈশিষ্ট্য রয়েছে, যা সচরাচর অন্যান্য কবুতরের মধ্যে দেখা যায় না। কবুতরগুলো কাবাঘরের চারপাশে উড়াউড়ি করলেও তাওয়াফকারী বা মুসল্লিদের কষ্ট হয় এমন কিছু করে না। সারা দিন কাবা চত্বরে আনাগোনা থাকলেও তারা মসজিদের ভেতরে বসবাস করে না এবং রাতেও এখানে থাকে না।
এমনকি বিভিন্ন সময় পশু-পাখির মধ্যে নানা ধরনের রোগ-ব্যাধি ছড়ালেও তাতে এসব কবুতর আক্রান্ত হওয়ার খবর পাওয়া যায় না।
কবুতরগুলো নানা নামে পরিচিত। কেউ এদের হামামাতুল হারাম অর্থাৎ সম্মানিত স্থানের কবুতর বলে থাকে। আবার কেউ বলে থাকে হামামু হুম্মা বা জ্বরের কবুতর।
অর্থাৎ তারা সম্মানিত এ স্থানে দীর্ঘদিন ধরে বসবাস করছে এবং তাদের জন্য রয়েছে বিশেষ নিরাপত্তা। কারণ হারাম এলাকায় সব ধরনের পশু-পাখি হত্যা করা নিষিদ্ধ। আল্লাহ প্রদত্ত নিরাপত্তা উপভোগ করে কবুতরগুলো সর্বত্র বিচরণ করে। কারণ এখানে কেউ শিকারের প্রাণী হত্যা করলে তাকে অনুরূপ গৃহপালিত জন্তু সদকা করতে হবে। অথবা এর সমমূল্য পরিমাণ অর্থ অভাবীদের খাবার খাওয়াবে কিংবা রোজা রাখবে।
ইরশাদ হয়েছে, ‘হে মুমিনরা, তোমরা ইহরামে থাকা অবস্থায় শিকারের জন্তু হত্যা কোরো না। তোমাদের কেউ তা ইচ্ছাকৃত হত্যা করলে এর বিনিময় হচ্ছে হত্যাকৃত জন্তুর অনুরূপ গৃহপালিত জন্তু, যা তোমাদের দুজন নিষ্ঠাবান ব্যক্তি নির্ধারণ করবেন, তা কাবাঘরে কোরবানি হিসেবে পাঠানো হবে কিংবা দরিদ্রকে খাবার দিয়ে এর কাফফারা দেওয়া হবে অথবা সমান পরিমাণ রোজা রাখা হবে, যেন সে কৃতকর্মের সাজা ভোগ করে…।’ (সুরা মায়িদা, আয়াত : ৯৫)
এমনকি এসব জীব-জন্তুকে কষ্ট দেওয়া, ভয় দেখানো, তাড়িয়ে দেওয়া, এদের ডিম ভেঙে ফেলা নিষিদ্ধ। আবদুল্লাহ বিন আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) মক্কা বিজয়ের দিন বলেছেন, ‘আল্লাহ তাআলা এই শহরকে আসমান ও জমিন সৃষ্টির পর থেকে সম্মানিত করেছেন। আল্লাহর নির্দেশে কিয়ামত পর্যন্ত এ শহরের সম্মান অটুট থাকবে। আমার আগে কারো জন্য এখানে যুদ্ধ করা বৈধ ছিল না। আমার জন্যও দিবসের কিছু সময় ছাড়া তা বৈধ ছিল না। আল্লাহর নির্দেশে কিয়ামত পর্যন্ত এ শহর সম্মানিত ও নিষিদ্ধ থাকবে। অতএব এখানে যুদ্ধ করা যাবে না। শিকারকে উত্যক্ত করা যাবে না। কাঁটাযুক্ত গাছ ওপড়ানো যাবে না। এখানে শিকারের পেছনে ছোটা যাবে না। কোনো পড়ে থাকা জিনিস তোলা যাবে না; তবে কেউ ঘোষণা দিতে চাইলে পারবে। এখানকার ঘাস কাটা যাবে না।’ (বুখারি, হাদিস : ১৮৩৪)
এসব কবুতরের উৎসমূল নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে বিভিন্ন মত রয়েছে। কারো মতে, এগুলো সাওর পাহাড়ের হেরা গুহায় বাসা বাঁধা কবুতরের বংশধর। হিজরতের সময় তারা সাওর পাহাড়ে মহানবী মুহাম্মদ (সা.) ও আবু বকর (রা.)-এর আশ্রয় নিলে তারা এসে গুহার মুখে বাসা বাঁধে। পুরস্কারস্বরূপ আল্লাহ তাদের বংশধরদের মক্কায় নিরাপদে বসবাসের সুযোগ দেন।
কারো কারো মতে, বিশেষ নিরাপত্তা পাওয়া এসব কবুতর আবাবিল পাখির বংশধর। কাবাঘর ভাঙতে আসা আবরাহা ও তার বাহিনীকে ধ্বংস করতে আল্লাহর পক্ষ থেকে আবাবিল পাখি পাঠানো হয়েছিল। পবিত্র কোরআনের সুরা ফিল-এ এই ঘটনার বিবরণ রয়েছে। কেউ কেউ বলেছেন, তা নুহ (আ.)-এর জাহাজে থাকা কবুতরের বংশধর।
