#বাংলাদেশে_মাদ্রাসা_ব্যাকগ্রাউন্ডের_চাকুরিপ্রার্থীরা_কি_বৈষম্য_ফেস_করে?
এগ্রিকালচারাল এন্ড অ্যাপ্লায়েড ইকোনোমিক্স অ্যাসোসিয়েশনের কনফারেন্সে আজকে প্রেজেন্ট করছি বাংলাদেশের চাকরির বাজারে বৈষম্য নিয়ে আমাদের একটা গবেষণার পোস্টার “Labor Market Discrimination in Bangladesh: An experimental Evidence from the job market of college graduates” শিরোনামে! অ্যাপ্লায়েড ইকোনোমিক্সের সবচেয়ে বড় কনফারেন্স এটা; সারা দুনিয়ার প্রায় ১৫০০ অর্থনীতিবিদরা অংশগ্রহন করছেন এখানে।
এই স্টাডিতে আমরা দেখার চেষ্টা করেছি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাশ করা একজন চাকরিপ্রার্থী তার হাইস্কুল (এসএসসি এবং এইচএসসি) কোন ধরণের প্রতিষ্ঠানে পড়েছে (মাদ্রাসা বা জেনারেল স্কুল), তার জেন্ডার, কিংবা ধর্মীয় পোশাক (যেমন- ছেলেদের ক্ষেত্রে দাঁড়ি-টুপি, মেয়েদের হিজাব) পরার কারণে কোন ধরণের বৈষম্যের শিকার হয় কিনা! বৈষম্য থাকলে তার মাত্রা কতটুকু এবং বিভিন্ন সেক্টরে সেটা কিভাবে ভ্যারি করে?
গবেষণাটি করার জন্য আমরা চারজন পুরুষ ও চারজন নারীর মোট ৮টা কাল্পনিক সিভি (fictitious resume) বানিয়েছি। যারা সবাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাশ করেছে একই বা কাছাকাছি ধরণের বিভাগ থেকে; এবং তাদের অ্যাকাডেমিক রেজাল্ট ও অন্যান্য যোগ্যতা সমান রাখা হয়েছে।
চারজন পুরুষের দুজন মাদ্রাসা থেকে দাখিল আলিম পাশ করা, দুজন জেনারেল স্কুল থেকে এসএসসি এইচএসসি পাশ করা। মেয়েদের ক্ষেত্রেও তাই। তাদের ছবিগুলোতে আমরা একজনকে ধর্মীয় পোশাক সহ (দাঁড়ি-টুপি/হিজাব), আরেকজন জেনারেল পোশাকে রেখেছি; মাদ্রাসা এবং স্কুল দুই ব্যাকগ্রাউন্ডের ক্ষেত্রেই।
তারপর সেই কাল্পনিক সিভিগুলো আমরা পাঠিয়েছি চারটা সেক্টরে- এনজিও, মিডিয়া, কর্পোরেট, এবং আইটি। প্রায় দশ মাস ধরে বিডিজবস, প্রথমআলোজবস সহ বিভিন্ন মাধ্যমে প্রকাশিত চাকরির বিজ্ঞপ্তিগুলো ফলো করে আমরা প্রতিটা জবে আটটা করে সিভি পাঠিয়েছি। সর্বমোট ৪০৬ টা জবে ৩২৪৮ টা সিভি।
আমরা দেখতে চেয়েছি একজন এমপ্লয়ার প্রথমিক বাছাইয়ের পর কাদেরকে ইন্টারভিউ বা লিখিত পরীক্ষার জন্য ডাকে। প্রত্যেক সিভির বিপরীতে একটা করে ফোন নাম্বার ও ইমেইল আইডি ছিলো যা আমাদের দুজন গবেষণা সহকারী যত্নের সাথে মেইনটেইন করেছে।
সংক্ষেপে আমাদের ফান্ডিংসগুলো হচ্ছেঃ
১) ঢাকাবিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাশ করা গ্রাজুয়েট যাদের দাখিল আলিম মাদ্রাসা ব্যাকগ্রাউন্ড ছিলো, অন্যান্য সকল যোগ্যতা সমান থাকার পরেও তারা চাকরির বাজারে বৈষম্যের শিকার হয়। জেনারেল স্কুল ব্যাকগ্রাউন্ডের ক্যান্ডিডেটদের সমান সংখ্যক ইন্টারভিউ কল পেতে হলে তাদেরকে ওভারঅল অন্তত ৪০% বেশি চাকরিতে আবেদন করতে হয়। পুরুষদের জন্য সেটা ৯৬%। আমরা যদি শুধু মাদ্রাসা ও স্কুল ব্যাকগ্রাউন্ডের দুজন ক্লিনশেভ করা পুরুষের মধ্যে তুলনা করি তাহলে দেখা যাচ্ছে মাদ্রাসা ব্যাকগ্রাউন্ডের প্রার্থীকে ১৭১% বেশি চাকরিতে আবেদন করতে হবে সমান সংখ্যক ইন্টারভিউয়ের ডাক পেতে। সব সেক্টরেই এই বৈষম্য বিভিন্ন মাত্রায় বিদ্যমান।
২) একইভাবে দাঁড়ি-টুপি, হিজাবের জন্যও বৈষম্য বিদ্যমান। তবে এক্ষেত্রে হিজাবী নারীদের চেয়ে দাঁড়ি-টুপি আছে এমন পুরুষ প্রার্থীরা বেশি বৈষম্যে ফেস করেন। এনজিওতে হিজাবের কারনে বৈষম্য না থাকলে দাঁড়ি-টুপি বা মাদ্রাসা ব্যাকগ্রাউন্ডের কারনে পুরুষরা কম কল পেয়েছে। ধর্মীয় পোশাকের কারনে সবচেয়ে বেশি বৈষম্য হয় মিডিয়া ও কর্পোরেট সেক্টরে।
৩) জেন্ডারের ভিত্তিতে আমরা উল্লেখযোগ্য কোন ভিন্নতা দেখি নি। এনজিওর চাকরিতে বরং নারীরা অনেক প্রায়োরিটি পায় (সেখানে পুরুষ ক্যান্ডিডেটরা বরং বৈষম্য ফেস করে)। নারীর প্রতি বৈষম্যতার বিরুদ্ধে গত দু-তিন দশকের সচেতনতার সুফল হিসেবে এটা হয়েছে। তবে নারীরা তুলনামূলক কম বেতনের চাকুরিতে এবং ক্লায়েন্ট-ইন্টারেকশান বেশি এ ধরণের চাকুরিতে বেশি কল পেয়েছে। সামগ্রিকভাবে লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্য কমলেও নারীদের কম বেতনের জবে প্রাইয়োরিটি এখনো বেশি। আমাদের অনুমান ছিলো এনজিও এবং মিডিয়াতে নারীরা বেশি কল পাবে। ইন্টারেস্টিংলি, মিডিয়া জবে নারীরা তুলনামূলক কম কল পেয়েছে। সমান যোগ্যতার নারী ও পুরুষ আবেদন করলে মিডিয়া পুরুষ প্রার্থীকে তুলনামূলক বেশি প্রায়োরিটি দেয়।
আমার সাথে সহ-গবেষক হিসেবে ছিলেন মিশিগান স্টেট ইউনিভার্সিটির একজন অধ্যাপক ও একজন সহযোগী অধ্যাপক, এবং বিশ্বব্যাংকের ডেভেলপমেন্ট রিসার্চ গ্রুপের একজন লিড ইকোনোমিস্ট।
বাংলাদেশে জব মার্কেটে বৈষম্য আছে বলে মানুষের মধ্যে পারসেপশান থাকলেও এব্যাপারে কোন রিসার্চ-ইভিডেন্স নেই। এটা প্রথম গবেষণা যার মাধ্যমে বৈষম্যের বিদ্যমানতা প্রমাণিত হয়েছে। বৈশ্বিক পর্যায়েও হাইস্কুল ব্যাকগ্রাউন্ডের কারণে জব মার্কেটে বৈষম্য অনুসন্ধান করার গবেষণা এটি প্রথম। অত্যন্ত অবজেক্টিভ জায়গা থেকে বৈষম্য যাচাই করার ক্ষেত্রে দুনিয়া জুড়ে এ পদ্ধতি (audit/correspondence experiment) খুবই প্রশংসনীয় একটা পদ্ধতি। যুক্তরাষ্ট্র সহ অনেক দেশেই বর্ণ, লিঙ্গ, ধর্ম, জাতীয়তা ইত্যাদির ভিত্তিতে বৈষম্য অনুসন্ধান করার ক্ষেত্রে এ পদ্ধতি অনুসরণ করে অনেক গবেষণা করা হয়েছে।
আশা করি বাংলাদেশের পলিসি-মেকাররা এ গবেষণার ফলাফলের ভিত্তিতে চাকরির বাজারের বৈষম্য দূরিকরণে ভুমিকা রাখবে, যথোপযুক্ত পলিসি নির্ধারণ করবে। বিশেষ করে ইউনিভার্সিটি গ্রাজুয়েট চাকরি প্রার্থীদের সিভিতে ছবি ও এসএসসি এইচএসসি বা সমমানের পর্যায়ের ডিগ্রী সম্পর্কিত তথ্য মেনশান করার প্রথা বাতিল করা উচিত। দুনিয়ার কোথাও এসএসসি এইচএসসির তথ্য দিতে হয় না, ছবি তো তার আগেই বাদ। তাহলে হাইস্কুল বা পরিচ্ছদের ভিত্তিতে প্রাথমিক বাছাইতে বৈষম্য করার মাত্রা কমবে। শুধু যোগ্যতার ভিত্তিতেই চাকরি হবে, দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে যোগ্যরা ভূমিকা রাখতে পারবে। দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশ লাভবান হবে।
নোটঃ অন্যান্য যেসব বৈশিষ্ট্যের কারনে বায়াস হতে পারে সেগুলো আমরা কন্ট্রোল করেছি। যেমন হাইস্কুল বা মাদ্রাসাগুলো মোটামুলি সমমানের রেখেছি, হাইস্কুল জিপিএ, বিভাগ সমান রেখেছি। মাদ্রাসায় যেহেতু বানিজ্য বিভাগ নেই সেহেতু স্কুলের ক্যান্ডিডেটদের ক্ষেত্রেও আমরা সেটা রাখি নি। ইংলিশ মিডিয়াম বা ইংলিশ ভার্সনের স্কুল বা মাদ্রাসা রাখা হয় নি যাতে ইংলিশে ভালো বা উচ্চবিত্ত মনে করে বায়াস না হয়।
প্রার্থীদের নাম, ঠিকানা, ছবিগুলো এমনভাবে রাখা হয়েছে যাতে নাম-ঠিকানা দেখে এলিট-ক্লাসের মনে করে বায়াস তৈরি না হয়।
প্রার্থীদের অভিজ্ঞতা, রেজাল্ট, কো-কারিকুলাম অভিজ্ঞতা, ও অন্যান্য দক্ষতা সমান রাখা হয়েছে। যেসব জবের জন্য ইংলিশ ল্যাঙ্গুয়েজ একটা গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হতে পারে সেখানে সব প্রার্থীদের IELTS স্কোর মেনশান করা হয়েছে যাতে বুঝা যায় সবার ইংরেজির দক্ষতা সমান।
জবগুলোতে যে ধরণের যোগ্যতা-দক্ষতা চেয়েছে আমরা সিভিগুলো সেভাবেই সাজিয়েছি যাতে সিভি দেখে ওভার-কোয়ালিফায়েড বা আন্ডার-কোয়ালিফায়েড মনে না হয়। আমাদের এক্সপার্ট গবেষণা সহকারীরা অনেক পরিশ্রম করেছে, তাদেরকেও অনেক ধন্যবাদ।
