সম্প্রতি বাংলাদেশের ঢাকায় জলাবদ্ধ রাস্তায় বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে একই পরিবারের তিনজনসহ মোট চারজন নিহত হয়েছে। তবে বেঁচে গেছে ওই পরিবারের সাতমাস বয়সী এক শিশু। এ সম্পর্কিত ছবি ও ভিডিও নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপক সমালোচনা চলছে।
মিরপুর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোহাম্মদ মহসীন বিবিসি বাংলাকে বলেন, বৃহস্পতিবার রাত আনুমানিক সাড়ে ৯টার দিকে এ ঘটনা ঘটে।
এ ঘটনায় এরইমধ্যে একটি মামলা হয়েছে। এর অভিযোগে বলা হয়েছে, অজ্ঞাতনামা কারো অবহেলার কারণে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে চারজনের মৃত্যু হয়েছে।
মহসীন বলেন, ‘বিদ্যুৎ-টা কোথা থেকে আসছে সে বিষয়ে এখনো আমরা নিশ্চিত হতে পারিনি। মামলা হয়েছে, তদন্ত চলছে।’
পুলিশ বলছে, বৃহস্পতিবার রাতে ঝিলপাড় বস্তির বিপরীত পাশের রাস্তা দিয়ে চারজনের একটি পরিবার যাওয়ার সময় পানিতে পড়ে বিদুৎস্পৃষ্ট হয়। এ সময় ঘটনাস্থলে থাকা একজন তাদের উদ্ধার করতে গেলে তিনিও বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হন। পরে তাদের হাসপাতালে নেয়া হলে চিকিৎসক চারজনকে মৃত ঘোষণা করে।
এদের মধ্যে সাতমাস বয়সী এক শিশু আহত হলেও পরে সে সুস্থ হয়েছে। পরে ওই শিশুটিকে তার আত্মীয়ের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে বলে পুলিশ জানিয়েছে।
ঢাকার রাস্তায় ঝুলন্ত তার আর জলাবদ্ধতার এমন ঘটনা নতুন কিছু নয়। ঝুলন্ত তার থেকে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হওয়া, আগুন লাগার মতো দুর্ঘটনা ঘটার আশঙ্কা নিয়ে এর আগে নানা সমালোচনা হলেও খুব একটা পরিবর্তন আসেনি।
তবে সিটি করপোরেশন এবং ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি অবশ্য দাবি করছে যে, এসব সমস্যা সমাধানে তারা কাজ করে যাচ্ছেন তারা এবং এরইমধ্যে কিছুটা উন্নতিও হয়েছে।
বৃহস্পতিবারের এই ঘটনাটি নিয়ে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সেলিম রেজা বিবিসি বাংলাকে বলেন, ‘এটা খুবই দুঃখজনক ঘটনা।’
তিনি বলেন, ‘ঢাকা শহরে যাতে জলাবদ্ধতা না হয় তার জন্য আমাদের লোকজন রাতে বৃষ্টি, ঠাণ্ডার মধ্যেও মাঠে ছিল। ওয়াটার লগিং যাতে না হয় সেটার জন্য কাজ করে যাচ্ছে। আজ সকাল থেকেও লোকজন মাঠে আছে। আমরা সেটা মনিটরিং করছি।’
তিনি আরো বলেন, ‘বিদ্যুতের তার কেন সেখানে ঝুলে থাকবে, ঝড়ে তো মূলত গাছ পড়ে, গাড়ি ভাঙে…আমরা এগুলা অপসারণের চেষ্টা করছি।’
এ ঘটনার পর সংশ্লিষ্ট সবাইকে সতর্ক করা হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, জলাবদ্ধতার নিরসনে তারা কিছুটা উন্নতি করেছেন এবং আরো উন্নতি করার চেষ্টা করা হচ্ছে। তবে জলাশয় ভরাট হয়ে যাওয়ার কারণে পানি নিষ্কাশনের উপায় থাকছে না বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
এদিকে ঢাকা শহর থেকে ঝুলন্ত সব ধরণের তার অপসারণের বিষয়ে কতটা কাজ করা হচ্ছে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, মাটির নিচ দিয়ে বিদ্যুতের তার নেয়ার প্রকল্প এরইমধ্যে ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি-ডিপিডিসি হাতে নিয়েছে। আর ডেসকো এ ধরণের প্রকল্প নিয়ে চিন্তা করছে।
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে ডিপিডিসিকে কিছু রাস্তা খননের অনুমতি দেয়া হয়েছে যাতে তারা কাজ শুরু করতে পারে।
তিনি বলেন,‘সম্ভবত এটা আসাদগেট, মোহাম্মদপুর, মিরপুর রোড, ওই এলাকাতে। এছাড়া শের-এ-বাংলা নগরের কিছু এলাকাতে, তেজগাঁ পর্যন্ত জাহাঙ্গীরগেট থেকে শুরু করে বিজয় সরণী হয়ে ফার্মগেট পর্যন্ত।’
বিদ্যুৎ ছাড়াও অন্য বিভিন্ন সেবা যেমন স্যাটেলাইট টিভির কেবল, ইন্টারনেট ও টেলিফোনের ঝুলন্ত তার অপসারণের কর্মসূচি ঢাকাতে চলমান রয়েছে বলেও জানান তিনি। অনেকগুলো রাস্তায় ঝুলন্ত তার অপসারণ করা হয়ে গেলেও কিছু রাস্তায় পর্যায়ক্রমে অপসারণের কাজ এখনো চলছে বলেও জানান তিনি।
তিনি বলেন, ‘ঝুলন্ত যে সার্ভিস তারগুলো রয়েছে সেগুলো আমরা কেটে দিতে চেয়েছিলাম, কাটার উদ্যোগও নেয়া হয়েছে, কিন্তু জনসাধারণের ভোগান্তি খুব বেড়ে যায়। সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সাথে সমন্বয় করে রাস্তাগুলো ভাগ করে দেয়া হয়েছে। প্রতি মাসেই দুই চারটা করে রাস্তা থেকে তারা তার কেটে মাটির নিচ দিয়ে নিয়ে নিচ্ছে।
ঢাকা শহর থেকে ঝুলন্ত তার সরানোর লক্ষে ২০২০ সালের অগাস্টে অভিযান শুরু করা হয়েছিল সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে। পরে সেটি কেবল অপারেটরদের চাপের মুখে বন্ধ হয়ে যায়। প্রায় একই সময়ে হাতে নেয়া হয়েছিল মাটির নিচ দিয়ে বিদ্যুতের তার নেয়ার প্রকল্পও। তবে সেটিও দীর্ঘ সময় পর্যন্ত আটকে ছিল।
এ বিষয়ে ডিপিডিসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক বিকাশ দেওয়ান বলেন, যে কাজগুলোর পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছিল, কোভিডের কারণে তা প্রায় দুই বছর আটকে ছিল। প্রকল্পের পরিকল্পনা করতেও একটা লম্বা সময় লেগেছে। এছাড়া রাস্তা খননের জন্য বিভিন্ন দফতর থেকে অনুমতি পেতে আরো সময় লেগে গেছে।
তিনি বলেন, ‘পারমিশন পাওয়া, সমন্বয় করা অনেক কঠিন হয়ে যায়। আদারওয়াইজ আমরা রেডি আছি।’
দেওয়ান বলেন, রাস্তা খননের জন্য সিটি করপোরেশন এবং রোডস অ্যান্ড হাইওয়েজ বিভাগের অনুমোদনের দরকার হয় তাদের।
তিনি বলেন, ‘একচুয়ালি পারমিশনটাই (আসল কারণ)। কারণ রোড এক্সক্যাভেশনে তো অনেকগুলো ইউটিলিটি যায়, আবার সিটি করপোরেশন নতুন রাস্তা হলে দিতে চায় না, আবার বর্ষার একটা ব্যাপার ছিল, এই-সেইগুলো আরকি।’
ডিপিডিসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক বিকাশ দেওয়ান বলেন, বিদ্যুতের তার মাটির নিচ দিয়ে নেয়ার জন্য এ পর্যন্ত দুটি প্রকল্প হাতে নিয়েছেন তারা।
এরমধ্যে একটি প্রকল্পের আওতায় জাহাঙ্গীরগেট থেকে বঙ্গভবন পর্যন্ত রাস্তায় তার মাটির নিচ দিয়ে নেয়ার পরিকল্পনা ছিল। পরে সেটি বাড়িয়ে বাংলামটর পর্যন্ত করা হয়েছে। এরমধ্যে বঙ্গভবন থেকে বাংলামটর পর্যন্ত অংশের কাজের জন্য সিটি করপোরেশনের অনুমোদনের অপেক্ষায় আছেন।
একই প্রকল্পের আওতায় গাবতলি থেকে রাপা প্লাজা পর্যন্ত কাজ চলছে। এরইমধ্যে সেন্ট্রাল কলেজ এলাকা পর্যন্ত কাজ শেষ হয়েছে বলে জানান তিনি।
আরেকটি প্রকল্পের আওতায়, ধানমন্ডিতে চার-পাঁচটি রাস্তায় এরইমধ্যে বিদ্যুতের তার মাটির নিচ দিয়ে নেয়া হয়েছে। আর কিছু কাজ এখনো চলমান রয়েছে।
তিনি বলেন, ‘কিছু কাজের জন্য আমরা সিটি করপোরেশনের পারমিশনের জন্য অপেক্ষা করছি… আশা করছি দুই-চার দিনের মধ্যে অনুমতি পাব এবং আমাদের কাজ শুরু হবে।’
হাতিরঝিল এলাকায় তার মাটির নিচ দিয়ে নেয়ার কাজটি হয়ে গেছে বলেও জানিয়েছেন তিনি।
তবে পুরো ঢাকা শহরের বিদ্যুতের তার মাটির নিচ দিয়ে নিতে কত দিন লাগবে এমন প্রশ্নের উত্তরে দেওয়ান বলেন, এ কাজের জন্য অন্তত আরো দুই বছর সময় লাগবে তাদের।
২০২৫ সালের আগে ঢাকা শহরের সব এলাকায় বিদ্যুতের তার মাটির নিচ দিয়ে নেয়াটা সম্ভব হবে না বলে মনে করেন তিনি।
সূত্র : বিবিসি
