খুলনা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী (চেইনম্যান) মুজিবুর রহমান নিজেকে এখনো উপসচিব ও রাজউকের কর্মকর্তা পরিচয় দিয়ে প্রতারণা করে চলেছেন। সম্প্রতি তিনি এক শিক্ষকের সঙ্গে প্রতারণা করেন। এ ঘটনায় রাজধানীর ধানমণ্ডি থানায় অভিযোগ দিয়েছেন ওই শিক্ষক।
প্রতারণাতার বিরুদ্ধে প্রতারণার অভিযোগে দায়ের করা একাধিক মামলা তদন্ত করতে গিয়ে পুলিশ জানতে পেরেছে, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উপ-সচিব পরিচয় দিয়ে প্রতারণা করলেও, প্রকৃতপক্ষে মুজিবুর রহমান কখনোই উপ-সচিব ছিলেন না।
খুলনা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী (চেইনম্যান) পরিচয় দিলেও বর্তমানে এই পদেও নেই তিনি। এই পদে থেকেই দুর্নীতির দায়ে একসময় চাকরিচ্যুত হন তিনি। এছাড়া তিনি কখনো নিজেকে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) উপ-পরিচালক, আবার কখনো প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের কর্মকর্তা পরিচয় দিয়েও প্রতারণা করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এসব পরিচয়ে প্রতারণা করে তিনি এখন গাড়ি-বাড়িসহ বিপুল সম্পদের মালিক।
প্রতারণার অভিযোগে রাজধানীর ধানমন্ডি থানায় দায়ের করা একটি মামলার তদন্ত করতে গিয়ে এমন আরো অনেক তথ্য পেয়েছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। ওই মামলায় গত ২৭ সেপ্টেম্বর মজিবুরের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র জমা দিয়েছে পিবিআই। প্রতারণার অভিযোগে গত বছর ৩ মার্চ মুজিবুরের বিরুদ্ধে ধানমন্ডি থানায় মামলাটি করেন মোস্তাফিজুর রহমান নামে এক ঠিকাদার।
পিবিআইয়ের তদন্তে উঠে এসেছে, ছয় বছর আগে রাজধানীর ধানমন্ডিতে ৩ কোটি টাকা দামের একটি ফ্ল্যাট কেনেন মুজিবুর রহমান।
তখন তিনি নিজের পরিচয় দেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উপ-সচিব। এই মিথ্যা পরিচয়ে ফ্ল্যাট মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদকও হন তিনি। এর কিছুদিন পর মজিবুর জানান, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে তিনি রাজউকে অথরাইজড কর্মকর্তা হিসেবে বদলি হয়েছেন। বিশ্বাস করে তখন মুজিবুরের কাছে একটি প্লট কেনার বিষয়ে সহায়তা চান মোস্তাফিজুর রহমান। তবে প্লট বিক্রির নাম করে প্রতিবেশী মোস্তাফিজুরের সঙ্গেও প্রতারণা করেন মজিবুর।
তিনি (মুজিবুর) মোস্তাফিজের কাছ থেকে তিন কোটি সাত লাখ টাকা হাতিয়ে নেন। তবে সেই প্লট এখনো পর্যন্ত নিবন্ধন করে দেননি তিনি। এই নিয়ে চাপ দেওয়ায় তিনি উল্টো মোস্তাফিজুরের বিরুদ্ধে তিন কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ এনে মামলা করেন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে পিবিআইয়ের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ও মামলার তদন্ত কর্মকর্তা মোহাম্মদ তাহেরুল হক চৌহান কালের কণ্ঠকে বলেন, মোস্তাফিজুরের কাছে প্লট বিক্রির নাম করে নেওয়া অর্থ আত্মসাৎ করার যে অভিযোগ মুজিবুর রহমানের বিরুদ্ধে করা হয়েছে, তদন্তে তার সত্যতা পাওয়া গেছে। এর পাশাপাশি তিনি সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা পরিচয় দিয়ে যেসব প্রতারণা করছেন তদন্তে তারও তথ্য-প্রমাণ পাওয়া গেছে। এর পরই মুজিবুরের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে।
পিবিআইয়ের তদন্তে উঠে এসেছে, মুজিবুর রহমান ১৯৯৮ সালে খুলনা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেইনম্যান হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। ১০ বছর সেখানে কর্মরত ছিলেন তিনি। তাকে ২০০৮ সালে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের অফিস সহায়ক হিসেবে বদলি করা হয়। পরে তাকে জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষের কার্যালয়ে বদলি করা হয়। এরপর ২০১৯ সালে তাকে খুলনা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের কার্যালয়ে বদলি করা হয়। পরে তাকে বদলি করা হয় বরিশাল উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের কার্যালয়ে। তবে যোগদানের এক মাস পর থেকে তিনি কর্মস্থলে আর যাননি। পরে ২০২০ সালে কর্মস্থলে অনুপস্থিত, অসদাচরণ, অবহেলার কারণে তাকে চাকরিচ্যুত করা হয়। তখন তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলাও হয়।
তবে পিবিআইয়ের তদন্তের বিষয়ে জানতে চাইলে মুজিবুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, পিবিআই তার বিরুদ্ধে তদন্তে যা পেয়েছে তা সত্য নয়। তার প্রতারণার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।
এ বিষয়ে ভুক্তভোগী ব্যবসায়ী মোস্তাফিজুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, তিনি ধানমন্ডির বাসিন্দা। একই ভবনে থাকার সুবাদে মুজিবুর রহমানের সঙ্গে তার পরিচয় ও সখ্যতা গড়ে উঠে। মুজিবুর নিজেকে রাজউকের অথরাইজড কর্মকর্তা পরিচয় দেয়। পূর্বাচলে একটি প্লট কিনে দেওয়ার কথা বলে আমার কাছ থেকে ৩ কোটি ৭ লাখ ৪০ হাজার টাকা নেয়। এ জন্য একটি অঙ্গীকারনামায় সই করি আমরা। পরে প্লট কিনে না দিয়ে মুজিবুর প্রতারণা করে। তিনি বলেন, এখন টাকা চাইতে গেলে স্থানীয় সন্ত্রাসী বাহিনী দিয়ে আমাকে ও পরিবারকে হত্যার হুমকি দেয়। এ নিয়ে মুজিবুরের বিরুদ্ধে গত ১৪ ফেব্রুয়ারি ধানমন্ডি থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করি। এতে মজিবুর ক্ষিপ্ত হয়ে মামলা তুলে নিতে হুমকি দেয়। এরপর মুজিবুর আমার বিরুদ্ধে ধানমন্ডি থানায় উল্টো মিথ্যা জিডি করে।
পরে জানতে পারি, ২২ ফেব্রুয়ারি মুজিবুর আমাকে আসামি করে ধানমন্ডি থানায় একটি মামলাও করেছে। ওই মামলায় পুলিশ দিয়ে হয়রানি করতে থাকে। ধানমন্ডি থানা পুলিশও হয়রানি করে। পরে জামিন নিয়ে ৩ মার্চ মুজিবুরকে আসামি করে ধানমন্ডি থানায় মামলা করি। মামলা তদন্তে আদালতের মাধ্যমে পিবিআইয়ের সহযোগিতা চাই। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা পিবিআইয়ের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোহাম্মদ তাহেরুল হক চৌহান বলেন, মুজিবুর রহমান ব্যবসায়ী মোস্তাফিজুর রহমানের বিরুদ্ধে মামলায় যে অভিযোগ করেছেন, তদন্তে তা পাওয়া যায়নি। ব্যবসায়ী মোস্তাফিজুর রহমানের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি। তাই অভিযোগটা সঠিক নয় বলে মামলায় ফাইনাল রিপোর্ট দেওয়া হয়েছে।
জানা গেছে, নামে-বেনামে প্রতারক মজিবুর এখন বিপুল সম্পদের মালিক। হাতিরপুল ফ্রি স্কুল স্ট্রিটের পুকুরপাড়ে একটি অ্যাপার্টমেন্টে ফ্ল্যাট রয়েছে তার। তবে তিনি সপরিবারে ধানমন্ডির ১১/এ নম্বর রোডে ৭৭ নম্বর বাড়িতে বসবাস করেন। ওই বাড়ির তৃতীয় তলায় ২/এ ফ্ল্যাট মালিক হিসাবে পরিচিত মুজিবুর। ফ্ল্যাটের মূল্য প্রায় ৪ কোটি টাকা। যাতায়াতের জন্য (ঢাকা মেট্রো-গ-৩৬-৩০৩৯ এবং ঢাকা মেট্রো-গ-২৬-৪৪০৬) দুটি ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহার করেন। দুটি গাড়ির জন্য দুজন চালক রয়েছে। এছাড়া তার রিয়েল স্টেট ব্যবসাও রয়েছে। মোহাম্মদিয়া সুপার মার্কেটের ৭৯/৮০ নম্বর দোকানে খোলা হয়েছে কম্পানির অফিস। এছাড়া মুজিবুরের নামে-বেনামে একাধিক প্লট রয়েছে। বিভিন্ন জনকে পূর্বাচলে প্লট কিনে দেওয়ার কথা বলে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়ে জমি রেজিস্ট্রি করে দেননি। জমি দলিল করে না দেওয়ায় এক পর্যায়ে টাকা চাইলে উল্টো তাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা জিডি ও মামলা করেন তিনি। টাকার বিনিময়ে স্থানীয় এক প্রভাবশালী তাকে সহযোগিতা করছে।
এ বিষয়ে ধানমন্ডি সোসাইটির এক কর্মকর্তা বলেন, মজিবুর অনেক আগে তাদের সংগঠনের সদস্য হয়েছেন। তখন তিনি নিজেকে সরকারি কর্মকর্তা পরিচয় দিয়েছেন। কিন্তু পরে জানতে পারি, তিনি চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী ছিলেন। নানা অনিয়মের কারণে তার চাকরি চলে গেছে। তার বিরুদ্ধে আমাদের কাছেও অভিযোগ আসছে। তার সদস্য পদ বাতিলের জন্য আমরা বসব।
ভবনের বাসিন্দাসহ আরো কয়েকজন ভুক্তভোগী তার বিরুদ্ধে দুদকেও অভিযোগ করেছেন। তবে অভিযোগটি অনুসন্ধান পর্যায়ে রয়েছে বলে দুদক সূত্রে জানা গেছে। অন্যদিকে ব্যবসায়ী মোস্তাাফিজুর রহমানের করা মামলায় মুজিবুরের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছিল আদালত।
