সারা দেশে এক হাজার ২৮৫টি অবৈধ হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের তথ্য পেয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। গত সপ্তাহে চলা অভিযানে এসব তথ্য পাওয়া যায়। এর মধ্যে বিভিন্ন বিভাগ ও জেলায় বেশ কিছু অবৈধ হাসপাতাল বন্ধ ও জরিমানা করা হয়েছে।
বিভাগীয় কর্মকর্তাদের তথ্যে দেখা গেছে, সবচেয়ে বেশি ৪১৫টি অবৈধ হাসপাতাল-ক্লিনিক রয়েছে ঢাকা বিভাগে। এরপর ময়মনসিংহে ২৫২টি, চট্টগ্রামে ২৪০টি, খুলনায় ১৫৬টি, রংপুরে ১১১টি, রাজশাহীতে ৫৫টি, বরিশালে ৪৮টি ও সিলেট বিভাগে আটটি অবৈধ প্রতিষ্ঠান রয়েছে।
লাইসেন্সবিহীন এসব প্রতিষ্ঠানের নানা অনিয়মের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলেন, অবৈধ ক্লিনিকগুলোর কোনোটি ক্লিনিকের লাইসেন্স নিয়ে এর সঙ্গে ডায়াগনস্টিক সেন্টার, কোনোটি ডায়াগনস্টিক সেন্টারের অনুমোদন নিয়ে এর সঙ্গে ক্লিনিক পরিচালনা করে এসেছে। আবার কোনোটি শুধু লাইসেন্সের জন্য আবেদন করে সে কপি ডেস্কের সামনে ঝুলিয়ে স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এসব অবৈধ প্রতিষ্ঠানে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে রোগী দেখেন সরকারি চিকিৎসকরা।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আহমেদুল কবীর বলেন, ‘শুধু ব্যবসা করার জন্য স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান খুলে মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করা নৈতিক স্খলনের শামিল। নিবন্ধন ছাড়া এসব প্রতিষ্ঠানের নানা ধরনের অন্যায় করার সুয়োগ থাকে। এর সঙ্গে সরকার রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হয়। এসব কার্যক্রম সম্পর্কেও জানা খুব কঠিন। আমি বিশ্বাস করি, মনিটরিংয়ে দ্রুত এগুলো ঠিক করে ফেলতে পারব।’
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দেশে প্রাথমিক নিবন্ধিত বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক, ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও ব্লাড ব্যাংকের সংখ্যা ৫০ হাজারের মতো, যেগুলোর বেশির ভাগই এক প্রতিষ্ঠানের জন্য আলাদা মোবাইল নাম্বার দিয়ে ১০ থেকে ১২টি নিবন্ধন করেছে। অনেকের নিবন্ধন নম্বর থাকলেও প্রতিষ্ঠান আলোর মুখ দেখেনি। তবে সারা দেশে অনুমোদিত বেসরকারি হাসপাতাল আছে পাঁচ হাজার। আর অনুমোদন নিয়ে চলছে ১০ হাজার ডায়াগনস্টিক সেন্টার।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসাপাতাল ও ক্লিনিক) ডা. আবু হোসেন মো. মঈনুল আহসান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘অনলাইনে প্রাথমিক নিবন্ধন যে কেউ করতে পারে। যখন কোনো প্রতিষ্ঠান প্রাথমিক নিবন্ধন করে, তখন আমরা চিহ্নিত করতে পারি। এ ছাড়া সম্ভব হয় না। প্রাথমিক নিবন্ধন শেষে নামের জন্য আবেদন করতে হয়। অধিদপ্তর যদি দেখে এই নামে কোনো প্রতিষ্ঠান নেই, তখন আবেদনে অনুমতি দেয়। আবেদন করলে কী কী থাকা অত্যাবশ্যকীয়, তা জানিয়ে দেওয়া হয়। এরপর পরিদর্শন শেষে অনুমোদন দেয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।’
ডা. আবু হোসেন বলেন, ‘লাইসেন্সের জন্য আবেদনের আগমুহূর্ত পর্যন্ত আমরা জানতে পারি না সেটি বৈধ না অবৈধভাবে চলছে। আবার বৈধতা যাচাইয়ে অধিদপ্তরের নিজস্ব জনবল (আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী) বা তেমন কিছু নেই।’
চিকিৎসাবিজ্ঞানী অধ্যাপক ডা. লিয়াকত আলী কালের কণ্ঠ বলেন, বড় আকারে যথার্থ পরিসংখ্যান ছাড়া সঠিক সংখ্যা বলা সম্ভব নয়। অনুমানে মনে হচ্ছে সংখ্যা কম। তবে নজরদারির অভাব রয়েছে এটা ঠিক। কিছুটা ইচ্ছাকৃত, কিছুটা অনিচ্ছাকৃত।
ডা. লিয়াকত আলী বলেন, বেসরকারি খাতে স্বাস্থ্যসেবা চলে ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ। সে কলেবরে প্রাইভেট সেক্টরে নজরদারির জন্য জনবলের ও কাঠামোর যে বিস্তৃতি দরকার, সেটি কিন্তু খুব বেশি পরিবর্তন হয়নি। অধিদপ্তরের জনবল অপ্রতুল। সারা দেশের সিভিল সার্জন ও বিভাগীয় পরিচালকদের অবস্থা আরো করুণ। দু-তিনজনের লোকবল নিয়ে চলছে। এই জনবল ও কাঠোমো দিয়ে নজরদারি করতে চাইলেও সম্ভব নয়।
খুলনা বিভাগের অনিবন্ধিত স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠান ১৩৩
খুলনা মহানগরীর ১০টিসহ বিভাগের মোট ১৩৩টি অনিবন্ধিত হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের তালিকা করেছে স্বাস্থ্য দপ্তর। এরই মধ্যে এসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযানও শুরু হয়েছে। বিভাগীয় স্বাস্থ্য দপ্তর বলেছে, অনিবন্ধিত হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনাসহ আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
খুলনার বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক ডা. মো. মনজুরুল মুরশিদ কালের কণ্ঠকে বলেন, অবৈধ ক্লিনিক, হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের তালিকা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। এরই মধ্যে বিভাগের বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালানো হচ্ছে। এ বিষয়ে মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা হবে।
ময়মনসিংহ বিভাগে ৪৩ ক্লিনিক বন্ধ
স্বাস্থ্য বিভাগের নির্দেশনা অনুযায়ী ময়মনসিংহে বিভাগের চারটি জেলায় স্বাস্থ্য প্রশাসন কয়েক দিন ধরেই অবৈধ ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করে যাচ্ছে। গত বৃহস্পতিবার পর্যন্ত লাইসেন্সবিহীন ৪৩টি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। ময়মনসিংহ বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালকের কার্যালয় থেকে এ তথ্য পাওয়া গেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, বিভাগের লাইসেন্সবিহীন ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের সংখ্যা ২৫২। এর সবগুলোতেই অভিযান পরিচালনা করা হবে বলে স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা জানান।
রংপুরে বন্ধ ১১২ চিকিৎসাকেন্দ্র
রংপুর বিভাগে বেসরকারি ক্লিনিকের সংখ্যা ৫৩০ আর বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টারের সংখ্যা ৮২৭। এর মধ্যে কাগজপত্র না থাকায় গত বছর বন্ধ করা হয়েছে ১১২টি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার। তবে যেসব প্রতিষ্ঠানের কাগজপত্র আছে তাদেরও যাচাই-বাচাই চলছে বলে জানান সিভিল সার্জন।
স্বাস্থ্যমন্ত্রীর নির্দেশক্রমে সারা দেশের মতো রংপুর বিভাগেও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক ও কর্মকর্তারা ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে কাগজপত্র যাচাই-বাছাই করছেন।
সিলেটে অবৈধ ৮ প্রতিষ্ঠান বন্ধ
দেশব্যাপী অনিবন্ধিত ক্লিনিক, ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও হাসপাতালের বিরুদ্ধে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অভিযানে অবৈধ প্রতিষ্ঠান মিলেছে মাত্র আটটি। তবে কতটি প্রতিষ্ঠানকে কী পরিমাণ জরিমানা করা হয়েছে কিংবা কতটি প্রতিষ্ঠান বন্ধ করা হয়েছে এ বিষয়ে সঠিক তথ্য মেলেনি।
[প্রতিবেদনে তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করেছেন সংশ্লিষ্ট বিভাগের প্রতিবেদক ও প্রতিনিধিরা।]
