সরদার আবদুর রহমান : ভারতে বিজেপি’র নেতৃত্বাধীন জোট এনডিএ পুনরায় ক্ষমতাসীন হলেও একান্তভাবে ‘শরিক-নির্ভর’ এই সরকারের স্থিতিশীলতা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। তবে ‘ইন্ডিয়া’ জোটের অবস্থানও খুব স্থিতিশীল নয় বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা। বাস্তবে দুই জোটই ‘নড়বড়ে’ অবস্থায় রয়েছে। ফলে ভারতে সরকার গঠন ও টিকিয়ে রাখা নিয়ে ১৯৮৯-৯৮ দশকের ভিপি সিং, চন্দ্রশেখর, আইকে গুজরাল, দেবগৌড়ার সময়কালের মতো সরকার নিয়ে ভাঙাগড়া চলতে পারে বলেও আশংকা করা হচ্ছে। ‘আব কি বার, চারশো পার’Ñএই শ্লোগান নিয়ে এবার নির্বাচনি লড়াইয়ে নেমেছিলেন ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। কিন্তু চারশ’ পার হওয়া দূরে থাক, এবারের নির্বাচনে প্রধানমন্ত্রীর দল বিজেপি সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতাও খুইয়েছে। এখন তাদের নেতৃত্বাধীন জোটের শরিকদের সমর্থনের উপর নির্ভর করেই সরকারকে টিকিয়ে রাখতে হবে। সদ্য বিদায়ী সরকারের জোটের শরিকদেরকে যেখানে বিজেপি’র পিছনে পিছনে ঘুরতে হতো, এখন বিজেপিকেই শরিকদের তোয়াজ করে চলতে হবে। আবার সংবিধান সংশোধন করার মতো গরিষ্ঠতাও মেলেনি এনডিএ বা ইন্ডিয়া জোটের।
শরিক-নির্ভরতার ঝুঁকি: লোকসভার মোট ৫৪৩ আসনের মধ্যে সরকার গঠনের জন্য একটি দলকে ২৭২টি আসনে জয় পেতে হয়।
চূড়ান্ত ফলাফলে বিজেপি নেতৃত্বাধীন ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক অ্যালায়েন্স-এনডিএ জোট মোট আসন পেয়েছে ২৮৬টি। আর কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ‘ইন্ডিয়া’ জোট পেয়েছে মোট ২০২টি আসন। এর আগে, ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে এককভাবে ৩০৩টি আসনে জিতেছিল বিজেপি। তখন বিজেপির নেতৃত্বাধীন জোট এনডিএ পেয়েছিল ৩৫২টি আসন। ভারতীয় মিডিয়ার মতে, লোকসভা ভোটে বিজেপি এবার একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি। ৫৪৩টি আসনের মধ্যে ২৭২টি আসনে জিতলে সেটা হতো। কিন্তু বিজেপি থমকে গেছে ২৪০-এ। স্বাভাবিকভাবেই কেন্দ্রে সরকার গড়ার জন্য এখন এনডিএর শরিক টিডিপির চন্দ্রবাবু নাইডু, জেডিইউয়ের নীতিশ কুমার এবং শিবসেনা (শিন্ডে)-র একনাথ শিন্ডেদের মুখাপেক্ষী হয়ে থাকতে হচ্ছে বিজেপিকে। কিন্তু শরিকদের পাশে পাওয়ার বিষয়টিও নির্ভর করছে কিছু নতুন ও পুরনো অঙ্কের উপর। এরই মধ্যে মোদীর কাছে একগাদা দাবি নিয়ে হাজির হয়েছে বড়ো দুই শরিক। ভারতে যে ধরণের রাজনৈতিক দরকষাকষি হয় তাতে শেষ পর্যন্ত এনডিএ জোটের ক্ষমতা কতোটা মসৃন হবে তা নিশ্চিত নয়। ভারতীয় মিডিয়া বলছে, অনেকেরই মত যে, “শরিক-নির্ভর বিজেপির অবস্থা খুব শীঘ্রই কঠিন হয়ে উঠতে চলেছে।”
ইন্ডিয়া জোটের অবস্থান : দেশের মোট ১৮টি বিরোধী দল রয়েছে ‘ইন্ডিয়া’ জোটের সঙ্গে। মজার ব্যাপার হলো, ‘ইন্ডিয়া’ জোট তৈরির উদ্যোগ প্রথম নিয়েছিলেন জেডিইউ প্রধান নীতিশ কুমার- যিনি এখন বিজেপি’র শরিক। লোকসভায় তাঁর দল পেয়েছে ১২টি আসন। নীতিশ লোকসভা ভোটের আগে জোট বদলিয়ে যোগ দেন এনডিএতে। ফলে তাঁর প্রাপ্ত আসন আপাতত এনডিএর হাতে। ইন্ডিয়া জোটের প্রথম বৈঠকটিও নীতিশ করেছিলেন বাংলার মুখ্যমন্ত্রী মমতার সঙ্গেই। ‘ইন্ডিয়া’ নামটিও দিয়েছিলেন মমতা। লোকসভায় মমতার তৃণমূল ২৯টি আসন পেয়েছে। সব মিলিয়ে মোট ২৩৩টি আসন নিজেদের বিরোধী জোটে টানতে পেরেছে ‘ইন্ডিয়া’। যেখানে নীতিশ, নাইডু এবং শিন্ডের মতো বড় তিনটি দল নিয়ে বিজেপি এনডিএ’র ছাতার নিচে আনতে পেরেছে ২৯২টি আসন।
এই পরিস্থিতিতে একদা ‘ইন্ডিয়া’ জোটে থাকা নীতিশ, কয়েক মাস আগে জেলে যাওয়া চন্দ্রবাবু নাইডু এবং আঞ্চলিক আরো কিছু দলকে যদি সঙ্গে ভিড়িয়ে নিতে পারে তাহলে অচিরেই হয়তো সংখ্যাগরিষ্ঠতার দাবি নিয়ে হাজির হতেও পারে ইন্ডিয়া জোট। তবে গত বুধবারের বৈঠকে ‘ইন্ডিয়া’ যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে তারা সর্বসমক্ষে জানিয়েছে, তার মূল বক্তব্য হলো, ঐক্যবদ্ধ বিরোধী হিসেবেই সংসদে থাকতে চায় তারা। আপাতত ‘ওয়েট অ্যান্ড ওয়াচ’ রাজনৈতিক অবস্থান নিতে চাচ্ছে তারা।
৮৯-৯৮’র মতো ভাঙাগড়া!
এই পরিস্থিতিতে ভারতে সরকার গঠন ও টিকিয়ে রাখা নিয়ে ১৯৮৯-৯৮ দশকের মতো ভাঙাগড়া চলতে পারে বলেও আশংকা করা হচ্ছে। সেই ভাঙাগড়ার ভেতর এক দশকে ভিপি সিং, চন্দ্রশেখর, আইকে গুজরাল, দেবগৌড়া প্রমুখ প্রধানমন্ত্রী হওয়ার ‘সৌভাগ্য’ অর্জন করেছিলেন। সেসময়, ১৯৮৯ সালে বোফর্স কেলেঙ্কারি নামে পরিচিত দুর্নীতির মামলার জেরে রাজীব গান্ধীর কংগ্রেস (আই) নির্বাচনে হেরে যায়। জনতা দলের নেতৃত্বাধীন ন্যাশনাল ফ্রন্ট বাইরে থেকে ভারতীয় জনতা পার্টি ও বামফ্রন্টের সমর্থন নিয়ে ক্ষমতাসীন হয়। ভিপি সিং হন প্রধানমন্ত্রী। ১৯৯০ সালের নভেম্বরে এই জোটের পতন ঘটে এবং কংগ্রেসের সমর্থনে চন্দ্রশেখরের নেতৃত্বে রাষ্ট্রীয় সমাজবাদী জনতা পার্টির অধীনে একটি নতুন সরকার ক্ষমতায় আসে। চন্দ্রশেখর একটি নতুন সংখ্যালঘু সরকার গঠন করে নিজে প্রধানমন্ত্রী হতে সফল হন। তবে কংগ্রেস (আই) সমর্থন প্রত্যাহার করে নিলে চার মাসেরও কম সময়ের মধ্যে তার পতন ঘটে। এর ক্ষমতার দ্বিতীয় পর্যায় শুরু হয় ১৯৯৬ সালে, যখন সীতারাম কেশরীর অধীনে কংগ্রেসের বাইরে থেকে দেয়া সমর্থনে জনতা দলের নেতৃত্বাধীন ইউনাইটেড ফ্রন্ট ক্ষমতায় আসে। এইচডি দেবগৌড়া হন প্রধানমন্ত্রী। কিন্তু দেবগৌড়া সরকার অনেক কংগ্রেস নেতার বিরুদ্ধে দুর্নীতির মামলার তদন্ত পুনরায় শুরু করলে কংগ্রেস এক বছরেরও কম সময়ের মধ্যে তাদের সমর্থন প্রত্যাহার করে নেয়। এরপর বিভিন্ন যুক্তফ্রন্ট গঠনকারী গোষ্ঠীর সমর্থনে আই কে গুজরাল পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হন। কিন্তু এই সরকারেরও পতন ঘটে কয়েক মাসের মধ্যে। অতঃপর ১৯৯৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে জনতা দলের নেতৃত্বাধীন জোট সাধারণ নির্বাচনে ভারতীয় জনতা পার্টির কাছে ক্ষমতা হারায়।
উগ্র রাজনীতির পারদ কি কমবে?
এমন একটি রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে ভারতে যে উগ্র রাজনীতির আবহ মাথা চাড়া দিয়েছিল তার পারদ কি কিছুটা কমবে বলে মনে হয়? এমন প্রশ্ন ও আশা সমভাবে জাগতে শুরু করেছে। ভারতীয় মিডিয়াগুলো এখনই এবিষয়ে কোনো বিশ্লেষণ প্রকাশ করেনি। তবে আঞ্চলিক দলগুলো মোটামুটিভাবে নমনীয় রাজনীতিতে অভ্যস্থ হওয়া এবং কেন্দ্রীয় সরকারে তাদের প্রভাব থাকবে বলে এমনটি আশা করছেন বিশ্লেষকরা। তাছাড়া প্রতিবেশি দেশগুলোর সঙ্গে একটি ‘শোভন’ আচরণ প্রকাশ পাওয়া এবং গণতন্ত্রের প্রতি আগ্রহ বৃদ্ধি পাওয়ার আশা করছেন অনেকেই।
