Sunday, June 7, 2026
No menu items!

আমাদের মুসলিমউম্মাহ ডট নিউজে পরিবেশিত সংবাদ মূলত বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদের সমাহার। পরিবেশিত সংবাদের সত্যায়ন এই স্বল্প সময়ে পরিসরে সম্ভব নয় বিধায় আমরা সৌজন্যতার সাথে আহরিত সংবাদ সহ পত্রিকার নাম লিপিবদ্ধ করেছি। পরবর্তীতে যদি উক্ত সংবাদ সংশ্লিষ্ট কোন সংশোধন আমরা পাই তবে সত্যতার নিরিখে সংশোধনটা প্রকাশ করবো। সম্পাদক

Homeদৈনন্দিন খবররোজকার তাজা খবরশিক্ষাক্ষেত্রে সুবাতাস আশা করতেই পারি

শিক্ষাক্ষেত্রে সুবাতাস আশা করতেই পারি

প্রায় দশ বছর আগের স্মৃতিচারণা করছি। ২০১৪ সালের ১৯ আগস্ট কালের কণ্ঠে একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছিল। সে প্রতিবেদনটি দেশের স্কুলপড়ুয়া শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবকদের দৃষ্টি আকৃষ্ট করেছিল। প্রথম পাতায় প্রকাশিত প্রতিবেদনটির শিরোনাম ছিল “আড়াই বছর ধরে ‘ভুল’ পড়ছে শিক্ষার্থীরা”।

প্রতিবেদনটিতে এনসিটিবি কর্তৃক প্রকাশিত ষষ্ঠ, সপ্তম ও অষ্টম শ্রেণির ‘বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয়’ বইটির ভেতরে থাকা কিছু ভুলত্রুটির কথা উল্লেখ করা হয়েছিল। বই তিনটির লেখক তালিকায় আমার নাম মুদ্রিত থাকায় সংগত কারণেই পরিচিতজনরা আমাকে টেলিফোন করে এবং সাক্ষাতে নানা প্রশ্ন করেছেন। আমি ১৯৯৬ সাল থেকে এনসিটিবির কারিকুলাম তৈরি ও বই লেখায় যুক্ত ছিলাম। এমন প্রশ্নের মুখোমুখি কখনো হইনি।

আমি বলেছিলাম, বই তিনটিতে যে লম্বা লেখক তালিকা ছিল তাঁরা সবাই বইগুলোর লেখক ছিলেন না। পুস্তক প্রণয়ন কমিটির সদস্য ছিলেন। অসাবধানেই হোক বা যেকোনো কারণেই হোক লেখক হিসেবে সবার নাম মুদ্রিত হয়েছিল। এটি খুব বড় বিষয় নয়।

বড় বিষয় হচ্ছে, প্রধানত যে পাঁচজন লেখক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছি, বই প্রকাশের পর দেখা গেল আমাদের পাণ্ডুলিপির যৎসামান্যই সেখানে রয়েছে। বাকি সব আমাদের না জানিয়ে প্রায় নতুনভাবে লেখা এবং এর ভেতর ছড়িয়ে আছে অনেক মারাত্মক ভুল; যেসবের আমাদের কোনো সম্পর্ক নেই। পুনর্লিখন কারা করলেন জানা হলো না। এ ভুলের দায় সম্পাদনা পরিষদ না অন্য কারো তা আমরা জানতে পারিনি। আমরা পাঁচ লেখক সে সময় এনসিটিবির চেয়ারম্যানের কাছে লিখিতভাবে আমাদের বক্তব্য জানিয়েছিলাম।

বলেছিলাম এই ভুল তথ্যে ভরা বইয়ের দায়িত্ব আমরা নিতে পারব না। আমাদের জানা মতে এনসিটিবি কর্তৃপক্ষ সে সময় এর কোনো বিহিত করেনি। তাই দীর্ঘদিন ধরে এসব ভুলই পড়তে হয়েছিল শিক্ষার্থীদের।

তবু ভালো এনসিটিবি কর্তৃপক্ষ শেষ পর্যন্ত বিষয়টির প্রতি নজর দিয়েছিল। ভুল সংশোধন ও পুনর্বিন্যাসের জন্য গঠন করেছিল কমিটি। ঘটনাচক্রে ‘বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয়’ বইয়ের সংস্কার সংশোধনের জন্য গঠিত কমিটিতে আমি একজন সদস্য ছিলাম। এই বই তিনটির সবচেয়ে মারাত্মক ত্রুটি ছিল এগুলো এনসিটিবি কর্তৃক প্রণীত কারিকুলাম মেনে রচিত হয়নি। তাই এনসিটিবি প্রণীত অন্য সব বই থেকে এগুলো ব্যতিক্রম ও সনাতন পদ্ধতির হয়ে যায়। অথচ আমাদের লেখা পাণ্ডুলিপিতে সব নিয়মই যথাযথভাবে পালন করা হয়েছিল। বিশ্বের অধিকাংশ দেশেই আধুনিক শিক্ষা পদ্ধতিতে স্কুলপাঠ্য বই লেখা হয়। সেখানে শিখন ফল, মূল্যায়ন কার্যক্রম ইত্যাদির ভিত্তিতে বই রচিত হয়। যাতে শিক্ষার্থী পঠন-পাঠনের ভেতর নিজেকে যুক্ত করে ফেলতে পারে।

আমরা এনসিটিবির সংশ্লিষ্ট বিধায়কদের জানিয়েছিলাম ২০১৫-এর জানুয়ারিতে যে বই শিক্ষার্থীদের হাতে পৌঁছবে, কারিকুলামের ভিত্তিতে এগুলোর আমূল সংস্কার করা এই অল্প সময়ে সম্ভব নয়। কারণ চূড়ান্ত পাণ্ডুলিপি আগস্ট মাসের মধ্যে প্রেসে যেতে হবে। এ কারণে আপাতত তথ্যগত ভুলগুলো সংশোধন করে দিয়েছি। সিদ্ধান্তমতো ২০১৬-এর বই পূর্ণতা পাবে।

ভুলের বিষয়টি আলোতে আসায় সম্ভবত যথাযথ সময়ে উল্লিখিত অনুসন্ধানী রিপোর্টটি প্রকাশ করে একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছিল কালের কণ্ঠ। শুধু দেশের শিক্ষক-শিক্ষার্থী নয়, পরবর্তী পদক্ষেপ নিতে এনসিটিবিরও অনেক উপকার হয়েছে বলে আমি মনে করি। আমার ধারণা, রিপোর্টটি এনসিটিবি গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছিল। কারণ রিপোর্ট প্রকাশের পর সংশ্লিষ্টজনদের কেউ কেউ টেলিফোনে প্রতিবেদকের বক্তব্য যাচাই করার জন্য আমার সঙ্গে কথাও বলেছেন।

এরই মধ্যে কয়েকজন স্কুলশিক্ষক, আমার এক বন্ধু এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন সহকর্মী টেলিফোনে দৃষ্টি আকর্ষণ করলেন। বললেন, ইতিহাসের ভুলগুলো সত্য বলে চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা নাকি কোনো কোনো পক্ষ করছে। এবং এমন মনোভাব সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়েছে। সবচেয়ে বেশি হতাশা প্রকাশ করলেন স্কুলশিক্ষকদের কয়েকজন। তাঁদের বক্তব্য ‘ভুল তথ্যে এমনিতেই তো আমরা হাবুডুবু খাচ্ছি, তার মধ্যে বিদগ্ধজন আত্মপক্ষ সমর্থন করতে গিয়ে ভুলগুলো যেভাবে নতুন করে চাপিয়ে দিতে চাইলেন তাতে দেশের লাখ লাখ শিক্ষার্থী ও শিক্ষক-শিক্ষিকা আরো বিভ্রান্ত হবেন। তাই তাঁদের অনুরোধ, আমি যাতে ইতিহাসের সঠিক সূত্রে সত্য উপস্থাপন করে এসিটিবির দৃষ্টি আকর্ষণ করি। আমি আপ্লুত ও বিব্রত হলাম আমার মতো প্রত্নতত্ত্ব ও ইতিহাসের নগণ্য ছাত্রের ওপর এতটা ভরসা করায়।

দশক পেরোনোর পরও এনসিটিবি শিশু শিক্ষার্থীদের একই সংকটে ফেলছে। ২০২২-এ একটি নতুন কারিকুলাম প্রণীত হয়। সময় সময় কারিকুলাম আধুনিকায়ন ও যুগোপযোগী তো হতেই পারে। শিশু শিক্ষার টেক্সট বই প্রণয়নের কারিকুলাম ও বই রচনায় প্রশিক্ষিত অভিজ্ঞ শিক্ষকদের অন্তর্ভুক্তি থাকা জরুরি। এবার দেখলাম অভিজ্ঞতার চেয়ে দলীয় বিবেচনা প্রাধান্য পেল। শিখন পদ্ধতি থেকে শুরু করে শিখনফল অর্জনের ধাপ তৈরি ও অনুশীলনী কার্যক্রম প্রস্তুতের জন্য একটি সাধারণ প্রশিক্ষণের প্রয়োজন হয়। কিন্তু নতুন করিকুলামে যেসব বই রচিত হলো তার মধ্যে অনেক বিধিরই যথার্থ প্রতিফলন নেই। গ্রন্থ রচনা এবং সম্পাদনায় যথেষ্ট স্বাধীনতা ভোগ করা হয়েছে। লেখকদের লেখা পাণ্ডুলিপির ভুল সম্পাদকদের দৃষ্টিও এড়িয়ে গেছে। বই নির্ভুল করার জন্য লেখক-সম্পাদক ছাড়াও এনসিটিবির বিশেষজ্ঞরাও থাকেন। তারাও নানাভাবে ঝাড়াই বাছাই করেন। কিন্তু দেখা গেল বইগুলো শিক্ষার্থীদের হতে চলে আসার পর পরিবেশিত নানা ভুল নিয়ে দেশজুড়ে শোরগোল উঠে গেল। বিশেষ করে সপ্তম শ্রেণির ইতিহাস ও সামাজিক বিজ্ঞান বই নিয়ে মারাত্মক প্রশ্ন উত্থাপিত হলো। এ পর্যায়ে এনসিটিবির ২৬টি বইয়েই ভুল সংশোধন করতে হয়েছে। সপ্তম শ্রেণির ইতিহাস ও সামাজিক বিজ্ঞান বইটি শেষ পর্যন্ত উঠিয়ে নিতে হয়েছিল। শিক্ষাবর্ষের চার মাস অতিক্রান্ত হওয়ার পর আবার সংশোধিত বই শিক্ষার্থীদের হাতে আসে। কিন্তু এসব থেকে এনসিটিবি শিক্ষা গ্রহণ করেনি। দলীয় দৃষ্টিভঙ্গিতেই চলতে চেষ্টা করেছে। শিক্ষার্থীদের বয়স ও শ্রেণি বিবেচনা না করে আধুনিক চিন্তার নামে এ বছর সপ্তম শ্রেণির বইয়ে ভাষা পরিবেশনায় গুরুত্ব না দিয়ে তৃতীয় লিঙ্গের মানুষদের নিয়ে ‘শরিফার গল্প’ নামে একটি নিবন্ধ যুক্ত করা হলো। এই লেখাটি শিক্ষক ও অভিভাবক মহলে তীব্র সমালোচনার ঝড় ওঠে। অবশেষে লেখাটি বই থেকে উঠিয়ে নিতে হয়।

এ বছরই আবার পরিবর্তন আনা হয় কারিকুলামে। বিদেশি মডেল প্রয়োগ করতে গিয়ে এ দেশের বাস্তবতাকে বিবেচনায় আনলেন না বিশেষজ্ঞরা। বড়সংখক শিক্ষার্থীর অভিভাবক যে সচ্ছল নন, কৃষক-শ্রমিক খেটে খাওয়া মানুষের সন্তান, প্রত্যন্ত অঞ্চলের খুঁড়িয়ে চলা স্কুলের শিক্ষার্থী যেখানে প্রয়োজনের অর্ধেক শিক্ষক নেই, রয়েছে প্রশিক্ষিত শিক্ষকের অভাব—এর কোনো কিছুই ভাবনায় আসেনি। কারিকুলামের মুখোমুখি হতে গিয়ে কজন আভিভাবক স্মার্ট ফোনের জোগান দিতে পারবেন? শিশু শিক্ষার্থীর স্মার্ট ফোনের অপব্যবহার কেমন করে রোধ করা যাবে? অ্যাসাইনমেন্ট-মডেল ইত্যাদি তৈরির সরঞ্জাম কে সরবরাহ করবে দরিদ্র অভিভাবকদের সন্তানদের? এর কোনো কিছুই ভাবিনি আমরা। 

উচ্চাভিলাষী চিন্তা ভালো, তবে এর প্রায়োগিক দিক বিবেচনায় না এনে আমরা যেন ঘোড়ার আগে গাড়ি জুড়ে দিলাম। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের দুর্নীতি ও কঠিন দলীয়করণ নীতি আমাদের শিক্ষা, সমাজ ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রে যথেষ্ট ক্ষতি করেছে। এদিক থেকে কিছুটা অভিশাপমুক্ত হয়েছি আমরা। নতুন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কাছে আমাদের তাই প্রত্যাশা অনেক। আমাদের অনেক আক্ষেপ ছিল এ কথা আমি আমার অনেক লেখায় প্রকাশও করেছি যে স্বাধীনতার পর থেকে আমরা শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে একজন শিক্ষাবিদকে পেলাম না, যিনি শিক্ষা উন্নয়নের খুঁটিনাটি বিষয়গুলো বুঝতে পারবেন। সে আকাঙ্ক্ষা এবার পূরণ হয়েছে। এই মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে আমরা সজ্জন প্রাজ্ঞ শিক্ষাবিদকে পেয়েছি। এখন সময়টাই এমন যেখানে দলীয়করণের অপচ্ছায়া থাকছে না। মুক্তচিন্তায় সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে কোনো বাধা নেই। তাই আমরা শিক্ষা ক্ষেত্রে সুবাতাস আশা করতেই পারি।                                                                                             

লেখক : অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

[email protected]

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

8 + fourteen =

সবচেয়ে জনপ্রিয়

সাম্প্রতিক মন্তব্য