ভারতে মুসলমানদের দান করা শত শত কোটি ডলার মূল্যের ওয়াকফ সম্পত্তির ব্যবস্থাপনা ও বহু বছরের পুরনো পরিচালনা পদ্ধতি সংশোধনে আনা একটি বিল লোকসভায় পাস হয়েছে।
টানা ১২ ঘণ্টার বেশি তুমুল তর্ক-বিতর্কের পর বুধবার রাতে পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষে এই ওয়াকফ (সংশোধনী) বিলটি পাস হয় বলে জানিয়েছে বিবিসি, আনন্দবাজার।
বিজেপি নেতৃত্বাধীন ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার বলছে, বিলটি আইনে পরিণত হলে তা ওয়াকফ সম্পত্তির ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা আনবে।
কিন্তু বিরোধী দল এবং প্রায় সব মুসলিম সংগঠনই বলছে, এই বিলটি আনাই হয়েছে ভারতের সর্ববৃহৎ সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সাংবিধানিক অধিকার খর্ব করতে।
বুধবার লোকসভায় বিলটি ২৮৮-২৩২ ভোটে পাস হয়। নিম্নকক্ষে পাস হওয়ায় এটি এখন রাজ্যসভায় যাবে। সেখানে পাস হলে যাবে ভারতের রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুর কাছে। তিনি স্বাক্ষর করলে সেটি আইনে পরিণত হবে।
ভারতীয় গণমাধ্যমগুলো বলছে, বৃহস্পতিবারই বিলটি উচ্চকক্ষ রাজ্যসভায় ওঠার কথা। আলাপ-আলোচনার পর সেটি ভোটে যাবে। বিজেপি-নেতৃত্বাধীন জোটের প্রাধান্য থাকায় এই কক্ষেও বিলটি পাসে সমস্যা হওয়ার কথা নয়।
পার্লামেন্টে বিলটি প্রথম উঠেছিল গত বছরের অগাস্টে। কিন্তু পরে সেটি যৌথ পার্লামেন্টারি কমিটির (জেপিসি) কাছে পর্যালোচনার জন্য পাঠানো হয়।
ওই সংস্করণের সঙ্গে বুধবার যে বিলটি পাস হয়েছে তার খানিকটা পার্থক্য রয়েছে। জেপিসি বিলটির কিছু জায়গায় পরিবর্তন এনেছে।
তবে বিরোধীরা বলছেন, বিজেপি এবং এর মিত্রদের প্রস্তাবিত সংশোধনীগুলোই জেপিসি গ্রহণ করেছে, অন্যদিকে বিরোধীরা যেসব প্রস্তাব দিয়েছিল সেগুলো খারিজ করে দেওয়া হয়েছে।
কংগ্রেসের সাংসদ ও রাজ্যসভায় বিরোধী দলের নেতা মল্লিকার্জুন খাড়্গে আশা প্রকাশ করে বলেছেন, সব বিরোধীরা ঐক্যবদ্ধ, সবাই মিলে ‘ওয়াকফ সংশোধনী বিলকে ঘিরে নরেন্দ্র মোদী সরকারের অসাংবিধানিক ও ভেদাভেদের এজেন্ডাকে’ পরাজিত করা হবে।
ভারতে ক্রিয়াশীল মুসলিম সংগঠনগুলো বলছে, বিজেপি নেতৃত্বাধীন সরকারের আনা এই বিলের ‘উদ্দেশ্যই হচ্ছে ওয়াকফ আইনকে দুর্বল করে দেওয়া এবং ওয়াকফ সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত ও ধ্বংসের পথ প্রশস্ত করা’।
লোকসভায় দেওয়া বক্তব্যে কংগ্রেস নেতা গৌরব গগই বলেছেন, এই বিল ‘সংবিধানকে দুর্বল করবে, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মর্যাদাহানি করবে, ভারতীয় সমাজকে বিভক্ত করবে এবং সংখ্যালঘুদের তাদের অধিকার থেকে বঞ্চিত করবে’।
তবে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ এসব অভিযাগ উড়িয়ে দিয়ে বলেছেন, বিলের মাধ্যমে মুসলিম ভাইদের ধর্মীয় কার্যক্রম ও তাদের দান করা সম্পত্তিতে হস্তক্ষেপ করা হবে এমন বিভ্রম তৈরি করে বিরোধীরা সংখ্যালঘুদের আতঙ্কিত করতে চাইছে।
কী আছে সংশোধিত বিলে?
ওয়াকফ সম্পত্তির মধ্যে মসজিদ, মাদ্রাসা, আশ্রয় কেন্দ্রের পাশাপাশি মুসলিমদের দান করা হাজার হাজার একর জমি আছে। ওয়াকফ বোর্ড এসব সম্পত্তির দেখভাল করে।
এর মধ্য কিছু সম্পত্তি খালি পড়ে আছে, কিছু আবার আছে অন্যদের দখলে।
ইসলামিক রীতি অনুযায়ী, ওয়াকফ সম্পত্তি হলো মুসলিম সম্প্রদায়ের কল্যাণে মুসলমানদের দেওয়া দাতব্য বা ধর্মীয় দান। এসব সম্পত্তি বিক্রি করা যায় না, কিংবা অন্য উদ্দেশ্য ব্যবহারও করা যায় না।
ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার বলছে, ভারতে এখন সবচেয়ে বেশি জমির মালিক যারা, তাদের মধ্যে ওয়াকফ বোর্ডগুলো রয়েছে। তাদের হিসাবে ভারতজুড়ে অন্তত ৮ লাখ ৭২ হাজার ৩৫১টি ওয়াকফ সম্পত্তি রয়েছে, যার আওতায় আছে ৯ লাখ ৪০ হাজার একর জমি। সব ওয়াকফ সম্পত্তির আনুমানির মূল্য প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার কোটি রুপি।
নতুন সংশোধনীতে ওয়াকফ বোর্ডের গঠনতন্ত্র পরিবর্তন, অমুসলিমদের সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা, কোন সম্পত্তি ওয়াকফ বলে বিবেচিত হবে, কোনটা হবে না সরকারকে তা নির্ধারণের এখতিয়ার দেওয়ার কথাও বলা হয়েছে বলে জানিয়েছে বিবিসি।
তবে বৃহস্পতিবার লোকসভায় অমিত শাহ বলেছেন, সংশোধিত বিলে ওয়াকফ বোর্ডে কোনো অমুসলিম রাখার কথা বলা হয়নি।
“একজন মুসলিম তো চ্যারিটি কমিশনার হতেই পারেন। তাঁকে ট্রাস্ট দেখতে হবে না, আইন অনুযায়ী ট্রাস্ট কীভাবে চলবে, সেটা দেখতে হবে। এটা ধর্মের কাজ নয়। এটা প্রশাসনিক কাজ। সব ট্রাস্টের জন্য কি আলাদা আলাদা কমিশনার থাকবে? আপনারা তো দেশ ভাগ করে দিচ্ছেন। আমি মুসলিম ভাই-বোনদের স্পষ্টভাবে বলতে চাই, আপনাদের ওয়াকফ বোর্ডে কোনও অমুসলিম থাকবে না। এই আইনে এমন কিছু নেই,’’ কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বিরোধীদের সমালোচনার জবাবে এমনটাই বলেছেন বলে জানিয়েছে আনন্দবাজার।
