Tuesday, April 21, 2026
No menu items!

আমাদের মুসলিমউম্মাহ ডট নিউজে পরিবেশিত সংবাদ মূলত বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদের সমাহার। পরিবেশিত সংবাদের সত্যায়ন এই স্বল্প সময়ে পরিসরে সম্ভব নয় বিধায় আমরা সৌজন্যতার সাথে আহরিত সংবাদ সহ পত্রিকার নাম লিপিবদ্ধ করেছি। পরবর্তীতে যদি উক্ত সংবাদ সংশ্লিষ্ট কোন সংশোধন আমরা পাই তবে সত্যতার নিরিখে সংশোধনটা প্রকাশ করবো। সম্পাদক

Homeনিবন্ধতাদাব্বুরুল কুরআনিল কারীম

তাদাব্বুরুল কুরআনিল কারীম

ড. আব্দুর রহমান বিন ইবরাহীম আল-ফাওযান (প্রফেসর, কিং সউদ বিশ্ববিদ্যালয়, রিয়াদ, সৌদি আরব)

আল্লাহ তা‘আলা কুরআন কারীম অবতীর্ণ করেছেন যাতে আমরা এ কুরআন তেলাওয়াত করি এবং এ কুরআন নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করি। তাদাব্বুরুল কুরআন বা কুরআন নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করার অর্থ হচ্ছে, কুরআন বুঝা, কুরআনের অর্থ, উদ্দেশ্য এবং হুকুম-আহকাম অনুধাবন করার উদ্দেশ্যে কুরআন নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করা।
আল্লাহ তা‘লা কুরআন কারীমকে আরবী ভাষায় সহজ করে অবতীর্ণ করেছেন। আল্লাহ তা‘লা বলেন, “নিঃসন্দেহে আমি কুরআনকে আপনার ভাষায় সহজ করে দিয়েছি, যাতে তারা চিন্তা করে।” এ কারণেই আমরা দেখতে পাই, অনেক অনারব ছোট্ট ছোট্ট শিশু কুরআন কারীমকে খুব সহজেই অল্প সময়ে মুখস্থ করে ফেলে। কুরআন যদি কঠিন হতো, অল্প সময়ে ত্রিশ পারা কুরআন মুখস্থ করা কী সম্ভব হতো?

কুরআন তেলোয়াত খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। এর চেয়েও অধিক গুরুত্বপূর্ণ হলো, কুরআনের অর্থ বুঝা, কুরআনের আয়াত নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করা এবং সে অনুযায়ী জীবনকে সাজানো। তেলোয়াতের সময় মদ, গুন্নাহ, তারক্বীক, তাফখীম ইত্যাদি বিষয় যেমন বিবেচ্য, তদ্রুপ এ তেলোয়াত আপনার অন্তরকে বিগলিত করছে কীনা, কুরআনের বিধি-নিষেধ আপনার জীবনে প্রতিফলিত হচ্ছে কীনা সেই বিষয়টিও বিবেচ্য। কুরআনের আয়াতসমূহের তেলোয়াতের সাথে সাথে প্রয়োজন সঠিক অর্থ বুঝার চেষ্টা করা এবং কুরআন নিয়ে চিন্তা করা, যাতে আমাদের কাজে ও জীবনে এ কুরআনের প্রভাব আরো গভীর হয়।

কুরআন কারীমের জায়গায় জায়গায় আল্লাহা তা‘আলা কুরআন নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করার বিষয়টি উল্লেখ করেছেন। সূরা ছোয়াদের ২৯ নং আয়াতে আল্লাহ তা‘লা বলেন, “এটি একটি বরকতময় কিতাব, যা আমি আপনার প্রতি অবতীর্ণ করেছি। যাতে মানুষ এর আয়াতসমূহ নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করে এবং বুদ্ধিসম্পন্ন ব্যক্তিরা যেন তা থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে।” সূরা মুহাম্মদের ২৪ নং আয়াতে আল্লাহ তা‘লা বলেন, “তারা কি কুরআন নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করে না? নাকি তাদের অন্তর তালাবদ্ধ?” সূরা মুমিনূন ৬৮ নং আয়াতে বলেন, “অতএব তারা কি এ কালাম নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করেনা? না তাদের কাছে এমন কিছু এসেছে, যা তাদের পূর্বপুরুষদের কাছে আসেনি?” সূরা নিসার ৮২ নং আয়াতে বলেন, “ তারা কি কুরআন নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করেনা? এটা যদি আল্লাহ ব্যতীত আর কারো পক্ষ থেকে হত, তবে তারা এতে অনেক বৈপরিত্য দেখতে পেত?”
শওকানী (রহঃ) বলেন, “আয়াতসমূহে সুস্পষ্ট প্রমাণ বিদ্যমান, আল্লাহ তা‘আলা কুরআনকে অবতীর্ণ করেছেন কুরআন এবং এর অর্থ নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করার জন্য। তাদাব্বুর (গভীর চিন্তা) ব্যতীত তেলাওয়াতের জন্য নয়।”

ইমাম রাযি (রহঃ) বলেন, “যে ব্যক্তি কুরআন নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করে না, কুরআন নিয়ে চিন্তা করার তৌফিক যার হয়না, মহান এ কুরআনে উল্লেখিত সুন্দর রহস্য সম্পর্কে সে কখনো অবগত হতে পারে না।”
ইবনে সাদী (রহঃ) বলেন, “বান্দাহ কুরআন নিয়ে যত বেশী চিন্তা-ভাবনা করবে, তার জ্ঞান, প্রজ্ঞা এবং আমল তত বৃদ্ধি পাবে। এ কারণেই আল্লাহ তাআ‘লা কুরআন নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করতে আদেশ করেছেন এবং উদ্বুদ্ধ করেছেন। কুরআন অবতীর্ণ করার প্রধান উদ্দেশ্যই হলো কুরআন নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করা। আল্লাহর কিতাব নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করার বড় একটি উপকার হচ্ছে, এর মাধ্যমে বান্দাহ ইয়াকীন এর পর্যায়ে পৌঁছে যায়। তার মধ্যে দৃঢ় বিশ্বাস জন্মে এ কুরআন আল্লাহর বাণী। এর এক অংশ অপর অংশকে সত্যায়িত করে, এক অংশ অপর অংশের সম্পূর্ণ উপযুক্ত।”

ইবনে উসাইমিন (রহঃ) বলেন,“প্রথম আয়াতটি থেকে (সূরা ছোয়াদ এর ২৯ নং আয়াত) প্রমাণিত হয়, আল্লাহ তা‘লা কুরআন কারীম অবতীর্ণ করার হেকমত হলো, মানুষ এর আয়াতসমূহ নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করবে এবং শিক্ষা গ্রহণ করবে। তাদাব্বুরের অর্থ হচ্ছে, অর্থ বুঝার জন্য শব্দসমূহ নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করা। কুরআন নিয়ে চিন্তা-ভাবনা এবং গবেষণা যদি না হয় তাহলে কুরআন অবতীর্ণ করার হেকমতটিও ছুটে যাবে এবং কুরআন প্রভাবহীন শব্দভান্ডারে পরিণত হবে। কারণ কুরআনের অর্থ বুঝা ছাড়া কুরআন কারীম থেকে শিক্ষা গ্রহণ করা কোনভাবেই সম্ভব নয়। দ্বিতীয় আয়াতটি থেকে (সূরা মুহাম্মদের ২৪ নং আয়াত) প্রমাণিত হয়, আল্লাহ তা‘আলা ঐসকল লোককে তিরস্কার করছেন যারা কুরআন নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করেনা। তাদের অন্তরের দরজা যেন তালাবদ্ধ। কল্যাণকর কোন বিষয় যেন সে অন্তরে প্রবেশ করেনা।”
রাসুলুল্লাহ (সঃ) বলেন, “তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম ঐ ব্যক্তি যে নিজে কুরআন শিক্ষা করে এবং অপরকে শিক্ষা দেয়।” তিনি (সঃ) আরোও বলেন, “যে ব্যক্তি তিন দিনের কমে কুরআন পড়লো সে কিছুই বুঝল না”। অনেকে খুব তাড়াহুড়া করে, না বুঝে দুই দিনে, তিন দিনে কুরআন খতম করেন। এভাবে তাড়াহুড়া করলে যথাযথরুপে উপকৃত হওয়া যায়না। কুরআনের তেলোয়াত যখন ইলমের সাথে, চিন্তা-ভাবনার সাথে, আমলের সাথে ধারাবাহিকভাবে হবে, তখন যথাযথভাবে উপকৃত হওয়া সম্ভব হবে।
আমাদের পূর্ববর্তীরা কুরআনের আয়াত তেলাওয়াত শিক্ষা করার সাথে সাথে এর অর্থও শিখে নিতেন। এভাবে তারা যথাযথভাবে কুরআন অনুযায়ী আমল করতে পারতেন। কারণ যেটার অর্থ জানা যায় না সেটা অনুযায়ী আমল করা কোনভাবেই সম্ভব নয়। হযরত আব্দুর রহমান সালামী বলেন, আমাদেরকে যারা কুরআন শিক্ষা দিতেন যেমন উসমান বিন আফফান, আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ প্রমুখ সাহাবারা (রাঃ) বলতেন, আমরা যখন রাসুলুল্লাহ (সঃ) থেকে দশটি আয়াত শিক্ষা করতাম, তখন এ দশ আয়াতে যত জ্ঞান এবং আমল আছে তা শিক্ষা না করা পর্যন্ত সামনে এগুতাম না। এভাবেই আমরা কুরআন, ইলম এবং আমল একসাথে শিক্ষা করেছি।” স্তর বিন্যাসের দিকে তেলোয়াতের স্তর প্রথম। দ্বিতীয় স্তরে কুরআন বুঝা। তৃতীয় স্তরে হলো কুরআন নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করা। দ্বিতীয় স্তরে যারা দুর্বল থাকবে অর্থাৎ কুরআন বুঝবে না তাদের জন্য তাদাব্বুর কোনভাবেই সম্ভব নয়। কুরতুবী বলেন, “এখান থেকে প্রমাণিত হয়, কুরআনের অর্থ জানা ওয়াজিব”।

বর্তমান সময়ে মুসলিম উম্মাহর অবস্থা এতই দূর্বল হয়েছে যে তারা কুরআনের প্রতি যথাযথভাবে গুরুত্বারোপ করছে না। আবার, যারা গুরুত্ব দেন তাদের গুরুত্ব তেলাওয়াত এবং কুরআন হিফয করার মধ্যে সীমাবদ্ধ। তাদের কাছে কুরআনের অর্থ বুঝা, কুরআন নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করার গুরুত্ব একেবারেই নগন্য। ফলে কুরআন অনুযায়ী আমল হয়না, অথবা পরিপূর্ণরুপে আমল করা সম্ভব হয়না। “আল্লাহ তা‘আলা কুরআন অবতীর্ণ করেছেন। কুরআন নিয়ে তাদাব্বুর করতে তিনি আমাদেরকে আদেশ করেছেন। আল্লাহ তা‘আলা এ কুরআনকে হিফয (সংরক্ষণ) করার দায়িত্ব নিয়েছেন। আমরা ব্যস্ত হয়ে পড়েছি কুরআন হিফয করতে। আর ছেড়ে দিয়েছি কুরআন নিয়ে তাদাব্বুর করতে।” আমাদের উচিৎ আমাদের পূর্ববর্তী সালফে সালেহীনের পথ অনুসরণ করে কুরআনের তাজবীদ ও তেলাওয়াতের সাথে কুরআন বুঝা এবং কুরআন নিয়ে তাদাব্বুর করার প্রতিও গুরুত্ব আরোপ করা।

অনারবদের জন্য কুরআন কারীম নিয়ে তাদাব্বুর করা কীভাবে সম্ভব?
আমরা পূর্বেই জেনেছি, কুরআন কারীম নিয়ে গবেষণা করার তিনটি স্তর।

প্রথম স্তর: কুরআন তেলোয়াত।

দ্বিতীয় স্তর: কুরআনের অর্থ বুঝা।

তৃতীয় স্তর: কুরআন নিয়ে তাদাব্বুর করা চিন্তা-ভাবনা করা।

অধিকাংশ অনারব মুসলিম শুদ্ধরূপে কুরআন তেলাওয়াত করতে পারে। কিন্তু তারা যা তেলাওয়াত করে তা বুঝে না। অর্থ না বুঝার কারণে তাদের জন্য কুরআন নিয়ে তাদাব্বুর করা সম্ভব হয়না। ফলে দ্বিতীয় স্তরে কুরআনের অর্থ বুঝার জন্য তাদের সামনে দুটি পথ খোলা থাকে।

০১- কুরআন কারীমের অর্থের অনুবাদ থেকে নিজ ভাষায় কুরআনের অর্থ জানা।

০২- আরবী ভাষা শিক্ষা করে কুরআনের ভাষায় কুরআনের অর্থ জানা।
কুরআন কারীমের অর্থের অনুবাদ থেকে নিজ ভাষায় কুরআনের অর্থ জানা:

শায়খ ইবনে উসাইমিন (রহঃ) বলেন, অনেক আহলুল ইলমের বক্তব্য অনুসারে কুরআন কারীমের শাব্দিক অনুবাদ অসম্ভব। অনেকে বলেছেন, কিছু আয়াতে শাব্দিক অনুবাদ সম্ভব। কিন্তু এরপরো এভাবে শাব্দিক অনুবাদ করা নিষিদ্ধ যেহেতু এ ধরণের অনুবাদ দ্বারা যথাযথভাবে অর্থ আদায় করা সম্ভব হয়না, এবং অন্তরে সুস্পষ্ট কুরআনের প্রভাব প্রতিফলিত হয়না। কুরআনের অর্থের অনুবাদ করা যেহেতু সম্ভব তাই এ ধরণের শাব্দিক অনুবাদের কোন প্রয়োজনও নেই।”

বর্তমান সময়ে কুরআন কারীমের অর্থের অনেক অনুবাদ লাইব্রেরীগুলোতে স্থান পেয়েছে। এ অনুবাদগুলো এক প্রকারের তাফসীর গ্রন্থ। যারা এ ধরণের অনুবাদ থেকে কুরআনের অর্থ বুঝতে চেষ্টা করেন তারা প্রধানত কয়েকটি সমস্যার সম্মুখীন হন।

০১- আরবী এবং অনুবাদের ভাষায় সমানভাবে পারদর্শী ব্যক্তির দুষ্পাপ্র্যতা।

০২- এ ধরণের ব্যক্তি যদি পাওয়া যায়, তখন আরেকটি সমস্যা সামনে আসে। তা হলো, অনুবাদক আক্বীদা সংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয়ে অভিজ্ঞ নন।

০৩- অনুবাদ যারা পড়েন তারা মূল আরবী টেক্সট সম্পর্কে ধারণা না থাকার কারণে কোন ভুল বা বৈপরিত্য অনুভব করতে পারে না।

০৪- অনুবাদক তাফসীরের বিভিন্ন গ্রন্থ থেকে তাফসীরের উপাদান সংগ্রহ করেন। এক্ষেত্রে তিনি যদি কোন ভাল তাফসীর নির্বাচন করেন তাহলে তার অনুবাদ ভালো হবে। অন্যথায় বিপরীত হবে।

সারকথা হলো, কুরআনের অর্থকে যখন আরবী থেকে অন্য ভাষায় অনুবাদ করা হবে তখন তা অনুবাদের ভাষায় পরিপূর্ণরুপে স্থানান্তরিত করা সম্ভব না। কুরআনের অনুবাদ এর অলৌকিকতার এমন অনেক বৈশিষ্ট্যই হারিয়ে ফেলে যার মাধ্যমে আল্লাহ তা‘আলা আরব জাতি, মানুষ এবং জ্বীনকে চ্যলেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছেন। আল্লাহর নাযিলকৃত কুরআনে অন্তরে প্রভাববিস্তারকারী যে শৈলী রয়েছে অনুবাদ তার প্রভাব ধরে রাখতে পারে না। কুরআনের অনুবাদ করা হলে তা আর আল্লাহর কথা থাকে না। যার ফলে এটি তখন কুরআন থাকে না এবং এর তেলাওয়াতও ইবাদত হয়না।”

কুরআন কারীমে এমন অনেক শব্দ ও বর্ণনা রয়েছে যা অন্য কোন ভাষায় অনুবাদ করা সম্ভব না। আল্লাহ তা‘লা যখন চ্যলেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছিলেন তখন স্বয়ং আরবরাই আরবী ভাষাতে এ ধরণের শব্দ আনতে অপারগ হয়ে গিয়েছিল। তাহলে অন্য ভাষায় কীভাবে এর অনুবাদ সম্ভব?”
অন্যান্য ধর্মের ধর্মীয় গ্রন্থগুলো বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হওয়ার পরও ঐ ধর্মের অনুসারীদের কাছে অনুবাদগ্রন্থগুলো স্বীয় মর্যাদায় এবং আপন নামে বহাল থাকে। কিন্তু কুরআন কারীম, শব্দ এবং টেক্সট সহকারে কুরআন। যা অনূদিত হয় না এবং অনুবাদ করা সম্ভবও না। যদিও এর অর্থের অনুবাদ হয়, তবে সেটাকে কুরআন বলা যাবেনা। কারণ শুধু অর্থ ও চিন্তার নাম কুরআন নয়। বরং কুরআন হচ্ছে অর্থ, আল্লাহর পক্ষ থেকে নাযিলকৃত শব্দ, বর্ণনাশৈলী, গঠন এবং চিন্তাসহ সবকিছুর সমন্বয়। যদিও অমুসলিমরা তাদের পবিত্র কিতাবের অনুবাদ দিয়েও ইবাদত আদায় করে, কিন্তু ইসলামী শরীয়তে নামাযে কুরআনের আরবী তেলাওয়াত ব্যতীত অন্য কোন অনুবাদ পাঠ করা নিষিদ্ধ।”

অতএব যারা কুরআনের অর্থের অনুবাদ থেকে কুরআনের অর্থ জানার চেষ্ট করেন তাদের জ্ঞান অপূর্ণাঙ্গ এবং আংশিক। যারা এভাবে কুরআন নিয়ে তাদাব্বুর বা গভীর চিন্তা-ভাবনা করতে চান তাদের জন্য এটা অসম্ভব। ইবনে তাইমিয়া (রহঃ) বলেন, “যারা দ্বীনকে গ্রহণ করেছে, এ দ্বীন তাদের উপর আরবী ভাষা শিক্ষা করাকে বাধ্যতামূলক করে দেয়। কারণ আরবী ভাষা কুরআনের ভাষা এবং কুরআন বুঝার চাবিকাঠি।”

আরবী ভাষা শিক্ষা করে কুরআনের ভাষায় কুরআনের অর্থ জানা:

উপর্যুক্ত আলোচনা থেকে প্রমাণিত হয়, মাতৃভাষায় বা অন্য কোন ভাষায় কুরআনের অর্থের অনুবাদের মাধ্যমে যথাযথভাবে তাদাব্বুরুল কুরআন সম্ভব নয়। অতএব কুরআন নিয়ে তাদাব্বুর বা গভীরভাবে চিন্তা করতে হলে আরবী ভাষা শিক্ষা করে কুরআনের ভাষায় কুরআনকে বুঝতে হবে। এ পদ্ধতি অবলম্বন করলে দুটি উদ্দেশ্য একসাথে বাস্তবায়িত হবে- কুরআন শিক্ষা করা এবং আরবী ভাষা শিক্ষা করা। ইবনে তাইমিয়া (রহঃ) বলেন, “দ্বীনের অনেক বক্তব্য এবং কাজকে বুঝতে হয়। আরবী ভাষা বুঝার মাধ্যমে দ্বীনের বক্তব্যসমূহ বুঝা যায়, আর সুন্নাহ বুঝার মাধ্যমে দ্বীনের কাজসমূহ বুঝা যায়।” তিনি আরো বলেন, “যারা আরবী ভাষা শিখতে সক্ষম তাদের উচিৎ আরবী ভাষা শিক্ষা করা”।

ড. খালিদ বিন আব্দুল করিম লাহেম কুরআনের তাদাব্বুরের দশটি চাবিকাঠি উল্লেখ করেছেন। দ্বিতীয় চাবিকাঠি সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে তিনি বলেন, কুরআন তেলোয়াতের তিনটি উদ্দেশ্য। তিনটি উদ্দেশ্যই অর্থ বুঝা সংক্রান্ত। উদ্দেশ্যসমূহ হলো, জ্ঞান অর্জনের উদ্দেশ্যে কুরআন তেলোয়াত করা। আমলের উদ্দেশ্যে কুরআন তেলোয়াত করা। আল্লাহর সাথে সম্পর্ক স্থাপন বা কথা বলার উদ্দেশ্যে কুরআন তেলোয়াত করা। অষ্টম চাবিকাঠির বর্ণনায় এসেছে, কুরআনের শব্দসমূহের সাথে অর্থের সমন্বয়। আরবী ভাষার জ্ঞান ছাড়া এটা কোনভাবেই সম্ভব নয়।

যারা কুরআন কারীম বুঝতে চান, কুরআনের নিয়ে তাদাব্বুর করতে চান তাদেরকে আরবী ভাষা শিক্ষা দেওয়ার জন্য বিশেষ প্রোগ্রাম হাতে নেওয়া যেতে পারে। বিভিন্ন ইনিস্টিটিউট, এ্যরাবিক সেন্টারে আরবী ভাষা শিক্ষা দেওয়া হয়ে থাকে। বর্তমানে কুরআন তেলোয়াত এবং বুঝার উদ্দেশ্যে অর্থাৎ ধর্মীয় উদ্দেশ্যকে সামনে রেখেও আরবী ভাষা শিক্ষা করা যায়। এক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনাও হাতে নেওয়া যেতে পারে। আপনি আপনার বাচ্চার সাথে খুব ছোট থেকেই আরবীতে কথা বলতে পারেন। এতে তারা আরবীর সাথে পরিচিত হয়ে ওঠবে। ড. খালেদ বলেন, “সবচেয়ে উত্তম পদ্ধতি হচ্ছে, স্কুল বা মকতবে বাচ্চাদের সাথে আরবীতে কথা বলার অভ্যাস গড়ে তুলুন। শিশুরা এতে ভাষাটি সুন্দরভাবে আয়ত্ব করতে পারবে। ইসলাম এবং মুসলিমদের শিআরও এতে প্রতিফলিত হবে। মুসলিমদের জন্য তখন সহজ হবে কুরআন-সুন্নাহর অর্থ বুঝা। একটি ভাষা শিখে ফেলার পর অপর একটি ভাষা শিক্ষা করা অনেক কঠিন হয়ে পড়ে।”

অনারবদেরকে আরবী ভাষা শিক্ষা দেওয়ার অনেক বইয়ে কুরআনের আয়াত বা টেক্সট স্থান পায়না। এটা খুবই আশ্চর্যজনক। আরবী ভাষা শিক্ষা দেওয়ার ক্ষেত্রে কুরআনের টেক্সট খুব অল্প আনা, বা একেবারে না আনা, আরবী ভাষা শিক্ষা দেওয়ার যথোপোযুক্ত পদ্ধতি নয়। যারা এ ধরণের করেন তারা দলীল হিসেবে উপস্থাপন করেন, কুরআনের আরবী ক্লাসিক আরবী। অথবা তারা শিরোনাম দেন “ক্লাসিক আরবী”। তারা মডার্ণ আরবী থেকে কুরআনের আরবীকে ভিন্ন মনে করেন। তারা মূলত আরবী ভাষাকে ল্যটিন, গ্রীক ইত্যাদি ভাষার সাথে তুলনা করে এমনটি বলে থাকেন। অথচ কুরআনের আরবীর প্রায় পুরো অংশই মডার্ণ। কুরআনের আরবীকে মানুষ এখনও প্রাত্যহিক জীবনে শুনে থাকে, বইয়ে পড়ে থাকে এবং নিজেদের ভাষায় ব্যবহার করে থাকে।

তেলাওয়াত এবং তাদাব্বুরের উদ্দেশ্যে অনারবদেরকে আরবী শিক্ষা দেয়ার জন্য ভাষা শিক্ষা দান পদ্ধতির মৌলিক নিয়মসমূহ অনুসরণ করে প্রাথমিকভাবে একটি পরিকল্পনা করা সম্ভব। এক্ষেত্রে যতদূর সম্ভব উপাদান সংগ্রহ করতে হবে কুরআন থেকে। শিক্ষার্থীদের স্তর, পর্যায়ক্রমে সহজ থেকে কঠিন, ধারাবাহিকতা ইত্যাদি রক্ষা করতে হবে। এভাবে যদি করা যায় তাহলে ভাষা শিক্ষা এবং কুরআন শিক্ষা- দুটি উদ্দেশ্যই বাস্তবায়িত হবে।

প্রথমে শিখানো যেতে পারে কুরআনের ধ্বনিসমূহ। কুরআনের বিভিন্ন শব্দ এবং আয়াত থেকে ধ্বনিসমূহের উচ্চারণ শিখানো হবে। এরপর পর্যায়ক্রমে কুরআনের শব্দ এবং বাক্য। কুরআনের আয়াতসমূহ শ্রবণের উপরও গুরুত্বারোপ করতে হবে। তদ্রুপ পড়া এবং লেখার প্রতিও। সহজ থেকে কঠিন এর বিষয়টি বিবেচনায় রেখে কুরআনের বিভিন্ন কাহিনী থেকে শ্রবণ এবং পড়ার উপাদানসমূহ সংগ্রহ করা যেতে পারে। অথবা সহজ পদ্ধতিতে কুরআনের কাহিনীগুলো বর্ণনা করা যেতে পারে। এরপর শিক্ষার্থীর সামনে কুরআনের টেক্সটসমূহ উপস্থাপন করা যেতে পারে।

ভাষান্তর:
মুহাম্মদ শিহাব উদ্দীন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

one × 4 =

সবচেয়ে জনপ্রিয়

সাম্প্রতিক মন্তব্য