মূসা (আঃ) কি আল্লাহ্ কে দেখেছিলেন? আসুন আল-কুরআনের আয়াত থেকেই সেই ঘটনা জেনে নেওয়া যাক। সুরাতুল আ’রাফে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বর্ননা করেন,
উপরোক্ত আয়াত থেকে আমরা কি জানতে পারছি?
প্রথমত,
মূসা (আঃ) যখন আল্লাহ্ সুব্হানাহু ওয়া তা’আলাকে দেখতে চাইলেন, তখন তার জবাবে আল্লাহ্ সুব্হানাহু ওয়া-তা’আলা সুস্পষ্টভাবে মূসা (আঃ)-কে জানিয়ে দিলেন,
لَن تَرَانِي
“তুমি আমাকে দেখতে পাবে না”
আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার এই সুস্পষ্ট ওহীর বিষয়ে কারো যদি বিন্দুমাত্র সংশয় থাকে, তাহলে তাকে একথা স্মরণ করিয়ে দিতে হবে যে,
هَٰذَا هُدًى ۖ وَالَّذِينَ كَفَرُوا بِآيَاتِ رَبِّهِمْ لَهُمْ عَذَابٌ مِّن رِّجْزٍ أَلِيمٌ
এটা (আল-কুরআন) হচ্ছে হুদা (গাইড, পথ প্রদর্শক), আর যারা তাদের পালনকর্তার আয়াতসমূহ অস্বীকার করে, তাদের জন্যে রয়েছে কঠোর যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি। [সুরাতুল-জাসি-য়া ৪৫, আয়াত ১১]
দ্বিতীয়ত,
আয়াতের দ্বিতীয় অংশে আমরা দেখতে পাই, আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা মূসা (আঃ) এর তাক্ক্ওয়াকে সুপ্রতিষ্ঠিত করার জন্য একটা ছোট্ট আয়াত, একটা ছোট্ট নিদর্শন, একটা ছোট্ট কুদরত প্রদর্শন করলেন। তিঁনি মূসা (আঃ) কে বললেন, “কিন্তু তুমি পাহাড়ের দিকে তাকাও – ”
فَإِنِ اسْتَقَرَّ مَكَانَهُ فَسَوْفَ تَرَانِي
যদি সেটি স্বস্থানে দাঁড়িয়ে থাকে, তাহলে তুমিও আমাকে দেখতে পাবে।
এই ধরনের বাক্যকে আরবী ভাষায় বলা হয়, জুম্লাহ্ শর্তীয়া, ইংরেজীতে Conditional Sentence, আর বাংলায় শর্ত আরোপিত বাক্য। আল-কুরআনে তিন ধরনের জুমলাহ শর্তীয়া হতে পারে,
১) এক ধরনের জুমলাহ্ শর্তীয়া শুরু হয়,
হার্ফ্ আশ-শর্ত্ (Conditional Particle) إِذَا (ইজা-) দিয়ে। إِذَا দিয়ে শুরু হলে এই বাক্যের বক্তব্য এমন হয় যে, যা অবশ্যই ঘটবে অর্থাৎ যা বাস্তব হবে, যা মিথ্যা প্রতিপন্ন হবার কোন সম্ভাবনা নেই। যেমন,
إِذَا أُلْقُوا فِيهَا سَمِعُوا لَهَا شَهِيقًا وَهِيَ تَفُورُ
যখন তারা তথায় নিক্ষিপ্ত হবে, তখন তার উৎক্ষিপ্ত গর্জন শুনতে পাবে [সুরাতুল-মুল্ক্ ৬৭, আয়াত ৭]
উপরোক্ত আয়াতে শর্ত হচ্ছে “যখন” – إِذَا
যখন মানুষ জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হবে, তখন সেখানে তারা জাহান্নামের উৎক্ষিপ্ত গর্জন শুনতে পাবে। এই আয়াতের বক্তব্য মিথ্যা হবার কোন সম্ভাবনা নাই। অর্থাৎ এই ধরনের আয়াত সত্য বলে প্রতিপন্ন হবে।
২) আরেক ধরনের জুমলাহ শর্তীয়া শুরু হয়,
হার্ফ্ আশ-শর্ত্ (Conditional Particle) لَوْ (লাও) দিয়ে। لَوْ দিয়ে শুরু হলে এই বাক্যের বক্তব্য এমন হয় যে, যা ঘটার বা বাস্তবায়িত হবার কোন সম্ভাবনা নাই। যেমন,
وَقَالُوا لَوْ كُنَّا نَسْمَعُ أَوْ نَعْقِلُ مَا كُنَّا فِي أَصْحَابِ السَّعِيرِ
তারা আরও বলবেঃ যদি আমরা শুনতাম অথবা বুদ্ধি খাটাতাম, তবে আমরা জাহান্নামবাসীদের মধ্যে থাকতাম না। [সুরাতুল-মুল্ক্ ৬৭, আয়াত ১০]
উপরোক্ত আয়াতে শর্ত হচ্ছে “যদি” – لَوْ –
জাহান্নামের বাসিন্দারা বলবে – হায় আফসোস! যদি আমরা রাসুলদের কথা শুনতাম, আল্লাহ’র আয়াতকে বিশ্বাস করতাম, তাহলে আমাদের এই দূর্দশা হতো না। কিন্তু সেদিন দুনিয়াতে ফেরত আসার, রাসুলদের কথা শোনার, তওবা করার সুযোগ আর থাকবে না।
৩) তৃতীয় আরেক ধরনের জুমলাহ শর্তীয়া শুরু হয়,
হার্ফ্ আশ-শর্ত্ (Conditional Particle) إِنْ (ইন্) দিয়ে। إِنْ দিয়ে শুরু হলে এই বাক্যের বক্তব্য সত্য হবার অথবা মিথ্যা হবার সম্ভাবনা থাকে, তবে তা নির্ভর করবে বাক্যে আরোপিত শর্ত পূরনের উপর। যেমন,
فَإِنْ آمَنُوا بِمِثْلِ مَا آمَنتُم بِهِ فَقَدِ اهْتَدَوا ۖ وَّإِن تَوَلَّوْا فَإِنَّمَا هُمْ فِي شِقَاقٍ ۖ فَسَيَكْفِيكَهُمُ اللَّهُ ۚ وَهُوَ السَّمِيعُ الْعَلِيمُ
অতএব তারা যদি ঈমান আনে, তোমাদের ঈমান আনার মত, তবে তারা সুপথ পাবে। আর যদি মুখ ফিরিয়ে নেয়, তবে তারাই হঠকারিতায় রয়েছে। সুতরাং এখন তাদের জন্যে আপনার পক্ষ থেকে আল্লাহই যথেষ্ট। তিনিই শ্রবণকারী, মহাজ্ঞানী। [সুরাতুল-বা’ক্কারাহ্ ২, আয়াত ১৩৭]
উপরোক্ত আয়াতে শর্ত হচ্ছে “যদি” – إِنْ –
যদি তারা ঈমান আনে, তবে শর্ত হচ্ছে – সেই ঈমান হতে হবে মুমিনগণের ঈমানের মত, তাহলেই তারা সুপথ প্রাপ্ত হবে। এখানে সম্ভাবনা আছে, তারা সুপথ পেতেও পারে, আবার নাও পেতে পারে। অর্থাৎ সুপথ পাবে কি পাবে না, সেই বিষয়টা নির্ভর করছে বাক্যের শর্ত পূরন হবার উপরে। বাক্যের শর্ত পূরন হলে তারা সুপথ পাবে, নতুবা বাক্যের শর্ত পূরন না হবার কারনে তারা হঠকারিতায় পতিত হবে।
এবার আসুন দেখা যাক, সুরাতুল আ’রাফের ১৪৩ নং আয়াতটা পর্যালোচনা করা যাক। নীচের ٍSyntatic Tree Graphটি আয়াতটি পর্যালোচনা করতে সহায়তা করবে ইনশা-আল্লাহ।
উপরোক্ত আয়াতটি শুরু হয়েছে, হার্ফ্ আশ্-শর্ত্ “যদি” – إِنْ দিয়ে।
শর্ত ছিল – যদি পাহাড়টি স্বস্থানে দাঁড়িয়ে থাকে,
শর্তের ফলাফল হবে – তাহলে মূসা (আঃ) আল্লাহ্কে দেখতে পাবেন।
প্রশ্ন হচ্ছে,
পাহাড়টি কি স্বস্থানে দাঁড়িয়ে ছিল? উত্তরটি সবার জানা। কারন উপরোক্ত আয়াতেই বলা হয়েছে, পাহাড়টি স্বস্থানে দাঁড়িয়ে ছিল না। বরঞ্চ বিধ্বস্ত হয়ে গিয়েছিল। সুতরাং মূসা (আঃ) আল্লাহ্কে দেখেছেন এমন দাবী যারা করছেন, আল-কুরআনের ভাষাশৈলী, আল-কুরআনের বালাগ তাদের সে দাবীকে মোটেও সমর্থন করে না। বরঞ্চ এই আয়াতের সূক্ষ্ম পর্যালোচনা এটাই প্রমান করে যে, মূসা (আঃ) আল্লাহ্কে পার্থিব দৃষ্টি দিয়ে দেখতে পাননি। অতএব আবারো এটাই প্রমানিত হয় যে,
لَا تُدْرِكُهُ الْأَبْصَارُ وَهُوَ يُدْرِكُ الْأَبْصَارَ ۖ وَهُوَ اللَّطِيفُ الْخَبِيرُ
দৃষ্টিসমূহ তাঁকে প্রতক্ষ্য করতে পারে না, অবশ্য তিনি দৃষ্টিসমূহকে অনুধাবন করেন। তিনি অত্যন্ত সুক্ষদর্শী, সুবিজ্ঞ – [সুরাতুল আন’আম ৬, আয়াত ১০৩]
আর আয়াতের শেষাংশ থেকেও একথা সূস্পষ্ট প্রতীয়মান হয় যে, মূসা (আঃ) আল্লাহ্কে দেখতে পান নি।
وَخَرَّ مُوسَىٰ صَعِقًا ۚ فَلَمَّا أَفَاقَ قَالَ سُبْحَانَكَ تُبْتُ إِلَيْكَ وَأَنَا أَوَّلُ الْمُؤْمِنِينَ
এবং মূসা অজ্ঞান হয়ে পড়ে গেলেন। অতঃপর যখন তার জ্ঞান ফিরে এলো, তিনি বললেন, “পবিত্র তোমার সত্তা, তোমার দরবারে আমি তওবা করছি এবং আমিই সর্বপ্রথম বিশ্বাস স্থাপনকারী।
মূসা (আঃ) জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন, জ্ঞান ফিরে আসার পর মূসা (আঃ) আল্লাহ্র পবিত্রতা ঘোষনা করেন, আল্লাহ্র নিকট তওবা করেন এবং নিজের কওমের মানুষের মধ্যে সবার আগে তিনিই আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করেন। আল্লাহ্কে না দেখেই।
উপসংহার
মানুষের অজ্ঞতার সুযোগ নিয়ে ধর্ম-ব্যবসায়ী মানুষগুলো প্রতিনিয়ত তাদেরকে প্রতারিত করছেন। যে কারনে সাধারণ মানুষ দুনিয়া এবং আখেরাত উভয় জীবনেই চরম ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এই সব ধর্ম ব্যবসায়ী মানুষগুলো আর যাই হোক – কুরআনের বালাগ বিষয়ে ন্যূনতম জ্ঞান রাখে না।
না আপনি তাদের কাছ থেকে কিতাবুন-মূবীনের – সুস্পষ্টতা পাবেন,
না আপনি তাদের কাছে বালাগুল-মূবীনের – সুস্পষ্ট বালাগ পাবেন।
সুতরাং আপনাকেই ভাবতে হবে, ধর্মীয় অজ্ঞতার কারনে তরীকাপন্থিদের খপ্পরে পড়ে আর কতকাল নিজের ঈমান ও আমলকে ধুলিস্যাত করতে থাকবেন। সিদ্ধান্ত আপনার!
