ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় ইসরায়েলি বাহিনীর লাগাতার বোমা হামলায় ফের রক্তাক্ত হলো একটি দিন। নিহত হয়েছেন কমপক্ষে ৮১ জন ফিলিস্তিনি, যাদের মধ্যে রয়েছে শিশুও। আহত হয়েছেন চার শতাধিক। বাস্তুচ্যুতদের আশ্রয়স্থল, ঘুমন্ত পরিবার ও শিশুরা এসব হামলার প্রধান শিকার। আন্তর্জাতিক মহলে আবারও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে এই ‘বেসামরিক গণহত্যা’ নিয়ে।
শুক্রবার (২৮ জুন) সকাল থেকে শনিবার (২৯ জুন) দুপুর পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টার মধ্যে গাজার বিভিন্ন এলাকায় ইসরায়েলি বাহিনী ব্যাপক বোমাবর্ষণ করে। ফিলিস্তিনি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানায়, এসব হামলায় নিহতদের অধিকাংশই নারী ও শিশু। এমনকি যেসব এলাকা ছিল শুধু বাস্তুচ্যুতদের আশ্রয়ের জন্য নির্ধারিত—সেসবও লক্ষ্যবস্তু হয়েছে। প্রতিরোধ আন্দোলন হামাসের ওপর দমন-পীড়নের অংশ হিসেবে ইসরায়েল এই হামলা চালিয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে, তবে প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, এসব এলাকায় কোনো ধরনের সন্ত্রাসী তৎপরতা ছিল না।
গাজা শহরের একটি স্টেডিয়ামের কাছে একটি বোমা হামলায় কমপক্ষে ১১ জন নিহত হন। ওই স্টেডিয়ামটি আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছিল, যেখানে তাঁবুতে বাস করছিলেন বাস্তুচ্যুত পরিবারগুলো। হামলার সময় শিশুরাও উপস্থিত ছিল।
বিবিসি যাচাইকৃত ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, আতঙ্কিত মানুষ কোদাল ও খালি হাতে বালুর নিচে চাপা পড়া মরদেহ খুঁড়ে বের করছেন। স্থানীয় বাসিন্দা আহমেদ কিশাউই রয়টার্সকে বলেন, “এখানে কোনো যোদ্ধা ছিল না। পুরো এলাকা ছিল সাধারণ মানুষ ও শিশুতে পরিপূর্ণ। এখন সব তাঁবু বালুর নিচে চাপা পড়ে আছে।”
এছাড়া গাজার দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় আল-মাওয়াসি এলাকায় একটি অ্যাপার্টমেন্ট ব্লক ও আশ্রয়কেন্দ্র লক্ষ্য করে চালানো হামলায় নিহত হন আরও ১৪ জন, যাদের মধ্যে ছিল তিনটি শিশু এবং তাদের বাবা-মা। এই পরিবারটি ঘুমের মধ্যে নিহত হয়। শিশুদের দাদি সুয়াদ আবু তেইমা বলেন, “এই শিশুরা কী অপরাধ করেছিল? কেন ওদের এভাবে হত্যা করা হলো?”
শনিবার বিকেলে গাজার তুফফাহ মহল্লায়, জাফা স্কুলের কাছে আরও এক বিমান হামলা চালানো হয়, যেখানে আশ্রয় নিয়েছিল শত শত গাজাবাসী। এখানে নিহত হয়েছেন অন্তত আটজন, যাদের মধ্যে পাঁচজন শিশু। প্রত্যক্ষদর্শী মোহাম্মদ হাবুব বলেন, “এই হামলায় আমার ভাগ্নে, বাবা এবং আমাদের প্রতিবেশীদের সন্তানরা নিহত হয়েছে। আমরা তো সাধারণ মানুষ, আমরা ওদের কী ক্ষতি করেছি?”
ফিলিস্তিনি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যানুযায়ী, ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে ধ্বংসস্তূপ, বন্ধ সড়ক এবং গোলাবর্ষণের কারণে অ্যাম্বুলেন্স ও সিভিল ডিফেন্স কর্মীরা অনেক জায়গায় পৌঁছাতে পারছেন না। ফলে আরও অনেকে ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে থাকতে পারেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এই হামলার মধ্যেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন, আগামী সপ্তাহেই একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তি সম্পন্ন হতে পারে।
গত মার্চে ইসরায়েলের নতুন হামলার মধ্য দিয়ে ভেঙে পড়ে আগের যুদ্ধবিরতি। ১৯ জানুয়ারি থেকে শুরু হওয়া ওই চুক্তিটি তিনটি ধাপে বিভক্ত থাকলেও, প্রথম ধাপের পর আর অগ্রগতি হয়নি। দ্বিতীয় ধাপে ছিল—ইসরায়েলি বাহিনীর গাজা থেকে সম্পূর্ণ প্রত্যাহার, গাজায় থাকা ইসরায়েলি জিম্মিদের মুক্তি এবং বিনিময়ে ফিলিস্তিনি বন্দিদের মুক্তি।
হামাসের এক ঊর্ধ্বতন নেতা বিবিসিকে জানান, মধ্যস্থতাকারীরা নতুন যুদ্ধবিরতি ও জিম্মি মুক্তির জন্য চেষ্টা চালালেও ইসরায়েলের পক্ষ থেকে আলোচনা অগ্রসর হচ্ছে না।
এদিকে, শনিবার সন্ধ্যায় তেল আবিবে একটি সমাবেশে অংশ নেয় জিম্মি পরিবারগুলো। তারা যুদ্ধের অবসান ঘটিয়ে, এক দফায় সবাইকে ফিরিয়ে আনার দাবি জানান। আয়োজকদের বক্তব্য ছিল, “যুদ্ধ আর নয়—এবার সবাইকে বাড়ি ফেরানোর সময়।” তথ্যসূত্র : বিবিসি
