জীবন পথে বিবাহ একটি পবিত্র মিলন, যেন দুটি আত্মার সেতুবন্ধন, যা আল্লাহ তা’আলার রহমতে সুখ ও শান্তির পথে নিয়ে যায়। ইসলামে বিবাহ এতটাই সরল যে তা কেবল দুজনের সম্মতি, সাক্ষী ও মহরের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়।
কিন্তু আমাদের সমাজ যেন এই সরল পথকে কাঁটায় কাঁটায় জটিল করে তুলেছে। কনভেনশন হলের ঝলমলে আলো, ধন-সম্পদের প্রদর্শনী, গাড়ির শোভাযাত্রা আর শত শত অতিথির ভিড়ে বিবাহের পবিত্রতা প্রায় হারিয়ে গেছে।
আরও দুঃখের বিষয় হচ্ছে, এই জটিলতার কারণে অধিকাংশ যুবক-যুবতীরা হতাশার অন্ধকারে পা বাড়ায়, জিনার মতো পাপের পথে চলে যায়। তাই আজ আমরা একটি প্রশ্নের মুখোমুখি: কেন আমরা বিবাহকে কঠিন করে তুলছি আর অভিযোগ করছি আমাদের সন্তানদের ভুল পথে চলার?
কল্পনা করুন একটি শান্ত গ্রামের বাড়ি। আব্দুল্লাহ নামের এক যুবক যেনা থেকে বেঁচে থাকতে ও সুন্দর জীবন সাজাতে বিয়ে করতে চায়। তার হৃদয়ে যেমন ভালোবাসার ফুল ফুটেছে, তেমনি মনের ভিতর জমছে সমাজের ভয়।
“বড় হল না হলে লোকে কী বলবে?” “৩-৫ শতাধিক অতিথি ছাড়া ওয়ালিমা কীভাবে হবে?” “লক্ষ টাকার লোক দেখানো মহর না ধরলে মেয়ের পরিবার কি মেনে নিবে?” এই হিসাব কষলে বিবাহের খরচ প্রায় ৫-৭ লক্ষ টাকায় পৌঁছে যায়।
আব্দুল্লাহর সামান্য আয়, তাই তার মনের জমতে থাকা ভালোবাসা এখনেই ইতি টানে। আপাতত বিবাহের চিন্তা স্থগিত। হতাশা তাকে গ্রাস করে আর কোন এক নির্জন সন্ধ্যায় সে শয়তানের ধোঁকায় অনাকাঙ্ক্ষিত প্রেমের ফাঁদে পা বাড়ায় আর বুঁদ হয়ে থাকে পর্ণের মায়াজালে।
এই গল্প আমাদের সমাজের একটি প্রতিচ্ছবি, যেখানে অভিভাবক ও সমাজের অতিরিক্ত আকাঙ্ক্ষা সন্তানের জীবনকে অন্ধকারে ঠেলে দেয়।
ইসলামে বিবাহের সৌন্দর্য তার সরলতায়। নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও সাহাবী রাদিয়াল্লাহু আনহুমদের জীবন থেকে আমরা দেখি, তারা কত সরলভাবে বিবাহ সম্পন্ন করেছিলেন। কোনো কনভেনশন হল ছিল না, কোনো জমকালোক হলদি বা মেহেন্দি নাইট আয়োজন ছিল না। ছিল না শত শত লোকের লোক দেখানো খাওয়ার আয়োজন।
তবু সেই বিবাহ ছিল পবিত্র, সুখময়।
কিন্তু আজ আমরা বিবাহে নানান কুসংস্কার ও বিদ’আতের নামে নতুন নতুন রীতি চালু করেছি। ফর্দ, গায়ে হলুদ, বউ ভাত, জামাই ভাত, হিরানি, উপহার লেনদেন, হানিমুন ইত্যাদির আয়োজনে আজ বিবাহের সরলতাকে জটিল করে ফেলেছে। এগুলো ইসলামের শিক্ষার সঙ্গে সাংঘর্ষিক, কারণ এসব জমকালো আয়োজনের কোনো ভিত্তি নেই আমাদের দ্বীনে। এ যেন এমন একটি বাগান, যেখানে অপরিচিত ফুল ঢুকে সত্যিকারের ফুলের সুবাস নষ্ট করে দিয়েছে।
জীবনের পথে দুটি দরজা: একটি বিবাহের, যা সমাজের লোহার তালায় আবদ্ধ; অন্যটি জিনার, যা খোলা আকাশের মতো সহজলভ্য। বর্তমানে জিনার জন্য কেবল একটি নির্জন কোণ , কোনো হল কিংবা কোনো ধন-সম্পদের প্রয়োজন নেই। একটু ইন্টারনেট কানেকশন, সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করতে পারলেই যথেষ্ট। এছাড়া গভীর রজনীতে রাস্তার পাশ কিংবা পতিতালয় তো সব সময় খোলা।
সম্মানিত অভিভাবক, বিবাহকে সরল করুন। বিলাসবহুল বিবাহ এবং ওয়ালিমার চাপ দিয়ে আপনার সন্তানদের জীবনকে কঠিন করে তুলবেন না। তাদের জেনার পথে যেতে বাধ্য করবেন না।
আর ওয়ালিমা ইসলামের অংশ, কিন্তু তা সাধ্যের মধ্যে, সরলভাবে। নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, ওয়ালিমায় মানুষকে খাওয়াতে বলেছে, কিন্তু তা ছিল সাধারণ, হৃদয়ের উষ্ণতায় পূর্ণ। লোক দেখানো কনভেনশন হলে লক্ষ টাকা খরচ করে শত শত মানুষকে খাওয়তে বলে নি।
আমরা কেন তবে বিলাসিতার পিছনে ছুটি? কেন আমাদের সন্তানদের জীবনকে কঠিন করে তুলি? এই প্রশ্নগুলো আমাদের অভিভাবকদের হৃদয়ে জাগ্রত হোক। বিবাহ হলো দুই আত্মার মিলন, এটি সমাজের বাজারে কোন প্রদর্শনী নয়।
সব শেষে বলব, জীবন একটি নদীর মত, যা সরল পথে প্রবাহিত হওয়ার জন্য সৃষ্ট। আমরা সেই পথে বাঁধ দিয়ে, জটিলতার পাথর ফেলে স্রোতকে আটকে দিচ্ছি। আসুন, বিবাহকে সরল করি, কুসংস্কার ও বিদ’আহ থেকে মুক্ত করি। আমাদের সন্তানদের জীবন যেন পবিত্র থাকে, সুখে ভরে উঠে এই দু’আ করি। আল্লাহ আমাদের সঠিক পথে চলার তৌফিক দিন।
