আরবী ‘ইমাম’ শব্দের অর্থ নেতা। আর এর ইংরেজি প্রতিশব্দ হলো Leader. ইংরেজি একটি প্রবাদ বাক্যে Leader. বা নেতা সম্পর্কে বলা হয়েছে, He is the Leader, Who knows the way, who go’s the way and who show’s the way. অর্থাৎ ‘যিনি সঠিক পথ সম্পর্কে জানেন, সেই পথে চলেন এবং মানুষকে পথ দেখান তিনিই নেতা।’ অর্থাৎ নেতাকে জানতে হবে জীবন চলার সঠিক পথ সম্পর্কে; শুধু জানলেই হবে না বরং তাঁকে অনুসরণ করতে হবে সেই পথ এবং একইসাথে তিনি অনুসারীদেরকে সেই সঠিক পথে পরিচালিত করবেন।
মুসলিম মিল্লাতের পিতা ইব্রাহীম (আঃ)
পবিত্র কালামে পাকের সূরা বাকারা-এর আয়াত-১১২, সূরা মুমিনিন-এর আয়াত-০১, সূরা আহযাব-এর আয়াত-২২ তে একজন ইমামের যোগ্যতা সম্পর্কে ধারণা দেয়া হয়েছে। সে অনুযায়ী পর্যায়ক্রমে একজন ইমামের যে সকল যোগ্যতা থাকা আবশ্যক তা হলোঃ
১. মুসলমান হওয়া;
২. আলেম হওয়া; অর্থাৎ দ্বীনী ইল্ম বা শরিয়াতের পরিপূর্ণ জ্ঞান থাকতে হবে;
৩. বালিগ হওয়া;
৪. সুস্থ্য ও স্বাভাবিক হওয়া:
৫. পুরুষ হওয়া;
৬. স্বাধীন হওয়া;
৭. বিভিন্ন প্রকার ওযর ও অসুবিধামুক্ত হওয়া।
ইমাম প্রধানতঃ আলেম বা দ্বীনী জ্ঞানসম্পন্ন ব্যক্তিগণই হয়ে থাকেন। সে হিসেবে তাঁরা ‘ওয়ারাসাতুল আম্বিয়া’ অর্থাৎ নবী-রসূলগণের ওয়ারিশ। নবী-রসূলগণ কোন বৈষয়িক সম্পত্তি রেখে যাননি। তাঁরা রেখে গেছেন মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের পক্ষ থেকে প্রাপ্ত জ্ঞান ও তার আলোকে পরিচালিতব্য মিশন। বিদায় হজ্বের ঐতিহাসিক ভাষণে এ প্রসঙ্গে তিনি পরিস্কারভাবে জানিয়ে দেন যে, তিনি আল্লাহর কুরআন ও তাঁর হাদীস রেখে যাচ্ছেন, যা পরবর্তীতে মানুষকে সঠিক পথে পরিচালনা করবে। সুতরাং যারা এ দুটো জিনিসকে আঁকড়ে ধরবে তারাই সফল হবে। এর ব্যতিক্রম হলে মানুষের জন্য দুনিয়া ও আখিরাতে সাফল্য লাভ করা সম্ভব হবে না। ওয়ারাসাতুল আম্বিয়া হিসেবে মহানবী (স.) প্রদত্ত সেই দায়িত্ব আঞ্জাম দিবেন বর্তমান আলেম সমাজ; বিশেষ করে দেশের মসজিদে নিয়োজিত সম্মানিত ইমামগণ এটাই ইসলামের দাবি। যুগ যুগ ধরে দেশের আলেম সমাজের ওপর অর্পিত রয়েছে এই দ্বীনী দায়িত্ব।
ইমাম সমাজ সে দায়িত্ব পালন করছেন না তা নয়। কিন্তু সু-সমন্বিতভাবে ও সঠিক উপায়ে ইমামতির দায়িত্ব পালনে তাঁরা সক্ষম হলে এ সমাজ তথা দেশের চিত্র পাল্টে যেতে বেশি সময়ের প্রয়োজন হবে না। আর একারণেই দেশের উন্নয়নে তাঁদেরকে সম্পৃক্ত করার প্রশ্নটি বিভিন্ন মহল থেকে বেশ গুরুত্বের সাথে উচ্চারিত হচ্ছে। ইমামগণ কি আসলের দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে কোন অবদান রাখছেন? বা তাঁরা কি তা রাখতে সক্ষম এই প্রশ্নের জবাব খুঁজতে গভীর গবেষণার প্রয়োজন। তেমন কোন গভীর গবেষণার অভাবে ইমামদের কর্মকান্ড সমাজ তথা জাতির সামনে অনেকটা অলক্ষেই রয়ে গেছে। দেশের ইমাম সমাজের কর্মকান্ড ও তাঁদের সমস্যা ও সমাধানের উপায় সম্পর্কে আলোকপাত করলে প্রকৃত চিত্র সামনে চলে আসবে।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার ২০০৬ সালের ৩০ নভেম্বর ‘মসজিদ ব্যবস্থাপনা নীতিমালা’ নামে একটি প্রজ্ঞাপন জারী করে। ওই প্রজ্ঞাপনে একজন ইমামের দায়িত্ব-কর্তব্য কি হবে সে সম্পর্কে এর ২৪(৩)(ক) উপ-অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে- ইমাম-
(অ) মসজিদের আমানতদার হিসেবে কাজ করিবেন;
(আ) মসজিদের সাধারণ মুসুল্লী ও এলাকাবাসীর শিক্ষা, স্বাস্থ্য, স্বভাব, চরিত্র, আমল আখলাক উন্নয়নে সাধ্যানুযায়ী অবদান রাখিবেন;
এখানে উপ-অনুচ্ছেদ (অ)-তে ‘মসজিদের আমানতদার হিসেবে কাজ করবেন’ বলতে ধর্মীয় দৃষ্টিতে একজন ইমামের যে দায়িত্ব রয়েছে তা নিষ্ঠার সাথে পালনের দিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে, আর উপ-অনুচ্ছেদ (অ)-তে তাঁর সামাজিক দায়-দায়িত্বের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। ধর্মীয় ও রাষ্ট্র কর্তৃক প্রদত্ত এসকল দায়িত্বের দিকে দৃষ্টিপাত করলে বোঝা যায় ইমাম শুধুমাত্র নামায পড়ানোর মধ্যেই তার দায়িত্ব সীমাবদ্ধ রাখবেন না; বরং তাকে সামাজিক নেতৃত্বের আসলে আসীন হয়ে দায়িত্ব পালন করতে হবে।
সর্বোচ্চ ইমাম পর্ষদের অবকাঠামো
১) ইউনিয়ন পর্যায়েঃ ইউনিয়ন পর্যায়ে সমস্ত মাসজিদের ইমামদের নিয়ে একটা পর্ষদ গঠিত হবে, যেখানে শুধুমাত্র ওয়ার্ড ভিত্তিক একজন ইউনিয়ন পর্যায়ে কণ্ঠ ভোটে ইমাম নির্বাচিত হবেন যিনি উপজিলা পর্যায়ের ইমামকে নির্বাচিত করবেন। ৪,৫৭১ টি ইউনিয়ন থেকে ৪৫৭১ জন ইমাম উপজিলা ইমাম নির্বাচন করবেন।
২) উপজিলা পর্যায়েঃ প্রত্যেক ইউনিয়ন ইমাম কণ্ঠভোটে একজন উপজিলা ইমাম নির্বাচিত করবেন। উপজিলা ইমাম জেলা ইমামকে নির্বাচিত করবেন। ৪৯৫ জন উপজিলা ইমাম নির্বাচিত হবেন।
৩) জেলা পর্যায়েঃ প্রত্যেক উপজিলা ইমাম কণ্ঠ ভোটে জেলা পর্যায়ের ইমাম নির্বাচিত করবেন। জেলা ইমাম বিভাগ পর্যায়ের ইমাম নির্বাচিত করবেন। ৬৪ জন ইমাম জেলা পর্যায়ে নির্বাচিত হবেন।
৪) বিভাগ পর্যায়েঃ জেলা ইমাম কণ্ঠ ভোটে বিভাগ পর্যায়ের ইমাম নির্বাচিত করবেন, প্রত্যেক বিভাগ থেকে একজন নির্বাচিত ইমাম দেশ পর্যায়ে তার কর্ম সম্পাদিত করবেন। ৮ জন ইমাম এই পর্যায়ে নির্বাচিত হবেন।
৫) দেশ পর্যায়েঃ রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে তারা ইসলামের মুল ভাবধারা তুলে ধরবেন, এবং তা বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় কর্ম সম্পাদন করবেন। এই ৮ জনের সাথে বাড়তি ১ জন অনির্বাচিত প্রতিনিধি থাকবেন যিনি বিশেষত যে কোন মতের পক্ষে তার মূল্যবান ভোটাধিকার প্রয়োগ করে উদ্ধৃত বিষয়ের সুরাহা টানবেন।
