২০১৬ সালের ১৫ জুলাই তুরস্কে সংঘটিত সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে এরদোগানকে উৎখাত করার চেষ্টা বিফলে যাওয়ার পরপরই এরদোগান তার এই অভ্যুত্থানের জন্য অভিযুক্ত ফেতুল্লাহ গুলেনের দলের সামরিক-বেসামরিক সদস্য, কর্মী, সমর্থক, সিম্প্যাথাইজার সহ সমস্ত পর্যায়ে ব্যাপক ক্র্যাকডাউন শুরু করে।
ঘটনার প্রথম কিছুদিনের মধ্যেই গণগ্রেপ্তারে ৪০,০০০ লোককে গ্রেপ্তার করা হয়, এর মধ্যে ১০,০০০ সৈনিক এবং প্রায় ৩ হাজার ছিল বিচারক। শিক্ষাখাতে কর্মরত ১৫,০০০ কর্মী এবং ২১,০০০ শিক্ষককে চাকরিচ্যুত করা হয় এই অভিযোগে যে তারা গুলেনপন্থী। সামরিক ও সিভিল মিলিয়ে ১ লাখ ৬০ হাজার জনকে চাকরিচ্যুত করা হয়, ৫ লাখের ওপর লোককে বন্দী করা হয়, বিচারের মুখোমুখি হতে হয় ৩০ লাখ লোককে। জেনারেল, অফিসার পদমর্যাদাধারী, সৈনিক সহ পরবর্তী বছরগুলোতে সামরিক বাহিনীর ২০ হাজার জন বরখাস্ত হয়। হাজারের ওপর স্কুল, ১২০০+/চ্যারিটি সংস্থা, ১৫টি বিশ্ববিদ্যালয় আর ৩৫টি হাসপাতাল বন্ধ করে দেওয়া হয় এই অভ্যুত্থানের সাথে জড়িত থাকার অভিযোগে।
উইকিপিডিয়ায় প্রায় সবগুলো তথ্য আছে। বলা বাহূল্য, এত মানুষ এই কাজে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবেও জড়িত ছিল না, নিশ্চিতভাবেই এখানে প্রচুর মানুষের ওপর জুলুম হয়েছে। স্রেফ এই ধরণের ঘটনা যেন আবার না ঘটে এবং নিজের ক্ষমতাকে সুসংহত করার জন্য এত পরিমাণ মানুষ মামলা, গ্রেপ্তার, সাজা ও চাকরিচ্যুতির শিকার হয়েছে এরদোগান সরকারের হাতে।
এবার বাংলাদেশের কথা চিন্তা করেন। বাংলাদেশের জনসংখ্যা তুরস্কের দ্বিগুণ। ষোলো বছর ধরে পুরো রাষ্ট্র কাঠামোকে খুনীলীগ পুরোপুরি আয়ত্ব করে একটা মাফিয়া রাষ্ট্রে পরিণত করেছিল। প্রশাসনের সমস্ত স্তরে নিজেদের লোক দিয়ে ভরে ফেলেছিল। নিরাপত্তা বাহিনীতে নিজেদের লোক দিয়ে হেন অপকর্ম, অপরাধ আর সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড তারা বাকি রাখে নি। গোয়েন্দা সংস্থার প্রত্যক্ষ পরিচালনায় হাজার হাজার মানুষকে গুম, ক্রসফায়ার আর জেলে পচানো হত। প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয় সারির মিডিয়াগুলো ফ্যাশিবাদি বয়ান নির্মাণ করতো আর বিরোধীপক্ষকে হত্যা-জুলুম-নিপীড়নের পক্ষে কনসেন্ট ম্যানুফ্যাকচার করতো। বড় ব্যবসায়ীদের একটা পুরো সময় ধরে লীগকে সর্বান্তভাবে সমর্থন দিয়ে গেছে ও সুবিধা আদায় করে নিয়েছে সেটা বলা বাহূল্য।
এরকম একটা ভয়ানক ত্রাস আর নিপীড়ণের রাজ্যের সরকার যখন পতন হল, তখন স্রেফ ভেবে দেখেন, তুরস্কের সাড়ে আট হাজার সৈনিকের অভ্যুত্থান চেষ্টার জবাবে যদি এরদোগান সরকার উপরোল্লিখিত এক্সট্রিম থেকেও এক্সট্রিম পদক্ষেপ নেয়, তাহলে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ইউনুস সরকার একদম নিদেনপক্ষে, রয়ে-সয়ে, ছাড় দিয়ে লীগের রেখে যাওয়া কাঠামোয় কী পরিমাণ কঠোর অভিযান চালানো প্রয়োজন ছিল? কত লাখ মানুষকে গ্রেপ্তার, চাকরিচ্যুত বা বিচারের মুখোমুখি করা দরকার ছিল?
যা করার দরকার ছিল তার ০.০১% ও অথর্ব ইউনুস ও অথর্ব উপদেষ্টারা করে নি। তারা ব্যস্ত ছিল কিছু এনজিও টাইপের কাজ করে নিজেদের পোর্টফোলিও ভারি করে পরবর্তীতে আরো কিছু কাজ বাগিয়ে নেওয়া সহজ হয়। এনজিওগ্রস্ত ছোটোলোকের থেকে এর চাইতে বেশি অ্যাসপিরেশন আশাও করা যায় না।
শুধু উপদেষ্টাদের দোষ দিলেও ফেয়ার হয় না।
এতকাল যারা ফ্যাশিবাদের বিরুদ্ধে বিরাট বিরাট আলাপ করতো, তারা লম্বা লম্বা রচনা লিখে দাবি করা শুরু করলো পুলিশের বিচার করা হলে ওরা গাল ফুলিয়ে কাঁদবে, তখন দেশের কী হবে? আর্মির বিচার করা হলে ওরা খুব রাগ করবে, প্রতিষ্ঠানের ইন্টেগ্রিটি নষ্ট হবে, আহা-উহু-আহা! গোয়েন্দা সংস্থার বিচার করা হলে আমাদেরকে আদর করে কে দেখে রাখবে? ওখানে হাত দেওয়ার দরকার নেই। বুরোক্রেসির শুয়োরগুলোকে চাকরিচ্যুত করলে দেশ অচল হয়ে যাবে, ওরা বরং থাকুক।
এই ছাগলগুলো চিন্তা করে দেখে নাই একটা প্রতিষ্ঠানের ব্যাড অ্যাক্টরগুলোকে তাড়িয়ে দিয়ে অর্ধেক করে ফেললেও সেই প্রতিষ্ঠানটা ক্রিমিনালদের খপ্পড় থেকে বের হয়ে আসতে পারলে সেটার ইন্টেগ্রিটি রিবিল্ড হয়, আস্থা ও বিশ্বাসের জায়গা তৈরি হয়, সঠিক পথে কার্যক্ষমতা বাড়ে। তুরস্ক থেকে যে এত লাখ লোকের চাকরি খেয়ে দিল, ওরা কি অচল হয়ে গেছে?
এই সব নটাংকিপনা করে আমাদের তথাকথিত সুশীল বুদ্ধিজীবী, অ্যাক্টিভিস্ট আর জাতির নতুন বিবেকরা জুলাই এর গণঅভ্যুত্থানকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে এসেছে। জিকির করেছে দুটো — নির্বাচন আর সংস্কার। অথচ কাজ ছিল তিনটা — দমন, বিচার, শাস্তি।
আজকে ফ্যাশিবাদের অক্ষত কাঠামো পুরোমাত্রায় সচল, শুধু অপেক্ষা নির্বাচনের, কাঙ্ক্ষিত দলটা সরকারে এলেই, ফ্যাশিবাদ ২.০ এর বন্দোবস্ত পাকাপোক্ত হবে।
