ইরানের আকাশচুম্বী মূল্যস্ফীতি এবং মুদ্রার রেকর্ড দরপতনের প্রতিবাদে শুরু হওয়া বিক্ষোভ দশম দিনে গড়িয়েছে। রাজধানী তেহরানসহ দেশটির অন্তত ৮৮টি শহরে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। মার্কিন এক মানবাধিকার সংস্থার বরাত দিয়ে ইরানের বামপন্থী মিডিয়া ইরান ইন্টারন্যাশনাল জানায় নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে এখন পর্যন্ত অন্তত ৩৬ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং ১,২০০-এর বেশি বিক্ষোভকারীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
গত ২৮ ডিসেম্বর তেহরানের গ্র্যান্ড বাজারে ব্যবসায়ীদের ধর্মঘটের মধ্য দিয়ে এই আন্দোলনের সূত্রপাত হয়। রিয়ালের মান কমে যাওয়া এবং জীবনযাত্রার ব্যয় অসহনীয় পর্যায়ে চলে যাওয়ায় সাধারণ মানুষ রাস্তায় নেমে আসেন। মঙ্গলবার তেহরানের গ্র্যান্ড বাজারে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের ব্যাপক সংঘর্ষ হয়, যেখানে পুলিশ টিয়ার গ্যাস নিক্ষেপ করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করে। হিউম্যান রাইটস অ্যাক্টিভিস্ট নিউজ এজেন্সি (HRANA)-এর তথ্যমতে, বিক্ষোভ এখন দেশটির ২৫৭টি স্থানে ছড়িয়ে পড়েছে।
পরিস্থিতি আরও জটিল হওয়ার আশঙ্কায় ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান বুধবার নিরাপত্তা বাহিনীকে বিক্ষোভ দমনে সর্বোচ্চ সংযম দেখানোর নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি কর্মকর্তাদের বলেন, “যারা শান্তিপূর্ণভাবে নিজেদের দাবি জানাচ্ছেন এবং যারা সহিংসতায় লিপ্ত, তাদের আলাদাভাবে বিবেচনা করতে হবে।” তিনি নিরাপত্তা বাহিনীকে বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা না নিতে এবং সাধারণ মানুষের ক্ষোভের যৌক্তিকতা অনুধাবন করার আহ্বান জানান।
ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা IRNA-এর রিপোর্ট অনুযায়ী, প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান মঙ্গলবার এক ভাষণে স্বীকার করেছেন যে, দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি অত্যন্ত জটিল। তিনি বলেন, “সরকারের সম্পদ সীমিত এবং বর্তমানে অনেক কিছু আমাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে।” তবে তিনি বিক্ষোভকারীদের “বৈধ দাবি” শোনার জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে নির্দেশ দিয়েছেন বলে IRNA জানিয়েছে।
সরকার-ঘনিষ্ঠ Fars News Agency তাদের প্রতিবেদনে জানিয়েছে যে, বিক্ষোভের সময় কয়েকশ পুলিশ সদস্য এবং ‘বাসিজ’ (স্বেচ্ছাসেবী আধাসামরিক বাহিনী) সদস্য আহত হয়েছেন। সংস্থাটি বিক্ষোভকারীদের একাংশকে “দাঙ্গাকারী” (Rioters) হিসেবে অভিহিত করে দাবি করেছে যে, তেহরানের গ্র্যান্ড বাজারে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির দায়ে অনেককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের দাবি অনুযায়ী, বিদেশি ইন্ধনে একদল লোক জনসাধারণের জানমালের ক্ষতি করছে।
ইরানের বিচার বিভাগীয় প্রধান গোলাম হোসেন মহসেনি এজেয়ি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন যে, যারা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করবে তাদের বিরুদ্ধে কোনো প্রকার নমনীয়তা দেখানো হবে না। এদিকে, ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি গত ৩ জানুয়ারি এক ভাষণে বলেছেন, “প্রতিবাদ করা জনগণের অধিকার, কিন্তু ভাঙচুর ও দাঙ্গা ভিন্ন বিষয়।” তিনি নিরাপত্তা বাহিনীকে পরিস্থিতি মোকাবিলায় যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান।
Tasnim News Agency রিপোর্ট করেছে যে, তেহরানের পশ্চিমাঞ্চল থেকে প্রায় ৩০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে যারা শৃঙ্খলা ভঙ্গের দায়ে অভিযুক্ত। সংবাদমাধ্যমটি অভিযোগ করেছে যে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট এবং ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী এই বিক্ষোভকে উসকে দেওয়ার চেষ্টা করছেন। ইরানের সামরিক কর্মকর্তারা সতর্ক করেছেন যে, দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে বাইরের হস্তক্ষেপ বরদাশত করা হবে না।
