গত ২২শে আগস্ট, ২০২৫, ঢাকার ফার্মগেটে অবস্থিত ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিকের (UAP) বিজনেস এডমিনিস্ট্রেশন বিভাগের অধ্যাপক ড. শামসেদ আহমেদ এবং কিছু শিক্ষার্থী জুম্মার নামাজের পর বিশিষ্ট আলিম শায়েখ আহমাদুল্লাহ সাহেবের সাথে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন। এই ব্যক্তিগত সাক্ষাতের উদ্দেশ্য ছিল UAP-তে একটি ‘সীরাত সেমিনার’ আয়োজনের সম্ভাবনা ও শায়েখের সময়সূচী জানা।
এই সাক্ষাতকালে শায়েখ আহমাদুল্লাহ ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেন এবং আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণ পেলে সেপ্টেম্বর মাসে কর্মসূচি পালনের ইচ্ছা প্রকাশ করেন। কিন্তু এক শিক্ষার্থী কর্তৃক শায়েখ, অধ্যাপক শামসেদ ও অন্যান্যদের সাথে ক্যামেরায় ধারণ করা গ্রুপফটোটি ফেসবুকে আপলোড এবং বিশ্ববিদ্যালয় গ্রুপে শেয়ার করার পর পরিস্থিতি বিপর্যয়কর আকার নেয়।
‘অপরাধ’ হিসেবে ছবি শেয়ার করা এবং প্রথম ধাপের হেনস্তা
বিশ্বস্ত সূত্রে জানা যায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান মাহবুবা এই ছবিটি দেখে ক্ষুব্ধ হন এবং এটি ভিসি, রেজিস্ট্রার ও ডিনদের কাছে জরিমানা হিসেবে পাঠান। এরপর শুরু হয় অধ্যাপক শামসেদকে হেনস্তার পর্ব।
প্রথম ধাক্কা: সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহে (মিড-টার্ম পরীক্ষার সময়) ভিসি ড. কামরুল আহসান এবং রেজিস্ট্রার ব্রিগেডিয়ার (অব.) নজরুল ইসলাম অধ্যাপক শামসেদকে তলব করে শায়েখের সাথে দেখা করা ও ছবি তোলার বিষয়ে কঠোর ভাষায় বকা এবং মানসিক নির্যাতন করেন।
শিক্ষার্থীদের প্রতি অবিচার: পরের দিন (১০ই সেপ্টেম্বর) শিক্ষার্থীরা রেজিস্ট্রারের সাথে দেখা করতে গেলে তাদের ৭-৮ ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়।
সেমিনারে নিষেধাজ্ঞা: যখন শিক্ষার্থীরা সেমিনারের আবেদনপত্র জমা দেয়, তখন রেজিস্ট্রার শায়েখের সাথে ছবি তোলাকে “অমার্জনীয় অপরাধ” আখ্যা দিয়ে সেমিনারের অনুমতি প্রত্যাখ্যান করেন। আবেদনপত্র পড়েও দেখা হয়নি। ছাত্র-ছাত্রীদের চাপের মুখে পরবর্তীতে এক মিটিং হলেও কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি এবং সেমিস্টারে আর সেমিনার হয়নি।
দ্বিতীয় ধাপে ফ্যাসিবাদী আচরণ
সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহে আবারও অধ্যাপক শামসেদকে ভিসি অফিসে তলব করা হয়। এবার দাবি করা হয় শায়েখের সাথে দেখা করা এবং ছবি তোলার জন্য “লিখিত কৈফিয়ত” জমা দেওয়ার। নভেম্বর মাসে ফাইনাল সেমিস্টার পরীক্ষার সময়ও তাকে শোকজ করে “অনুমতিবিহীন আমন্ত্রণ” এবং ছবি তোলার অভিযোগে লিখিত ব্যাখ্যা চাওয়া হয়।
দ্বিচারিতা ও অসাংগঠনিক নীতি
বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের এই আচরণ চরম হিপোক্রিসির পরিচায়ক:
১. ইসলামিক সেমিনার বনাম অন্যান্য ধর্মীয় অনুষ্ঠান: কর্তৃপক্ষ দাবি করে যে ইসলামিক সেমিনারের জন্য কোনো নীতিমালা নেই এবং মহল থেকে চাপ আসে। কিন্তু ক্যাম্পাসে প্রতিবছর ধর্মীয় পূজা অনুষ্ঠিত হয় এবং তাতে কোনো বাধা নেই। এমনকি রেজিস্ট্রার “পূজা আমাদের সংস্কৃতির অংশ” বলে ব্যাখ্যা দিয়েছেন।
২. ডিএসডব্লিউ-এর দ্বৈত চরিত্র: (DSW) থেকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, “কোনো ধর্মীয় অনুষ্ঠানে DSW ডিরেক্টরকে জড়ানো যাবে না।” অথচ ডিরেক্টর শায়েম মহসিন বিভিন্ন পূজার পৃষ্ঠপোষকতা করেন। ২০২৪ সালের সীরাত সেমিনারের জন্য তাকে দায়িত্ব দিলেও তিনি উপস্থিত হননি।
পুনরাবৃত্তি
বিশ্ববিদ্যালয়ের অথোরিটির এই মনোভাব নতুন নয়। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে ছাত্র আন্দোলন চলাকালে ক্যাম্পাসের গেট বন্ধ করে শিক্ষার্থীদের ধাওয়া করা হয়েছিল। পরবর্তীতে ২০২৪’র ১৯ আগস্ট ছাত্রদের দাবির মুখে তারা অস্বেচ্ছায় একটি সেমিনারের অনুমতি দিয়েছিল, যেখানে অধ্যাপক মোখতার আহমদকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। কিন্তু এখন পরিস্থিতি আবার স্বাভাবিক হওয়ার বদলে ফ্যাসিবাদী রূপ ধারণ করেছে এবং পরীক্ষার সময় অধ্যাপকদের হেনস্তা করে ছাত্রদের নজর সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা চলছে।
উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অথোরিটি ধর্মীয় সম্প্রদায়ভেদে আচরণ করছে এবং আন্তঃবিভাগীয় শিক্ষক-ছাত্রদের সৌহার্দ্যপূর্ণ সাক্ষাতকে সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করাকে “অপরাধ” হিসেবে গণ্য করছে।
এসকল তথ্য উপস্থাপন করে জামশেদ কুতুব পাশা, UAP এর সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অ্যালামনাই ফেইসবুকে পাবলিকলি পোস্ট করেছেন।
UAP শিক্ষার্থীদের দ্বারা পরিচালিত যে পেইজটিতে ছবিটি আপলোড করা হয়েছে, সেখান থেকে সেপ্টেম্বরের ১০ তারিখ বলা হয়েছিলো,
“গত ২২শে আগস্ট, জুমআর দিনে, বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষার্থী জুমার নামাজের পর সম্মানিত শায়েখ আহমাদুল্লাহ সাহেবের সাথে একটি আনঅফিসিয়াল সাক্ষাৎ করে। এই সাক্ষাতের উদ্দেশ্য ছিল কেবলমাত্র জানতে চাওয়া— ভবিষ্যতে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে ইসলামিক মূল্যবোধভিত্তিক একটি সেমিনারে তাঁকে আমন্ত্রণ জানানো সম্ভব কি না এবং সে ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্রিয়াটি কীভাবে অনুসরণ করতে হবে।
এই সাক্ষাৎ ছিল সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত উদ্যোগে এবং আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণের সাথে সম্পর্কিত নয়। দুর্ভাগ্যবশত, সেই সাক্ষাতের একটি ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছিল, যা দ্রুতই মুছে ফেলা হয়। এর ফলে কিছু ভুল বোঝাবুঝি সৃষ্টি হয়েছে, যদিও শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্য ছিল কেবল তথ্য সংগ্রহ।
পরবর্তীতে, বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ম মেনে গত ৮ই সেপ্টেম্বর আমরা মাননীয় ভাইস চ্যান্সেলর মহোদয়ের নিকট একটি আবেদনপত্র এবং প্রয়োজনীয় নথিপত্র যথাযথভাবে রেজিস্ট্রার অফিসের মাধ্যমে দাখিল করেছি। কিন্তু দুঃখজনকভাবে এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে কোন Office Order বা সিদ্ধান্ত আমরা পাইনি।
আমাদের ক্যাম্পাসে প্রায় ৯০% শিক্ষার্থী মুসলিম, যাদের প্রাণের দাবি— ইসলামিক মূল্যবোধকে ধারণ ও চর্চার জন্য প্রতি সেমিস্টারে অন্তত একটি সেমিনারের আয়োজন করা হবে। তাই আমরা বিনীতভাবে অনুরোধ জানাচ্ছি, শায়েখ আহমাদুল্লাহ সাহেবকে বক্তা হিসেবে আমন্ত্রণ জানানোর জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে ইনভাইটেশন লেটার (Invitation Letter) ও প্রয়োজনীয় অনুমোদন (Office Order) প্রদান করা হোক।
আমরা বিশ্বাস করি, বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এই আবেদনকে সবোর্চ্চ গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করবেন এবং অতিদ্রুত যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন, ইনশাআল্লাহ।”
