Saturday, May 30, 2026
No menu items!

আমাদের মুসলিমউম্মাহ ডট নিউজে পরিবেশিত সংবাদ মূলত বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদের সমাহার। পরিবেশিত সংবাদের সত্যায়ন এই স্বল্প সময়ে পরিসরে সম্ভব নয় বিধায় আমরা সৌজন্যতার সাথে আহরিত সংবাদ সহ পত্রিকার নাম লিপিবদ্ধ করেছি। পরবর্তীতে যদি উক্ত সংবাদ সংশ্লিষ্ট কোন সংশোধন আমরা পাই তবে সত্যতার নিরিখে সংশোধনটা প্রকাশ করবো। সম্পাদক

Homeদৈনন্দিন খবরআন্তর্জাতিকএকবিংশ শতাব্দীর দখল ও আধিপত্যের নতুন কাঠামো

একবিংশ শতাব্দীর দখল ও আধিপত্যের নতুন কাঠামো

১ ফেব্রুয়ারি ইসরায়েলের চ্যানেল ১২ এমন একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে, যা পৃথিবীকে থামিয়ে দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু থামায়নি। প্রতিবেদনে বলা হয়, সংযুক্ত আরব আমিরাত গাযা উপত্যকার পূর্ণ বেসামরিক প্রশাসন নিজের হাতে নেওয়ার বিষয়ে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা চালাচ্ছে। এটি কোনো মানবিক সহায়তা সমন্বয় নয়, কোনো পুনর্গঠন সহযোগিতাও নয়—এটি গাযার সম্পূর্ণ বেসামরিক দখলের পরিকল্পনা। প্রস্তাব অনুযায়ী, গাযার বাজার, বাণিজ্য ও লজিস্টিকস পরিচালনা করবে আবুধাবি; সব আমদানি-রপ্তানি যাবে ইসরায়েলের মাধ্যমে; ইসরায়েলি সরবরাহকারী ও ঠিকাদার ব্যবহার বাধ্যতামূলক হবে; আমিরাতি সশস্ত্র বাহিনী মার্কিন বেসরকারি সামরিক ঠিকাদারদের সঙ্গে যৌথভাবে মোতায়েন হবে; এবং ইসরায়েল, UAE ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে খসড়া চুক্তি ইতিমধ্যেই আদান-প্রদান হয়েছে।

ইসরায়েলি কর্মকর্তারা বিষয়টি গোপন করছেন না। তাদের ভাষায়, এটি একটি সম্পূর্ণ আমিরাতি বেসামরিক টেকওভার, যার পেছনে থাকবে বহু বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ। UAE স্বাভাবিকভাবেই সব অস্বীকার করছে, কিন্তু এই অস্বীকারের গুরুত্ব কম, কারণ বাস্তবায়নের অবকাঠামো বহু আগেই তৈরি, নেটওয়ার্ক গত পনেরো বছরে গড়ে তোলা হয়েছে, একের পর এক বাধা পদ্ধতিগতভাবে সরানো হয়েছে, এবং একই শক্তিগুলো এখন বাস্তবায়নে নেমেছে।

এই অবস্থায় প্রশ্ন ওঠে—আমরা এখানে কীভাবে এলাম? উত্তর পেতে হলে একাধিক সুতো একসঙ্গে ধরতে হয়। একজন মৃত গোয়েন্দা অপারেটিভ, যিনি পর্দার আড়ালে কাজ করেছেন। একজন পাকিস্তানি প্রধানমন্ত্রী, যাকে “বিপজ্জনক” বলে চিহ্নিত করা হয়েছিল। দখলকৃত ভূখণ্ডে প্রশিক্ষিত ভাড়াটে বাহিনী। নজরদারি প্রযুক্তিতে বাঁধা স্বৈরশাসকদের জোট। আর মার্কিন রাজনৈতিক সহযোগিতা নিশ্চিত করতে ঢালা উপসাগরীয় অর্থ। এই সব সুতো একত্র করলে যে চিত্রটি ভেসে ওঠে, তা মোটেও বিচ্ছিন্ন ঘটনার সমষ্টি নয়, বরং একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার বাস্তবায়ন।

জেফ্রি এপস্টাইন কোনো ধনী ব্যক্তি ছিলেন না, যিনি কাকতালীয়ভাবে ক্ষমতাবানদের চিনতেন। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে প্রকাশিত নথিগুলো নিশ্চিত করেছে, তিনি ছিলেন একজন গোয়েন্দা অপারেটিভ, যিনি ইসরায়েল ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মধ্যে একটি ছায়া জোট গড়ে তুলছিলেন—যে জোট আজ গাযা গ্রাস করতে যাচ্ছে।

২০১৩ সালে, আব্রাহাম অ্যাকর্ডস আলোচনায় আসার বহু আগেই, এপস্টাইন গোপন বৈঠকের আয়োজন করেন ইসরায়েলের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও সামরিক গোয়েন্দা প্রধান ইহুদ বারাক এবং DP World-এর প্রধান নির্বাহী সুলতান আহমেদ বিন সুলাইয়েমের মধ্যে। DP World বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ বন্দর ও লজিস্টিকস অপারেটর, যা সম্পূর্ণভাবে UAE নিয়ন্ত্রিত। এপস্টাইন ব্যবসায়িক সাক্ষাৎ আয়োজন করছিলেন না; তিনি ইসরায়েলের কৌশলগত স্বার্থে DP World-কে অপরিহার্য হিসেবে তুলে ধরছিলেন, লজিস্টিকস বিনিয়োগ ও গোয়েন্দা সহযোগিতা এগিয়ে নিচ্ছিলেন এবং দুবাইয়ের শাসক পরিবারের সঙ্গে তার সরাসরি যোগাযোগ ব্যবহার করে ইসরায়েল–UAE সহযোগিতার ভিত তৈরি করছিলেন। নথিতে দেখা যায়, তিনি ইহুদ বারাকের অধীনে সামরিক গোয়েন্দা প্রশিক্ষণ পেয়েছিলেন, সিরিয়া ও ইরান ইস্যুতে রাশিয়া–ইসরায়েল গোয়েন্দা চ্যানেল গঠনে ভূমিকা রেখেছিলেন এবং আফ্রিকাজুড়ে ইসরায়েলি নজরদারি প্রযুক্তি বিক্রি সহজ করেছিলেন। ফাঁস হওয়া বার্তায় তার সংযুক্তি পাওয়া যায় UAE শাসকগোষ্ঠীর শীর্ষ স্তরে, এমনকি মোহাম্মদ বিন জায়েদের সঙ্গেও। FBI মেমোগুলো তাকে মোসাদ-সংযুক্ত ফিক্সার হিসেবে বর্ণনা করেছে, যিনি ট্রাম্প ও কুশনারসহ মার্কিন রাজনীতিকদের লক্ষ্য করে প্রভাব বিস্তার করতেন।

এপস্টাইনের মৃত্যু ২০১৯ সালে হলেও তার তৈরি নেটওয়ার্ক মরেনি; সেগুলো আনুষ্ঠানিক রূপ নিয়েছে, বিস্তৃত হয়েছে, এবং এখন গাযাকে তাদের প্রকল্পের চূড়ান্ত পরীক্ষাক্ষেত্র হিসেবে বেছে নিয়েছে।

এই নেটওয়ার্কের পথে যিনি বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন, তিনি ছিলেন ইমরান খান। ২০১৮ সালে, তিনি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হওয়ার পরপরই, এপস্টাইন একটি ইমেইলে লেখেন যে ইমরান খান এরদোয়ান, খামেনি, শি জিনপিং ও পুতিনের চেয়েও শান্তির জন্য বড় হুমকি।

একজন সদ্য নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী কেন এত “বিপজ্জনক”? কারণ তিনি ছিলেন একটি পারমাণবিক শক্তিধর মুসলিম দেশের নেতা, যিনি প্রকৃত অর্থেই স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতির কথা বলতেন। তিনি ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দিতে অস্বীকৃতি জানান, ফিলিস্তিনের পক্ষে আপসহীন অবস্থান নেন এবং স্পষ্ট করে বলেন, পাকিস্তান কারও প্রক্সি হবে না। ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে, ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর দিনই তিনি মস্কোয় গিয়ে পুতিনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন এবং দেশে ফিরে ঘোষণা দেন যে পাকিস্তান পশ্চিমা শক্তির দাস হবে না। এর পাঁচ সপ্তাহের মধ্যেই তাকে ক্ষমতা থেকে সরানো হয়।

ইমরান খানের পতন কোনো স্বাভাবিক রাজনৈতিক প্রক্রিয়া ছিল না। এটি ছিল নথিভুক্ত অভ্যুত্থান। ২০২২ সালের মার্চে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের সহকারী সচিব ডোনাল্ড লু পাকিস্তানের রাষ্ট্রদূতকে স্পষ্টভাবে বলেন, ইমরান খানকে সরানো হলে ওয়াশিংটনে “সব ক্ষমা” করা হবে, আর না হলে ভবিষ্যৎ কঠিন হবে। এই কথোপকথন পাকিস্তানের গোপন কূটনৈতিক কেবলে নথিভুক্ত ছিল, যা পরে ফাঁস হয়। ১০ এপ্রিল ২০২২, এই হুমকির ছায়ায় পাকিস্তানের পার্লামেন্ট ইমরান খানকে অনাস্থা ভোটে সরিয়ে দেয়। তিনি হন পাকিস্তানের ইতিহাসে প্রথম প্রধানমন্ত্রী, যিনি এই পদ্ধতিতে অপসারিত হলেন। এরপর তার বিরুদ্ধে একের পর এক দুর্নীতির মামলা দেওয়া হয়, যার উদ্দেশ্য শাস্তি নয়, বরং রাজনীতিতে তার প্রত্যাবর্তন ঠেকানো। কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতিবিদ জেফ্রি স্যাকস স্পষ্টভাবে লেখেন, ইমরান খানের অপসারণে মার্কিন ভূমিকা ছিল, এবং তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো ছিল রাজনৈতিকভাবে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।

ইমরান খানের পতনের পর পাকিস্তানের অবস্থান দ্রুত বদলে যায়। যে দেশটি একসময় ঘোষণা করেছিল, ফিলিস্তিনের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত না হলে ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দেবে না, সেই পাকিস্তান ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে দাভোসে ট্রাম্পের “বোর্ড অব পিস”-এ স্বাক্ষর করে। এই কাঠামোর আওতায় UAE ও আরও কয়েকটি দেশের সঙ্গে পাকিস্তান গাযার ভবিষ্যৎ ব্যবস্থাপনায় যুক্ত হয়। সরকারি ভাষ্যে বলা হয়, পাকিস্তান শুধু মানবিক সহায়তায় যুক্ত থাকবে, সামরিক ভূমিকায় নয়। কিন্তু মার্কিন নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বাহিনীর অংশ হিসেবে হাজার হাজার পাকিস্তানি সেনা মোতায়েনের গুঞ্জন চলছেই। সেনা যাক বা না যাক, স্বাক্ষরটাই মূল বিষয়। এটি পাকিস্তানকে সেই ব্যবস্থার অংশ করে ফেলেছে, যেটি ইমরান খান কখনোই মেনে নিতেন না। মার্কিন চাপ, উপসাগরীয় ঋণ, IMF নির্ভরতা এবং অর্থনৈতিক দুর্বলতা পাকিস্তানকে এই পথে ঠেলে দিয়েছে। ইমরান খান ছিলেন সেই বাধা, যাকে সরিয়ে এই একীভূতকরণ সম্ভব হয়েছে।

এই পুরো ব্যবস্থার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ট্রাম্প পরিবার। জ্যারেড কুশনার হোয়াইট হাউস ছাড়ার ছয় মাসের মধ্যেই ২ বিলিয়ন ডলারের তহবিল সংগ্রহ করেন, যদিও তার ফান্ডকে নিজের উপদেষ্টারাই অযোগ্য বলেছিলেন। এই অর্থ কোনো স্বাভাবিক বিনিয়োগ ছিল না; এটি ছিল রাজনৈতিক সেবার মূল্য। হোয়াইট হাউসে থাকাকালীন কুশনারই ছিলেন আব্রাহাম অ্যাকর্ডসের প্রধান স্থপতি। তিনি ফিলিস্তিন প্রশ্নকে “রিয়েল এস্টেট সমস্যা” বলে আখ্যা দেন এবং দুই রাষ্ট্র সমাধানকে “ভয়াবহ ধারণা” বলেন। এই দৃষ্টিভঙ্গিই গাজাকে আজ একটি উন্নয়ন প্রকল্পে পরিণত করছে। উপসাগরীয় অর্থ ইসরায়েলি প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ হয়, সেই প্রযুক্তি নজরদারি ও দমনযন্ত্রে রূপ নেয়, আর সেটিই আবার নতুন রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সুবিধা তৈরি করে। এটি একটি বন্ধ চক্র, যার প্রতিটি ধাপ পরবর্তী ধাপকে শক্তিশালী করে।

আব্রাহাম অ্যাকর্ডসকে শান্তিচুক্তি হিসেবে প্রচার করা হয়েছিল, কিন্তু বাস্তবে এটি ছিল ফিলিস্তিনকে পাশ কাটিয়ে ইসরায়েল ও আরব চাটুকারদের মধ্যে গোয়েন্দা ও অর্থনৈতিক একীভূতকরণ। ট্রাম্পের “ডিল অব দ্য সেঞ্চুরি” ছিল এই প্রকল্পের প্রকাশ্য রূপ, যা পশ্চিম তীরের অধিকাংশ এলাকা কার্যত ইসরায়েলের সঙ্গে সংযুক্ত করার পরিকল্পনা করেছিল। সেটি তখন ব্যর্থ হয় অতিরিক্ত স্পষ্টতার কারণে। কিন্তু তার যুক্তি হারায়নি; বরং নতুন ভাষায়, নতুন কাঠামোয় ফিরে এসেছে। আজ গাযায় UAE-এর বেসামরিক টেকওভার সেই একই পরিকল্পনার নীরব বাস্তবায়ন।

UAE এখানে কোনো নিরপেক্ষ মানবিক শক্তি নয়। গত এক দশকের বেশি সময় ধরে তারা ভাড়াটে বাহিনী, নজরদারি প্রযুক্তি ও প্রক্সি প্রশাসনের মাধ্যমে দখল পরিচালনার মডেল তৈরি করেছে। এরিক প্রিন্সের ব্ল্যাকওয়াটার, কলম্বিয়ান ভাড়াটে সৈন্য, ইয়েমেন ও লিবিয়ায় পরীক্ষিত অভিযান, ইসরায়েলি প্রশিক্ষণ ও Pegasus স্পাইওয়্যার—সবকিছুই প্রমাণ করে এই মডেল কতটা পরিণত। এখন সেই মডেল গাযায় প্রয়োগের জন্য প্রস্তুত। এতে ইসরায়েল সরাসরি সামনে না থাকলেও নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি তাদের হাতে থাকবে, আর দখলকে বলা হবে প্রশাসন।

সব টুকরো মিলিয়ে দেখলে একটি পূর্ণাঙ্গ প্যাটার্ন স্পষ্ট হয়। প্রথমে নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা হয়েছে, তারপর বাধা শনাক্ত করা হয়েছে, এরপর সেই বাধাগুলো—যেমন ইমরান খান—পদ্ধতিগতভাবে সরানো হয়েছে, এবং অবশেষে বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে। গাযা এই ব্যবস্থার পরীক্ষাক্ষেত্র। এখানে সফল হলে একই মডেল প্রয়োগ হবে পশ্চিম তীর, দক্ষিণ লেবানন এবং যেকোনো জায়গায়, যেখানে প্রতিরোধ ও স্বাধীন নেতৃত্ব এই আঞ্চলিক ব্যবস্থার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াবে।

এটি শুধু ফিলিস্তিনের গল্প নয়। এটি একবিংশ শতাব্দীর দখল ও আধিপত্যের নতুন কাঠামোর গল্প, যেখানে সামরিক আক্রমণের বদলে আসে প্রশাসনিক গ্রাস, অর্থনৈতিক নির্ভরতা ও নজরদারিভিত্তিক নিয়ন্ত্রণ। যেখানে গোয়েন্দারা নেটওয়ার্ক বানায়, স্বৈরশাসকরা অর্থ জোগায়, রাজনীতিকরা লাভ তোলে, ভাড়াটেরা মাঠে নামে, আর যে নেতৃত্ব স্বাধীন থাকতে চায়, তাকে সরিয়ে দেওয়া হয়। গাযা সেই ভবিষ্যতের নমুনা। আর এই ভবিষ্যৎ হঠাৎ তৈরি হয়নি এটি বহু বছর ধরে পরিকল্পিত,ধাপে ধাপে নির্মিত।

— ফ্রেম দ্য গ্লোব

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

2 × one =

সবচেয়ে জনপ্রিয়

সাম্প্রতিক মন্তব্য