Thursday, May 14, 2026
No menu items!

আমাদের মুসলিমউম্মাহ ডট নিউজে পরিবেশিত সংবাদ মূলত বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদের সমাহার। পরিবেশিত সংবাদের সত্যায়ন এই স্বল্প সময়ে পরিসরে সম্ভব নয় বিধায় আমরা সৌজন্যতার সাথে আহরিত সংবাদ সহ পত্রিকার নাম লিপিবদ্ধ করেছি। পরবর্তীতে যদি উক্ত সংবাদ সংশ্লিষ্ট কোন সংশোধন আমরা পাই তবে সত্যতার নিরিখে সংশোধনটা প্রকাশ করবো। সম্পাদক

Homeদৈনন্দিন খবরপদ্মা ব্যারাজের স্বপ্নপূরণ হচ্ছে

পদ্মা ব্যারাজের স্বপ্নপূরণ হচ্ছে

দীর্ঘ সাড়ে ছয় দশকের যাত্রা। সমীক্ষার পর সমীক্ষা। প্রতিবেশী দেশের বাগড়া। অর্থায়নের অনিশ্চয়তা। সব বাধা-বিপত্তি অতিক্রম করে অবশেষে প্রতীক্ষার অবসান। স্বপ্নপূরণের পথে হলো বড় অগ্রগতি। চূড়ান্ত অনুমোদন পেল বহুল কাঙ্ক্ষিত পদ্মা ব্যারাজ।

শুষ্ক মৌসুমে বাংলাদেশের বিস্তীর্ণ এলাকা মরূকরণের হাত থেকে রক্ষা করতে রাজবাড়ীর পাংশা এলাকায় ২ দশমিক ১ কিলোমিটার (কিমি) দীর্ঘ পদ্মা ব্যারাজ নির্মাণের প্রথম ধাপ বাস্তবায়নে ৩৪ হাজার ৪৯৭ কোটি ২৫ লাখ টাকার প্রকল্প অনুমোদিত হয়েছে। এই মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নের মেয়াদকাল নির্ধারণ করা হয়েছে ২০২৬ সালের জুলাই থেকে ২০৩৩ সালের জুন পর্যন্ত।

গতকাল বুধবার সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রী ও একনেক চেয়ারপারসন তারেক রহমানের সভাপতিত্বে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় এ অনুমোদন দেওয়া হয়। সভায় ৩৬ হাজার ৬৯৫ কোটি ৭২ লাখ টাকা ব্যয়সংবলিত মোট ৯টি প্রকল্প অনুমোদন করা হয়েছে। এর মধ্যে সরকারের নিজস্ব অর্থায়ন ৩৬ হাজার ৪৯০ কোটি ৯৩ লাখ টাকা এবং সংস্থার নিজস্ব অর্থায়ন ২০৪ কোটি ৭৯ লাখ টাকা। প্রকল্পগুলোর মধ্যে নতুন তিনটি, সংশোধিত পাঁচটি ও মেয়াদ বৃদ্ধি প্রকল্প একটি। অনুমোদিত প্রকল্পের মধ্যে সবচেয়ে বড় হলো পদ্মা ব্যারাজ (প্রথম পর্যায়) প্রকল্প। এদিকে পদ্মা ব্যারাজ নির্মাণে ভারতের সঙ্গে আলোচনার কিছু নেই বলে জানিয়েছেন পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানি। সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকের পর তিনি এ কথা জানান।

একনেক বৈঠক সূত্রে জানা যায়, মূলত ফারাক্কা বাঁধের কারণে শুষ্ক মৌসুমে পানির যে সংকট দেখা দেয়, তা থেকে কিছুটা রেহাই পেতে পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্পটির অনুমোদন করা হয়েছে। কয়েক দশকের পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে পদ্মা ব্যারাজ নামে প্রকল্পটি অবশেষে চূড়ান্ত অনুমোদন পেল। গত মাসে পরিকল্পনা কমিশন প্রকল্পটি বর্তমান সরকারের প্রথম একনেক সভায় উপস্থাপনের জন্য প্রস্তুতি নিলেও শেষ মুহূর্তে তা প্রত্যাহার করা হয়।

পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে জানা গেছে, পদ্মা ব্যারাজ (প্রথম পর্যায়) প্রকল্পটি প্রস্তাব করেছে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়। চলতি বছর থেকে শুরু করে ২০৩৩ সালের জুনের মধ্যে এটি বাস্তবায়ন করবে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (বাপাউবো)। প্রকল্পটির মোট প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছে ৫০ হাজার ৪৪৩ কোটি ৬৪ লাখ টাকা। তবে প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটি (পিইসি) ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের সুপারিশ করায় প্রথম ধাপের জন্য ৩৪ হাজার ৪৯৭ কোটি ২৫ লাখ টাকা অনুমোদন করা হয়েছে। পুরো অর্থায়ন সরকারি তহবিল থেকেই করা হবে।

মিলবে যেসব সুফল

ব্যারাজ নির্মাণের মাধ্যমে পদ্মা নদীতে প্রায় দুই হাজার ৯০০ মিলিয়ন বা ২৯০ কোটি ঘনমিটার পানি সংরক্ষণ করা হবে। সংরক্ষিত পানি দিয়ে পাঁচটি নদীর পানিপ্রবাহ পুনরুজ্জীবিত করা হবে। এগুলো হলো—হিসনা-মাথাভাঙ্গা, গড়াই-মধুমতি, চন্দনা-বারাশিয়া, বড়াল ও ইছামতী নদী। শুষ্ক মৌসুমে এসব নদীতে প্রায় ৮০০ কিউসেক মিটার পানি সরবরাহ করা হবে। এতে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের পানি ব্যবস্থাপনায় গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আসবে বলে আশা করা হচ্ছে। প্রথম ধাপে রাজবাড়ীর পাংশায় ২ দশমিক ১ কিলোমিটার দীর্ঘ পদ্মা ব্যারাজ নির্মাণ করা হবে। ব্যারাজটিতে থাকবে ৭৮টি স্পিলওয়ে, ১৮টি আন্ডার স্লুইসগেট, মাছ চলাচলের জন্য দুটি ফিশ পাস, একটি নেভিগেশন লক এবং গাইড ও সংযোগ বাঁধ।

পদ্মা ব্যারেজের মাধ্যমে সংরক্ষিত পানি দিয়ে হিসনা-মাথাভাঙ্গা, গড়াই-মধুমতি, চন্দনা-বারাশিয়া, বড়াল ও ইছামতী নদী পুনরুজ্জীবিত করা সম্ভব হবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। শুষ্ক মৌসুমে এসব নদীতে প্রায় ৮০০ কিউসেক মিটার পানি সরবরাহ করা যাবে বলে আশা করা হচ্ছে। প্রকল্পের নথি বলছে, বৃহত্তর কুষ্টিয়া, ফরিদপুর, যশোর, খুলনা, বরিশাল, পাবনা ও রাজশাহী অঞ্চলের চাষযোগ্য প্রায় ২৯ লাখ হেক্টর কৃষি জমিতে প্রয়োজনীয় সেচের পানি সরবরাহ করা যাবে। প্রায় ২৪ লাখ টন ধানের ও দুই দশমিক ৩৪ লাখ টন মাছের উৎপাদন বৃদ্ধির প্রত্যাশার কথা বলা হয়েছে প্রকল্প প্রস্তাবে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে বছরে প্রায় আট হাজার কোটি টাকার সামাজিক ও অর্থনৈতিক সুবিধা পাওয়ার প্রত্যাশা করা হচ্ছে।

পানি বিশেষজ্ঞদের মত হচ্ছে, ক্রমবর্ধমান পানির সংকট, সুন্দরবন এলাকায় লবণাক্ত ও পলি জমে জলাবদ্ধতার সমস্যা ভবিষ্যতে আরো বাড়বে। তাই স্বাদু পানির সরবরাহ বাড়াতেই হবে। সেজন্য এ ব্যারাজ নির্মাণের কোনো বিকল্প নেই।

কবে থেকে, কেন এ উদ্যোগ

প্রকল্পসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, সত্তরের দশকে ভারতের পশ্চিমবঙ্গে ফারাক্কা বাঁধ নির্মাণের কারণে বাংলাদেশের পদ্মার পানিপ্রবাহ মারাত্মকভাবে কমে যায়। এতে পদ্মার সঙ্গে সংযুক্ত ছয়টি নদী শুকিয়ে যায়। ফলে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কৃষি, মৎস্য, নৌ চলাচল থমকে গিয়ে জীববৈচিত্র্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

এছাড়া বৃহত্তর রাজশাহী, পাবনা, কুষ্টিয়া, যশোর, খুলনা, ফরিদপুর ও বরিশাল জেলায় পদ্মা নদী একমাত্র সুপেয় পানির উৎস। এজন্য বর্ষার পানি ধরে রেখে শুষ্ক মৌসুমে নিয়ন্ত্রিত পানি সরবরাহের জন্য বাঁধটি নির্মাণ করা হবে। এ প্রকল্পটি গঙ্গানির্ভর এলাকার পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনায় মাস্টারমাইন্ড প্রকল্প হিসেবে গণ্য হচ্ছে। এটি গঙ্গা নদীব্যবস্থা থেকে পানিপ্রবাহ পুনরুদ্ধারে ভূমিকা রাখবে। একই সঙ্গে পলি জমা কমানো এবং শুষ্ক মৌসুমে পানি সরবরাহ নিশ্চিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।

প্রথম ধাপে যা থাকছে

প্রকল্পের সারসংক্ষেপে বলা হয়েছে, পদ্মা ব্যারাজ ও গড়াই অফটেক এলাকায় জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন করা হবে। এসব কেন্দ্র থেকে মোট ১১৩ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা রয়েছে। প্রথম ধাপের আওতায় ১৩৫ দশমিক ৬ কিলোমিটার দীর্ঘ গড়াই-মধুমতি নদী এবং ২৪৬ দশমিক ৪৬ কিলোমিটার হিসনা নদীব্যবস্থার ড্রেজিং ও পুনঃখননের কাজও করা হবে। অন্যান্য কাজের মধ্যে রয়েছে ১৫টি স্পিলওয়েসহ গড়াই অফটেক, ফিশ পাস, নেভিগেশন লক ও ৩৬ দশমিক ৬ মেগাওয়াট ক্ষমতার জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ। পাশাপাশি চন্দনা অফটেকে চারটি স্পিলওয়ে, হিসনা অফটেকে পাঁচটি স্পিলওয়ে এবং ১৮০ কিলোমিটার দীর্ঘ অ্যাফ্লাক্স বাঁধ নির্মাণ করা হবে। হিসনা অফটেককে হিসনা-মাথাভাঙ্গা নদীব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

প্রকল্প প্রস্তাবে আরো বলা হয়েছে, প্রকল্পে কৃষি ও মৎস্য খাতে উৎপাদন বৃদ্ধিতেও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। প্রতি বছর ধান উৎপাদন প্রায় ২৩ লাখ ৯০ হাজার টন এবং মৎস্য উৎপাদন প্রায় দুই লাখ ৩৪ হাজার টন বাড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। কর্মসংস্থান সৃষ্টির ক্ষেত্রেও প্রকল্পটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প বাংলাদেশের মোট এলাকার প্রায় ৩৭ শতাংশ, যা দেশের চারটি বিভাগের ২৬ জেলার ১৬৩ উপজেলায় বিস্তৃত। তবে প্রথম ধাপ বাস্তবায়িত হলে খুলনা, ঢাকা, রাজশাহী ও বরিশাল বিভাগের অবহেলিত অন্তত ১৯ জেলা ও ১২০ উপজেলা সরাসরি উপকৃত হবে। জেলাগুলো হলো—কুষ্টিয়া, মেহেরপুর, চুয়াডাঙ্গা, ঝিনাইদহ, মাগুরা, যশোর, নড়াইল, বাগেরহাট, খুলনা, সাতক্ষীরা, রাজবাড়ী, ফরিদপুর, গোপালগঞ্জ, পাবনা, রাজশাহী, নাটোর, নওগাঁ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ এবং পিরোজপুর। দ্বিতীয় ধাপে অতিরিক্ত সহায়ক অবকাঠামো নির্মাণ এবং চন্দনা-বারাশিয়া, বড়াল ও ইছামতী নদীব্যবস্থা পুনরুদ্ধারের কাজ করা হবে।

স্বপ্ন দেখা শুরু ১৯৬০ সালে

পদ্মার ওপর ব্যারাজ নির্মাণের ধারণা নতুন নয়। ১৯৬০ থেকে ২০০০ সালের মধ্যে সম্ভাব্য স্থান নির্ধারণে চারটি সমীক্ষা পরিচালিত হয়। প্রায় ২৫ বছর আগে তৎকালীন ক্ষমতাসীন বিএনপি সরকার পদ্মা ব্যারাজ নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছিল। পরে ২০০৫ সালে বিস্তারিত সম্ভাব্যতা যাচাই শুরু হয় এবং স্থানীয় ও বিদেশি পরামর্শকদের একটি কনসোর্টিয়াম ২০১৩ সালে ওই সমীক্ষা শেষ করে।

গতকাল রাতে যোগাযোগ করা হলে পরিবেশ ও পানিসম্পদ বিশেষজ্ঞ আইনুন নিশাত প্রকল্পটির বিস্তারিত না জেনে মন্তব্য করতে অপারগতা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, সর্বশেষ যে প্রকল্পটি অনুমোদিত হয়েছে, তার টেকনিক্যাল দিকগুলো সম্পর্কে আমার ধারণা নেই। আশির দশকে এ প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের সঙ্গে জড়িত ছিলেন বলে জানান এ পানিবিশেষজ্ঞ। ১৯৯৭ সালে পদ্মা ব্যারাজের স্থান নির্ধারণের সঙ্গে জড়িত ছিলেন ড. আইননু নিশাত। তখন বাঁধটি নির্মাণে সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল ভারত সরকার। তবে পরে নানা রাজনৈতিক কারণে তা আটকে যায়। প্রকল্পটির উপকারিতা নিয়ে কোনো প্রশ্ন নেই বলে জানান তিনি।

বিগত বিএনপি সরকারের আমলে ২০০২ সালে এ ধরনের একটি প্রকল্প নেওয়ার আলোচনা ছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেটি আলোর মুখ দেখেনি। পরে ২০০৯-২০১৩ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ, অস্ট্রেলিয়া ও পাকিস্তানের বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে প্রকল্পটির সম্ভাব্যতা যাচাই করা হয়। এরপর ২০১৬ সাল পর্যন্ত পানি উন্নয়ন বোর্ড প্রকল্পটির নকশা প্রণয়নে কাজ করে।

ভারতের সঙ্গে আলোচনার কিছু নেই

পদ্মা ব্যারাজ নির্মাণে ভারতের সঙ্গে আলোচনার কিছু নেই বলে জানান পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি। তিনি বলেন, দেশের ২৪টি জেলার নদীতে পানি সরবরাহ ঠিক রাখতে পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়েছে একনেক সভায়। গতকাল সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের এ কথা জানান তিনি।

পানিসম্পদমন্ত্রী বলেন, সাত বছর মেয়াদে নির্মাণ হতে যাওয়া পদ্মা ব্যারাজে খরচ ধরা হয়েছে প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকা। এর সম্পূর্ণ অর্থ আসবে সরকারের কোষাগার থেকে। তিনি বলেন, ফারাক্কা বাঁধের বিপরীতে দেশের স্বার্থে হওয়া পদ্মা ব্যারাজ নির্মাণে ভারতের সঙ্গে আলোচনার কিছু নেই।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

fourteen + eleven =

সবচেয়ে জনপ্রিয়

সাম্প্রতিক মন্তব্য