একটি ১০ বছরের শিশু তার নিজের মাতৃভাষায় লেখা চার লাইনের একটি সহজ গল্প পড়তে পারছে না; দৃশ্যটি কল্পনা করলেই যে কোনো সচেতন নাগরিকের শিউরে ওঠার কথা। অথচ এটিই এখন বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষার বাস্তবতা।
আমাদের দেশের শিক্ষাব্যবস্থার গলদটা একদম গোড়ায়, অর্থাৎ প্রাথমিক স্তরেই। আর এই গোড়ার গলদ ধামাচাপা দিতে গিয়ে শহরের অলিগলিতে ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে উঠেছে এক সমান্তরাল বাণিজ্যিক ব্যবস্থা, যাকে আমরা চিনি ‘কোচিং ইন্ডাস্ট্রি’ নামে। সরকারি বা বেসরকারি স্কুলগুলোর শ্রেণিকক্ষ যেখানে সঠিক পাঠদানে ব্যর্থ হচ্ছে, সেই শূন্যস্থান পূরণ করে রাতারাতি কোটি টাকার সাম্রাজ্য গড়ে তুলছে এই কোচিং সেন্টারগুলো। এখন প্রশ্ন হলো, এই সংকট কি আকস্মিক নাকি রাষ্ট্র নিজেই তার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাব্যবস্থাকে এই বাণিজ্যিকীকরণের দিকে ঠেলে দিয়েছে?
শ্রেণিকক্ষের আকাল: সংখ্যা যখন সংকটের আয়না
আমাদের প্রাথমিক শিক্ষার ভেতরের এই জীর্ণ কঙ্কালটিকে নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান (বিআইডিএস)-এর একটি সাম্প্রতিক জরিপ। দেড় হাজারের বেশি শিক্ষার্থীর ওপর চালানো এই গবেষণায় দেখা গেছে, তৃতীয় শ্রেণির প্রায় অর্ধেক শিশুই এখনো বাংলা বর্ণ ও শব্দ ঠিকঠাক চেনে না।
পড়ালেখার মূল ভিত্তিটাই যেখানে নড়বড়ে, সেখানে সাবলীল পড়ার ক্ষমতা আশা করা তো আরও আকাশচুম্বী। বিআইডিএস-এর জরিপ অনুযায়ী, তৃতীয় শ্রেণির ৭৬ শতাংশ এবং চতুর্থ শ্রেণির প্রায় ৭০ শতাংশ শিক্ষার্থী তাদের মাতৃভাষা বাংলাই ঠিকমতো পড়তে পারছে না। বিআইডিএস-এর গবেষণা পরিচালক এম এম জুলফিকার আলী যখন আগারগাঁওয়ে এক অনুষ্ঠানে এই ডেটা প্রকাশ করেন, তখন তা আসলে আমাদের পুরো প্রাথমিক শিক্ষা কাঠামোর ওপর এক মস্ত বড় প্রশ্নবোধক চিহ্ন ছুড়ে দেয়।
তবে এই অন্ধকার চিত্র শুধু দেশের ভেতরের গবেষণাতেই সীমাবদ্ধ নয়। বিশ্বব্যাংকের ২০২২ সালের এক প্রতিবেদন (যা কোভিড-পরবর্তী দীর্ঘ স্কুল বন্ধের প্রভাবকে আমলে নিয়ে তৈরি) অনুযায়ী, বাংলাদেশের ১০ বছর বয়সী শিশুদের ৭০ শতাংশ একটি সাধারণ লেখা পড়ে বুঝতে অক্ষম, যাকে বৈশ্বিক পরিভাষায় ‘লার্নিং পোভার্টি’ বা ‘শিক্ষা দারিদ্র্য’ বলা হয়। ২০২৪ সালের এপ্রিলে প্রকাশিত হালনাগাদ প্রতিবেদনে এই সূচকে কিছুটা উন্নতি (৫১ শতাংশ) লক্ষ্য করা গেলেও তা এখনো সন্তোষজনক নয়। কারন প্রতিবেদনটি বলছে, প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করার পরও দেশের ৫০ শতাংশ শিক্ষার্থীই ন্যূনতম দক্ষতার মান ছুঁতে পারছে না। আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, এই ব্যর্থতার হার মেয়েদের (৪৮%) তুলনায় ছেলেদের (৫৩%) মধ্যে বেশি।
প্রাতিষ্ঠানিক শূন্যতা বনাম সমান্তরাল কোচিং অর্থনীতি
সরকারি ও বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর ক্লাসরুমে পাঠদানের যে পদ্ধতিগত ব্যর্থতা, ঠিক তার সমান্তরালেই দেশের অলিগলিতে জন্ম নিয়েছে হাজারো কোচিং সেন্টার ও গাইড বইয়ের বাজার। ক্লাসরুমে যখন শিক্ষার্থীরা ভালো করে পড়া বুঝতে পারে না, তখন অভিভাবকরা বাধ্য হয় বিকল্প খুঁজতে। একাধিক গবেষণামূলক বিশ্লেষণ বলছে, দেশের সিংহভাগ শিক্ষার্থী এখন মূল পাঠ্যবই বা সৃজনশীল চিন্তার চেয়ে কোচিং সেন্টারের শিট আর গাইড বইয়ের ওপর শতভাগ নির্ভরশীল। শিক্ষাবিদদের মতে, এই সংস্কৃতি শিক্ষার্থীদের নিজস্ব চিন্তাশক্তি ও সৃজনশীলতাকে অঙ্কুরেই বিনষ্ট করে দিচ্ছে।
এই নির্ভরতার চূড়ান্ত রূপ দেখা যায় উচ্চ মাধ্যমিকের গণ্ডি পেরোনোর পর, বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষার মৌসুমে। অবাক করা বিষয় হলো, প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি নির্দেশিকাতেই সিলেবাস, প্রশ্নের ধরন এবং মানবন্টন স্পষ্টভাবে লেখা থাকে। বছরের পর বছর প্রায় একই ধাঁচের প্রশ্নে পরীক্ষাও হয়। অথচ, দেশের কোনো শিক্ষার্থীর এই সাহসটুকু হয় না যে তিনি কোচিংয়ের সাহায্য ছাড়া পরীক্ষায় বসবেন। ভর্তি কোচিং এখন উচ্চ মাধ্যমিকে পড়ার মতোই এক অলিখিত ‘আবশ্যিক’ শিক্ষাক্রম হয়ে দাঁড়িয়েছে। আর এই মনস্তাত্ত্বিক ভীতিকে পুঁজি করেই প্রতি বছর শত কোটি টাকার বাণিজ্য করে যাচ্ছে এই খাত।
গোড়ার গলদ: শিক্ষকদের ক্ষোভ ও বাণিজ্যিকীকরণ
তাহলে সমস্যাটা আসলে কোথায়? বিশ্লেষকরা এর পেছনে অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে দেখছেন শিক্ষকদের অত্যন্ত দুর্বল বেতন কাঠামোকে। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের একজন শিক্ষকের মাসিক বেতন বর্তমানের তীব্র মূল্যস্ফীতির বাজারে পরিবার নিয়ে স্বাভাবিক জীবনযাপনের জন্য যথেষ্ট নয়। একজন শিক্ষক যখন শ্রেণিকক্ষে তার মেধার সর্বোচ্চটা দিয়েও অর্থনৈতিকভাবে অনিশ্চিত থাকেন, তখন তার মনস্তত্ত্বে এক ধরনের হতাশা তৈরি হয়। জীবনধারণের তাগিদেই অনেক শিক্ষক তখন স্কুলের ক্লাসরুমের চেয়ে নিজের কোচিং সেন্টার বা প্রাইভেট টিউশনিতে বেশি মনোযোগী হতে বাধ্য হন। ফলস্বরূপ, শিক্ষা তার সামাজিক ও নৈতিক চরিত্র হারিয়ে রূপ নেয় এক খাঁটি মুনাফাভিত্তিক ব্যবসায়।
নারায়ণগঞ্জ শিল্পকলা একাডেমীতে এক মতবিনিময় সভায় শিক্ষা উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. চৌধুরী রফিকুল আবরার বলেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো যদি ক্লাসরুমে তাদের দায়িত্ব ঠিকঠাক পালন করত, তবে শিক্ষার্থীদের কোচিং সেন্টারে যাওয়ার কোনো প্রয়োজনই হতো না। এই স্বীকারোক্তি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এটি প্রমাণ করে যে, রাষ্ট্র সংকটটি জানে, তবে সেটি সমাধানের রাজনৈতিক সদিচ্ছা বা কার্যকর কৌশল গ্রহণের ক্ষেত্রে এখনও ঘাটতি রয়েছে।
রিট, কর্মশালা ও অন্তহীন আবর্ত
এই সংকট দূর করতে যে একেবারেই কোন চেষ্টা হয়নি, তা নয়। অভিভাবক ঐক্য ফোরামের রিট আবেদনের প্রেক্ষিতে উচ্চ আদালত সরকারি ও এমপিওভুক্ত স্কুলের শিক্ষকদের কোচিং বাণিজ্য বন্ধে প্রজ্ঞাপন জারির নির্দেশনা দিয়ে রুল জারি করেছিল। কিন্তু মাঠপর্যায়ে যথাযথ বাস্তবায়ন ও নজরদারির অভাবে এই নিষেধাজ্ঞা অনেকটা কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ রয়ে গেছে। এছাড়া এই সমস্যা সমাধানে সরকার সম্প্রতি জুন মাসে ইউনিসেফ ও গ্লোবাল পার্টনারশিপ ফর এডুকেশন (জিপিই)-এর সহযোগিতায় ‘বাংলাদেশ এডুকেশন সেক্টর অ্যানালাইসিস ২০২৬’ এর একটি যাচাই কর্মশালা আয়োজন করেছিল।
তবে হতাশার কথা এই যে, বছরের পর বছর ধরে এই ধরনের কর্মশালা, আইনি রুল কিংবা নীতিগত প্রতিশ্রুতি আমরা কম দেখিনি। কিন্তু কাজের কাজ তেমন কিছুই হয়নি। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার মান বাড়েনি, কমেনি কোচিং-নির্ভরতাও। এটি স্পষ্ট করে নীতি প্রণয়ন আর মাঠপর্যায়ে তা বাস্তবায়নের মধ্যে এখনও এক বিশাল ফাঁক রয়ে গেছে। অর্থাৎ, যতদিন না শিক্ষকদের সামাজিক মর্যাদা, বেতন কাঠামো এবং শ্রেণিকক্ষের পাঠদানের মানোন্নয়নে মৌলিক সংস্কার আসছে, ততদিন এই সমান্তরাল কোচিং অর্থনীতি আরও শক্তিশালী হবে। অপরদিকে আমাদের মূল ধারার শিক্ষাব্যবস্থা ক্রমান্বয়ে তার উপযোগিতা হারাবে।
তথ্যসূত্র:
- প্রথম আলো — “তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির ৭০ শতাংশের বেশি শিক্ষার্থী ঠিকমতো পড়তে পারে না” (BIDS গবেষণা)
- World Bank — “70% of 10-Year-Olds now in Learning Poverty, Unable to Read and Understand a Simple Text” (২০২২)
- World Bank — “Bangladesh Learning Poverty Brief” (এপ্রিল ২০২৪)
- বাংলাদেশের শিক্ষা (bdeduarticle.com) — “কোচিং সেন্টার নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজন সুস্পষ্ট ও কার্যকর নীতিমালা”
- ThinkBengal — “শীর্ষ কোচিং সেন্টারগুলির রুট ম্যাপ”
- দৈনিক জনকণ্ঠ — “কোচিং নির্ভরতা: শিক্ষার গুণগত মান হ্রাস পাচ্ছে!”
- UNICEF Bangladesh — “Validation workshop: Bangladesh Education Sector Analysis 2026”
