১৯২৯ সাল। নিউ ইয়র্ক শহর।
ইস্টার প্যারেড চলছে। রাস্তায় হাজারো মানুষ, সাংবাদিক, ক্যামেরা। হঠাৎ একদল তরুণী প্যারেডের মাঝখানে দাঁড়িয়ে সিগারেট ধরালেন। সেই যুগে ব্যাপারটা ছিল অকল্পনীয়। নারীরা প্রকাশ্যে ধূমপান করে না — এটাই ছিল সমাজের নিয়ম।
সাংবাদিকরা ছুটে গেলেন। ছবি উঠল। প্রশ্ন করা হলো — এটা কী? তরুণীরা উত্তর দিলেন, এগুলো সিগারেট নয়। এগুলো “স্বাধীনতার মশাল।”
পরদিন নিউ ইয়র্ক টাইমসের প্রথম পাতায় খবর ছাপা হলো। সারা দেশে আলোচনা শুরু হলো। নারীর অধিকার, নারীর মুক্তি, শতাব্দীর পুরোনো শৃঙ্খল ভাঙা। একটা স্বতঃস্ফূর্ত বিদ্রোহ। একটা ঐতিহাসিক মুহূর্ত।
শুধু একটা সমস্যা।
পুরোটাই সাজানো ছিল।
ওই তরুণীরা বিদ্রোহী ছিলেন না। তাঁদের ভাড়া করা হয়েছিল। সাংবাদিকদের আগে থেকেই খবর দিয়ে রাখা হয়েছিল, যেন তাঁরা ঠিক সময়ে ঠিক জায়গায় ক্যামেরা নিয়ে থাকেন।
আর যিনি পুরো ব্যাপারটা সাজিয়েছিলেন, তাঁর নাম ‘এডওয়ার্ড বার্নেইজ’। তিনি কাজ করছিলেন আমেরিকান টোব্যাকো কোম্পানির হয়ে।
কোম্পানির মালিক তাঁর সামনে আসল চ্যালেঞ্জটি তুলে ধরেছিলেন। হিসেবটা সহজ—নারীরা ঘরের চারদেওয়ালে ঠিকই সিগারেট খায়, কিন্তু জনসমক্ষে বা রাস্তায় খাওয়ার সামাজিক সাহস পায় না। ফলে সম্ভাব্য বাজারের প্রায় অর্ধেকটাই অব্যবহৃত থেকে যাচ্ছে। এই সামাজিক ট্যাবু ভেঙে সেই বিশাল বাজার উন্মুক্ত করার পথ কী?
বার্নেইজ সোজাসুজি সিগারেট বিক্রির পথে হাঁটলেন না। বরং, তিনি দ্বারস্থ হলেন এক মনোবিজ্ঞানীর। তার জিজ্ঞাস্য ছিল—নারীদের সাব-কনশাস মাইন্ডে সিগারেটের প্রকৃত অর্থ কী? উত্তর যা এলো, তা এক কথায় বৈপ্লবিক: পুরুষের সমঅধিকার, ক্ষমতা আর মুক্তির প্রতীক। ব্যস, এটুকুই দরকার ছিল বার্নেইজের; তিনি তার কাঙ্খিত সূত্রটি পেয়ে গেলেন।
আর এই পুরো খেলার সবচেয়ে মোক্ষম কৌশলটা কী ছিল জানেন?
তৎকালীন কোনো খবরের কাগজে বার্নেইজের নাম প্রকাশ পায়নি, এমনকি এর পেছনে যে তামাক কোম্পানি রয়েছে, তারও কোনো চিহ্ন রাখা হয়নি। সাধারণ পাঠক পত্রিকা খুলে দেখল—আমেরিকার নারীরা যেন নিজেদের অধিকার আদায়ে স্বতঃস্ফূর্তভাবে রাজপথে বিদ্রোহ ঘোষণা করেছে!
কিন্তু পর্দার অন্তরালে থেকে এই সাজানো ‘বিদ্রোহে’র সমস্ত খরচ ও কলকাঠি কে নেড়েছিল, তা কেউ টের পেল না।
এই লোকটা সম্পর্কে আরেকটা কথা জেনে রাখুন।
এডওয়ার্ড বার্নেইজ ছিলেন ‘সিগমুন্ড ফ্রয়েডের’ ভাগ্নে — সেই ফ্রয়েড, যিনি মানুষের সাব-কনশাস মাইন্ড নিয়ে গবেষণা করেছিলেন।
মামার আবিষ্কারগুলোকে ভাগ্নে কাজে লাগালেন বাণিজ্যিক ব্যবসায়।
আর এ কাজটি তিনি গোপনে করেননি। নিজের এই মনস্তাত্ত্বিক কৌশল নিয়ে তিনি আস্ত একটি বই-ই লিখে ফেললেন, যার নাম—”প্রোপাগান্ডা” (Propaganda)। সেখানে তিনি অকপটে লিখেছিলেন: জনমতকে সচেতন ও বৈজ্ঞানিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করাই হলো আধুনিক গণতান্ত্রিক সমাজের ‘অদৃশ্য সরকার’ (Invisible Government)।
এই কৌশলটির তিনি একটি চমৎকার নামও দিয়েছিলেন—”Engineering of Concent”
শব্দ দুটোর গভীরতা একটু ভেবে দেখুন—
Concent (সম্মতি): অর্থাৎ, সিদ্ধান্তটি আপনি নিজেই নিচ্ছেন, কেউ আপনাকে বাধ্য করছে না।
Engineering (প্রকৌশল): অর্থাৎ, আপনার সেই সিদ্ধান্ত নেওয়া বা রাজি হওয়াটা আগে থেকেই অন্য কেউ অত্যন্ত নিখুঁতভাবে ডিজাইন করে রেখেছিল।
আপনি মনে করছেন এটি আপনার সম্পূর্ণ স্বাধীন চিন্তা ও সিদ্ধান্ত; অথচ সত্য হলো, সিদ্ধান্তটি আগেই আপনার জন্য নির্ধারণ করা হয়ে গিয়েছিল, শুধু আপনার মুখ দিয়ে তা বলানো হলো আরকি।
আর এখানে একটা কথা সৎভাবে বলি।
কেউ কেউ দাবি করেন, এই একটা ঘটনাতেই নাকি সারা আমেরিকার নারীরা ধূমপান শুরু করে দিয়েছিলেন। কিন্তু আধুনিক গবেষক ও ঐতিহাসিকদের মতে, এই দাবিটি অনেকটাই অতিরঞ্জিত—বার্নেইজ নিজেও নিজের অর্জনের গল্পগুলো বাড়িয়ে বলতে ভালোবাসতেন।
কাজেই এই নির্দিষ্ট ঘটনার তাৎক্ষণিক প্রভাব নিয়ে বিতর্ক থাকতে পারে; কিন্তু তাঁর উদ্ভাবিত ‘মনস্তাত্ত্বিক কৌশল’ নিয়ে কোনো দ্বিমত নেই। কারণ, সেই কৌশলের মূলনীতিগুলো তিনি নিজেই বইয়ের পাতায় স্পষ্ট করে লিখে রেখে গেছেন।
আর সবচেয়ে চিন্তার বিষয় হলো—সেই কৌশলটি আজও চলছে, আরও সূক্ষ্ম ও নিখুঁতভাবে।
একটু চারপাশে খেয়াল করলেই তা বুঝতে পারবেন।
আজকের দিনে কেউ আপনাকে সরাসরি পণ্য বেচে না; তারা আপনাকে বেচে একটি ‘আইডেন্টিটি’ বা পরিচয়।
যেমন আপনার মোবাইল ফোনটা। ওটা শুধু যোগাযোগের মাধ্যম না, ওটা “আপনি কোন ক্লাসের মানুষ” তার প্রমাণ। আইফোন, ফ্লাগশিপ এন্ড্রয়েড, জেনারেল ফোন – সবই একেকটা আইডেনটিটি বহন করে।
সেইমভাবে পোশাকটা শুধু পোশাক না, ওটার মধ্যেও “আধুনিকতার” মিশেল আছে। এমনকি আপনার ব্যাড হাবিটটাও যেন আপনার স্বাধীনতার প্রতীক।
যে বিষয়টিকে সমাজ একসময় ক্ষতিকর বা লজ্জার মনে করত, সূক্ষ্ম প্রোপাগান্ডার মাধ্যমে সেটাকেই ধীরে ধীরে “সাহসিকতা”র রূপ দেওয়া হয়। যা নীতিগতভাবে ভুল ছিল, পরিভাষার জাদুতে সেটাকেই বানিয়ে ফেলা হয় “ব্যক্তিস্বাধীনতা”।
নামের বদল ঘটলে আমাদের কাছে ক্ষতিকর জিনিসটাও যেন হঠাৎ গ্রহণযোগ্য মনে হতে শুরু করে।
সিগারেটকে ‘স্বাধীনতার মশাল’ (Torches of Freedom) আখ্যা দিলে ধোঁয়াটা বিষহীন হয়ে যায় না, কিন্তু মানসিকভাবে তা গিলতে সুবিধা হয়।
আর এখানেই কুরআনের একটা কথা মনে পড়ে যায়।
আল্লাহ তাআলা কুরআনে শয়তানের প্ররোচনা দেওয়ার পদ্ধতি বোঝাতে বারবার একটি শব্দ ব্যবহার করেছেন—‘যাইয়্যানা’ (زَيَّنَ)। এর অর্থ হলো: কোনো মন্দ বা ক্ষতিকর বিষয়কে চোখধাঁধানোভাবে সুন্দর ও আকর্ষণীয় করে সাজিয়ে উপস্থাপন করা।
আল্লাহ বলেন,
“আর শয়তান তাদের কাছে তাদের কাজগুলোকে সুশোভিত করে দিয়েছিল।”
(সূরা আনফাল, ৮:৪৮)
খেয়াল করুন, আল্লাহ বলেননি শয়তান মানুষকে জোর করে। শয়তানের হাতে জোর করার ক্ষমতা নেই। তার একটাই অস্ত্র — মানুষের কাছে খারাপ জিনিসটাকে সুন্দর মোড়কে করে সাজিয়ে দেওয়া।
সে বলে না “চলো পাপ করি।” সে বলে “এটাই তো স্বাধীনতা।” “এটাই তো আধুনিকতা।” “সবাই তো করছে। তুমি কেন পিছিয়ে থাকবে?”
ঠিক যেন একজন দক্ষ প্রোপাগান্ডিস্ট বা মার্কেটারের মতো।
তার মানে কৌশলটা নতুন না। এটা বার্নেইজের আবিষ্কার নয়। তিনি কেবল শয়তানের ব্যবহৃত এই হাজার বছরের পুরোনো কৌশলটিকেই বিজ্ঞানের মোড়ক দিয়েছিলেন।
তাহলে এই বিভ্রান্তির যুগে আমাদের করণীয় কী?
একটা প্রশ্ন করতে শিখুন। শুধু একটা।
যখনই কোনো চিন্তা, ট্রেন্ড বা ফ্যাশন আপনার সামনে খুব সুন্দর করে সাজিয়ে আনা হবে—নিজেকে থামিয়ে জিজ্ঞেস করুন: “এই সাজানো দৃশ্যটার পেছনের কলকাঠি কে নাড়ছে?”
এই ট্রেন্ডটা জনপ্রিয় হওয়ার পেছনে কার মূল লাভ হচ্ছে? এই “স্বাভাবিক” মনে হওয়া জিনিসটি ঠিক কবে থেকে এবং কার স্বার্থে স্বাভাবিক হয়ে উঠল?
আল্লাহ আমাদের সতর্ক থাকতে বলেছেন —
“হে ঈমানদারগণ, যদি কোনো ফাসেক তোমাদের কাছে কোনো সংবাদ নিয়ে আসে, তাহলে তোমরা তা যাচাই করে নাও।”
(সূরা হুজুরাত, ৪৯:৬)
যাচাই করো। এটি কেবল কোনো সাধারণ পরামর্শ নয়; এটি স্রষ্টার সরাসরি নির্দেশ।
আল্লাহ আমাদের এই সাজানো দুনিয়ার বাহ্যিক চাকচিক্য ভেদ করে আসল সত্যকে দেখার দৃষ্টি দান করুন। আর যা কেবল সুন্দর দেখায়, আর যা সত্যিই সুন্দর ও কল্যাণকর—এই দুটোর আসল পার্থক্য বোঝার তাওফিক দান করুন।
আমীন। ![]()
-আবু মুহাম্মদ রাফিউজ্জামান
