সৌদি আরবে ৩৫ বছর পর ফিরেছে সিনেমা হল
সৌদি আরবে ১৯৮০-এর দশকের শুরু থেকে প্রায় ৩৫ বছর বাণিজ্যিক সিনেমা প্রদর্শন বন্ধ ছিল। ২০১৭ সালের ডিসেম্বরে দেশটির সরকার সিনেমা হল পরিচালনার অনুমতি দেওয়ার ঘোষণা দেয়। এর ধারাবাহিকতায় ২০১৮ সালের ১৮ এপ্রিল রিয়াদে প্রথম বাণিজ্যিক সিনেমা প্রদর্শিত হয়।
ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমানের ঘোষিত ভিশন ২০৩০ কর্মসূচির আওতায় দেশটির অর্থনীতি ও সমাজব্যবস্থায় বৈচিত্র্য আনার অংশ হিসেবে এই পরিবর্তন আনা হয়।
এরপর থেকে সৌদি আরবে সিনেমা হল, কনসার্ট, সংগীত উৎসব, খেলাধুলা, পর্যটন এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বিনোদন আয়োজনের প্রসার ঘটেছে। হলিউডসহ বিভিন্ন দেশের সিনেমা দেশটির প্রেক্ষাগৃহে প্রদর্শিত হচ্ছে।
সৌদি ফিল্ম কমিশনের ২০২৫ সালের বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওই বছর দেশটিতে ৬২টি সিনেমা হল এবং ৬০৩টি স্ক্রিন চালু ছিল। প্রদর্শিত হয় ৫৩৮টি সিনেমা। টিকিট বিক্রি হয় ১ কোটি ৮৮ লাখ এবং বক্স অফিস আয় দাঁড়ায় প্রায় ৯২১ মিলিয়ন সৌদি রিয়ালে।
উল্লেখ্য, ৩৫০টি সিনেমা হলের সংখ্যাটি সৌদি আরবের বর্তমান বাস্তব চিত্র নয়। ২০২১ সালে জার্মান সংবাদমাধ্যম ডয়চে ভেলের এক প্রতিবেদনে ২০৩০ সালের মধ্যে প্রায় ৩৫০টি সিনেমা হল প্রতিষ্ঠার সম্ভাব্য লক্ষ্যমাত্রার কথা বলা হয়েছিল।
মধ্যপ্রাচ্যে ভিন্নধর্মীদের উৎসবের আয়োজন
মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশে বসবাসরত ভারতীয় ও অন্যান্য হিন্দু সম্প্রদায়ের ধর্মীয় উৎসব পালনের সুযোগ রয়েছে। বিশেষ করে সংযুক্ত আরব আমিরাতে বিভিন্ন ধর্ম ও সংস্কৃতির মানুষের উৎসব উদযাপনে সরকারি পর্যায়েও অংশগ্রহণ দেখা যায়।
আবুধাবিতে অবস্থিত বোচাসনবাসী অক্ষর পুরুষোত্তম স্বামীনারায়ণ সংস্থা (BAPS) হিন্দু মন্দিরটি ২০২৪ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করা হয়। এটি মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ হিন্দু উপাসনালয়।
আবুধাবির কমিউনিটি ডেভেলপমেন্ট বিভাগ ২০২২ সালে ভারতীয় সম্প্রদায়ের সঙ্গে দীপাবলি উদযাপনে অংশ নেয়। সংস্থাটির প্রকাশিত বিবৃতিতে বলা হয়, বিভিন্ন সম্প্রদায়ের সাংস্কৃতিক উৎসবে অংশগ্রহণ সামাজিক সম্প্রীতি, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহাবস্থানকে শক্তিশালী করে।
এ ছাড়া আবুধাবির সরকারি পর্যটন ওয়েবসাইটেও দীপাবলি উদযাপনের বিভিন্ন আয়োজনের তথ্য রয়েছে।
এছাড়া মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে হ্যালোইন, ক্রিসমাস ও ভ্যালেন্টাইনস ডের মতো ইসলামি ঐতিহ্যের বাইরের আন্তর্জাতিক উৎসবের আয়োজন বেড়েছে। সৌদি আরবের রিয়াদ সিজনে হ্যালোইন উপলক্ষে বিশেষ আয়োজন, সংযুক্ত আরব আমিরাতের বিভিন্ন শপিংমল ও বিনোদনকেন্দ্রে হ্যালোইন উৎসব, পাশাপাশি দুবাইয়ে ক্রিসমাস ও ভ্যালেন্টাইনস ডে ঘিরে নানা অনুষ্ঠান ও বাণিজ্যিক আয়োজন দেখা যায়। কাতার, বাহরাইন ও ওমানেও হ্যালোইনকেন্দ্রিক অনুষ্ঠান হচ্ছে। এসব আয়োজন মধ্যপ্রাচ্যের কিছু দেশে আন্তর্জাতিক পর্যটন ও বিনোদন সংস্কৃতির প্রসারের পাশাপাশি পশ্চিমা সাংস্কৃতিক প্রভাবের উপস্থিতিও তুলে ধরে।
ভারতে মুসলিমদের বাড়িঘর বুলডোজার দিয়ে উচ্ছেদ নিয়ে উদ্বেগ
অন্যদিকে ভারতে মুসলিমদের বাড়িঘর, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও ধর্মীয় স্থাপনা বুলডোজার দিয়ে উচ্ছেদের ঘটনা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলোর সমালোচনার মুখে পড়েছে।
২০২৪ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে ২০২২ সালের এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত ভারতের পাঁচটি রাজ্য—আসাম, দিল্লি, গুজরাট, মধ্যপ্রদেশ ও উত্তরপ্রদেশে ১২৮টি সম্পত্তি উচ্ছেদের ঘটনা বিশ্লেষণ করা হয়।
সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, এসব উচ্ছেদে অন্তত ৬১৭ জন ক্ষতিগ্রস্ত হন। তাদের অনেকেই মুসলিম পরিবারের সদস্য। সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষ ও প্রতিবাদের পর এসব উচ্ছেদের ঘটনা ঘটেছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
অ্যামনেস্টির অভিযোগ, অনেক ক্ষেত্রে যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে মুসলিমদের বাড়িঘর ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান উচ্ছেদ করা হয়েছে। সংস্থাটি এসব ঘটনাকে সম্মিলিত শাস্তি ও জোরপূর্বক উচ্ছেদের উদাহরণ হিসেবে বর্ণনা করে।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচের ২০২৫ সালের ভারতবিষয়ক প্রতিবেদনেও একই ধরনের উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। সংস্থাটি জানায়, ২০২৪ সালে কয়েকটি রাজ্যে মুসলিমদের বাড়িঘর, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও উপাসনালয় যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া ছাড়াই ভেঙে ফেলা হয়েছে।
বিষয়টি ভারতের সুপ্রিম কোর্টেও গড়ায়। ২০২৪ সালের ১৩ নভেম্বর আদালত স্পষ্ট করে দেয়, অপরাধে অভিযুক্ত বা দোষী সাব্যস্ত হওয়ার কারণে কারও বাড়িঘর যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া ছাড়া ভেঙে ফেলা যাবে না। এ ধরনের উচ্ছেদের ক্ষেত্রে আগাম নোটিশসহ একাধিক সুরক্ষামূলক নির্দেশনা দেওয়া হয়।
গরু জবাই ও গরুর মাংসকে কেন্দ্র করে সহিংসতা
ভারতে গরু জবাই এবং গরুর মাংস বিক্রির বিষয়ে রাজ্যভেদে বিভিন্ন আইন রয়েছে। দেশটির অধিকাংশ রাজ্যেই গরু জবাইয়ের ওপর কোনো না কোনো ধরনের নিষেধাজ্ঞা বা কঠোর বিধিনিষেধ কার্যকর রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসনাল রিসার্চ সার্ভিসের ভারতবিষয়ক ধর্মীয় স্বাধীনতা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভারতের ২৮টি রাজ্যের মধ্যে ২৫টিতে গরু বা নির্দিষ্ট ধরনের গবাদিপশু জবাইয়ের ওপর উল্লেখযোগ্য বিধিনিষেধ রয়েছে। আইন ভঙ্গের ক্ষেত্রে রাজ্যভেদে কারাদণ্ড ও জরিমানার বিধান রয়েছে।
তবে শুধু আইনগত নিষেধাজ্ঞাই নয়, গরুর মাংস খাওয়া বা গবাদিপশু পরিবহনের অভিযোগকে কেন্দ্র করে উগ্রবাদী গোষ্ঠীর হামলার ঘটনাও উদ্বেগ তৈরি করেছে।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচের ২০২৫ সালের প্রতিবেদনে ২০২৪ সালের জুন থেকে আগস্ট পর্যন্ত গরুর মাংস খাওয়া কিংবা গরু জবাইয়ের জন্য পরিবহনের সন্দেহে মুসলিমদের ওপর হামলার একাধিক ঘটনা তুলে ধরা হয়।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ২০২৪ সালের আগস্টে হরিয়ানায় পশ্চিমবঙ্গের এক মুসলিম অভিবাসী শ্রমিককে গরুর মাংস খাওয়ার অভিযোগে স্থানীয় হিন্দু উগ্রবাদীরা হত্যা করে। একই মাসে মহারাষ্ট্রে ট্রেনে গরুর মাংস বহনের সন্দেহে ৭২ বছর বয়সী এক মুসলিম ব্যক্তিকে মারধর ও হয়রানি করা হয়।
এসব ঘটনা ভারতের ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি করেছে।
পশ্চিমবঙ্গে কোরবানির পশু জবাই নিয়ে ২০২৬ সালের বিতর্ক
পশ্চিমবঙ্গেও ২০২৬ সালের কোরবানির ঈদকে কেন্দ্র করে পশু জবাইসংক্রান্ত বিধিনিষেধ নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়।
দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের ২২ মে ২০২৬-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, রাজ্য সরকার ১৩ মে গবাদিপশু জবাইয়ের ক্ষেত্রে উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে ফিট সার্টিফিকেট নেওয়ার নির্দেশনাসহ একটি বিজ্ঞপ্তি জারি করে। নির্দেশনা অমান্য করলে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও বলা হয়।
বিষয়টি কলকাতা হাইকোর্টে গড়ায়। আদালত বিজ্ঞপ্তি স্থগিত করতে অস্বীকৃতি জানালেও ঈদুল আজহা উপলক্ষে কোনো ছাড় দেওয়া যায় কি না, তা বিবেচনার জন্য রাজ্য সরকারকে নির্দেশ দেয়। একই সঙ্গে প্রকাশ্য স্থানে পশু জবাই নিষিদ্ধ করার বিষয়টি বিজ্ঞপ্তিতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করতে বলে।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে: আদালতের নির্দেশ বা সরকারি বিজ্ঞপ্তি থেকে পশ্চিমবঙ্গে মুসলমানদের কোরবানি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। বরং পশু জবাইয়ের ক্ষেত্রে সরকারি অনুমোদন, স্বাস্থ্যসংক্রান্ত শর্ত এবং প্রকাশ্য স্থানে জবাইয়ের বিধিনিষেধ নিয়ে এই বিতর্ক তৈরি হয়েছিল।
‘জয় শ্রীরাম’ বলতে বাধ্য করা ও ধর্মীয় বিদ্বেষমূলক হামলা
ভারতে ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে মুসলিমদের ওপর হামলা এবং ধর্মীয় স্লোগান দিতে বাধ্য করার অভিযোগও বিভিন্ন সময়ে সামনে এসেছে।
২০২৪ সালের ২২ জানুয়ারি অযোধ্যায় রামমন্দির উদ্বোধনের দিন দেশটির বিভিন্ন রাজ্যে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা ও সহিংসতার ঘটনা ঘটে।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচ ৩১ জানুয়ারি ২০২৪ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জানায়, রামমন্দির উদ্বোধনকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন স্থানে হিন্দুত্ববাদী মিছিল থেকে মুসলিমদের ওপর হামলা, হুমকি ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে।
প্রতিবেদনে মহারাষ্ট্রের একটি ঘটনার বিবরণ দেওয়া হয়। সেখানে আবদুল হক চৌধুরী নামের এক ব্যক্তি অভিযোগ করেন, তাঁর ছেলেকে ও কয়েকজন শ্রমিককে হামলাকারীরা ‘জয় শ্রীরাম’ বলতে বাধ্য করার চেষ্টা করে। তারা রাজি না হওয়ায় মারধর করা হয় বলে তিনি জানান।
এ ছাড়া কর্ণাটকে এক দলিত কিশোরকে ‘জয় শ্রীরাম’ বলতে বাধ্য করার অভিযোগে হামলার ঘটনাও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

