আফগানিস্তানে একদিক দিয়ে শেষ মার্কিন সেনাদল ও সামরিক সরঞ্জাম বেরিয়ে যাচ্ছে, আর অন্যদিক দিয়ে তালিবানরা ক্রমশ কাবুলের দিকে এগিয়ে আসছে। কিছু গোয়েন্দা বিশ্লেষণে বলা হয়েছে যে, ৬ মাস থেকে ২ বছরের মধ্যে দেশটিতে যুক্তরাষ্ট্র সমর্থিত প্রেসিডেন্ট আশরাফ গনির সরকার তালিবানদের চাপে পড়তে পারে এবং সরকার পতন ঘটতে পারে। যদি তা ঘটে, তাহলে দেশটির শাসনতন্ত্রের সাম্প্রতিক ইতিহাস অনুযায়ী গণি এবং তার অনুসারীদের অত্যন্ত মারাত্মক পরিণতি হতে পারে।
মে মাসের শুরু থেকেই আফগানিস্তানের উত্তরে বেশিরভাগ অঞ্চল এবং কিছু প্রাদেশিক রাজধানীসহ দেশটির ৪শ’ ২১টিরও বেশি জেলা তালেবানরা দখল করে নিয়েছে। কিছু স্থানে গোলাবারুদ ও প্রয়োজনীয় রসদ শেষ হয়ে যাওয়ায় সরকারি বাহিনী বিনা লড়াইয়ে তালিবানদের কাছে আত্মসমর্পণ করছে যেহেতু সরকার বেশিরভগ সময় তাদের সরঞ্জাম ও বাড়তি সেনা সরবরাহ করছে না।
পাশাপাশি, আফগান সেনাদের বিশেষ সামরিক ট্রাক, অস্ত্র এবং গোলাবারুদগুলো তালিবানদের হাতে পড়ছে, যেগুলো তারা বিজয়ের নজির হিসাবে সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রকাশিত ভিডিওগুলোতে প্রদর্শন করছে। অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল হাদি খালিদ বলেন, ‘এটি একক ব্যক্তির বিষয় নয়, এটি নেতৃত্বের বিষয়।’ দেশটিতে বসবাসরত আফগান নাগরিক জুবায়ের আহমদ অন্যদের সাথে একমত হয়ে শঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, ‘ভবিষ্যতের কোনো আশা নেই। আফগানরা দেশ ছাড়ছে। আমি এখন থেকে ১০ মিনিট পর নিরাপদ থাকব কিনা তা আমি জানি না।’ প্রকৃতই আফগান সরকারের প্রথম মারাত্মক দুর্বলতাটি বছরের পর বছর ধরে প্রকট আকার ধারণ করেছে। এবং এ জাতীয় সঙ্কটের সময়ে সৈন্য ও নাগরিকদের ওপর হামলার ঘটনা থেকে তাদের বিচ্ছিন্ন বলে মনে হচ্ছে। এসব নিয়ে মাথা ঘামানোর পরিবর্তে কাবুলের ধনী এলাকাগুলোতে প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার ডলার পর্যন্ত জুয়ার আসরে মগ্ন থাকেন দেশটির বহু উচ্চ পদস্থ সরকারি কর্মকর্তা। আসরগুলোতে উপস্থিত বেশ কয়েকজন লোক এমনটাই জানিয়েছেন নিউইয়র্ক টাইমসকে।
কাবুলের আত্মঘাতী বোমা হামলায় নিহত প্রায় ৭০ স্কুলছাত্রীর গত মে’র মৃত্যুবার্ষিকীতে কোনো কর্মকর্তাই উপস্থিত হননি। ফলস্বরূপ, আফগানিস্তানের নাগরিকরা অন্ধকারে, চিন্তিত এবং দ্রুত গনির প্রতি আস্থা হারাচ্ছে। তারা নিজেদের রক্ষা করতে বিভিন্ন নৃগোষ্ঠী এবং আঞ্চলিক দলে জোটবদ্ধ হয়ে তালিবানদের বিরুদ্ধে স্বেচ্ছাসেবামূলক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। আফগানিস্তানের প্রাক্তন উপ-প্রতিরক্ষামন্ত্রী জেনারেল হিলালুদ্দীন হিলাল বলেন, ‘আজ আমরা যেখানে রয়েছি সরকার আমাদের যেখানে দাঁড় করিয়েছে, আমেরিকানরা চলে গেলে তাদের কৌশলগত পরিকল্পনা নেই।’
গনির বর্তমান ও প্রাক্তন সহযোগীরা বলছেন যে, মাঝে মাঝে অর্থনীতি বা দুর্নীতি সম্পর্কে ঘোষণা দেয়া ছাড়া তিনি বেশিরভাগ ক্ষেত্রে জনসাধারণের মধ্যে অনুপস্থিত। গনির বেশ কয়েকজন প্রাক্তন সহযোগী পশ্চিমা শিক্ষিত পরামর্শদাতাদের একটি ক্ষুদ্র বৃত্তের ওপর তার নির্ভরতার সমালোচনা করেছেন। তারা উল্লেখ করেছেন যে, মন্ত্রী পরিষদের সদস্যরা তার চিৎকার করার প্রবণতার কারণে তার বিরোধিতা করতে ভয় পান। প্রাক্তন অর্থমন্ত্রী জাখিলওয়ালসাইদ বলেন, ‘এ কারণেই আমরা আফগানিস্তানজুড়ে সৈন্যদের আত্মসমর্পণ করতে দেখছি।’
এ অরাজকতাটি আফগানিস্তানে এক সুদীর্ঘ এবং ধ্বংসাত্মক গৃহযুদ্ধ ডেকে আনার জন্য এতটাই উস্কানিমূলক যে, অনেকেই আশঙ্কা করছেন, এটি দেশটিতে আসন্ন বৃহত্তর বিশৃঙ্খলার সূতিকাগার। এ মুহূর্তে সেখানে তালিবানদের বিরুদ্ধে কোনো কার্যকর নেতৃত্ব নেই। হিলাল বলেন, ‘পরিবেশ অত্যন্ত উত্তেজনাপূর্ণ। আফগানিস্তানের প্রাক্তন অর্থমন্ত্রী ওমর জাখিলওয়াল দেশটির সার্বিক পরিস্থিতিকে একটি সঙ্কটের থেকেও মারাত্মক সঙ্কট বলে অভিহিত করেছেন। সূত্র : দ্য নিউইয়র্ক টাইমস।
