গত ২১ নভেম্বর চট্টগ্রাম অঞ্চলের প্রবীণ আলেম শায়খুল হাদিস মাওলানা ফজলুল্লাহ (রহ.) ইন্তেকাল করেন। তিনি জীবনের অর্ধশতাব্দীকালের বেশি সময় হাদিস অধ্যয়ন ও অধ্যাপনায় নিয়োজিত ছিলেন। তাই মুহাদ্দিস সাহেব নামে তিনি পরিচিত ছিলেন। ইলম, আমল, তাকওয়া, প্রজ্ঞা ও বিনয়ে এক অনুসরণীয় আলেম ছিলেন তিনি।
মাওলানা মুহাম্মদ ফজলুল্লাহ (রহ.) ১৩৬৩ হি. মোতাবেক ১৯৪৩ সালে চট্টগ্রামের বোয়ালখালী উপজেলার খরন্দীপের মুন্সীপাড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা মাওলানা আহমদুল্লাহ (রহ.) বুজুর্গ আলেম ছিলেন। প্রথম দিকে তাঁর পিতা জামিয়া ইসলামিয়া পটিয়ার শিক্ষক ছিলেন। পরবর্তী সময়ে খরন্দীপ এমদাদুল উলূম মাদরাসার মুহতামিম ছিলেন।
তাঁর মাতা ছিলেন জামিয়া ইসলামিয়া পটিয়া মাদরাসার প্রতিষ্ঠাতা আল্লামা মুফতি আজিজুল হক (রহ.)-এর আপন বোন। পিতা ও মাতা উভয় দিক দিয়ে ফজলুল্লাহ (রহ.) উঁচু বংশের অধিকারী ছিলেন। বংশপরিক্রমায় তাঁর পরিবার ইসলামের প্রথম খলিফা আবু বকর সিদ্দিক (রা.)-এর বংশধর।
পড়াশোনা : পারিবারিকভাবে মাওলানা ফজলুল্লাহ (রহ.)-এর প্রাথমিক দ্বিনি শিক্ষা শুরু হয়।
পাশাপাশি খরন্দীপ স্কুলে ষষ্ঠ শ্রেণি পর্যন্ত পড়েন। এরপর তাঁর পিতা ও মামার নির্দেশে তিনি পটিয়া মাদরাসায় পড়াশোনা শুরু করেন। ১৩৮৯ হিজরিতে তিনি কৃতিত্বের সঙ্গে দাওরায়ে হাদিস সম্পন্ন করেন। এরপর ফুনুনাত ও ফালসাফা তথা দর্শনশাস্ত্র নিয়ে পড়েন। অতঃপর পটিয়া মাদরাসার তৎকালীন মুহতামিম মাওলানা হাজি ইউনুস (রহ.)-এর পরামর্শে তিনি পাকিস্তানের জামিয়া আশরাফিয়া লাহোরে আবার দাওরায়ে হাদিস পড়েন।
সেখানে তিনি আল্লামা ইদরিস কান্ধলভি (রহ.), আল্লামা রাসুল খান (রহ.) প্রমুখ আলেমের কাছে হাদিস পড়েন।
শিক্ষকতা ও মাদরাসা পরিচালনা : মাওলানা ফজলুল্লাহ (রহ.) রাঙ্গুনিয়ার কোদালা আজিজিয়া কাসেমুল উলুম মাদরাসায় শিক্ষকতার মাধ্যমে কর্মজীবন শুরু করেন। সেখানে তিনি দীর্ঘ এগারো বছর শিক্ষকতার পাশাপাশি শিক্ষাপরিচালকের দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর নিজ এলাকা বোয়ালখালীতে ধর্মীয়ভাবে অনগ্রসর হওয়ায় সেখানে দ্বিনি মাদরাসা স্থাপনের প্রয়োজন ছিল। পরবর্তীতে পটিয়া মাদরাসার তৎকালীন মুহতামিম হাজী ইউনুস (রহ.) ও খরন্দীপ এলাকাবাসীর পরামর্শে কোদালা মাদরাসা থেকে অব্যাহতি নেন। এদিকে বাবুনগর মাদরাসার প্রতিষ্ঠাতা মাওলানা হারুন বাবুনগরি (রহ.) ও জিরি মাদরাসার সাবেক মুহতামিম মুফতি নুরুল হক (রহ.)-এর নির্দেশনায় মুন্সীপাড়ায় মাওলানা আবুল কালাম (রহ.) প্রতিষ্ঠিত ওয়াহেদীয়া আজিজুল উলুম মাদরাসায় শিক্ষকতা শুরু করেন। মাওলানা আবুল কালাম (রহ.)-এর সহযোগী হিসেবে তিনি ওই প্রতিষ্ঠানকে এগিয়ে নেওয়ার কার্যক্রম শুরু করেন। তাঁর কঠোর পরিশ্রমে কয়েক বছরের মধ্যেই দাওরায়ে হাদিস শুরু হয়। শুরু থেকেই তিনি সেখানে সহিহ বুখারি পাঠদান করাতেন এবং আমৃত্যু শায়খুল হাদিস হিসেবে ছিলেন। মাওলানা আবুল কালাম (রহ.)-এর ইন্তেকালের পর তিনি মুহতামিম হিসেবে দীর্ঘ পনের বছর দায়িত্ব পালন করেন। পাশাপাশি তিনি চট্টগ্রাম শহরের জামেয়া দারুল মা’আরিফ আল ইসলামিয়ায় অনেক বছর সহিহ বুখারির পড়াতেন।
আধ্যাত্মিক সম্পর্ক : মাওলানা ফজলুল্লাহ (রহ.) পড়াশোনা শেষ করে আধ্যাত্মিক উন্নতির লক্ষ্যে মাওলানা জমির উদ্দিন (রহ.)-এর খলিফা পটিয়া মাদরাসার তৎকালীন মুহতামিম হাজী ইউনুস (রহ.)-এর সান্নিধ্যে সময় কাটান। তাঁর ইন্তেকালের পর মাওলানা আলী আহমদ বোয়ালভি (রহ.)-এর সঙ্গে আধ্যাত্মিক সম্পর্ক গড়ে তুলেন এবং তাঁর কাছ থেকে ইজাজত লাভ করেন। এরপর তিনি হ্নীলার মাওলানা ইসহাক (রহ.) ও মাওলানা নুরুল ইসলাম জদিদ (রহ.)-এর কাছ থেকে খেলাফত লাভ করেন। কিন্তু বিনয় ও নিষ্ঠার জন্য তিনি সবসময় আধ্যাত্মিক সম্পর্ককে আড়ালে রাখতেন এবং সহজে কাউকে বাইয়াত করাতেন না। আধ্যাত্মিক জগতে উঁচু মর্যাদার অধিকারী হয়েও তিনি তা গোপন রাখতেন এবং ব্যাপক বাইয়াতের প্রতি অনাগ্রহী ছিলেন।
বিশেষ গুণাবলি : ছাত্র, শিক্ষক থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের সঙ্গে তাঁর আচরণ ছিল অতুলনীয়। তাঁর সুন্দর আচার ব্যবহারে মুগ্ধ হতো সবাই। মেহমানদারিতে তিনি ছিলেন অনন্য ব্যক্তিত্ব। কারণ তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে কেউ খালি মুখে ফিরতে পারত না। আমলের প্রতি খুবই যত্নবান ছিলেন তিনি। চরম অসুস্থতার মধ্যেও তিনি আলেমদের মধ্যে ‘মুস্তাজাবুদ দাওয়াহ’ তথা কবুল দোয়ার অধিকারী হিসেবে পরিচিত ছিলেন।
