যুক্তরাষ্ট্রে জব্দ থাকা আফগানিস্তানের অর্থ নাইন-ইলেভেনের ঘটনায় ভুক্তভোগীদের ক্ষতিপূরণে ব্যয় করার মার্কিন প্রশাসনের সিদ্ধান্তকে ‘চুরি’ ও ‘নৈতিক অবক্ষয়’ হিসেবে বর্ণনা করেছে আফগানিস্তানের ক্ষমতাসীন সশস্ত্র রাজনৈতিক দল তালেবান ।
শুক্রবার এক নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন ব্যাংকে থাকা আফগান সেন্ট্রাল ব্যাংকের সাত শ’ কোটি ডলার অর্থের অর্ধেক নাইন-ইলেভেনের ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য ব্যয় করার নির্দেশ দেন। বাকি অর্ধেক সম্পদ আফগানিস্তানে মানবিক সহায়তার জন্য ব্যয় করা হবে বলে আদেশে জানানো হয়।
২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্কে টুইন টাওয়ারখ্যাত ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার ও মার্কিন প্রতিরক্ষা দফতর পেন্টাগনে ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলার ঘটনা ঘটে। এই ঘটনাকেই সংক্ষেপে ‘নাইন-ইলেভেন’ বলে নির্দেশ করা হয়।
কাতারের দোহায় অবস্থিত তালেবানের রাজনৈতিক দফতরের মুখপাত্র মোহাম্মদ নাইম ওয়ারদক মার্কিন এই পদক্ষেপের প্রতিক্রিয়ায় এক টুইট বার্তায় একে ‘চুরি’ হিসেবে বর্ণনা করেন।
টুইট বার্তায় তিনি বলেন, ‘জব্দ থাকা আফগান জনগণের সম্পদ চুরি ও আত্মসাৎ করার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র দেশটির ও তার নাগরিকদের চূড়ান্ত মানবিক ও নৈতিক পতনের প্রমাণ দিলো। মানুষের ইতিহাস ও জীবনে জয়-পরাজয় স্বাভাবিক ঘটনা। কিন্তু একটি দেশের ও তার জনগণের জন্য চরমতম ও হীনতম পরাজয় হচ্ছে একইসাথে সামরিক ও নৈতিক পরাজয়ের অভিজ্ঞতা।’
অপরদিকে জাতিসঙ্ঘের জন্য তালেবানের নির্ধারিত প্রতিনিধি সুহাইল শাহিন মার্কিন পদক্ষেপেরর নিন্দা জানিয়ে শিগগিরই আফগানিস্তানের সম্পদ অবমুক্ত করার আহ্বান জানান।
শুক্রবার এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, ‘এই তহবিল আফগানিস্তান ব্যাংকের সম্পদ এবং এই বিবেচনায় তা আফগানিস্তানের সাধারণ মানুষের সম্পদ। আফগানিস্তানের ব্যাংকের পুরো এই তহবিলের আমরা অবমুক্তি চাই।’
এদিকে আফগানিস্তানের এই সম্পদকে নাইন-ইলেভেনের ভুক্তভোগীদের ক্ষতিপূরণে ব্যবহারের এই সিদ্ধান্তের নিন্দা করছেন আরো অনেকেই।
আফগান বংশদ্ভুত মার্কিন অধিকারকর্মী বিলাল আসকারিয়ার কাতারভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আলজাজিরাকে বলেন, ‘নাইন-ইলেভেনের সাথে আফগান জনগণের কোনো সংযোগ নেই। এটিই নিরেট সত্য।’
তিনি বলেন, ‘নাইন-ইলেভেনের ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর প্রতি বাইডেনের এই প্রস্তাব ন্যায়বিচার নয়, এটি যুক্তরাষ্ট্রের দুর্দশামূলক প্রত্যাহারের ফলে সৃষ্ট দুর্ভিক্ষ ও ক্ষুধার ইতোমধ্যেই মুখোমুখি হওয়া অনুন্নত এক জাতির সাধারণ তহবিল চুরি।’
অপরদিকে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক অধিকার সংস্থা আফগানস ফর বেটার টুমরোর সহপ্রতিষ্ঠাতা হালিমা ওয়ালি বলেছেন, এই অর্থ আফগান সেন্ট্রাল ব্যাংকের যার মালিক আফগানিস্তানের জনসাধারণ।
আলজাজিরাকে তিনি বরেন, ‘এটি সম্পূর্ণ মর্মান্তিক। এর অর্থ যেনো আফগানিস্তানের সেন্ট্রাল ব্যাংক কোনো ফ্যাংশনে নেই কিন্তু আমরা ক্ষুধার্সত জনগণের খাদ্যের জন্য কিছু অর্থ রাখছি। আমার মনে হয়, সর্বোপরি এই সিদ্ধান্ত দুরদৃষ্টিহীন।’
এর আগে গত বছরের আগস্টে তালেবান যোদ্ধারা আফগানিস্তানের প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণ নেয়ার পর যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশে থাকা আফগানিস্তানের সম্পদ জব্দ করা হয়। একইসাথে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও বিশ্বব্যাংক যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশটিতে তাদের সহায়তামূলক কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়।
যুক্তরাষ্ট্রে জব্দ থাকা আফগানিস্তানের সম্পদ ক্ষতিপূরণ হিসেবে দাবি করে মার্কিন আদালতে একটি মামলার শুনানি চলছে। নাইন-ইলেভেনের ক্ষতিগ্রস্তরা ওই অর্থ দাবি করে মামলাটি করেছিলেন।
তবে মামলার রায় যাই হোক না কেন, নাইন-ইলেভেনের ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য অর্ধেক অর্থ ব্যয় করা হবে বলে হোয়াইট হাউজ থেকে জানানো হয়েছে।
২০০১ সালে যুক্তরাষ্ট্রে নাইন-ইলেভেনের সন্ত্রাসী হামলার জেরে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ হামলার জন্য আফগানিস্তানে আশ্রয়ে থাকা আলকায়েদা প্রধান ওসামা বিন লাদেনকে দায়ী করেন। ওই সময় আফগানিস্তানের ক্ষমতাসীন তালেবান সরকারের কাছে ওসামা বিন লাদেনকে মার্কিন প্রশাসনের হাতে তুলে দেয়ার দাবি জানান বুশ।
তালেবান সরকার ওসামা বিন লাদেনকে তুলে দেয়ার পরিবর্তে যুক্তরাষ্ট্রে সন্ত্রাসী হামলার সাথে তার সংশ্লিষ্টতার বিষয়ে মার্কিনিদের কাছে প্রমাণ চায়। প্রমাণ ছাড়া তারা ওসামা বিন লাদেনকে মার্কিন প্রশাসনের কাছে তুলে দিতে অস্বীকৃতি জানায়।
বুশ প্রশাসন ও তালেবানের মধ্যে বিরোধের জেরে ২০০১ সালের অক্টোবরে আফগানিস্তানে আগ্রাসন শুরু করে মার্কিন বাহিনী। অত্যাধুনিক সমরাস্ত্রসজ্জ্বিত মার্কিন সৈন্যদের হামলায় তালেবান সরকার পিছু হটতে বাধ্য হয়।
তবে একটানা দুই দশক যুদ্ধ চলতে থাকে দেশটিতে।
এরইমধ্যে আফগান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে ন্যাটো জোটের সদস্য দেশগুলোও যুক্ত হয়। মার্কিনিদের সমর্থনে নতুন প্রশাসন ও সরকার ব্যবস্থা গড়ে উঠে দেশটিতে।
২০১১ সালের ২ মে পাকিস্তানের অ্যাবোটাবাদে মার্কিন সৈন্যদের এক ঝটিকা অভিযানে নিহত হন ওসামা বিন লাদেন। ২০১৩ সালে অজ্ঞাতবাসে তালেবানের প্রতিষ্ঠাতা মোল্লা মোহাম্মদ ওমরেরও মৃত্যু হয়।
তা স্বত্ত্বেও তালেবান যোদ্ধারা আফগানিস্তানে মার্কিন নেতৃত্বাধীন বহুজাতিক বাহিনীর দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে লড়াই অব্যাহত রাখে।
দীর্ঘ দুই দশক আফগানিস্তানে মার্কিন নেতৃত্বের বহুজাতিক বাহিনীর দখলের পর ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে কাতারের দোহায় এক দ্বিপাক্ষিক চুক্তিতে আফগানিস্তান থেকে মার্কিন বাহিনী প্রত্যাহার করতে সম্মত হয় যুক্তরাষ্ট্র। এর বিপরীতে আফগানিস্তানে শান্তি প্রতিষ্ঠায় অংশ নিতে তালেবান সম্মত হয়।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের ঘোষণা অনুসারে ৩১ আগস্ট আফগানিস্তান থেকে বহুজাতিক বাহিনীর সম্পূর্ণ প্রত্যাহারের ডেডলাইন থাকলেও ৩০ আগস্ট সম্পূর্ণ সৈন্য প্রত্যাহার সম্পন্ন হয়।
মার্কিনিদের সাথে চুক্তি অনুসারে ক্ষমতাসীন থাকা মার্কিন সমর্থনপুষ্ট আফগান সরকারের সমঝোতার জন্য তালেবান চেষ্টা করলেও দুই পক্ষের মধ্যে কোনো সমঝোতা হয়নি। তালেবানের অভিযোগ, আশরাফ গনির নেতৃত্বাধীন আফগান সরকার দেশে শান্তি প্রতিষ্ঠায় তাদের আহ্বানে সাড়া দেয়নি।
এর পরিপ্রেক্ষিতে মে মাসে বহুজাতিক বাহিনীর প্রত্যাহারের মধ্যেই পুরো দেশের নিয়ন্ত্রণে অভিযান চালানো শুরু করে তালেবান।
৬ আগস্ট প্রথম প্রাদেশিক রাজধানী হিসেবে দক্ষিণাঞ্চলীয় নিমরোজ প্রদেশের রাজধানী যারানজ দখল করে তারা। যারানজ নিয়ন্ত্রণে নেয়ার ১০ দিনের মাথায় কেন্দ্রীয় রাজধানী কাবুলে পৌঁছে যায় তালেবান যোদ্ধারা। তালেবানের অগ্রসরে আশরাফ গনির কাবুল ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার জেরে আফগান প্রশাসন ভেঙে পড়ার পরিপ্রেক্ষিতে ১৫ আগস্ট কাবুলে প্রবেশ করে তালেবান যোদ্ধারা।
তবে কাবুলের উত্তরের দুর্গম পাঞ্জশির প্রদেশ শুধু তাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে রয়ে গিয়েছিলো। আফগানিস্তানে রুশ আগ্রাসন প্রতিরোধ যুদ্ধের কিংবদন্তি যোদ্ধা আহমদ শাহ মাসুদের ছেলে আহমদ মাসুদের নেতৃত্বে তালেবানবিরোধী বিদ্রোহী যোদ্ধারা এই উপত্যকায় অবস্থান নিয়েছিলো।
৬ সেপ্টেম্বর পাঞ্জশির নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে পুরো আফগানিস্তানের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে তালেবান। এর পর ৭ সেপ্টেম্বর দলীয় প্রধান মোল্লা হিবাতুল্লাহ আখুন্দজাদাকে রাষ্ট্রপ্রধান ও রাহবারি শুরার সদস্য মোল্লা হাসান আখুন্দকে প্রধানমন্ত্রী করে নতুন আফগান সরকার প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেয় দলটি।
সূত্র : আলজাজিরা ও প্রেস টিভি
