গত কয়েক বছরের তুলনায় এবারে রমজানের আগে বাজারের চিত্র কিছুটা ভিন্ন দেখা গেছে। গত বছরের চেয়ে রমজানে প্রয়োজনীয় অনেক পণ্যের দাম বাড়েনি। কিছু কিছু পণ্যের দাম কমেছে। তবে এই কমার প্রভাব পড়েনি ইফতারির বাজারে। গত বছরের দামেই বিক্রি হয়েছে বেশির ভাগ ইফতার সামগ্রী। কিছু কিছু আইটেম বিক্রি হয়েছে বাড়তি দামে। এ ছাড়া ফলের বাজারে বাড়তি দামে ক্রেতাদের অস্বস্তি দেখা গেছে। রমজানের প্রথম দিন গতকাল বাজার ঘুরে এমন চিত্র মিলেছে।
বাজার ঘুরে দেখা গেছে, গত বছরের তুলনায় এ বছর ইফতার সামগ্রীর দাম খুব একটা বাড়েনি। তবে কমেওনি খুব একটা। কারণ যেসব পণ্য দিয়ে ইফতার আইটেম বানানো হয় তার দাম কমলেও ইফতার আইটেম আগের দামেই বিক্রি হতে দেখা গেছে। শশা, লেবু, বেগুনসহ কিছু কাঁচা পণ্য রমজান সামনে রেখে গত দুইদিনে অনেকটা বেড়ে যাওয়া ক্রেতারা ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। বেড়েছে ফলের দামও। কেজিতে ১০ থেকে ২০ টাকা বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে আপেল, মাল্টা, আঙ্গুর ও কমলা। রমজানকে কেন্দ্র করে বাজারে অসাধু চক্র কৃত্রিম সংকট তৈরি করে দাম বাড়ানোর অভিযোগ ক্রেতাদের। বিক্রেতারা বলছেন, রমজানে চাহিদার তুলনায় পণ্যের জোগান কম থাকলে দাম বাড়ে বাজারে। ইফতার কিনতে আসা বেশির ভাগ ক্রেতাই অস্বস্তির কথা জানিয়েছেন।
ইফতারি আইটেমের দামের বিষয়ে স্টার কাবাব অ্যান্ড বেকারির বিক্রেতা মো. সোহাগ বলেন, ইফতার সামগ্রীর দাম গত বছরের মতোই রয়েছে। আমাদের একটা পণ্যেরও দাম বাড়ানো হয়নি। সবকিছু আগের মতোই। বেচাবিক্রি কিছু বাড়ে ইফতারের আগ মুহূর্তে। আজকে প্রথম রমজান আস্তে আস্তে চাহিদা বাড়বে।
স্টার কাবাবের প্রতি পিছ পনির সমুচা ২৫ টাকা, কিমা সমুচা ২০ টাকা, চিকেন সাসলিক ৬০ টাকা, চিকেন কাটলেট ৬০ টাকা, চিকেন নাগেট ১০০ টাকা, চিকেন কারাজি ১০০ টাকা, চিকেন উইংস ৩০ টাকা, চিকেন ললিপপ ৬০ টাকা, চিকেন অনথর ২৫ টাকা, চিকেন ক্রামচিজ বল ৩০ টাকা, চিকেন তাওয়া ফ্রাই ৮০ টাকা, জালি কাবাব ২৫ টাকা, চিকেন স্প্রিং রোল ৩৫ টাকা, ড্রাম স্টিক ২৫ টাকা, চিকেন ফ্রাই ৮০ টাকা, চিকেন ক্রাম ফ্রাই ১৫০ টাকা, ভেজিটেবল রোল ২৫ টাকা। এ ছাড়া বাটার পরোটা ৬৫ টাকা, টানা পরোটা ৩৫ টাকা, কিমা পরোটা ৬৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
প্রতি পিস চিকেন টিক্কা ১২০ টাকা, বিফ শিক কাবাব ১৩০ টাকা, চিকেন বটি কাবাব ১২৫ টাকা, বিফ আদানা কাবাব ১৪০ টাকা, বিফ বটি কাবাব ১৬০ টাকা, চিকেন কাশমেরী কাবাব ১২০ টাকা, মাটন বটি কাবাব ১৫৫ টাকায় বিক্রি করা হচ্ছে।
জিলাপি বিক্রি হচ্ছে ২৪০ টাকা কেজি, বুরিন্দা ২২০ টাকা, ছোলা ১৮০ টাকা, চপ প্রতি পিছ বড় ২০ টাকা, আঙ্গুর ৩৮০ টাকা কেজি, আপেল আকার ভেদে ৩২০ থেকে ৩৮০ টাকা, তরমুজ প্রতি কেজি ৪০ থেকে ৬০ টাকা। মেশিনে ভাজা খোলা মুড়ি ৮০ টাকা থেকে বেড়ে বিক্রি হচ্ছে ১০০ টাকায়। হাতে ভাজা মুড়ির কেজি ১৫০ টাকা। এক মাস আগে এই মুড়ি ১৩০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। বিভিন্ন কোম্পানির প্যাকেট মুড়ি ৫ থেকে ১০ টাকা বেড়ে ১৫০ থেকে ১৬০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।
রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ বাজারগুলো ঘুরে দেখে গেছে, দোকানগুলোতে বিভিন্ন ব্রান্ডের শরবত তৈরির উপকরণ সাজিয়ে রাখা হয়েছে। এগুলোর দামও কিছুটা বেশি এখন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ট্যাং, রুহ আফজা, ফস্টার ক্লার্ক, গ্লুকোজ, ফ্রুট স্যালাইন, ইসবগুল ও দেশি-বিদেশি কোম্পানির ফলের জুস। বিভিন্ন স্বাদযুক্ত শরবতের পাউডার ১-২ কেজি, ৮৪০, ৫০০, ৪৮০ ও ২৭০ গ্রামের কৌটা ও বয়ামে বিক্রি হচ্ছে। শরবত পানীয়ের বিদেশি পণ্যের মধ্যে রয়েছে নিউট্রি-সি ও ট্যাং। নিউট্রি-সি ওজন অনুযায়ী ৩০০ থেকে এক হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। আর ট্যাং ওজন অনুযায়ী ৩০০ থেকে এক হাজার ৬০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এ ছাড়াও দেশীয় প্রতিষ্ঠান হামদর্দ ফুড প্রোডাক্টের পানীয় রুহ আফজা ৩০০ মিলি ৩০০ টাকা, ৭৫০ মিলি ৫৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
এ ছাড়া রমজানকে সামনে রেখে বাজারের চাহিদার দ্বিগুণ খেজুর আমদানি হওয়ায় দাম কমেছে। এতে সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন ক্রেতারা। ঢাকায় প্রতি কেজি খেজুরের সর্বনিম্ন দাম ছিল ২৫০ টাকা। মাঝারি মানের খেজুর বিক্রি হচ্ছে ৬০০ থেকে ৯০০ টাকা কেজি দরে। আর উন্নতমানের খেজুরের দাম ছিল এক হাজার ৬০০ টাকা প্রতি কেজি।
পশ্চিম তেজতুরী বাজারের ইফতার বিক্রেতা আরিফ রহমান বলেন, অন্যান্য বছরের তুলনায় এ বছর সবকিছুর দাম কম আছে। প্রতি বছরই তো কমবেশি দাম বাড়ে। এ বছর কোনোকিছুর দাম বাড়েনি বলা যায়। আমরাও বাড়ায়নি। আজকে কম করেই তৈরি করেছি ছোলা, বুরিন্দাসহ সবকিছু। আজকের চাহিদা দেখে আগামীকাল বেশি করে তৈরি করবো।
স্টার কাবাব অ্যান্ড বেকারির বিক্রেতা মো. সোহাগ জানান, গ্রাহকের চাহিদার শীর্ষে রয়েছে কিমা সমুচা, চিকেন সাসলিক, কাটলেট, নাগেট, কারাজি, চিকেন উইংস, চিকেন ক্রামচিজ বল, চিকেন তাওয়া ফ্রাই, জালি কাবাব, চিকেন স্প্রিং রোল, ড্রাম স্টিক, চিকেন ফ্রাই, ভেজিটেবল রোল।
ফলের দাম চওড়া: রমজানে ইফতারের টেবিলে অন্যতম প্রধান অনুষঙ্গ ফল। বিশেষ করে মাল্টা, কমলা, আপেল কিংবা দেশীয় ফলের প্রতি বাড়তি নজর থাকে অনেকের। যদিও নিম্নবিত্ত, স্বল্প আয়ের মানুষের কাছে ফল বরাবরই নাগালের বাইরে। তার ওপর শুরু হয়েছে রমজান। সুযোগ সন্ধানী ব্যবসায়ীরা এরই মধ্যে দাম বাড়িয়ে দিয়েছেন। বাড়তি দামে বিক্রি হচ্ছে ফল।
ক্রেতাদের অভিযোগ, রোজা এলেই দাম বাড়ানোর প্রতিযোগিতা চলে। সব ফল বাড়তি দামে বিক্রি হচ্ছে। অন্যদিকে ব্যবসায়ীরা বলছেন, ফলের দাম বরাবরই একটু বেশি। তবে বিদেশি ফলের ওপর শুল্ককর আরোপে দাম আরও বেড়েছে।
বাজার ঘুরে দেখা গেছে, মাল্টা, কমলা ও আপেলের দাম কেজি প্রতি ২০-৪০ টাকা বৃদ্ধি পেয়েছে। রাজধানীর অধিকাংশ বাজারে প্রতি কেজি মাল্টা ৩০০-৩২০ টাকা, কমলা ২৭০-২৮০ টাকা, চায়না (মোটা) কমলা ৩০০-৩২০ টাকা কেজি বিক্রি হচ্ছে। অন্যদিকে ফুজি জাতের আপেল বিক্রি হচ্ছে ৩১০-৩২০ টাকা কেজি দরে এবং গ্রিন ও গালা আপেল ৪২০-৪৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
কাওরান বাজারে ইফতার কিনতে আসা মহিউদ্দিন বলেন, গত বছর যেমন কিনেছি। এ বছরও একই বলা যায়। দু-একটা জিনিসের দাম আকার ভেদে ১০ থেকে ২০ টাকা বেড়েছে।
