ফ্যাসিস্ট পতিত হাসিনার আমলে আহুত টেন্ডারের মাধ্যমে নিম্নমানের প্রিন্টার মেশিন ক্রয় করে কোটি কোটি টাকা লোপাটের অভিযোগ উঠেছে। মেশিন কেনার কমিশনের টাকার ভাগবাটোয়ারা নিয়ে সাবেক প্রকল্প পরিচালক জসিম ও ইফা বঙ্গবন্ধু পরিষদের প্রভাবশালী নেতা মজুমদারের মধ্যে হাতাহাতির ঘটনাও ঘটেছিল। ফ্যাসিস্ট হাসিনার দোসাররা ইফায় এখনো বহাল তবিয়তে। ফলে আওয়ামী আমলের টেন্ডারের প্রকল্পের টাকা নিয়ে এখনো সুবিধাবাদীরা কমিশন হাতিয়ে নিচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। টেন্ডারের শর্ত ভঙ্গ করে পুরনো আমলের নিম্নমানের প্রিন্টার মেশিন ক্রয় করেছে ইসলামি ফাউন্ডেশন (ইফা)। এরই মধ্যে প্রতিষ্ঠানটি কারসাজি করে একটি ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান থেকে ম্যানুয়াল পদ্ধতির মেশিন সরবরাহ নিয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী ওই প্রিন্টার মেশিন এখন যাচাই চলছে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে ইফার সাবেক প্রকল্প পরিচালক ড. হারুন উর-রশিদ গতকাল রাতে ইনকিলাবকে বলেন, ফ্যাসিস্ট হাসিনার আমলের টেন্ডার আহুত ইফার ক্রয়কৃত মেশিন নিয়ে কোনো দুর্নীতি অনিয়ম হয়নি। টেন্ডারের শর্তানুযায়ীই জাপান থেকে মেশিন ক্রয় করা হয়েছে। বিশেষজ্ঞ ব্যক্তিকে নিয়ে আমরা জাপানে গিয়ে দেখে-শুনেই মেশিন ক্রয় করেছি। বর্তমন প্রকল্প পরিচালক মহিউদ্দিন মাহিন ইনকিলাবকে বলেন, আওয়ামী লীগের আমলের টেন্ডারে ইফার মেশিন ক্রয় হয়েছে আমার আগের প্রকল্প পরিচালক ড. হারুন উর-রশিদের মাধ্যমে। গত ৩০ জুনের আগে মেশিন গ্রহণ করা হয়েছে। মেশিন ক্রয় নিয়ে কোনো দুর্নীতি হয়েছে কিনা তা আমার জানা নেই। এ ব্যাপারে প্রকল্প পরিচালক ড. হারুন উর-রশিদ বলতে পারবেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, ইফা একটি প্রকল্পের আওতায় চার রঙা ডিজিটাল প্রিন্টার কেনার জন্য ২০২৩ সালের নভেম্বরে টেন্ডার আহ্বান করে। এতে তিনটি প্রতিষ্ঠান অংশ নেয়। টেন্ডারে সরবরাহ করা প্রিন্টার মেশিনটি অবশ্যই সিস (এসআইএস) প্রযুক্তির হতে হবে বলে শর্ত যুক্ত করা হয়। এটি প্রিন্টার মেশিনের সর্বাধুনিক প্রযুক্তি। যা হাতের ছোঁয়া ছাড়াই সব কাজ করবে মেশিন। কিন্তু ইফা এখন জিশান ইন্টারন্যাশনাল নামের একটি প্রতিষ্ঠান থেকে ওই প্রযুক্তি ছাড়াই মেশিন সরবরাহ নিয়েছে। যদিও গ্রাফিক সলিউশন নামের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান দরপত্রের শর্ত অনুযায়ী মেশিনটি সরবরাহের জন্য টেন্ডারে অংশ নিয়েছিল। সূত্র বলছে, পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে প্রায় ১৪ কোটি টাকার ওই দরপত্র আহ্বান করা হয়। তখন তৎকালীন সরকারের সাবেক ধর্ম মন্ত্রীর শ্যালক নূরুল আলম ওরফে কানা আলম ও ইফা বঙ্গবন্ধু পরিষদের প্রভাবশালী নেতা আলোচিত মজুমদারের জোর লবিংয়ে ঘনিষ্ঠ প্রতিষ্ঠানকে কাজ পাইয়ে দিতে টেন্ডারের শর্ত ভেঙে প্রিন্টার মেশিন সরবরাহের কার্যাদেশ দেয়া হয়। পতিত আওয়ামী লীগের ঘনিষ্ঠরা এখনো ইফায় থেকে যাওয়ায় ওই কার্যাদেশ বাতিল করেনি। উক্ত টেন্ডারের কমিশনের মোটা অংকের ভাগাভাগি নিয়ে ওই সময়ে প্রকল্প পরিচালক জসিম ও ফ্যাসিস্ট সরকারের দোসর মজুমদারের মধ্যে হাতাহাতির ঘটনায় ইফায় তোলপাড় শুরু হয়েছিল। সাবেক প্রকল্প পরিচালক বর্তমানে অবসরে রয়েছে। এসব দুর্নীতির অভিযোগ সাবেক প্রকল্প পরিচালক জসিমের অবসর ভাতা ও পেনশনের অর্থ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ আটকে দিয়েছে। পরে বহু দেন দরবার করে তার মাসিক ভাতা মানবিক কারণে চালু করা হয়েছে।
অভিযোগ উঠেছে জিশান ইন্টারন্যাশনাল নামের প্রতিষ্ঠানটি শর্ত ভঙ্গ করে স্থানীয় বাজার থেকে জাপানের কমোরী ব্রান্ডের প্রিন্টার মেশিন সরবরাহ করে। এর বিদ্যমান প্রযুক্তি অন্তত ২০ বছর আগের। এটি ম্যানুয়ালি পরিচালনা করতে হবে। তবে ইফার টেন্ডারের শর্ত অনুযায়ী গ্রাফিক সলিউশন লিমিটেড জার্মানের অত্যাধুনিক প্রযুক্তি সম্পন্ন মেশিন সরবরাহের প্রস্তাব দিয়েছিল। ওই প্রতিষ্ঠানটির একজন কর্মকর্তা জানান, তারা জার্মান কোম্পানির যে প্রিন্টার মেশিন সরবরাহ করতে চেয়েছিলেন, সেটি ২০২৫ সাল পর্যন্ত বিশ্বে সর্বাধুনিক প্রযুক্তি সম্পন্ন প্রিন্টার মেশিন। এই মেশিনে ইফার দরপত্রের সব শর্ত পূরণ করা হয়েছে। ওই কর্মকর্তা বলেন, বিষয়টি জানিয়ে তারা এরই মধ্যে ওই মেশিন কেনার প্রকল্প পরিচালক, ধর্ম মন্ত্রণালয়ের সচিবের কাছে চিঠি লিখেছেন। এরপরও একটি প্রতিষ্ঠান থেকে পুরনো প্রযুক্তির প্রিন্টার গ্রহণ করা হয়েছে। সাবেক প্রকল্প পরিচালক ডক্টর মোহাম্মদ হারুন বলেন আমার আগে প্রকল্প পরিচালক ছিলেন জসীমউদ্দীন। সেই সময় অনেকগুলো কেনাকাটা হয়েছে। আমার কর্মকালীন কোনো কেনাকাটায় কোনো অনিয়ম হয়নি। প্রকল্প দলিল অনুসারে এবং সরকারের নীতিমালা অনুসরণ করে যাবতীয় মেশিনারিজ ক্রয় করা হয়েছে। এখানে কোনো অনিয়মের প্রশ্নই উঠে না। টেন্ডার না পেলে বড় বড় কোম্পানিগুলো তখন এই ধরনের দরখাস্ত দেয়।
