প্রথমে ধরা যাক মুহাম্মদ বিন আব্দুল ওয়াহাবের কথা – পুনর্জাগরণের প্রচেষ্টার নিরিখে, তিনি যে ইসলামের ইতিহাসের একজন বিশাল ব্যক্তিত্ব, তা নিয়ে তাঁর শত্রুদেরও কোন সন্দেহ নেই। কিন্তু তাঁর উত্তরসূরীরা – বিশেষত রাজ-ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত বর্তমান সৌদী রাজের প্রতিষ্ঠাতা আব্দুল আজিজ ইবনে সৌদ – হঠাৎ পাওয়া ঐশ্বর্যের উত্তাপ সহ্য করতে না পেরে ভোগ-বিলাসে গা ভাসিয়ে দিয়ে পশ্চিমা তথা বস্তুবাদী অবিশ্বাসীদের worldview-কে যেভাবে আত্তীকরণ করলেন এবং তার পদাঙ্ক অনুসরণ করে (ফয়সলের সীমিত ব্যতিক্রম ছাড়া) বাকী যুবরাজরা সেই ধারাকে যেভাবে অব্যাহত রাখলেন, তাতে মুহাম্মদ বিন আব্দুল ওয়াহাবের স্বপ্নের পুনর্জাগরণের প্রচেষ্টা যে বর্জ্য পদার্থের মত একপ্রকার নর্দমায় প্রবাহিত হয়ে বিলীন হয়ে গেলো – তা বলার অপেক্ষা রাখে না। আজ তাই ইসলামের শত্রুদের কাছে তো বটেই, মুসলিম বিশ্বেও ‘ওয়াহাবী’ কথাটা একটা গালমন্দের মত ব্যবহৃত হয় – অথচ, মুহাম্মদ বিন আব্দুল ওয়াহাব, কোন নতুন ‘ইজমের’ জন্ম দিতে চান নি। তিনি কেবলই চেয়েছিলেন ইসলামকে শিরক ও বিদ’আতের আবর্জনা মুক্ত করে নবী(সা.)-এঁর প্রদর্শিত পর্যায়ে নিয়ে যেতে। আব্দুল আজিজ ইবনে সৌদ কি করতে পারতেন আর কি করলেন, তার বর্ণনা দিতে গিয়ে তার পুত্রপ্রতিম, ইহুদী থেকে ধর্মান্তরিত, অস্ট্রীয়-জার্মান মুহাম্মদ আসাদ বলেছেন, His unprecedented rise to power at a time when most of the Middle East had succumbed to Western penetration filled the Arab world with the hope that here at least was the leader who would lift the entire Arab nation out of its bondage; ….. establishing a state in which the spirit of the Koran would reign supreme. But these hopes remained unfulfilled. As his power increased ….. it became evident that Ibn Saud was no more than a king – a king aiming no higher than so many other autocratic Eastern rulers before him.
……………….. Ibn Saud has, nevertheless, not displayed the breadth of vision and inspired leadership which was expected of him.
……….he indulges and allows those around him to indulge in the most extravagant and senseless luxuries.*এরপর আসুন মিসরের আল-ইখওয়ানুল আল-মুসলিমুনের প্রতিষ্ঠাতা হাসানুল বান্না এবং ঐ একই প্রতিষ্ঠানের চিন্তাবিদ সৈয়দ কুতুবের কথায়। ইসলামের belief system-এর সাথে কেবল ইসলামের worldview সংযোজিত হলেই যে ইসলামের পুনর্জাগরণ সম্ভব, এ কথাটা তাঁদের কাছে স্ফটিক-স্বচ্ছ ছিল (যদিও তাদের আক্বীদাহ বা মানহাজ নিয়ে অনেক বিতর্ক রয়েছে)। কিন্তু তাঁদের উত্তরসূরীরা নানা কারণে তাঁদের দিক নির্দেশনা হারিয়ে ফেললেন – ইসলামী belief system-এর সাথে পশ্চিমা worldview-এর সংযোজন ঘটলো – দলের একাংশ তিজারাহ্পন্থী হয়ে নানা রকম ‘ইসলামী ব্যবসায়’ জড়িত হলেন, ভাবলেন ব্যবসার মুনাফা দিয়ে, সেবা দিয়ে এবং আস্থাভাজন হয়ে, জনগণের কাছে যাবেন তারা – সেই সঙ্গে পশ্চিমা worldview-এর গণতন্ত্রের প্রতিও ঝুঁকে পড়লেন তাদের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব। দল তাদের আদি সংগ্রামী চরিত্র হারালো। ফলে তাদের দলও দিক নির্দেশনা হারিয়ে নানা ভাগে ও নানা মতে বিভক্ত হয়ে পড়লো। তাদের কর্মকান্ডের স্থবিরতায় অসন্তুষ্ট হয়ে সেখান থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া সদস্যরা গঠন করলেন “ইসলামী জিহাদ”, “আল্ গামা আল্ ইসলামীয়াহ্” এবং “তাকফির ওয়া হিজরার” মত চরমপন্থী সংগঠনগুলো – মূল অংশ টিকে রইলো গৃহপালিত ও অরাজনৈতিক একটি বিরোধীদল হিসেবে। নানা নামের আড়ালে যদিও নির্বাচন ইত্যাদিতে অংশগ্রহণ করেছেন তারা – কিন্তু বিশ্বের সবচেয়ে বজ্রমুষ্টি ও দীর্ঘস্থায়ী স্বৈরাচারের একটি – মিসরীয় রাষ্ট্রযন্ত্রের গদি তাতে টলানো যায়নি। গোটা মধ্যপ্রাচ্যে আজ যেখানে ইসলামী যত দল রয়েছে, তাদের সাথে কোন না কোন ভাবে আল-ইখওয়ানুল আল-মুসলিমুনের একটা যোগসূত্র যেমন খুঁজে পাওয়া যাবে – তেমনি মধ্যপ্রাচ্যের ইসলামী intelligentsia-র অনেকেই আদতে আল-ইখওয়ানুল আল-মুসলিমুনের দীক্ষায় দীক্ষিত। প্রয়াত মুহাম্মদ আল গাজ্জালী ও বর্তমানে কাতারে বসবাসরত ইউসুফ আল্ কারযাভী – জন্মগতভাবে মিসরীয় এই দুই ব্যক্তিত্ব, আর বৃটেনে নির্বাসিত তিউনিশিয়ার ইসলামপন্থী নেতা রশীদ ঘানুসি হচ্ছেন এমন তিন ব্যক্তিত্ব। সময়ের সাথে এদের সবার চিন্তা-চেতনার বিবর্তন ঘটেছে, এরা সবাই আল-ইখওয়ানুল আল-মুসলিমুনের প্রতিষ্ঠাতাদের স্বপ্ন-সাধ থেকে সরে এসেছেন এবং পরিণত বয়সে এরা অনুভব করেছেন যে, ইসলামী belief system-এর সাথে পশ্চিমা worldview চলতে পারে। আধুনিক বিশ্বের নিয়ন্তা রাষ্ট্রসমূহ, অন্য অনেক কিছুর সাথে তাদের worldview-এর যে বিশ্বায়ন করতে চাইছে, তার ভয়াবহতা এঁরা কতটুকু আঁচ করেছেন আল্লাহু ‘আলাম। প্রয়াত মুহাম্মদ আল্ গাজ্জালী যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন পশ্চিমা সভ্যতাকে, পৃথিবীর ইতিহাসে এযাবত কালের সবচেয়ে অগ্রগামী এবং শ্রেষ্ঠ সভ্যতা বলে বর্ণনা করেছেন । মুসলিম বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসনের প্রতিবাদে সোচ্চার পৃথিবীর এক নম্বর ফিকাহ্ শাস্ত্রবিদ বলে পরিচিত ও সম্মানিত ইউসুফ আল্ কারযাভী – গণতন্ত্রসহ বেশকিছু বিতর্কিত বিষয়ে নতুন ধারার মন্তব্য করে হালে নিজেকে আধুনিকতাবাদী বলে পরিচিত করেছেন। অপর আলোচ্য ব্যক্তিত্ব রশীদ ঘানুসি, পশ্চিমের প্রতি তার বিশেষ অনুরাগ ব্যক্ত করে সোজা-সাপটা ভাষায় বলেছেন যে তিনি একজন ‘democratic Muslim’ – এছাড়া তিনি আরেকটি বক্তৃতায় বলেছেন যে, তিনি ‘আমেরিকান ইসলাম’ প্রতিষ্ঠা করতে চান** । সুতরাং দেখা যাচ্ছে যে, উপরে বর্ণিত তিনজন ইসলামী ব্যক্তিত্বেরও আসলে ইসলামের আকীদার সাথে পশ্চিমা worldview-কে গ্রহণ করতে তেমন সমস্যা নেই – এরা সবাই মনে করেন যে, আমাদের অর্থাৎ মুসলিমদের, পশ্চিমা সভ্যতা এবং worldview থেকে গ্রহণ করার মত অনেক কিছু রয়েছে। অথচ, একটু ভাবলেই যে কেউ বুঝবেন যে, পশ্চিমা worldview তথা সভ্যতা নির্ভেজাল কুফরের উপর প্রতিষ্ঠিত – যে সভ্যতার স্থপতিরা হয় মনে করেছেন যে, আল্লাহ্ বলতে আসলে কেউ নেই – নতুবা মনে করেছেন আল্লাহর এখন আর কোন প্রয়োজন নেই, আল্লাহর মৃত্যু ঘটেছে (যেমন নি্টশে বলেছেন – নাউজুবিল্লাহ্); নতুবা মনে করেছেন যে, কেউ আল্লাহ্ সম্বন্ধে কি ভাববে না ভাববে তা নিতান্তই তার ব্যাক্তিগত ব্যাপার – দৈনন্দিন পার্থিব জীবনে আল্লাহর কোন ভূমিকা নেই: আপনি উপাসনা করতে চান খুব ভালো, ব্যক্তিগত পর্যায়ে আপনি যত খুশি উপাসনা করুন – কিন্তু সমাজ, রাষ্ট্রীয় বা আন্তর্জাতিক পর্যায়ের কোন কর্মকান্ডে আল্লাহর আদেশ/নিষেধের প্রসঙ্গ উল্লেখের কোন অবকাশ নেই।এবার আসুন ইসলামের পুনর্জাগরণের প্রচেষ্টায় নিবেদিত প্রাণ, গত শতাব্দীর অপর অন্যতম প্রধান ব্যক্তিত্ব মৌলানা মৌদুদীর প্রসঙ্গে (যদিও তাঁরও আক্বীদাহ বা মানহাজ নিয়ে অনেক বিতর্ক রয়েছে)। ব্যতিক্রমী প্রজ্ঞার অধিকারী এই ব্যক্তিত্ব বুঝেছিলেন যে, ইসলামী belief system-এর সাথে বিজাতীয় worldview চলতে পারে না। এই বিষয় থেকে উদ্ভূত পার্থক্যকে ঘিরে একদিকে অখন্ড-হিন্দুস্থানপন্থী ট্র্যাডিশনাল ‘আলেমদের সাথে তার যেমন মতবিরোধ দেখা দেয়, তেমনি পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর পরই তিনি যখন বুঝলেন যে, পাকিস্তান আসলে ইসলামী belief system বা worldview-এর উপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত কোন রাষ্ট্র নয় বরং, তা মূলত পশ্চিমা worldview-এর উপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত এক মুসলিম প্রধান ‘ন্যাশন স্টেট’ – তখনি তিনি পাকিস্তানি রাষ্ট্রযন্ত্রের সাথে সংঘাতে জড়িয়ে পড়েন। তাঁর উত্তরসূরীরা সে অবস্থান থেকে আজ অনেকটা সরে এসে, হয় – তারা মনে করছেন যে, ইসলামী আক্বীদার সাথে পশ্চিমা worldview-কে খাপ খাওয়াতে না পারলে, ইসলাম তথা তাদের নিজেদের অস্তিত্বই বিলীন হয়ে যাবে এবং একথা বিশ্বাস করে হয় তারা নিজেদের আধুনিকায়নে যত্নশীল হয়েছেন – না হয় – ইসলামী belief system-এর সাথে যে পশ্চিমা বা কুফফারের worldview কিছুতেই ‘মিশ’ খাবার নয়, এ ব্যাপারটা নিয়ে তাদের চিন্তা করারই অবকাশ হয়নি। অর্ধ শতাব্দীরও বেশী সময় ধরে একটু একটু করে অত্যন্ত নিবেদিত প্রাণ কর্মীদের ত্যাগ-তিতিক্ষা ও তাগুতপন্থীদের হাতে তাদের নির্যাতন-নিপীড়নের বিনিময়ে, আমাদের দেশে একমাত্র উল্লেখযোগ্য ইসলামী সংগঠন হিসেবে তারা যে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন – আজ তাদের বিভ্রান্ত ও হত-বিহ্বল, সঠিক দিকনির্দেশনাবিহীন দলীয় কর্মকান্ড দেখে মনে হয় যে, তাদেরও সম্ভবত পশ্চিম-অনুকরণের westoxification বা occidentosis*** রোগে ধরেছে এবং আল্লাহর আইন প্রতিষ্ঠিত করতে চাওয়া তাদের আন্দোলন প্রায় চোরাবালিতে মুখ থুবড়ে পড়েছে। এটা বলার অপেক্ষা রাখেনা যে, গত শতাব্দীতে এই উপমহাদেশে, সত্যিকার অর্থে আল্লাহর আইন প্রতিষ্ঠা করা বলতে কি বোঝায়, তার মানসচিত্র এবং তা করার জন্য প্রয়োজনীয় ইখলাস প্রাথমিক ভাবে দলগত পর্যায়ে একমাত্র তাদেরই ছিল। আজ তারা সেই লক্ষ্য হারিয়েছেন। অন্যান্য অনেক কিছুর সাথে – সাধারণভাবে জ্ঞান বিমুখতা, দূরদর্শিতাসম্পন্ন চিন্তাশীল ও গতিশীল নেতৃত্বের অভাব, সাধারণের মাঝে (যেমন বস্তিবাসী মানুষের মাঝে) কাজ করার অপারগতা বা অনীহা, স্বাধীনতার মত প্রায় সর্বজনপ্রিয় ইস্যুতে ভুল পক্ষে অবস্থান (যদিও খুব সম্ভবত তারা তাদের বিশ্বাসের ব্যাপারে বিশ্বস্ত ছিলেন এবং আমরা এখন যেমন জানি যে, হিন্দুস্থানীরা অনেক আগে থেকেই, সেই ১৯৫০-এর দশক থেকেই, ‘পাকিস্তান’ নামক দেশটিকে ভাঙ্গার চক্রান্তে লিপ্ত ছিল – তারা হয়তো তখন তা আমাদের বোঝার অনেক আগেই আঁচ করেছিলেন) ও তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার: পরবর্তীতে স্বাধীনতা যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে মজলুমের পাশে দাঁড়াতে ব্যর্থ হওয়া, (পরবর্তীতে ব্যবসায় বা) তিজারায় সাফল্য হেতু দলে তিজারাহ্পন্থী ও বিলাসিতাকামী মনোভাবের বিস্তৃতি এবং সর্বোপরি আধুনিকতাবাদীদের হাতে দলের steering চলে যাওয়া – এগুলোই হচ্ছে সম্ভবত স্বাধীনতার পর থেকে নিয়ে বর্তমান অবস্থায় উপনীত হবার প্রধান কারণসমূহ। তাদের দলের বর্তমান অবস্থা হিজবুত তাহরীর, জামাতুল মুসলিমিন বা হিজবুত তৌহিদের-এর মত নতুন নতুন গোষ্ঠীর উত্থানের পথ সুগম করে দেয় – ফলে দেশের শতধাবিভক্ত ইসলামপন্থীরা আরো বিভক্ত হলেন। উপরে উল্লিখিত নতুন গোষ্ঠীগুলোর কারো কারো অধিকাংশ কর্মী ও সমর্থকই মূলত জামাত/শিবির থেকে দলছূট এবং জামাতের কর্মকান্ডে হতাশ তথা পরিবর্তনকামী ইসলামপন্থী। দ্বীন শিক্ষায় শিক্ষিত ‘আলেমদের মুখে বাংলায় খুতবা শোনার জন্য, আমি তাদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত, ঢাকার কাঁটাবন মসজিদে (কয়েক বছর আগে পর্যন্তও) জুম্মার নামাজ পড়তাম। সেখানকার খতিবদের আগুন-ঝরা খুতবার সাথে তাদের দলের কর্মকান্ডের অসঙ্গতি, স্পষ্টতই দলের মাঝে স্ববিরোধিতার আভাস দিত।(চলবে …ইনশা’আল্লাহ্!)
Footnotes:
*page#177, The Road to Mecca – Muhammad Asad.
**page#102, Between Jihad and Salaam – Joyace M Davis
***Occidentosis: A Plague from the West – Jalal Al-i Ahmed
