Wednesday, July 15, 2026
No menu items!

আমাদের মুসলিমউম্মাহ ডট নিউজে পরিবেশিত সংবাদ মূলত বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদের সমাহার। পরিবেশিত সংবাদের সত্যায়ন এই স্বল্প সময়ে পরিসরে সম্ভব নয় বিধায় আমরা সৌজন্যতার সাথে আহরিত সংবাদ সহ পত্রিকার নাম লিপিবদ্ধ করেছি। পরবর্তীতে যদি উক্ত সংবাদ সংশ্লিষ্ট কোন সংশোধন আমরা পাই তবে সত্যতার নিরিখে সংশোধনটা প্রকাশ করবো। সম্পাদক

Homeদাওয়াই-ফেতনা থেকে সাবধান

ই-ফেতনা থেকে সাবধান

اَلْحَمْدُ لِلّٰهِ وَحْدَهُ وَالصَّلَاةُ وَالسَّلَامُ عَلٰى مَنْ لَّا نَبِيَّ بَعْدَهُ

ই-ফেতনা তথা ইলেক্ট্রনিক ফেতনা বলতে বুঝায় ইন্টারনেটভিত্তিক ফেতনা। ইন্টারনেট আবিষ্কারের মধ্য দিয়ে ই-ফেতনার উৎপত্তি হয় এবং ইন্টারনেটের বিস্তারের সাথে পাল্লা দিয়ে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে এই ফেতনা। ইন্টারনেট এক কঠিন পিচ্ছিল পথ। যেখানে ভালো দিকের পাশাপাশি নীতি-নৈতিকতা ও চরিত্র ধ্বংসকারী বহু উপাদান বিদ্যমান রয়েছে। রয়েছে ধোঁকা-প্রতারণা ও সময় নষ্ট করার অদৃশ্য হাতিয়ার। এমনকি চরিত্র হননের পাশাপাশি রয়েছে আত্মহননেরও উপাদান। এই ফেতনা পুরো পৃথিবীকে গ্রাস করে ফেলেছে। অক্টোপাসের ন্যায় আষ্টেপৃষ্ঠে ধরে বিশ্ববাসীর দম বন্ধ করে ফেলার উপক্রম হয়েছে। বয়সভেদে আবালবৃদ্ধবনিতা অনলাইনভিত্তিক বিভিন্ন অ্যাপ্লিকেশন বা সফটওয়্যার যেমন ফেইসবুক, ইউটিউব, গুগল ক্রোম, ইমো, ভিগো, লাইকি, টিকটকসহ বিভিন্ন ধরনের গেইমিং সফটওয়্যারে চরমভাবে আসক্ত। ফ্রি ফায়ার গেইম খেলার জন্য ইন্টারনেট ডাটা কেনার টাকা না পাওয়ায় আত্মহত্যার ঘটনা পর্যন্ত ঘটছে (যুগান্তর, ২২ মে-২০২১)। টিকটক বানাতে গিয়ে ভয়াবহ দুর্ঘটনা, এমনকি মৃত্যুও ঘটছে (যুগান্তর, ২০ ডিসেম্বর-২০২১)। শিশুরা ইউটিউবে কার্টুনের মধ্যে ডুবে থাকে। এর মধ্যে ঈমান বিধ্বংসী অনেক কার্টুনও রয়েছে। যা কোমলমতি শিশুদের মনের মধ্যে শিরক ও কুফরের বীজ বপন করে। ফেইসবুক, টুইটারসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের আধিপত্যের কারণে মূর্খতার সাগরে ডুবে যেতে পারে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম। ২০১৭ সালে বুকার পুরস্কার বিজয়ী ব্রিটিশ লেখক হাওয়ার্ড জ্যাকবসন সতর্ক করে বলেছেন, ‘আগামী ২০ বছরের মধ্যে আমরা এমন শিশুদের পাব, যারা পড়তে পারবে না।’ ব্রিটিশ এই লেখক জানান, শুধু তরুণ প্রজন্মই নয়, তিনি নিজেও বইয়ের প্রতি আর তেমন মনোযোগ দিতে পারেন না। কারণ তাঁর মনোযোগের একটা বড় অংশও চলে যায় সেই স্ক্রিন টাইমের পেছনে। ২০০০ থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে কিশোর-কিশোরীদের বন্ধুদের সঙ্গে কাটানো সময়ের পরিমাণ ৪০ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের এক গবেষণায় দেখা গেছে, বর্তমানে কিশোর বয়সীদের মধ্যে একাকিত্বের মাত্রা আশঙ্কাজনকভাবে বেশি (সূত্র : এন টিভি, অনলাইন ভার্সন, ২১ আগস্ট-২০১৭)। আর একাকী থাকা যুবক-তরুণের নৈতিক, মানসিক ও শারীরিক অধঃপতন কোন্ তলানীতে গিয়ে ঠেকবে তা সহজেই অনুমেয়।

ই-ফেতনা ছড়িয়ে পড়ার বিভিন্ন কারণ রয়েছে। বেকার যুবকরা হতাশায় নিমজ্জিত থাকে। কর্ম নেই, ইনকাম নেই, জীবনের শ্রী নেই, মনে শান্তি নেই, পরিবারে মর্যাদার স্থান নেই এমন যুবকরা ইন্টারনেটে বুঁদ হয়ে থাকে। একাকিত্ব দূর করা ও মানসিক যন্ত্রণা লাঘব করার জন্য ডুবে যায় ইন্টারনেটের জগতে। কিন্তু এতে হিতে বিপরীত হয়। একের পর সাইট চেঞ্জ করে নিষিদ্ধ জগতে হারিয়ে যায়। সময়ের কোনো হিসাব থাকে না। সারাক্ষণ চোখ থাকে মোবাইলের পর্দায়। ফলে মানসিক যন্ত্রণা লাঘব হওয়ার পরিবর্তে আরো দাউ দাউ করে জ্বলে উঠে। স্বাভাবিক জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। কোনো কাজ খোঁজার আগ্রহ থাকে না। কাজ করতে মন চায় না। মানুষের সাথে মিশতে ইচ্ছা হয় না। মেজাজ সব সময় খিটখিটে থাকে। ফলে বেকারত্ব ও হতাশা আরো বাড়তে থাকে। পাশাপাশি অনেক সোস্যাল মিডিয়াকর্মী অনলাইন জগতকে অর্থ উপার্জনের মাধ্যম বানিয়ে ফেলেছে। যার কারণে ভাইরাল কনটেন্ট পেলেই তা লুফে নিয়ে ফলাও করে প্রচার করা শুরু করে। ঘটনার সত্যতা যাচাইয়ের কথা চিন্তাও করে না। অথচ বিনা তদন্তে বিনা সাক্ষ্য-প্রমাণে কথা বলাটাও অন্যায় (বুখারী, হা/২৬৭১)। আর বিশ্বাস করা তো সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ (আল হুজুরাত, ৪৯/০৬)। এমনকি নীতি-নৈতিকতা বিসর্জন দিয়ে মানুষের একান্ত ব্যক্তিগত জীবনের উপরেও নিউজ করতে তাদের বিবেকে বাধা দেয় না। অথচ আল্লাহ বলেছেন, ‘হে ঈমানদারগণ! …তোমরা কারো গোপন বিষয় সন্ধান করো না’ (আল হুজুরাত, ৪৯/১২)। এর কারণ- অর্থই তাদের মূল উপজীব্য। সম্পদই তাদের একমাত্র পূজ্য। যেকোনো উপায়ে যেকোনো পথে পয়সা হাতে আসাই তাদের মূল লক্ষ্য।

তাছাড়া ইন্টারনেট আবিষ্কারের পূর্বে মানুষের পরিচিতির গণ্ডি ছিল সীমিত। যে বা যারা তাদের চিনত, তারা জেনে-বুঝেই তাদের মূল্যায়ন করত। কিন্তু ইন্টারনেটের কল্যাণে এখন মানুষের পরিচিতির ভৌগলিক কোনো সীমারেখা নেই। ফেইসবুক, ইউটিউবের মাধ্যমে মানুষ নিজেকে বিশ্বব্যাপী তুলে ধরার সুযোগ পাচ্ছে। একজন প্রকৃত জ্ঞানী তার জ্ঞানকে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দিতে পারছে। ঘরে বসেই মানুষ জ্ঞান আহরণ করতে পারছে। এটা নিঃসন্দেহে ভালো দিক। কিন্তু বড় ভয়ঙ্কর ব্যাপার হলো, এই সুযোগকে কাজে লাগাচ্ছে দুনিয়ালোভী, স্বার্থপর, প্রবৃত্তিপূজারী কিছু মানুষ। জ্ঞানের জগতে যারা মিসকীন তারাই বনে যাচ্ছে সেলিব্রিটি। আত্মপ্রচারের তীব্র লালসার বশবর্তী জ্ঞানহীন এ লোকগুলো নিজেদের মঞ্চস্থ করছে দ্বীন প্রচারের ময়দানে। আর প্রকৃত জ্ঞানী, দুনিয়াত্যাগী, আল্লাহভীরু ও সৎ লোকেরা থেকে যাচ্ছে লোকচক্ষুর অন্তরালে। এর পিছনে আম-জনতার যে কোনো দোষ নেই, তা বলা যাবে না। অনলাইনে সুপরিচিত ব্যক্তি ছাড়া ওয়ায-মাহফিল নয়। বক্তব্যে ইলমের খোরাক কিছু নাই-বা থাক কথা বলার কৌশলই হয় বক্তা নির্বাচনের মূল বিষয়। জনগণ এই মানসিকতা থেকে বের হতে না পারলে না অর্বাচীন লোকদের সেলিব্রিটি বনে যাওয়ার উদগ্র বাসনা বন্ধ হবে না কখনও।

পাশাপাশি ই-ফেতনার ভয়াল থাবা পড়েছে আমাদের দেশের কিছু তরুণ তালেবে ইলম। এদের মধ্যে জ্ঞান-গরীমায় ভালো কেউ নেই তা নয়; তবে অধিকাংশের অবস্থা চরম শোচনীয়। কিন্তু আত্মপ্রচারের তীব্র বাসনা তাদেরকে একেবারেই নিচে নামিয়ে দিয়েছে। জ্ঞান অর্জনের চিন্তা নেই, কোনো চেষ্টা-তদবীর নেই, আছে শুধু সেলিব্রিটি হওয়ার জন্য বক্তব্য অনুশীলনের হীন প্রচেষ্টা। এদের মাধ্যমে জাতির কাছে কিছু ভালো কথা গেলেও অনেক স্পর্শকাতর বিষয়ে ভুল তথ্য চলে যাচ্ছে। ফলে সার্বিক বিচারে জাতির বিপথগামী হওয়ার পথ প্রশস্ত হচ্ছে।

ইলমী অঙ্গনে ই-ফেতনার সবচেয়ে ভয়ংকর একটি দিক হলো- অতি আবেগী কিছু তরুণ তালেবে ইলম দেশের বড় বড় উলামায়ে কেরামের ‘পান থেকে চুন খসলেই’ তাদের ক্ষেত্রে এমন শব্দ প্রয়োগ করা শুরু করেছে, যা রীতিমতো উলামায়ে কেরামের গ্রহণযোগ্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলছে। আলেমদের কথা শুনে সাধারণ মানুষ আমল করবে, কিন্তু এর ফলে উল্টো আলেমদের প্রতি অনাস্থা তৈরি হচ্ছে। বুদ্ধিহীন অবিবেচক এসব তরুণরা দেশের কোনো আলেমকে ছাড় দিচ্ছে না। কোনো না কোনো দিক থেকে সমালোচনা করে তাদের বিতর্কিত করার চেষ্টা করছে। এমন কোনো আলেম পাওয়া দুষ্কর হবে, যার সমালোচনা করা হয়নি বা হচ্ছে না। ফলে আরবী না জানা জেনারেল শিক্ষিত সমাজ এবং সাধারণ মানুষ আজ সমালোচনাহীন অনুসরণীয় কোনো আলেম পাচ্ছে না। ফলস্বরূপ সমাজের অধিকাংশ মানুষ আজ আলেমবিমুখ হয়ে যাচ্ছে। যা উম্মাহকে ভয়াবহ এক ক্ষতির দিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে।

অনলাইনে এক আদর্শের লোক অন্য আদর্শের বিরুদ্ধে বিষোদগার করছে। এক পক্ষ আরেক পক্ষকে গালি-গালাজ করছে। নিজের মতের চেয়ে সামান্য ভিন্ন মত কেউ ব্যক্ত করলেই তিলকে তাল বানিয়ে সোস্যাল মিডিয়া গরম করা কিছু মানুষের নেশা ও পেশায় পরিণত হয়েছে। অন্যের বিরুদ্ধে কিছু বলতে পারাটাই এদের কাছে যোগ্যতার মাপকাঠি হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই ইলমী ময়দানের অর্বাচীন তালেবে ইলমগুলো নিজের যোগ্যতার লেভেল বাড়াতে মরিয়া হয়ে উঠেছে। ফলশ্রুতিতে ইসলামী আক্বীদা-আদর্শ লালনকারী লোকগুলো আজ শতধা বিভক্ত হয়ে পড়ছে এবং এই বিভক্তি পূর্বের যেকোনো সময়ের তুলনায় অগ্নিস্ফুলিঙ্গের ন্যায় লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে। অতি আবেগী এই ভাইয়েরা এই বিভক্তির ক্ষেত্রে তাদের দায় কোনোভাবে এড়াতে পারবে কি-না তা গভীরভাবে ভাবা উচিত।

অস্ত্র দিয়ে ত্রাস সৃষ্টি করা যায়, আবার সন্ত্রাসও নির্মূল করা যায়। তাই আসুন! ইন্টারনেটকে অভিশাপ নয়, আশির্বাদ হিসেবে গ্রহণ করি। এর ভালো দিকগুলোর সর্বোত্তম ব্যবহার করে নিজেরা সমৃদ্ধ ও সংশোধিত হই, জাতিকে সংশোধন করি। আল্লাহ আমাদের তাওফীক দান করুন। আমীন ইয়া রব্বাল আলামীন!

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

eighteen − 9 =

সবচেয়ে জনপ্রিয়

সাম্প্রতিক মন্তব্য